অমিল ঠিকানায়

অনিন্দ্য বর্মন





সকাল ৮টা। ব্যস্ত বাজার এলাকা গমগম করছে। হরেক পসরায় বিকিকিনি। একাধারে মাছ, মাংস; অন্যদিকে ফল, ফুল, সবজীর মহামিলন উৎসব। হবে নাই বা কেন? একে রবিবারের বাজার, তায় কাল জন্মাষ্টমী, পরশু ১৫ আগস্ট। বাজারের স্থায়ী-অস্থায়ী দোকানগুলো উপচে পড়ছে ভিড়ে। ওদিকে এক মাসিমা কেলে ফুলওলার সাথে ঝগড়া বাঁধিয়েছেন। বেচারা ফুল দিতে গিয়ে পিঁয়াজের বস্তার ওপর ফুলটা রেখেছিল। অন্যদিকে এক বয়স্ক জ্যেঠু মাছের দাম নিয়ে গলার পারদ আসমানে তুলে ফেলেছেন। ১৪০০'র ইলিশ কোনভাবেই ১০০০'এ নামানো যাচ্ছে না। বাজারের সবর্ত্রই এক ছবি।
সকাল থেকেই রঘুর মন খারাপ। রঘু এই বাজারের মাছ বিক্রেতা। তার বাধাধরা খদ্দেররা আজ প্রায় কেউই আসেনি। দু'চারজন যাও বা এসেছিল, কাল জন্মাষ্টমী বলে কিছুই কেনেনি। এমন সময়েই লোকটাকে দেখতে পেল রঘু। ঢোলা পাজামা, ময়লাটে ফতুয়া, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, উস্কোখুস্কো চুল— একটু অদ্ভুতুড়ে হলেও চেহারায় একটা ভদ্রতার ছাপ আছে। ফতুয়ার বুক পকেটে সস্তার পেন, হাতে একটা কাগজ। নিশ্চয়ই ফর্দ! রঘু হেঁকে উঠল─ ‘অ দ্যাদা, ইদিকে শুনেন। এই দ্যাকেন কত্ত মাচ।’ রবিবারের বাজার চাঙ্গা থাকে বলেই আজ হরেক মাছ নিয়ে বসেছিল রঘু। তার সামনের কলাপাতায় লোভনীয় শুয়ে আছে পার্সে, আড়, ভেটকি, চিংরি, মাগুর ইত্যাদি। রঘুর ডাকে লোকটা এগিয়ে এল। ─ ‘দাম কত?’ রঘু বলল। ─ ‘অ, তা কী কী মাছ এখানে নেই? হুম। ট্যাংরা নেই, পমপ্লেট নেই, শিঙি নেই...আর?’ রঘুর চোখের অবাকের দিকে মিচকি হেসে লোকটা চলে গেল।


- কী বুঝলে?
- বাজারে ট্যাংরা নেই। তবু, আজ হোটেলে ট্যাংরার ঝাল খেলাম!
অম্লান হেসে ফেলে। সে এই পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার। তার সামনের সরল মানুষটি পার্টটাইম ফিচার লেখক জগদীশ। অম্লানের জগাইদা। অফিসে অবশ্য জবুদা নামটাই বিশেষ পরিচিত। জগদীশের পদবীতেও মিল, বসু। '৬৭র ৩০ নভেম্বর জন্ম নেওয়া শিশুটির নামকরণ করা হয় জগদীশ। নামের মাঝে ‘চন্দ্র’ যুক্ত হওয়ার আগেই বাবা-মায়ের নামের আগেই ‘চন্দ্র’ যুক্ত হয়। নাহ, জগা বোসের সামান্য চেষ্টা বাস্তব হয়নি, সে বৈজ্ঞানিক হতে পারেনি। ‘জ’ আর ‘ব’-র মিলে দীর্ঘ দুই দশক তাকে জবুদা বলেই চেনে।
- তুমি তো হোটেলেই দু’বেলা খাও?
- নয়তো আর কোথায় খাব? তোর বউ কী রোজ আমার জন্য রেঁধে পাঠায়?
অম্লান লজ্জিত হল।
- আচ্ছা, পরশু অমিত্রাকে বলব তোমার জন্য কিছু পাঠাতে। বলো, কী খাবে?
- অই দেখো, তোকে আমি কিছু বলিচি? বরং একটা হেল্প করতে পারিস।
- কী?
- সেই কোন ছোট্টবেলা থেকেই হোটেলে খাই। জীবনেও তো বাজারে যাইনি রে ভাই। ইদিকে নাশপাতি তো সেদিন ইয়াব্বড় হেডলাইন দিল লিখতে। ‘বর্তমান যুগে বাঙালীর ভাতে মাছের অভাব।’
অম্লান হেসে ফেলল।
সম্পাদক অবিনাশ নস্করকে সবাই আড়ালে নাশপাতি বলে। ভদ্রলোক যার ঘাড়ে চাপেন, আক্ষরিক অর্থেই তাকে নাশ করেন। কয়েক সন্ধ্যে আগে তিনি জগদীশের কাঁধে চেপে বসলেন─
- জবুদা, মাছ খান?
- আজ্ঞে? জগদীশ বুঝতে পারেনি তাকে কীভাবে নাশের মতলব করা হয়েছে। ─ হ্যা, মানে খাই স্যার।
- কী কী মাছ খেতে ভালবাসেন?
- তা...ইয়ে...চারাপোনা, তেলাপিয়া...
- আর?
- ইয়ে...রুইএর পেটি ভালো লাগে...
- দামী কোনও মাছ খান? এই যেমন ধরুন আড়, ভেটকি, পমফ্রেট, ম্যাকরেল, স্যামন, ট্যুনা?
- আজ্ঞে, আড়, ভেটকি মাঝে মাঝে খাই। কিন্তু ওই সামন, টোনা...?
- নাম শোনেননি তো! নাশপাতি খেঁকিয়ে উঠল─ একটু তো পড়াশোনা করতে হবে, ভালোমন্দ খেতে হবে। তবে তো লেখা বেরোবে। তা ইলিশ না চিংড়ি?
- অ্যাঁ?
প্রশ্নবাণে জগদীশ তখন জর্জরিত। অফিসের সবাই তখন নাশপাতির মন বোঝার আপ্রান চেষ্টায়। খাঁড়া শেষ অবধি জগদীশের কাঁধে নামল, তবে ধীরে...
- বুঝলেন জবুদা, আজকের বাজারে বাঙালীর প্রিয় মাছ অমিল। আসল ভেটকির দেখা নেই, বম্বে ভেটকিতে বাজার ছেয়ে গেছে। তোপসে পাওয়া যায় কালেভদ্রে। বান, প্যাঁকাল, মৃগেল, শিঙ্গি, মাগুর, চিতল ইত্যাদির দেখা নেই। এই যে বাজারে মাছের অভাব, বাঙালীর পাতে মাছ পড়ছে না, এই নিয়ে দিন ১০-১২র মধ্যে একটা জম্পেশ নামিয়ে ফেলুন।


লেখাটা পড়ল অম্লান। পরপর দু’বার। না! সত্যিই কিছু করার নেই। জগাইদার লেখা শেষ হয়েছে বটে, তবে তা ‘বর্তমান যুগে বাঙালীর ভাতে মাছের অভাব’ হয়নি, হয়ে গেছে ‘বাজার: এক চলচ্চিত্র।’ এই লেখা পড়ে সাব-এডিটর রতনদা জগাইদাকে মারতে গেছিল। সকলে মিলে কোনওমতে থামিয়েছে।
অম্লানের মনটা আরও খারাপ হয়ে যায়। কু-বুদ্ধিটা তো সে-ই দিয়েছিল।
- একটু বুদ্ধি দেনা ভাই।
- তুমি এক কাজ কর জগাইদা। হোটেলে জিজ্ঞেস করে হবে না। বরং নেট সার্ফ করে দেখতে পারো। অথবা একদিন, একটু বাজারটা ঘুরেই এসো। অনেক রকমের মাছ দেখতে পাবে। মাছওলাদের সাথে কথা বলে মাছের সাপ্লাইএর, বিক্রিবাট্টা ইত্যাদি ব্যাপার-স্যাপারও জানতে পারবে।
বাজার ঘুরে এসেই জগাইদা লেখাটা লিখেছে। অম্লানের চোখ বিশেষ এক জায়গায় কেন্দ্রিত হল। জগাইদা লিখেছে─ ‘ওহো! বেচারা পেঁয়াজ জানত না যে সবজী হলেও আম-বাঙালী তাকে আমিষ হিসেবেই দেখেন। কী দারুন সংস্কার। আচ্ছা, ফুলটা যদি কেউ না কেনে, ২০টাকা লোকসান কে পূরন করবে? এর থেকেও বড় প্রশ্ন হল কৃষ্ণ কী বাঙালী ছিলেন? মাছ-মাংস খেতেন? পুতানার দুগ্ধপান করেছিলেন। রাক্ষসীর দুধ আমিষ না নিরামিষ?’ আর এক জায়গায় জগাইদা লিখেছে─ ‘ইলিশটা ১০০০’এ হল না। ১২০০’ অবধি নেমেছিল খাঁদু। মাছওলা আর খদ্দের─ দু’জনেরই মন ভারাক্রান্ত। তবু মরিয়া চেষ্টা। অর্ধেক ইলিশ বিক্রি হল ১১৫০’এ। এবারে হাসি দেখা গেল। দু’টি মনের নরম হাসিতে ফুল আর পেঁয়াজের আদা-কাঁচকলা সম্পর্ক ঠাঁই পেল না।’ আরেক জায়গায়─ ‘লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে বলে গেল─ বুঝলেন কিনা, কাল ছেলের জন্মদিন। মাংস খেতে চাইছে। এদিকে বাড়িতে পুজো। এখন গিয়ে আবার ফিরে আসতে হবে। পুজোর জিনিসপত্রের সঙ্গে তো মাছ-মাংস নেওয়া যাবে না। জিজ্ঞেস করলাম─ কাল পুজো তাহলে মাংস...? ওই, বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মাংসটা পরশু রান্না হবে। আহা রে! জন্মাষ্টমী বলে বাড়ির একরত্তি কৃষ্ণটা পুজো পাবে না?’
- অম্লান, নাশপাতি ডাকছে।
অম্লান উঠে দাঁড়াল। সম্পাদকের কেবিনে ঢুকল।
- স্যার?
- বসো। পড়লে?
- কী?
- জবুদার লেখা? ওটা ছাপা যাবে না।
- জানি স্যার।
- কী জানো? ধমকে উঠল নাশপাতি─ কাজটা তুমি কন্ডাক্ট করবে। মাছের থেকেও much much ইম্পরট্যান্ট বিষয় পড়ে আছে। একটা লেখা তো রেডি আছেই। আরও ১৮-১৯টা জোগাড় কর। পরবর্তী সংখ্যা ‘বাজার: এক সম্পর্ক।’