ইচ্ছাপূরণ

প্রকল্প ভট্টাচার্য



ছোট্ট রুম্পির কথা শুনে স্বয়ং মা দুর্গা ঘাবড়ে গেলেন। এ আবার কী প্রার্থনা!
-"আর একবার বলো, কী চাও তুমি?"
একইরকম মিষ্টি, ঠান্ডা স্বরে রুম্পি বললো, "মা, আমি চাই তুমি কোনো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আর এসো না। যুদ্ধ তো অনেক হলো, এবার সত্যিকারের মায়ের মতো এসো!"
-"সত্যিকারের মা!"
-"হ্যাঁ, যেমন আমার মা। আমি দুষ্টুমি করলে বকে, মারেও, কিন্তু কখনোই অস্ত্র নিয়ে আমায় মেরে ফেলবার, কেটে ফেলবার কথা ভাবতেও পারে না। তাই আমি জানি, মা আমাকে ভালোবাসে ভীষণ। অথচ কেমন মা তুমি? অসুর কি তোমার ছেলে নয়? মারতে হবে কেন?"
দুর্গা বোঝাবার চেষ্টা করলেন, "আরে, সত্যি কি আর মারি! ওটা তো একধরণের প্রতীক, যাতে বোঝানো হয় অশুভের পরাজয় আর শুভর জয়!"
এবার রুম্পি ভুরু কোঁচকালো, "সত্যি মারো না? তাহলে সবাই দশপ্রহরণধারিনী, মহিষাসুরমর্দিনী বলে কেন তোমায়? পায়ের নীচে মোষের মাথাটা কেন? সন্ধিপুজোর সময় কী হয়েছিল? অসুরের গায়ে বুকে এত রক্ত কেন? আবার তুমিই তো কালী ঠাকুর হয়ে কাটা মুন্ডু হাতে ঝুলিয়ে... ইশ কি ভায়োলেন্ট ! কেন মা, এইরকমভাবে আমাদের ভয় দেখাতে খুব ভালো লাগে তোমার!"
-"কিন্তু এত যুগ ধরে এত মানুষ আমাকে যে রুপে দেখে অভ্যস্ত..."
-"তাহলে যাও, আমার ইচ্ছাপূরণ করে কাজ নেই তোমার। সকলের হাততালি কুড়োও আর খুশী থাকো!"
ছোট্ট রুম্পিকে অভিমান করতে দেখে মা দুর্গার কষ্ট হয়, কিন্তু তিনি তো নিরুপায়! এ যে অসম্ভব প্রার্থনা! অস্ত্র না নিয়ে, অসুর না মেরে তিনি দুর্গা হবেন কী করে! আবার একটা ছোট্ট মেয়েকে ইচ্ছাপূরণের বর দিয়েছেন তিনিই, সেটাও ফেলে দেওয়া যায় না...
শেষ চেষ্টা করবার জন্য বললেন, "আচ্ছা, তুমি এর বদলে অন্য কোনো বর..."
-"দরকার নেই, বললাম তো! যে মা শাসনের নামে অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে, হত্যা করে কাটা মাথা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, সেই মায়ের কোনো আশীর্বাদ আমার চাইনা!"
অগত্যা দুর্গা এলেন মহাদেবের শরণে। তাঁর কোনো হেলদোল নেই, সব শুনে বললেন, "তা বেশ তো, ভালোই বলেছে। দশটা হাতেরও তাহলে দরকার হয় না, এক হাতে অসুরের কানটা ধরে অন্য হাতে চড় মারবার ভঙ্গী করলেই..."
টুং-টুং করে আপত্তি জানালেন সরস্বতী। "সে আবার কী! আমাকেও তো অনেকে মা ডাকে, আবার পড়াশোনা করেনা বলে পরীক্ষায় ফেলও করে। কই, আমি তো তাদের কান মুলে চড় মারিনা!"
লক্ষ্মীও সায় দিলেন, "ঠিক। মা তো আমিও, কিন্তু মারধর কেন!"
নিজের কাছের লোকেদের সমর্থন না পেয়ে দুৰ্গা বিচলিত হয়ে বললেন, "ওরে, তোদের কি আর আমার মতো মহিষাসুর সামলাতে হয় রে! অতো ভয়ংকর..."
-"না মা, এ যুক্তি টিকবে না।" এবার গণেশের সোজা কথা। "মহিষাসুর যখন তোমারই ছেলে, তুমিই বা ওকে এত ভয়ঙ্কর হতে দিয়েছ কেন, যে সামলাতে না পেরে ধ্বংস করতে বাধ্য হচ্ছ?"
-"তোরাও আজ এই কথা বলছিস!" দুৰ্গা নিজে এমন দুর্গতিতে পড়েননি আগে। কার্তিক এসে বললেন, "মা, এইসব লড়াই, যুদ্ধ, এগুলো ছেলেদের কাজ, এবং ভুল কাজ। তুমি তো মা! বারণ করবে, শাসন করবে, কিন্তু কখনোই তোমার ছেলেদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যুদ্ধ করবে না। আর হত্যা তো মায়েরা করতেই পারেনা!"
সকলে চুপচাপ। হঠাৎ গলা খাকারি দিয়ে মহিষাসুর এলেন। "মা, আমি একটা কথা বলবো?"
-"হ্যাঁ নিশ্চই বলবে বাবা!"
-"আমিও আর যুদ্ধ করবোনা ভাবছি। ভালো লাগছেনা। এত বছর ধরে তুমি তো আসছো, এখনো কি কোনো একজনকেও বোঝাতে পেরেছো যুদ্ধ কেন সর্বনাশা! মর্ত্যের মানুষ এখন আরো বেশী করে যুদ্ধ চায়, অস্ত্র-আঘাত চায়! কে বলতে পারে, তোমাকে দেখেই তারা শক্তির অর্থ ভুল বুঝছে কি না! আমি যেমন স্বর্গ মর্ত্য পাতালের অধীশ্বর হতে চেয়েছি, আজ তারাও সেটাই চাইছে, গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর, দেশের পর দেশ ধ্বংস করে! তুমি দশরকম অস্ত্র প্রয়োগ করে আমাকে পরাজিত করলে, এই দেখে তারা একশোরকম অস্ত্র প্রস্তুত করছে যাতে তারা কারো কাছে পরাজিত না হয়। মা, এই কি তুমি চেয়েছিলে?"
মা দুর্গা কিছুক্ষন চিন্তা করে বললেন, "সত্যি, ওই ছোট্ট রুম্পি যা বললো, আগে কখনো তো ভেবেও দেখিনি! তাহলে তোমরাই বলো, আমার কী করা উচিত?"
ঠিক এইখানে রুম্পি-র ঘুমটা ভেঙে গেল। মা তাকে ডাকছে। "কীরে সকাল হয়ে গেল, উঠে পড়! ইস্কুলে দেরি হয়ে যাবে তো!"
উফফফ, মায়েরা বোধহয় এইরকমই হয়!
স্বপ্নের শেষটুকু দেখা হলো না বলে মনখারাপ রুম্পি বিছানা থেকে উঠতে যাবে, হঠাৎ শুনতে পেল দাদার গলার আওয়াজ, "মা জানো, এবার আমাদের পাড়ার প্রতিমার থিম কি? শান্তিরূপেণ সংস্থিতা! দুর্গা ঠাকুরের হাতে কোনো অস্ত্র নেই গো! দুটো হাতে মহিষাসুরকে কোলে তুলে নিচ্ছেন, আর মহিষাসুর অস্ত্র ত্যাগ করে প্রণাম করছে মা-কে! বেশ নতুন রকম, না মা?"
রুম্পি আনন্দে যেন আকাশে উড়তে লাগলো, সত্যিই তাহলে তার ইচ্ছাপূরণ হয়েছে!