আমাকে জাগাতে চাও কেন

শৌভ চট্টোপাধ্যায়



লোকটা রাস্তা পার হচ্ছিল।
বেশ কিছুক্ষণ ধরেই, আমি লোকটাকে অনুসরণ করছিলাম। কোনো নির্দিষ্ট কারণ ছিল না, এমনিই। অথবা, হয়তো কারণ ছিল, এখন মনে নেই। হয়তো, অনেকদিন, অমন উদ্দেশ্যবিহীনভাবে কাউকে হাঁটতে দেখিনি শহরের রাস্তায়। হয়তো, তার মাথা নীচু করে, মাটির দিকে চোখ রেখে একটানা হেঁটে যাওয়ার ধরণ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। হয়তো...
লোকটাকে আমি প্রথম দেখি বড়রাস্তার মোড়ে, ট্রামডিপোর কাছটায়। বাঁদিকের ফুটপাথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিল। লোকটার চেহারা-চরিত্র একেবারেই সাধারণ। ময়লা গায়ের রঙ, কালো চুল মাথার মাঝখানটায় বেশ পাতলা হয়ে এসেছে। ঝুলপির কাছে সামান্য কাঁচাপাকা। পরণে ইস্তিরি না-করা, কিন্তু পরিষ্কার, পাঞ্জাবি আর ধুতি। হাতের চুরুটটা প্রায় নিবে এসেছিল, অথচ সেদিকে তার কিছুমাত্র খেয়াল ছিল না। আমি হাতের সিগারেটে শেষ টান দিয়ে, অবশিষ্ট অংশটুকু মাটিতে ছুঁড়ে ফেলি, ও জুতো দিয়ে পিষে নিবিয়ে দিই। তারপর, লোকটাকে অনুসরণ করতে শুরু করি।
লোকটা, এর মধ্যে, দুকাপ চা খেয়েছে। পার্কে দুচক্কর হেঁটে আবার একটা চুরুট ধরিয়েছে। আমার দ্বিতীয় সিগারেটও প্রায় শেষ হবার মুখে।
লোকটা রাস্তা পেরোচ্ছিল, কোনোদিকে না-তাকিয়ে। কেমন বেভুল, নিতান্ত বেতালা একটা মানুষের ছবি। যেন-বা দিগভ্রষ্ট, পরম্পরাহীন। এইবার, আমি দ্বিধায় গ্রস্ত হই। অক্টোবর মাসের সন্ধ্যা। পুজোর পর, হাওয়া বেশ শীতল হয়ে এসেছে। সঙ্গে একটা গরম চাদর থাকলে ভালো হত। বাড়ির দিকে হাঁটা দেব, না কি লোকটার সঙ্গে আরো কিছুদূর যাব, কিছুতেই ঠিক করে উঠতে পারি না।
লোকটা কোথায় যাবে? কতদূর যাবে?
লোকটা রাস্তা পেরোচ্ছিল। বাঁদিকে পার্কের গেট। গেটের মুখে একটা পানের দোকান। একদল সুদৃশ্য মেয়ে কাচভাঙা হাসির আওয়াজ ছড়িয়ে একেবারে চোখের ওপর এসে পড়ে। ওদিক থেকে একটা ট্রাম আসছিল। বাড়ি ফিরতে চাইলে, তাতেও উঠে পড়া যায়। আমি মনস্থির করতে না-পেরে, মেয়েদের দলটির দিকে তাকিয়ে থাকি। কেন? মাঝখানের লম্বাপানা, দোহারা-চেহারার মেয়েটি কথা বলতে-বলতে একবার আমার দিকে তাকায়। চোখ নামিয়ে নেয়। কেন? আমি কি ওকে আগে কোথাও দেখেছি? ভাবতে ভাবতে, আমি ফুটপাথ ছেড়ে রাস্তায় নেমে পড়েছি। ওদিক থেকে ট্রাম আসছে। বাড়ি ফেরার ট্রাম।
লোকটা রাস্তা পার হচ্ছিল। সে কি তবে দেখতে পায়নি? সে কি হঠাৎ থেমে গেল, পাথর? ট্রামের ঘন্টি বাজতে থাকে—প্রথমে আস্তে, থেমে-থেমে, পরে একটানা—বাজতেই থাকে।
আমি, প্রায় একলাফে, লোকটার কাছে গিয়ে পৌঁছই। তার হাত ধরে টেনে, লাইনের এপাশটায় নিয়ে আসি। নিজের ক্ষিপ্রতায় আমি নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম!
“পাগল না কি মশায়, হ্যাঁ? চোখের মাথা খেয়েছেন? কী, ব্যাপারটা কী আপনার?” আমি রীতিমতো চীৎকার করে উঠি। ট্রাম-ড্রাইভারের ছুঁড়ে দেওয়া গালি, হাওয়ায় পাক খেতে-খেতে, নেমে আসে খানিকক্ষণ পরে।
লোকটা আমার দিকে তাকায়। আমার মুখের দিকে। তার চোখ চকচক করছিল, আলোয়। আমার মুঠোর মধ্যে লোকটার হাত, ঘামে-ভেজা, ঠান্ডা, কাঁপছিল।
আশেপাশে লোক জমতে শুরু করেছে। আমি নরমগলায় বলি, “চলুন। চা খাবেন?”

—সুইসাইড-ফাইড করতে গেসলেন না কি, আপনি?
—অ্যাঁ?
—আপনি কি আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন? আজকাল তো আর—
—নাহ...আমি তো...
—তাহলে? অতজোরে বাজাচ্ছিল, ট্রামের ঘন্টি, শুনতে পাননি?
—আসলে, আমি ঠিক...শুনেছি, তবে অত কাছে এসে পড়েছিল বলে—একেবারে ঘাড়ের ওপর তো—আমি আর...এড়াতে চাইনি...
—এড়াতে চাননি! আশ্চর্য! কী এড়াতে চাননি?
—ওই, নিজের মৃত্যুটা—একেবারে চোখের সামনে দেখে—আমি ওটা আর...
—সে তো সেই একই দাঁড়াল ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে—আপনি সুইসাইড করতে গেছিলেন!
—না, তা নয়।
—মানে?
—দুটো এক নয়। এক ব্যাপার নয় দুটো।
—বটে! আপনি কী করেন মশায়?
—পড়াই। কলেজে। হাওড়ায়। মেয়েদের কলেজ।
—অ। প্রফেসর। তা বাড়ি কোথায়?
—বরিশাল। মানে, ওটা—এখন, এখানেই, ল্যান্সডাউন রোড।
—ওহ! আমরাও ওদিককার। ফরিদপুর। আমরা অবিশ্যি আগেই—চুয়াল্লিশেই চলে এসেছি। শালার চেনাজানা ছিল। চাকরি হয়ে গেল—হাসপাতালে। ক্লার্ক।
—ও।
—কীরকম সব হয়ে গেল, হ্যাঁ? চারদিক! কেউ ভেবেছিল!
—আট বছর হতে চলল—সাত বছর দু-মাস।
—হাসছেন?
—আমার একটা ইয়ে ছিল, কবিতা। অনেকদিন আগে লিখেছিলাম—আট বছর আগের একদিন। সেটা আবার ওই আত্মহত্যা-টত্যা নিয়েই। কাকতালীয় ব্যাপার, মজার।
—কবিতা লেখার ইসে আছে বুঝি?
—ওই, যতটুকু হয়। পরিবার, চাকরি-বাকরি, ঝামেলা। সব সামলে।
—তা ভালো। একটা শখ-টখ থাকা—
—এই যে আপনি জিজ্ঞেস করলেন—আত্মহত্যার কথা। একসময়ে ভাবতাম, আগে—যে আত্মহত্যা করব। সেসময়ে একটা ইয়ে ছিল, চাকরি-টাকরির খুব ঝামেলা। টাকা-পয়সা নেই, হাতে। তখন ওসব ভাবতাম মাঝেমধ্যে। আমার স্ত্রীও আবার—মানে ওর দোষ নয়। আসলে ওর ব্যাপারটা—ও চাইত একটা ভালো চাকরি, রোজগার, বাড়ি-টাড়ি, কলকাতায়। মনে-মনে ভাবত। আমার আবার—লিখে তো আর পয়সা হয় না এখানে। ওসব...প্রফেসরি করেই বা কত আর...
—তারপর?
—কী তারপর? আত্মহত্যা? ও নিয়ে এখন আর—আসলে আমার আর কিছু করতেই ইচ্ছে হয় না, ইদানীং। মানে এইসব, বাঁধা-ধরা কোনোকিছু—চাকরি, সংসার, এইসব। একেকদিন খালি বসে থাকতেই ইচ্ছে হয়। বা, শুয়ে-টুয়ে, চুপচাপ।
—বাচ্চা-টাচ্চা আছে?
—এক ছেলে, এক মেয়ে।
—তবে? অনেক দায়িত্ব রয়েছে আপনার, মাথার ওপর।
—লেখাটাও মাঝেমাঝে দায়িত্ব বলে মনে হয়। বুঝলেন? বিরক্ত লাগে। লেখো, ছাপাও। ছাপা হলে সেই নিয়ে নানান কথা। তাই নিয়ে আবার মাথাব্যথা, চিন্তা, ঘুম নেই। কে কী বলল, কী বুঝল, কী বুঝল না। সেইসব নিয়ে। ভাল্লাগে না...ওইজন্যেই...অনেকগুলো লেখা আছে, ছাপাইনি। দেখাইনি কাউকে। কেউ জানে না। বাক্সে রাখা।
—কবিতা?
—কবিতাও আছে। একটা সিরিজ লিখেছিলাম একসময়। বাংলাদেশ, গ্রাম-ট্রাম নিয়ে। মানে প্যাস্টরাল গোছের। ঠিক ওরকম নয়, তবে খানিকটা ওই... সবগুলো মিলিয়ে একটাই, দীর্ঘ কবিতার মতো আর কি। ওইভাবেই লেখা। নাম দিইনি। বন্ধ করে দিয়েছিলাম, মাঝখানে। আরো মাজাঘষা করতে হত।
—বটে?
—গল্প-উপন্যাসও আছে। দুটো উপন্যাস তো রেডি। অনেকগুলো গল্পও।
—তো ছাপান সেগুলো! কবিতার চেয়ে ওসব তো লোকে অনেক বেশি পড়ে! আমিও তো, মানে কবিতা-টবিতা সেরকম নয়, কিন্তু নভেল-টভেল পড়ি। বিভূতি-তারাশংকর। বিভূতি তো আমার—
—এগুলো—জানি না সবাই পড়বে কি না। মরবিড, খুব ইয়ে...
—দেখুন, আমি ছাপোষা লোক। অতশত বুঝি না...
—না, না। তা কেন! আচ্ছা, আমার কিন্তু আপনাকে ‘ধন্যবাদ’ দেওয়া হয়নি। অবিশ্যি, এত বড় একটা ব্যাপার। এতে কি আর, মানে ওইভাবে ধন্যবাদ-টন্যবাদ, আনুষ্ঠানিকভাবে ওসব...
—আরে, ছাড়ুন। আপনি নিজেরটা ভাবুন।
—নিজের? মানে?
—একটা গল্প পড়েছিলাম, জানেন? অনেকদিন আগে। কোথায় ঠিক মনে নেই এখন। সেই একজন, মানে সে খুব অসুস্থ। বুঝলেন? সব ডাক্তার-বদ্যি সবাই জবাব দিয়ে দিয়েছে। তো, লোকটাও মরবে বলে রেডি। অপেক্ষা করছে। কবে মৃত্যু আসে। এমন সময়ে—মানে এখন আর পুরোটা মনে নেই—অন্য একটা ডাক্তার এসে, না কি অন্য কী সব করে, লোকটা বেঁচে ওঠে। মরে না। কিন্তু তারপর, ওই বেঁচে ওঠার পর, সে দেখে তার আর বেঁচে থাকতে ভাল্লাগছে না। মানে মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করতে করতে, বাঁচার ইচ্ছেটাই চলে গেছে আর কি, লোকটার। বুঝলেন তো?
—হা, হা! বেশ! আমার অবিশ্যি সেসব—আমি তো আপনাকে বললাম, আত্মহত্যা আমি—
—না, না, তা নয়। কিন্তু এটাও তো, মানে একরকম পুনর্জন্মই। এরপর দেখুন, হয়তো ওইসব নভেলগুলো আপনি ছাপতে দিয়ে দিলেন। লুকিয়ে না রেখে। নাম-ডাক হয়ে গেল আপনার। বিখ্যাত হয়ে গেলেন। কী? হ্যাঁ?
—বা, হয়তো, লেখাটেখা বন্ধ করে দিলাম। ছেড়েছুড়ে দিলাম সব। মন দিয়ে সংসার-টংসার করতে শুরু করলাম। বৌ-ছেলেমেয়ে সব নিয়ে। সবাই খুশি। আমিও...হয়তো...
—হে হে। তাও হতে পারে। খারাপ বলেননি এটা। কতকিছুই হতে পারে। প্রত্যেকটা সেকেণ্ডে কতগুলো সম্ভাবনা জন্ম নিচ্ছে, না? তারপর একটা বাদে সবগুলো মরে যাচ্ছে। আবার সেই যেটা বেঁচে থাকছে, তার ওপর নির্ভর করছে পরের সম্ভাবনাগুলো। হ্যাঁ?
—হুম।
—চলুন। ওঠা যাক। রাত হল। আমার বাড়িতেও আবার...হে হে, ভাববে লোকটা নিরুদ্দেশ হয়ে গেল কি না।
—চলুন। চায়ের দামটা কিন্তু আমিই—
—ছাড়ুন তো মশায়। নিন।

আমরা উঠে পড়ি। দুটো চা আর একটা নোনতা বিস্কুটের দাম দিয়ে, ফুটপাথে এসে দাঁড়াই। আমি অন্যদিকে যাব। বেশ শীত-শীত করছে। ওপরে তাকাই। ইলেক্ট্রিকের তারগুলো চাঁদটার গায়ে যেন কেটে বসেছে একেবারে—কেমন লাল, এবড়ো-খেবড়ো। একটা প্রাচীন, বলিরেখাজর্জর মুখের কথা মনে হয়। বুড়ি চাঁদ! নিজের মনেই অল্প হেসে উঠি আমি।