স্বপ্ন, স্বপ্নের ভিতরে স্বপ্ন, এবং…

বিশ্বদীপ দে



অরণ্যের স্বপ্নে কাল শ্রীময়ী এসেছিল।
শেষ রাত বা ভোরের স্বপ্ন নয়। দুপুরের স্বপ্ন। বলা যায় ভাতঘুমের স্বপ্ন। ছুটির দিনে দুপুরে ঘণ্টা দেড়েকের এই ঘুম অরণ্যর বড় প্রিয়। কাল ওর ছুটি ছিল। দুপুরের ঘুমে ছুটির অবসর কাটাতে কাটাতে ও বুঝতে পারল শ্রীময়ী এসেছে।
শ্রীময়ী সোফায় বসে ছিল। আরাম করে শরীরটাকে ইচ্ছেমতো মুড়ে রেখেছিল সে। কোথাও কোনও শব্দ ছিল না। ভাদ্রমাসের চড়া রোদ ঘরের এককোণের জানলা দিয়ে ঢুকছিল। অরণ্যর বালিশের পাশে রাখা ভাঁজ করা খবরের কাগজটা পাখার হাওয়ায় উড়ছিল ফরফর করে। একটা দুটো পাখির ডাক কিংবা দূরে কোনও বাড়িতে মিস্ত্রিরা কাজ করছিল, সেই শব্দের ক্ষীণ আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। আর কোনও শব্দ ছিল না।
শ্রীময়ী সোফায় বসে ছিল। খানিক আনমনে। আর অরণ্য তাকে দেখছিল। অনেকদিন পরে শ্রীময়ীকে এত মন দিয়ে দেখার সুযোগ পেল সে। শ্রীময়ীর গলার একটু নীচে অবস্থিত আঁচিল, কানের পাতলা সোনার রিং, থুতনির সুডৌল নরম গড়ন--- সবই নজরে পড়ছিল তার।
মাঝে মাঝেই রাগ হলে নিজের বাহু ব্লেড দিয়ে কেটে ফেলত শ্রীময়ী। অনেক দিন বাদে সেই দাগগুলো দেখে মনের মধ্যে একটা প্রশ্ন ভেসে উঠল অরণ্যর। শ্রীময়ী কোনওদিন হাতের শিরা কেটে ফেলার চেষ্টা করেনি। কেবল ব্লেড দিয়ে বাহুর নরম ত্বকের উপরে আঁকিবুকি কাটত। তখন তো আর ব্লু হোয়েল গেম ছিল না। তা হলে হাত কেটে ব্লেড দিয়ে কী লিখতে চাইত শ্রীময়ী! এটা তার কাছে কি কোনও খেলা ছিল?
এই সব সাত-পাঁচ ভাবনার মধ্যে দিয়ে সময় যাচ্ছিল। স্বপ্নের মধ্যে সময় বোঝা যায় না। অরণ্য বোঝার চেষ্টাও করেনি। স্বপ্নের মধ্যে তো এটাও বোঝা যায় না সেটা স্বপ্ন। যা হচ্ছে তাকেই সত্যি বলে মনে হয়।
আচমকাই ঘুম ভেঙে ধড়মড় করে উঠে বসেছিল অরণ্য। অবাক হয়ে দেখেছিল জানলার পাশে পড়ে থাকা রোদ। শুনেছিল কাগজের ফড়ফড়, দূরে পাখির ডাক ইত্যাদি। স্বপ্নের আবহটা অবিকল অরণ্যর চারপাশে। কেবল শ্রীময়ী নেই। উঠে গেছে।
সোফাটা এখন খালি। বাদবাকি দৃশ্য ও শব্দ একেবারে স্বপ্নের মতো। কোথায় গেল শ্রীময়ী। ভাবতে ভাবতে উঠে জানলার কাছে চলে এসেছিল অরণ্য। শ্রীময়ী আমেরিকায় থাকে। সে মৃত নয়। মৃত মানুষ যখন স্বপ্নে আসে তখন সে তাড়ায় থাকে। হয়তো পথচলতি দেখা হয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে দু-একটা কথা বলে চলে যায় সে। কিংবা বাড়িতে এলেও একটা অস্থিরতা থাকে। যেন যে কোনও সময়ে চলে যেতে হবে। হয়তো স্বপ্নের মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই দরকারি কথাটুকু বলে রাখার জন্যই একটা দ্রুততা স্বপ্নের মধ্যে পাক খেতে থাকে।
শ্রীময়ী বহাল তবিয়তে আছে। ক’দিন আগেই সূর্যগ্রহণের ছবি পোস্ট করেছিল ফেসবুকে। শ্রীময়ীর কোনও তাড়া ছিল না। একটা অদ্ভুত আলসেমি যেন তাকে পেয়ে বসেছিল। আনমনে একটা নিরালা দুপুরের স্বপ্নের মধ্যে শ্রীময়ীর দেখা পেয়ে অবাক হয়ে গেল অরণ্য।
এখন শ্রীময়ীদের ওখানে ক’টা বাজে? সময় যাই হোক, ধরেই নেওয়া যায় মধ্যরাত। নিজের বিছানায় সেও ঘুমে অচেতন। শ্রীময়ীও কি স্বপ্ন দেখছিল সে অরণ্যর সামনে বসে আছে?
এলোমেলো ভাবনার ভিতরে অরণ্য যেন কী একটা হাতড়াচ্ছিল। ব্রেক আপের পাঁচ বছর পরে আচমকা কেন সে দেখল শ্রীময়ীকে। সাইকোলজিস্টরা বলতে পারবেন।
তনয়াকে কি এই স্বপ্নের কথা বলা যায়? ভাবতেই হাসি পেল অরণ্যর। না বলার কী আছে! তনয়া মোটেই খারাপ মনে করবে না। সে ভাল করেই জানে শ্রীময়ীর সঙ্গে সবকিছু একেবারে শেষ হয়ে গেছে কবে! এখন আচমকা এই স্বপ্নে মোটেই প্রমাণ হয় না, যে অরণ্য দিনরাত শ্রীময়ীকে ভাবছে।
তা ছাড়া… ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল অরণ্য। শ্রীময়ীর সঙ্গে শেষের দিনগুলো এত খারাপ কেটেছে ওর কথা ভাবতে গেলেই সেগুলোও হুড়মুড় করে এসে পড়ে। দুটো পরিবারের মধ্যে গণ্ডগোল, শ্রীময়ীর অকারণে ওকে দোষারোপ… ধুসস! বিরক্ত অরণ্য সিগারেট ধরাল। তনয়াকে একটা ফোন করবে নাকি?
নাহ। থাক। অফিসে আছে। এখন এ সব কথা ওকে বললেও ফোনে সে ভাবে রিঅ্যাক্ট করতে পারবে না। তার থেকে থাক। আসুক, তার পর বরং বলা যাবে।
ঘুম আর আসবে না। অরণ্য ল্যাপটপটা অন করে গান চালাল। তার পর ফাঁকা সোফাটার দিকে তাকিয়ে বসে থাকল। কিছুক্ষণ আগেই এখানে শ্রীময়ী বসেছিল। ভাবতেই হাসি পেল।
গুলাম আলি গাইছেন। ম্যায় নজর সে পি রাহা হুঁ। চোখ বুজে গান শুনছিল অরণ্য। শ্রীময়ীর ইচ্ছে ছিল, একসঙ্গে দু’জনে মিলে গুলাম আলির কনসার্ট শুনবে। কথাটা মনে হতেই অবাক হল অরণ্য। যাহ বাবা! তা হলে এই জন্যই কি ও গুলাম আলি চালাল এখন। কী হচ্ছে এ সব! শ্রীময়ীকে তো সে একেবারেই ভুলে গেছে। বিরক্তিতে মুখ দিয়ে চিক করে একটা শব্দ করল অরণ্য।
কয়েকদিন আগেই কথা হচ্ছিল তনয়ার সঙ্গে। তনয়া বলছিল, ওর আর অর্জুনের কথা সে ভাবে মনে পড়ে না। তবে কদাকচ্চিৎ মনে পড়লে অবশ্য ভালই লাগে। ওর সঙ্গে কাটানো ভাল সময়গুলো মনে পড়ে। শুনে অরণ্য লঘু রসিকতায় ডুবিয়ে কয়েকটা কথা বলেছিল, ‘বাহ ভাই, এখনও চলছে তোমাদের মধ্যে। আমি ও সব কবে...’
তনয়া হঠাৎ খানিক সিরিয়াস হয়ে হয়ে বলেছিল, ‘সে আমি কি তোমার মনের মধ্যে ঢুকে দেখতে যাচ্ছি। দ্যাখো, একেবারে মনে পড়ে না, এ কথাটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’
তার পরেই কিছু একটা হয়েছিল। হয় ফোন বেজেছিল, কিংবা ডোরবেল। অথবা অন্য কোনও কথা উঠে এসেছিল আচমকা। মোদ্দা ব্যাপার হল, কথাটা আর এগোয়নি। তা হলে সেদিনের আলোচনাই অবচেতনের খেলায় শ্রীময়ীকে ফিরিয়ে আনল?
খুট করে একটা শব্দ হতেই অরণ্য চোখ খু‌লল। আর কারেন্ট শক খাওয়ার মতো চমকে উঠে দেখতে পেল শ্রীময়ী ফিরে এসেছে! একই ভাবে বসে আছে সোফার উপর।
অরণ্য কথা বলতে গিয়ে দেখল, গলায় কোনও স্বর ফুটছে না। যেরকমটা স্বপ্নে হয়। তা হলে এটাও কি একটা স্বপ্ন! কিন্তু স্বপ্নে কি এ কথা ভাবার সুযোগ হয় এটা স্বপ্ন কি না।
সব গুলিয়ে যাচ্ছে অরণ্যর। সে উঠে গিয়ে শ্রীময়ীর কাছে এসে বসল। শ্রীময়ী কোনও কথা বলল না। কিন্তু তার কথা স্পষ্ট শুনতে পেল অরণ্য।
---ভাবছ এটা স্বপ্ন কি না। তাই তো? ভেবে কী হবে। ধরে নাও, আজ বিশ্ব স্বপ্ন দিবস। আজ সবারই স্বপ্নগুলো সত্যি হওয়ার দিন।
অরণ্য মৃদু হাসল। মনে মনে বলল, তা হলে কি তনয়াও...
মনে মনে বলা কথাই স্পষ্ট শুনতে পেল শ্রীময়ী। মনে মনেই উত্তর দিল, ‘ওর কি এখন স্বপ্ন দেখার সময়! অফিসের কাজের মধ্যে কি মানুষ স্বপ্ন দেখে! ও হয়তো পরে দেখবে। কিংবা আদৌ দেখবে না।’
চুপ করে বসে আছে দু’জনে। গুলাম আলি গান গাইছেন। সেই কথা আর সুরের মধ্যে ওরা চুপ করে বসেছিল। যেমনটা থাকত অনেক বছর আগে। অরণ্যর বুকের মধ্যে কত কথা বিজবিজ করছিল। কিন্তু শ্রীময়ী চোখের ইশারায় কথা বলতে বারণ করছে। যেন কথা বললেই স্বপ্নের ঘোর কেটে যাবে।
অরণ্যর ইচ্ছে করছে শ্রীময়ীক আরও কাছে যেতে। কিন্তু কেন যেন ওর মনে হচ্ছে, আরেকটু এগোলেই শ্রীময়ী চলে যাবে। যেন এইটুকু প্রাপ্তিই এই স্বপ্নের কপিরাইট।
তনয়ার ফিরতে এখনও দেরি। কিন্তু তখনও যদি না যায় শ্রীময়ী। তনয়া কী ভাববে। ভাবার সঙ্গে সঙ্গে শ্রীময়ীর চিন্তার তরঙ্গ এর মনের মধ্যে ধাক্কা দিল।
---ও এলেও কিছু বুঝবে না। বুঝবে কী করে, এই স্বপ্ন তো আর ওর স্বপ্ন নয়। কেউ কারও স্বপ্নে অধিকার পায় না। আর এটাও তো আখেরে একটা স্বপ্নই। কেবল আমার আর তোমার কাছেই এটা সত্যি।
অরণ্যর মনে হচ্ছিল, এই ঘরটা যেন একটা ডুবো জাহাজ। স্মৃতির ভিতরে ঘাপটি মেরে এগিয়ে যাচ্ছে।
জানলা দিয়ে আসা চড়া রোদের আভা টের পাচ্ছিল অরণ্য। রোদের স্বপ্ন সে হয়তো আগে দেখে থাকবে। কিন্তু স্বপ্নের রোদ এই প্রথম স্পর্শ করছে তাকে।
শ্রীময়ী সোফায় বসে ছিল। আরাম করে শরীরটাকে ইচ্ছেমতো মুড়ে রেখেছিল সে।