ইচ্ছে করে

তুষ্টি ভট্টাচার্য



ইচ্ছা করে পরাণটারে গামছা দিয়া না বেঁধে উড়িয়ে দিই। হুইইইইইইই করে এক রকেটের মত তীব্র হুইশেলের শব্দে আকাশে গিয়ে ফেটে পড়ুক, আর ফেটে পড়া মানেই যে শেষ হয়ে গেলাম তাও না। একটা মৃদু উড়ন্ত দুলতে থাকা প্যারাশুটের মত ভেসে ভেসে কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম। সেই প্যারাশুট পেল হয়ত এক কাগজ কুড়ুনি। বস্তায় করে নিয়ে চলল আমার ইচ্ছেকে। আমি বাঁধা পড়তে চাই নি, তাই এবারেও পালালাম সেই বস্তা থেকে। তবে পালানো খুব সহজে হয় নি। সেই কাগজ কুড়ুনি তো আমার ইচ্ছেকে বস্তায় পুরে কাঁধে নিয়ে হেঁটে চলেছে খুব ভোর বেলায়। আর তার পেছনে চিৎকার করে চলেছে এক পাল কুকুর। সে ভ্রুক্ষেপ করছে না, তার এসব সয়ে গেছে। কিন্তু আজ একটা কুকুর ছুটে এসে তার পায়ে দাঁত বসিয়ে দিল। সে হাতের লাঠিটা দিয়ে কুকুরটাকে মেরে তাড়াতে গেল স্বাভাবিক ভাবে, আর তখনই বস্তাটা তার কাঁধ থেকে ফস্কে পড়ে গেল মাটিতে। ব্যাস্‌, সুযোগ বুঝে আমার ইচ্ছে সেই তালে দে ছুট……
কিছুক্ষণ হাওয়ায় উড়ে উড়ে সে হাঁফিয়ে গেছে, একেই বন্দী দশা থেকে মুক্ত হওয়ার উত্তেজনা চেপে রাখা আছে মনে, ফলে একটু জিরিয়ে নিতে চাইল ও। চুপ করে বসে থাকতে থাকতে প্রায় যখন ঘুমের ঘোরে ঢলে পড়েছে ও, ঠিক তখনই গায়ে যেন কে জল ছিটিয়ে তার কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে দিল। ধড়মড় করে উঠে বসেও কাউকে দেখতে পেল না। তবে সে একদিক থেকে ভালই হয়েছে। এই অবেলায় ঘুমিয়ে নেওয়া মানে অহেতুক কিছু সময় নষ্ট। কত কী ইচ্ছে বাকি আছে এখনো! কত কী যে হতে হবে তার। যেমন এই মুহূর্তে ওর ইচ্ছে হচ্ছে একটা নৌকো হওয়ার। দাঁড় টানা, পাল তোলা, ছই দেওয়া এক নৌকো হেলেদুলে নদীর ওপর দিয়ে বয়ে যাবে। রাতে মাঝি ভাটিয়ালী গাইবে, তারপর ওই নৌকোতেই রান্না করে, খেয়েদেয়ে মাঝিরা ঘুমোবে। আর নৌকোটা তখন নিজে নিজেই ঘুম পাড়ানি গান হয়ে যাবে। নদীর বুকে ঘুম, নৌকোর বুকে ঘুম, মাঝিদের ঘুম দেখতে দেখতে কখন যেন ভোর হয়ে আসবে আর আমার ইচ্ছেও ঘুম থেকে উঠে আরেক ইচ্ছে হয়ে যাবে।
এরপর ও জল হবে। টলটলে এক বিন্দু জল। জমে থাকবে কচু পাতার বুকে, পদ্ম পাতার বুকে। আবার কখন গড়িয়ে পড়ে যাবে টুপ করে! আর ফুরিয়ে যাবে সেই মুহূর্তেই। ইচ্ছে এবার আগুন হতে চায়। দাউদাউ এক দাবানল। কয়েক ঘন্টায় পুড়িয়ে ফেলবে যেন পৃথিবীর সমস্ত বনজঙ্গল। কোন মহাবৃক্ষ বা শিশু গাছ অথবা লতানো কোন লতা – কাউকেই ও জীবন্ত দেখতে চায় না। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে না দেওয়া পর্যন্ত এই আগুন নিভবে না। কিন্তু ওই কয়েকটি ঘন্টাতেই ও বুঝে যায়, এ ইচ্ছেও ওর মনের মত না। এ ইচ্ছেও ওকে শান্তি দেবে না। ও নিজেই আবার বৃষ্টি হয়ে অঝোরে ঝরে পড়ে আগুনের ওপর, অকালবর্ষণে আগুন নিভে যায়, গাছ বেঁচে যায়। ধ্বংস আর সৃষ্টির দ্বৈত খেলায় মেতেছে এক অবুঝ শিশু যেন! ইচ্ছে বিনাশকারী, ইচ্ছে সর্বংসহা, ইচ্ছে সৃষ্টির বীজ। ইচ্ছে মরে না, মনের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত। আর মন তো আবার ইচ্ছের অধীন।
ইচ্ছে কি আমার অপরিহার্যতা জানে? জানে কি যে আমি না থাকলে তারও কোন অস্তিত্ব নেই? ইচ্ছেগুলো তবুও পাগলামী করে, কল্পনার ডানায় উড়ে যায় যেখানে সেখানে।
হাওয়ার তো অবাধ যাতায়াত
ইচ্ছেরও তেমনি আছে অনুভব
চোখ এড়িয়ে যাওয়ার যত কৌশল
শিখে নিয়েছে ইচ্ছেডানা।
আমার চোখ দেখে নি আমার ইচ্ছেকে। কারুর চোখই দেখে না কারুর ইচ্ছেকে। তবু ইচ্ছে থেকে যায় তার অশরীর নিয়ে। ইচ্ছের শরীর নেই। ইচ্ছে তবু অতৃপ্ত কামনা। এ এক অশরীরী শরীরের আসঙ্গ লিপ্সা। তার অলীক ডানায় ভর করে সে উড়ে চলে। দিক হারানোর ভয় তার নেই, বরং দিকে দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকে যায় আমার ইচ্ছেরা। আমার ইচ্ছেরা কখনো রঙিন, কখনো সাদা-কালো কখনো ধূসর। সমস্ত মাত্রা নিয়ে, সমস্ত লন্ডভন্ড নিয়ে ইচ্ছেদের বুকে পুষে রাখি। না, কখনোই বেঁধে রাখি না বা বাধা হয়ে দাঁড়াই না। তারা নিজেদের ডানায় ভর করে যখন যেমন ইচ্ছে খুশিতে মেতে ওঠে, দুঃখে কেঁদে ফেলে, হাহাকার করে চিৎকৃত স্বকীয়তায়।
কিন্তু সত্যি বলতে কি, ইচ্ছেরা কি এত ভেবে জেগেছে? অন্তর্নিহিত মানে বা কারুর মানসিক অবস্থান বোঝার দায় তাদের নেই। যে ব্রেন সেলের উদ্দীপনায় তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়া ঘটে, সে বাহ্যিক ব্যবহারেই হোক বা মনের ভেতরে সুপ্ত থাকা ইচ্ছে কল্পনায় তার প্রকাশ ঘটাক – ইচ্ছেগুলোর পাগলামি থেকেই যায়। এত বেশি কচকচি তাদের জন্য নয়। যেমন এই মুহূর্তে বৃষ্টি নেবেছে অঝোরে, চারিদিক ভেসে যাচ্ছে আর আমার ইচ্ছেরাও ভীষণ ভিজছে। আসলে এই বৃষ্টি এক অলৌকিক সৃষ্টি বলে আমি ভাবি। যেমন আমার ইচ্ছেগুলোও লৌকিকতার থেকে দূরে থাকে আর ওরা ভিজতে থাকে নিঃসাড়ে। এখন, এই মুহূর্তে, আমার সমস্ত অস্থিরতা ধুয়ে যাচ্ছে, মন-প্রাণ ভিজে গলে গলে পড়ছে মোমের মত টুপটাপ। মাটি ধারণ করছে আমায়, আমি এক বীজ হয়ে মাটিতে প্রবেশ করছি, আমার নবজন্ম হল এই মাত্র! বীজ ফেটে বেরিয়ে এলাম এক সদ্য ফোটা সবুজ আমি। এই আমি ধীরে ধীরে বড় হব, মাথা দোলাবো, আবারো ঝুম বৃষ্টিতে ভিজব, আকন্ঠ পান করব জল। আমার শরীরে বয়ে যাবে এই জলের রক্ত, এই জলের উষ্ণতা। আমি মহীরুহ হব ক্রমশ। আমার ইচ্ছেদের কোন চোরাশিকারি কেটে নিতে পারবে না, আমি জানি। আমার বিশ্বাস এই ইচ্ছেগুলো আমার মৃত্যুর পরেও থেকে যাবে এই পৃথিবীতে। যেভাবে স্মৃতি হয়ে থাকব প্রিয়জনের মনে, সেভাবে আমার ইচ্ছেরাও অমর হয়ে থাকবে এখানে।
সময় থেকে সময়হীনতার দিকে যাবে আমার ইচ্ছেরা। সময়কে ছাপিয়ে গিয়ে আকাশের দিকে ছুটে যাবে বারবার। আবার শূন্যের হাউইয়ে চেপে নিঃশব্দে ফেটে পড়বে। তারাভরা আকাশে তারা হয়ে ফুটে থাকবে। গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে চলে যাবে রকেটে চেপে। মাধ্যাকর্ষন উপেক্ষা করে হেঁটে বেড়াবে সেই মাটিতে। আবার এক ঝুলন্ত প্যারাসুট দুলতে দুলতে নেমে আসবে পৃথিবীর বুকে। এই পরিক্রমা থামবে না কোনদিন, যতদিন না মানুষ হিসেবের খাতায় তার মন গুঁজে দেবে। যখন চিত্রকর তার তুলি ফেলে দেবে, ভাস্কর তার ছেনি হারিয়ে ফেলবে, কবি হারাবে তার কলম, তখন আর ইচ্ছেরা থাকবে না। আমিও থাকব না সেই সময়ে, এমনই ইচ্ছে আছে এখনো পর্যন্ত।