ডেভিড কপারফিল্ডঃ দ্য ইল্যুশনিস্ট

বৃতি হক



“ব্যক্তিগত জীবনে এমন কোনো অর্জনের কথা বলতে পারো কেউ, যা একান্তই তোমার? অন্য কেউ যা আয়ত্তে আনেনি, বা অন্য কেউ সে সম্পর্কে আদৌ ভাবেনি?”

রোকেয়া আপা সাধারণ আর অসাধারণের পার্থক্য বোঝাচ্ছেন। দশম শ্রেণীর বাংলা ক্লাসে বসে অন্য মেয়েদের সাথে মুখ চাওয়াচাওয়ি হয় নিঃশব্দে। স্কুলে একাডেমিক ফলাফল মোটামুটি ভালো, প্রথম স্থানটি বরাবর দখলে আমার। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি বিধায় অল্পস্বল্প প্রাপ্তিও হয়ত আছে। কিন্তু আমার মতন আরও হাজারো, লাখো ছেলেমেয়ে চারপাশে ছড়িয়ে আছে। ভেবে দেখলাম, বলার মত আমার নিজস্ব কোন অর্জন নেই। জনারণ্যে সহজে মিশে যাওয়া একজন অতি সাধারণ মানুষ আমি।

স্বপ্ন দেখা কালক্ষেপন নয়। রোকেয়া আপা বললেন। ঘুমিয়ে হোক, বা জাগরণে—আমরা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। আর সেই স্বপ্নের ভেতর নিজের অজান্তেই ভবিষ্যতের কিছু বীজ বুনে দেই আমরা। স্বপ্ন হলো সেই সত্য, যা আমাদের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। প্রতীক্ষায় আছে, আমরা তাদেরকে বাস্তবায়ন করবো বলে। স্বপ্ন না দেখলে স্বপ্নপূরণ হবে কীভাবে? আপা বলে চলেন, কম বেশি সবাই স্বপ্ন দেখলেও তা দীর্ঘদিন লালন করার মতন ধৈর্য ধারণ অথবা তা পূরণের মহান ব্রত পালন করতে পারেন খুব কম ক’জনই। চেষ্টা, ত্যাগ, তিতিক্ষা, অধ্যবসায়, ভালোবাসা আর মেধার চরম সমন্বয়ে এই অসাধারণত্বের উন্মেষ ঘটে।

সময় বয়ে গেছে অনেক। প্রশান্ত মহাসাগরের একপাশে এখন আমার বসবাস। সমুদ্রের দিকে তাকালে যেন জীবনকে দেখি। কখনো নিস্তরঙ্গ, কখনো ভীষণ ঢেউ। কোথাও স্লেট রঙা জল, কোথাও হালকা সবুজ, কখনো গভীর নীল। অতল কি বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, ওপর থেকে বোঝার উপায় নেই। প্রশান্ত মহাসাগরে পা ভিজিয়ে অতীতের দিকে ফিরি। বর্তমানকেও দেখি। চাওয়া পাওয়া, যোগ বিয়োগের হিসেব ছাড়া আমার আটপৌরে দিন কেটে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত, জলের টানে জলজ জীবনের নিজস্ব গতিতে। কিছুদিন আগে গ্রীষ্মের ছুটির অবকাশে কয়েকটি স্টেটে ঘুরে বেড়ালাম বোহেমিয়ানের মত। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে যাবার পথে ঐতিহাসিক Route 66 এ দলবেঁধে ছবি তুললাম। সেখানে ছোট কফিশপে স্যুভেনির আর কফি কিনতে গিয়ে মালিক মেয়েটির সাথে আলাপ, একফাঁকে এসে সে আমাকে জড়িয়ে ধরল। অ্যালেশিয়ার জন্ম এবং কৈশোর লস অ্যাঞ্জেলেসে, জীবিকার প্রয়োজনে অ্যারিজোনায় বসত গেড়েছে। সে কি আমার ভেতর তার পুরনো শহরকে একঝলক খুঁজে পেলো? সোনালি ঝলমলে চুল আর উজ্জ্বল হাসির মেয়েটির সাথে আমার সমুদ্রজীবনের শুধু একটি ছবির স্মৃতি রইল।

ইউটাহর বিভিন্ন শহরে থাকা হলো বেশি। সল্ট লেইক সিটি, সেডার সিটি, লা ভার্কিন, লালমাটির যায়ান। বাড়ি ফেরার পথে নেভাদা অঙ্গরাজ্যের লাস ভেগাসে দু’দিন ছিলাম। সেখানে এমজিএম গ্রান্ডে ডেভিড কপারফিল্ডের লাইভ শো দেখতে গিয়েছিলাম আমরা। আধো আলো আধো অন্ধকার অডিয়েন্সের সামনে “Heaven on the Seventh Floor” এর সুরের দ্যোতনায় যখন শূন্য থেকে স্টেজে ডেভিড কপারফিল্ড নেমে এলেন, বহুদিন পর রোকেয়া আপার কথাগুলো মনে পড়ল আমার। হ্যাঁ, কেউ কেউ তো সাধারণ জীবনকে অতিক্রম করে নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছেন। স্বপ্ন পূরণ তাহলে অসম্ভব কিছু নয়! ইচ্ছেডানায় ভর করে কেউ কেউ অন্য এক উচ্চতা থেকে অন্যদেরকে বলতে পারেন, Live the Dream. Live the Impossible.

ডেভিড কপারফিল্ডের টিভি স্পেশ্যাল আমি প্রথম কবে দেখেছি, ঠিক মনে করতে পারি না। অনেক ছোটবেলার কথা মনে পড়ে, যখন তাঁর টিভি শো’গুলো আমার বড় ভাই-বোনরা ভীষণ আগ্রহ নিয়ে দেখত। ঘন কালো ভ্রু’র নিচে উজ্জ্বল দুটো চোখ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, একহারা গড়নের লম্বা চুলের তরুণ। একবার চীনের বিখ্যাত প্রাচীরের এপাশ ফুঁড়ে অন্যপাশে বেরিয়ে এলেন। নায়াগ্রা জলপ্রপাতে হাত-পা বেঁধে বাক্স বন্দী করে ফেলে দেয়া হল তাঁকে আর একবার, রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছি-- বেরিয়ে আসতে পারবেন তো? আমেরিকার স্ট্যাচ্যু অব লিবার্টি অদৃশ্য করে দিলেন সবার সামনে, আবার ফিরিয়েও আনলেন। অন্যসময় এক বিশাল এরোপ্লেনকে। গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের সুগভীর প্রান্তরের ওপর ধ্যানমগ্ন মৌনীর মত ভেসে বেড়ালেন বনি টাইলরের গানের সাথে। সান ফ্রান্সিসকোর আলকাট্রায বন্দিশালা থেকে মায়াবী বিভ্রমের ভেতর বেরিয়ে এলেন, কিংবা টেলিপোর্টিং করে একস্থান থেকে অন্যস্থানে নিজেকে প্রতিস্থাপন করা—বলতে গেলে আরও কত শত বিশাল ব্যাপ্তির ইল্যুশনের কথা বলতে হয়! ইল্যুশনের অলিখিত সম্রাট তিনি। এক উপস্থাপনার কথা মনে পড়ছে। ডেভিডের হাতে এক বাজপাখি। সেই পাখিকে উড়িয়ে দিয়ে তাঁর নিজেরও শখ হল উড়বার। দু’হাত পাখির ডানার মত মেললেন। উড়ছেন, আবার নামছেন। দর্শক সারি থেকে এক তরুণীকে আনা হল তাঁর কাছে, তাকে কোলে নিয়ে পাখির মতই ভাসিয়ে দিলেন নিজেকে শূন্যতায়! সুরের নির্জনতায় দুজনে উড়ে বেড়াচ্ছেন। অনেক আগের সেই উড্ডয়নের দৃশ্য এখনও চোখে লেগে আছে আমার! এক বাজপাখিকে বুকের ভেতর দীর্ঘদিন লালন করেছেন নিশ্চয়ই ডেভিড। পাখি হওয়ার দুর্মর বাসনাকে অবশেষে হাতের মুঠোয় বন্দী করতে পেরেছেন।

জাদু মায়াজাল, বিভ্রম। বাস্তব আর অবাস্তবতার মাঝে সেতুবন্ধন। এই যে ইল্যুশন বা বিভ্রমের মায়াজাল, নিজের ইচ্ছেপূরণের এক অনন্য মাধ্যম, নিপুণ সৌকর্যে ডেভিড কপারফিল্ড তাকে নিয়ে গেছেন শিল্পের পর্যায়ে। তাঁর টিভি স্পেশ্যালগুলো এমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে একুশবার, নমিনেশন পেয়েছে আটত্রিশবার। গল্পের মাধ্যমে জাদুর ঐন্দ্রজালিক বিস্তারে গিনেস বুকে নাম লিখিয়েছেন এগারো বার। ইউএস লাইব্রেরি অব কংগ্রেস তাঁকে অভিহিত করেছে Living Legend হিসেবে। ফ্রেঞ্চ সরকার থেকে পেয়েছেন নাইট উপাধি, হলিউডের ওয়াক অব ফেইমে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। ফোর্বস তাঁকে আখ্যায়িত করেছে বাণিজ্যিকভাবে ইতিহাসের সবচেয়ে সফল জাদুকর হিসেবে।

জাদুবিদ্যার এই জাদুকরকে তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিমায়, নিজস্ব আবহে সামনাসামনি দেখার অভিজ্ঞতা ছিল আমার জন্য আনন্দের, রোমাঞ্চের। সময়ের ফেরে সেই তরুণের বয়স বেড়েছে, ষাটোর্ধ তিনি, কিন্তু তারুণ্য কমেনি। BLU32 নামের এক এলিয়েনকে তাঁর নিজ প্লানেটে স্পেসশীপে করে ফিরে যেতে সাহায্য করলেন, সেরকম এক সাই-ফাই গল্পের মোহময় বিস্তার ছিল পৌনে দু’ঘন্টা জুড়ে। সেইসাথে বাবা-মা’কে নিয়ে নস্টালজিয়া, অবশেষে অতীতে গিয়ে তাঁদের সাথে দেখা করে আসা, কারিগরী ও প্রযুক্তির দক্ষ উপস্থাপনায় এক দারুণ শৈল্পিক এবং মুগ্ধ সময় কাটালাম! এলিয়েন, আউট অব নো হ্যোয়ার আমাদের মাথার ওপর এক স্পেসশীপ, সবশেষে প্রমাণ সাইজের ডায়নোসর, আহা! ইল্যুশনের বহুমাত্রিক এবং সার্থক প্রয়োগ। পুরো অডিয়েন্স জুড়ে তাঁর এই বিশাল আয়োজন, দর্শকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে হয়ে উঠেছিল আরও উপভোগ্য। অনুষ্ঠানের মধ্যেই তাঁর সাথে হাত মেলালাম, কুশল বিনিময় হল। ডেভিড কপারফিল্ডের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হল, স্বপ্ন ও আর বাস্তবতায় মাখামাখি এক সার্থক, প্রমাণ আকারের ইল্যুশন তিনি। বেশ আবেগী, কিছুটা অদ্ভুতুড়ে হয়ত, সেইসাথে অনেকটাই রোমাঞ্চ, তারুণ্য আর মোহমুগ্ধতার অন্তরঙ্গ মিশেলে তিনি নিজেই এক শিল্প।

অসাধারণ এই জাদুকরের জন্য সাধারণ এই আমি অফুরান শুভেচ্ছা আর ভালোবাসা রেখে এলাম।

চন্দ্রস্নানে কেটে যাক এই রাত, প্রিয়।
ধূলোয় পদছাপ রেখে রেখে বড্ড সংসারী তুমি।
মৃত্তিকামৃত ভুলে সুপ্রভ, এই নাও সুগন্ধি রুমাল।
আজ তমসা তোমার বাসর। তারা তোমার বউ।
অকীক উড্ডয়ন শেষে ধরায় নাহয় ফিরে যেও কাল।