হাজার কুঁড়ির একটি গোলাপ

জয়দীপ দে



- ‘উত্তরা’ ছবিটা দেখেছো, নীলা?
- হুঁ। কেন?
- সেই গার্ডটার কথা মনে আছে, পয়েন্টস ম্যানের নতুন বউটাকে প্রতিদিন ক্যাপ খুলে অভিবাদন জানিয়ে আসত-যেত, মালগাড়ির ব্রেকভ্যানে বসে। সেই সাড়ে তিনফুটি লোকটা আরকি। বাজে কতগুলো লোকের হাত থেকে মেয়েটাকে বাঁচাতে তার পালোয়ান স্বামীটি আসেনি, এসেছিল ওই বামনটা। শেষে কি হয়েছিল তোমার মনে আছে নীলা?
নীলা মৃদু হাসে। তার হাসিতে রঞ্জনের বুক কাঁপে। কাঁপে শিরীষের চিরল পাতা। পাতা ছেঁকে আসা রোদগুলো তাই রঞ্জনের বিশাল টাকে দাঁড়াতে না পেরে পিছলে যায়। পড়ে যেতে যেতে ঝিলিক মারে।
- ওসব কথা বাদ দাও তা, আগে বলো কেমন আছো।
- আছি; কোন প্রকারে বেঁচে আছি। যন্ত্রের কৃপায়। এনজিওপ্লাস্ট করে বুকের ধমনীগুলো ফুলিয়ে নিয়েছি। তাই এখনো দম নিতে পারি। প্রেসারের ওষুধ খাই তিনবেলা। আর ডায়াবেটিসটাও বোধহয় হয়ে যাবে শিগগিরি। এখনো আমি তিন চামচ চিনি না হলে চা খেতে পারি না ...
- যেদিন গেলো শুধুই কি গেলো, তা আর ফিরবার নয় বুঝি।
- ফিরে এলে কি তুমি এভাবে আমার পাশে এসে বসতে! মিছে আফসোস করে কি হবে বলো। আসো, যা পেয়েছি তাতেই আমরা সুখী হই। এই যে কতদিন পর তোমাকে পেলাম, ইচ্ছে হচ্ছে তোমার পিঠে হাত রাখি, পায়ের পাতায় একটা চুমু এঁকে দেই। তুমি কী আমাকে বাঁধা দেবে?
টিএ ব্রাঞ্চের রঞ্জন বাবু বসে আছেন ডিসি হিলে। যে লোক অফিস, বাসা আর বাজার এ ত্রিভূজের বাইরে কোথাও পা রাখে না, সে কিনা ডিসি হিলে, তাও পাশে এক রমণীকে নিয়ে! এমন দৃশ্য কল্পনাও করতে পারে না এ শহরের লোকজন। তার ওপর পাশের নারীটি তার স্ত্রী নয়। আর এদের কথাবার্তার ছিরিই বা শোনো! এসব পুরোবাসীর চোখে পড়লে তারা তো চোখ মটকে মূর্ছা যাবে। এ ভেবে উত্তুরে বাতাসটা হঠাৎ ক্ষ্যাপাটে হয়ে ওঠে। কেউ আজ যেন না আসে এদিকটায়। নীলা আর রঞ্জন দু’যুগ পর অতীতের মুখামুখি হয়েছে, হউক।
- আশাকরি তোমার কোন আপত্তি নেই। আমার ছেলেটা ক্লাস এইটে পড়ে, মেয়েটা টুতে, ওর নাম নীলিমা। তোমার নামে নাম। আমার এ ইচ্ছে দুটো না হয় ওদের জন্য থাক-
- তোমার সেই পাগলাটে স্বভাব আর গেলো না। হাসতে হাসতে ভেঙে পড়ে নীলা।
রঞ্জন মনে মনে বলে, ‘আর হেসো না রাণী ইসাবেল, এই বৃদ্ধ কলম্বাস পথ হারাবে’।
-...তা চেহারা-সুরুত যা বানিয়েছো। নীলা চোখ পাকিয়ে বলতে শুরু করে। দেখে মনে হয় ষাট বছরের বুড়ো। এ বুড়ো হৃদয়ে এতো রোমান্স(!) বাইরে থেকে দেখে কেউ বলবে?
- তুমি তো নীলা যৌবনের দেবী; চিরযৌবনা ভেনাস। তুমি চাইলে মরা গাছে ফুল ফোটাতে পারো, আর আমি তো পঞ্চাশে পা রাখা এক বুড়ো হাবড়া।
- আর অদিখ্যেতা করো না। ভাগ্যিস রুমান শুনেনি।
- শুনলে নিশ্চয়ই পাগলা ষাড়ের মতো তেড়ে আসত। শুরু হতো ধোলাই। হাত পা ভেঙে চলে যেতাম ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে। তুমি আসতে আঙুর আর নাশপাতি হাতে। এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে ওয়ার্ডের দরজায়। আমার বেডটা দরজার দিকে মুখ করা। তোমাকে দেখে তো আর আমি আমি নেই। নিজেকে দিগি¦জয়ী আলেক্সজেন্ডার মনে হয়। ‘হেই, তোরা সব দেখে যা’, আমার মহারাণী আজ শাহী দরবারে...’। তুমি তো কখনো এই বামনটার দিকে ফিরেও তাকালে না। হাসি-ঠাট্টা করে গেলে কেবল। সুদেহী-সুদর্শন যুবকরা সারাক্ষণ ভ্রোমরের মতো ঘিরে রাখে তোমাকে। এই সাইফুল গেলো তো রুমান, রুমান গেলে অর্ণব...। আমার মতো একটা দেড়হাতী কাল্লুর কি মূল্য আছে তোমার কাছে। নিজেই নিজেকে প্রবোধ দেই। কিন্তু মন তো আর সাদা-কালোর ধার ধারে না। সে বামন হলেও হরহামেশা চাঁদের কাঁধে টোকা মারে। তাকে কিভাবে বোঝাই নীলা আমার হবার নয়। রাতভর নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করি। ফলাফল শূন্য। অভিমান যেন বাঁধভেঙে ছুটে যেতে চায়। নিজেকে যখন আর সামলে রাখতে পারি না, বালিশে মুখ চেপে কাঁদি। শব্দ করি না, যদি কেউ শুনে ফেলে। সেই তুমি আজ আমার জন্য ছুটে এসেছো মেডিকেলে! আমি আবার বলি, রুমান কই, শুনে যা, নীলা ইজ ট্রিমেনডাস...। ওমনি পাগলাটা বুঝি আবার ছুটে আসে। আবার ধোলাই। এই ধোলাইয়ের মাঝে যে কি নেশা তুমি যদি বুঝতে! আমি তো জানি তোমাকে পাবো না কখনো। আমাদের ধর্ম ভিন্ন, গায়ের রং, এমনকি উচ্চতা। অতএব আমরা চিরকাল রেললাইনের দু'টো পাতের মতো বয়ে যাবো পাশাপাশি, মিলন হবে না কখনো। এর মাঝে যদি সুযোগ হয় তোমার জন্য রক্ত ঝরাবার, সে কী কম আনন্দের নীলা?
নীলার মুখ অন্ধকার হয়ে যায়। বাতাস থেমে গিয়ে অন্ধকারের শার্টার পড়ে ধুমধাম।
- তোমরা সবাই মিলে আমার জীবনটা এতো দুঃসহ করে তুললে কেন? সবাই শুধু আমাকেই চাও, জগতে কি আর কোন মেয়ে নেই? আর তুমি যে এতো গভীরভাবে আমাকে ফিল করেছো, তা তো কখনো বলোনি...
- কেন বলবো স্নিগ্ধা, আমি তো পানকৌড়ি, আমি জানি শব্দ নয় রক্ত দিয়ে ভালোবাসার ফুল ফুটাতে হয়। যারা শব্দ দিয়ে ফোটাতে চায়, তাদের ফুলগুলো কুঁড়িতেই নষ্ট হয়ে যায়, ফোটে না। সেদিন তাই তোমার শরীরে যখন অভির কালো হাত উঠল, সাইফুল-রুমান কেউ আসেনি। আমি জানতাম রক্তেই ভালোবাসার ফুল ফোটে, তাই এ খর্বকায় শরীরটা নিয়ে এগিয়ে যেতে একবারও হাঁটু কাঁপেনি...
- তা তোমার ফুলটা কি ফোটাতে পেরেছো রঞ্জু?
মানিব্যাগ থেকে একটা ছবি বের করে রঞ্জন।
- দেখো, আমারা মেয়ে নীলা। আমার ঔরস্যের নয়, আত্মার। ওরা বাবা রিক্সা চালায়। মা কাজ করত আমার বাসায়। আমার একটা মেয়ের শখ অনেক দিনের। কিন্তু তোমার ভাবীর জরায়ুতে ক্যানসার ধরা পড়ার পর সেটা আর সম্ভব হয়নি। হঠাৎ একদিন শুনি কাজের বুয়ার মেয়েটা মৃত্যুশয্যায়, দু’টি কিডনিই ফেইল, বাঁচবে না আর। আমার বুকটা মোঁচড় দিয়ে উঠল। আমি বল্লাম, মেয়েটাকে আমাকে দেবে, যেভাবে হউক ওকে আমি বাঁচিয়ে তুলবো। বুুয়ার আরো চারটি সন্তান, তাই হাসি মুখেই প্রস্তাবটা মেনে নিল।
আমরা বাপ-বেটি এখন একটা করে কিডনি নিয়ে বেশ বেঁচে আছি। সন্ধ্যায় যখন বাড়ি ফিরি, একমনে গান গায় মেয়েটা। তখন মনে হয় নীলা তুমি নবীণবরণের রিহার্সেলে গাইছো। ‘কি নীলা, আজ যষ্টিমধু খাও নাই, গলাটা এমন ব্যাঙের মতো লাগছে।’ মেয়েটা আমার আহ্লাদে গদগদ হয়ে ছুটে আসে। জড়িয়ে ধরি তাকে। তার তুলতুলে দুটো পায়ে ইচ্ছেমতো চুমু আঁকি। কাঁধে হাত রাখি। আহারে জীবন, তুমি কতো মধুর ...
‘মিয়াভাইয়ের মাথায় প্রবলেম নাকি?’ এক ঝাঁক লোক ঘিরে ধরেছে তাকে। দূরে একটা হ্যাজাক লাইট শোঁ শোঁ শব্দ করে জ্বলছে। সে আলো মানুষগুলোর শরীরের একপাশে ধাক্কা খেয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। একজন রঞ্জনের কাছাকাছি এসে প্রশ্নটা করল। তার নাকে-মুখে টুকরো টুকরো কমলা-আলো।
রঞ্জন মুখ গম্ভীর করে তাকায় আকাশের দিকে। মেঘমুক্ত অন্ধকার আকাশ। আকাশ ভরা তারা। তারারা হাসছে মিটিমিটি। এই তারার ভিড়ে কোনটি নীলা? নীলাও নিশ্চয়ই হাসছে। আর মুখ গম্ভীর করে রাখতে পারল না রঞ্জন।