যেখানে রাজনীতি নেই

সরোজ দরবার




স্মরণসভায় এই একটানা বসে থাকাটা খুব অস্বস্তির। অনেকক্ষণ থেকেই উসখুস করছি। মনটা একটা বিড়ি বিড়ি করছে বলে, নাকি গীতা মাঝে মধ্যেই চোখ মুছছে বলে, কে জানে! গীতা আমার স্ত্রী। হ্যাঁ, এটা আমারই স্মরণসভা। এসব কথা লাস্টে বলে টুইস্ট দেওয়ার কোনও মানে হয় না। এরকম তো গল্পতেই ঢের ঢের পড়েছি। আর টুইস্ট দিয়েই বা কী লাভ! গোটা জীবনটাই শালা আমাকে টুইস্ট দিয়ে গেল। এখন আমার আর চমকানোর মতো আছেটাইবা কী!
জানেন, আজকের এই সভা-টভায় আসার কোনও ইচ্ছেই ছিল না। এলাম শুধু একটা জিনিস দেখব বলে। অনেকদিনের ইচ্ছে... স্বপ্নও বলা যায়, মনে পুষে রেখেছিলাম, কিন্তু এদিকে তো হুট করে মরেই গেলাম। এই রে, গীতা আবার চোখ মুছছে। গীতাটার জীবনভর এই এক চোখ মোছা রোগ। যত বলেছি, চোখের জল ফেলে কোনও লাভ নেই, ও তত কেঁদেছে। আমি আসলে জীবনে চাকরি-বাকরি তেমন কিছু করিনি। তাই বলে বউ-ছেলের দেখভাল করিনি এরকম কিন্তু নয়। যখন যা পেয়েছি জুটিয়ে নিয়ে কাজ চালিয়েছি। কিন্তু ওই যাকে বলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, স্বচ্ছল, সেরকমটা কোনওদিন হতে পারিনি। চাইওনি বোধহয়। আরে বাবা, গরিব তো গরিব! কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার পিছনে ছোটা আমার পোশাতো না। গীতা আফসোস করত। গরিব বলে অবশ্য আমি নিজেকে লুকোতাম না। দরকার পড়লে বন্ধুদের কাছে হাত পেতেছি। আরে ভাই, গরিব তো আমি শুধু একা নয়। দেশের বেশিভাগ মানুষই গরিব। এখনও। তার জন্যেই তো একদিন সব বদলাতে চেয়েছিলাম। তাই-ই যখন হল না, তখন আর গরিবি নিয়ে আমি একা লজ্জা পাব কেন? কই দেশের কেষ্টবিষ্টুরা তো পায় না! যত দায় বুঝি আমাদের!লজ্জাটজ্জা আমার তাই কোনওকালেই ধাতে ছিল না। গীতা পেত। ও তো মনে মনে একটা সাজানো, স্বচ্ছল সংসারের স্বপ্ন দেখেছিল। ওর মনের মতো কিছুই হল না।
‘...... রাতে তখন একটা শেল্টার দরকার হত। পুলিশের ভয়। আমরা দু’জন পিজিতে বহু রাত কাটিয়েছি। রোগীর আত্মীয়রা যেখানে থাকে, সেখানে রাতে মাথা গলিয়ে দিতাম। বলা বাহুল্য, আমাদের কোনও পেশেন্ট ছিল না। সে বেশ তোলপাড় করা একটা সময়। মনে হয়েছিল, কিছু একটা হবে। মানে আমরা তাই বিশ্বাস করতাম। নাহলে পুলিশের থেকে রাইফেল কেড়ে নেওয়ার হিম্মত ও দেখাল কী করে? তারপর হল কী, একসময় আমরা সবাই বসে গেলাম। যে রাজনীতি করতাম, সেখানেই অনেক ফাঁকফোকর চোখে পড়ল। যা চেয়েছিলাম সেসব কিছুই হল না। আমাদের বন্ধুবান্ধব সবাই নিজেদের জীবনের দিকে মন দিলাম। যে যার মতো করে কিছু না কিছু একটা জুটিয়ে নিলাম। আমাদের স্ট্যাটাস বদলে গেল, গরিবি ঘুচল ধীরে ধীরে। কিন্তু ও তা করল না। নিজেকে পালটাল না। যে কাজ ও করতে পারেনি, তার জন্য ওর লজ্জা ছিল না। বরং আমাদের এই বদলে যাওয়াকে অস্বীকার করে, প্রত্যখ্যান করে ও আমাদের সময়টাকে, আমাদের অঙ্গীকারকে আজীবন নিজের মধ্যে জাগিয়ে রেখেছিল...বোধহয় আমাদেরই মনে করিয়ে দিতে চাইত যে, আমাদের লজ্জা পাওয়া উচিত...’,-মঞ্চে এখন আমারই বন্ধু আমাদের পুরনো দিনের গল্প বলছে। গল্পই বটে, সবই এখন গল্প। বক্তিমে দেওয়ার অভ্যেসটা ওর এখনও বেশ জোরাল আছে। কীরকম গুছিয়ে বলল দেখলেন? চোখ বুজে শুনলে মনে হবে, সব কাগজে লিখে এনেছিল। যাকগে এসব শুনে কত কথা যে মনে পড়ে যাচ্ছে। সত্যি সেই কলোনির আন্দোলন, হাতে লেখা পোস্টার, উত্তাল সময়, পুলিশের ভয়- কী তোলপাড় করা সময়টাই না ছিল! শুনতে ভালই লাগছে। আবার লাগছেও না। মনটা বড্ড উসখুশ করছে। আসলে অনেকদিনের একটা ইচ্ছে ছিল... কী জানি সেটা পূরণ হয় কি না। নাহলে তো আসার কোনও মানেই হয় না।
২)
-একজন রাজনৈতিক কর্মী শেষপর্যন্ত আর কী করতে পারে? কিছুই যখন বদলাল না, তখন নিজেকে না বদলানোই তো ঠিক সিদ্ধান্ত।
-মানছি, কিন্তু শুধু সেটাতেই তো আর সবদিক বিচার হয় না। ওরও কতরকমের যন্ত্রণা ছিল জানিস তুই?
-সে তো থাকবেই।
-থাকবেই বললেই হল? কই আমরা তো সেসবের আঁচ পোহাইনি। আমরা তো নিজেদের মতো করে মোটামুটি গুছিয়ে নিয়েছি। তাহলে ওকে বোঝাতে পারলাম না কেন?
- শোন, আমরা অনেকদিন আদর্শ টাদর্শ থেকে বেরিয়ে গিয়েছি। মনে মনে নিজেদের যাইই ভাবি, বুকে হাত দিয়ে বল তো, আমরাই একদিন যে কথা বলেছি তার থেকে নিজেরা সরে আসিনি? হ্যাঁ, বলতে পারিস যে, সরতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু এটা তো মানবি, একমাত্র ওই-ই শেষদিন পর্যন্ত আমাদের রাজনীতিটা করে গিয়েছে। টিকে থেকেছে। আমরা দলছুট, ও নয়।
-কিন্তু তাতে কী হল? সারাজীবন কীইবা পেয়ে ও চলে গেল, বল? লোকে তো ওকে নায়ক ভাবেনি, একজন হেরো হিসেবেই দেখেছে। একটা ব্যর্থ, বেকার লোক। আমাদের বন্ধুদের কথা বাদ দে। তুই যেভাবে ভাবছিস, আর পাঁচজন কি ওকে সেভাবে দেখেছে, সেই সম্মান দিয়েছে?
-নাইই যদি দিত, তাহলে ওর সঙ্গে মিশত কেন এতলোক? খেয়াল করে দেখ, যদি ওকে হেরো ধরেও নিই, ওর স্মরণসভায় এতগুলো লোক কেন এল তাহলে? আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব তো মোটে এই ক’জন। বাকি সব বাইরের লোক। অনেকের সঙ্গে তো ওর কী সম্পর্ক, কতখানি ঘনিষ্ঠতা তাই-ই আমরা জানি না।
-সে তো আজকে। কিন্তু আমি নিজের চোখে দেখেছি, কেউ কেউ ওকে কতখানি ছোট করেছে। আজ অবশ্য সকলেই ভাল ভাল কথা বলবে। কিন্তু কেন ছোট হতে হয়েছে ওকে, ও অধ্যাপক, মাস্টার হয়নি বলে? নাকি, কেটে কেটে চিবিয়ে চিবিয়ে ইংরেজি বইয়ের নাম বলত না বলে?
-আহ তুই আবার ভুল করছিস। তোর কী মনে হয়, ও এসব বুঝত না? হান্ড্রেড পার্শেন্ট বুঝত। জেনেবুঝেই ওদের সঙ্গে মিশেছে। বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র আছে, মানে বুঝতে পারছিস তো কী বলছি...ও সেসবকে পাত্তাই দিত না। আবারও বলছি শোন, একজন রাজনৈতিক কর্মী শেষ পর্যন্ত কী করবে? যত বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানো যায় সেই চেষ্টাই তো করবে। আমরা একটা সময় পর আর তা করিনি। ও কিন্তু চালিয়ে গিয়েছে। আর তুই যেগুলো বলছিস, ওই সব আঁতলামি, নাক উঁচু তাত্ত্বিককে ও স্রেফ প্রত্যাখ্যান করেছে। যারা সেদিন বোঝেনি আজ বুঝছে। বুকে কোথাও না কোথাও ব্যথা চিনচিন করছে। দেখগে, ওই তত্ত্ব কপচিয়েরাও হয়তো মনে মনে নিজের এরকম একটা স্মরণসভার কথাই এখন ভাবছে।
-তবু কি জানিস তো, ওর বউ ছেলে, সংসারকে সেভাবে চালাতে না পারার কষ্ট, রাজনীতির ব্যর্থতা, এতগুলোর যন্ত্রণা আমি কিছুতেই ভুলতে পারি না। আমার আজ খুব মনে পড়ছে, তখন সংসার টানতে ও মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভের চাকরি নিয়েছে। একদিন এসে বলল, দেখ পার্ক স্ট্রিটের হোটেলে ডাক্তারদের মদ-মাংস খাইয়ে এলাম। কোম্পানির পয়সায়। ভাব তুই, যে কি না কেউ অসুস্থ হলে চাঁদা তোলে। শ্রমজীবী হাসপাতালে হলেও ভর্তি করানোর জন্য পাগল হয়ে যায়, তাকেই এই কাজটা করতে হল, দু’টো পয়সার জন্য। সেদিন যে ও কী যন্ত্রণা পেয়েছিল, সে শুধু আমিই জানি। ক’জন তার খোঁজ রেখেছে?
-তবু কোথাও তো রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সফল, সেটা তো মানতেই হবে?
-হয়তো, তবু একটু অন্যরকম কি ভাবতে পারত না? কী জানি!
এরা আমার দুই বন্ধু। খুব কাছের। বন্ধু নয়, এককালের রাজনৈতিক সহকর্মী বলাই ভাল। আমাকে খুব কাছ থেকে চেনে তো, এগুলো ওদের মনে হওয়া স্বাভাবিক। হ্যাঁ, একদিন আমরা সবাই বসে গিয়েছিলাম। আজ তো চাদ্দিকে তাকিয়ে দেখি, সবই প্রায় বসে গিয়েছে। কোথাও কিছু মাথা উঁচু করে আছে কি? গরিব টরিব বলে মাঝে মধ্যে কষ্ট হয়েছে বটে। কখনও ওদের কাছেই তা বলেও ফেলেছি। কিন্তু আমার সত্যিকারের হতাশা বলতে যদি কিছু হয়, তবে এই চতুর্দিকের সব বসে যাওয়া। শুধু আমরা নয়, সবাই, সবকিছু এভাবে বসে গেল! কেন?
যাকগে, ওরা বাইরে সিগরেট ফুঁকতে এসেছিল। আমিও উঠে এসেছি। এমনি সময় হলে তেড়ে গালাগালি করত। সিগরেট সিগরেট করেই তো ফুসুফুসে ক্যানসার ধরা পড়ল। শেষের দিকে ও বস্তুটির নাম শুনলেই বকাবকি শুরু করত সবাই। কিন্তু এখন তো আমায় দেখতে পাচ্ছে না। আর কী আশ্চর্য! আমিও ভুলে গিয়েছিলাম, এখন তো আর আমি বিড়ি-সিগরেট কিছুই টানতে পারব না। আপনারা নির্ঘাৎ ভাবছেন, বেকার এতটা সময় নষ্ট করে একটা অচেনা লোকের স্মরণসভার কচকচি কেন শুনছেন? কী লাভ! ঠিকই ভাবছেন, বুঝলেন। আমারও আর শোনার ইচ্ছে নেই। আমিও পালাব এবার। একবার ভিতর থেকে ঘুরে এসেই কাটব। বেকার সময় নষ্টই হচ্ছে মনে হয়। এসেছি যখন যাই আর একটিবার গীতাকে দেখে আসি শুধু।
৩)
‘ ... আমরা চাই আরও খানিকটা সময় ওর সঙ্গে থাকি, ওর স্মৃতির সঙ্গে। এক জীবনে তো কত ছোট ছোট পর্ব। অনেকগুলো টুকরো জীবনের মতো। অনেক মানুষের সঙ্গে মেলামেশা। প্রত্যেকের কথায় আলাদা আলাদা পৃথিবী উঠে আসে। সেগুলো এক করেই বোধহয় ওকে পুরোপুরি চিনে উঠতে পারব।’
-আমি কিছু বলতে চাই...
-এসো এসো, আমরা তো অনেককেই চিনি না, ওর সম্পর্কে কারও কিছু বলতে ইচ্ছে করলে প্লিজ এভাবেই উঠে আসবেন।
(এই এখন যে বলতে এল, ও আসলে একটা বাচ্চা ছেলে। কিছুই দেখেনি বেচারা। এমন একটা সময়ে বড় হয়েছে, যখন সবকিছুর শেষের শুরু। অল্পবয়সিদের সঙ্গে আমি খুব মেলামেশা করতাম। ভাল লাগত। ও বলতে এসেছে ভালই হল, পুরনো কাসুন্দি শুনতে শুনতে আমারই একঘেয়ে লাগছিল। আপনারাও নিশ্চয়ই বোর হচ্ছিলেন? দেখি, এ কী বলে শুনি...)
‘...আমি টাকা দিয়ে একটা কলেজে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তাম। মেরিট ফেরিট এসব বাজে কথা। টাকা না দিলে মেরিট থাকলেও এইসব কলেজে ভর্তি হওয়া যায় না। আর টাকা দিলে মেরিট না থাকলেও চলে। মেধা কথাটা আমাদের সময়ে অবসোলেট হয়ে গিয়েছে...তো এরকম জায়গায় যারা পড়ে টড়ে, তারাও চায় টাকাটা বুঝে নিতে। যা ইনভেস্ট হয়েছে, তা সুদে আসলে তুলে নাও। আমিও সেই দলে...’
(ছোঁড়া ধরে ফেলেসে...ওহহ ঋত্বিকবাবুর কথা মনে পড়ে গেল। সত্যি আজব কল ফেঁদেছে এই কলেজগুলো। মুখে মেরিট মেরিট, অথচ টাকা দিলেই মুড়ি মিছরিকে এক বাক্সে সেঁধিয়ে দিচ্ছে। সর্বগ্রাসী ব্যবসা। সে আর কাকে বোঝাবো! চেষ্টাও করিনি। তখন সেকেন্ড ইয়ার বোধহয়, যখন ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল...)
‘...দেখা হওয়ার পর ভাবলাম, আজকাল এমন মানুষও থাকে! কই ওঁর বন্ধু বান্ধবরা তো কেউ এমন নন। তাহলে এই লোকটা এরকম কেন? সব বুঝেও এরকম উদাসীন কেন? একদিন আমার মেসে টেনে নিয়ে গেলাম।’
(মেস বলে যেটা দেখাল, সে জায়গাটা এককালে জলাজঙ্গল ছিল। আমরা পুলিশের তাড়া খেয়ে ওখানে শেল্টার নিতাম। বহুকাল বাদে গিয়ে দেখলাম হয় পেল্লায় পেল্লায় বাড়ি নয় ফ্ল্যাট। সব বদলে গিয়েছে। আমাদের আত্মগোপনের জায়গা, এখন একটা তরতাজা ছেলের আত্মপ্রকাশের জায়গা। ওদের মেসটা দেখে সেদিন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয়েছিল।)
‘ অদ্ভুতই অনুভূতিই বটে। কিছুতেই ওঁর রহস্য আমি ভেদ করতে পারিনি। ওঁর কাছেই গল্প শুনেছি ওঁর কাজকর্মের। হুগলিতে পার্টির কাজ। আত্মগোপন। অন্য নাম নেওয়া। কিন্তু আমাকে কোনওদিন একটা রাজনীতির বই পড়তে দেওয়া তো দূরের কথা, সামান্য লিফলেটও দেননি।’
(দিয়ে কী হবে? খুব হাসি পাচ্ছে জানেন, ওর মুখে এই পাকা পাকা কথাগুলো শুনে।)
‘শুনতে ভাল লাগত...ছেলেমানুষের মতো কত কথা যে বলত। আমারও নিজের অনেক গোপন কথা বলতে পারতাম। মা-বাবা, এমনকী বন্ধুকেও যা বলা যায় না, সেসব কথাও বলে ফেলেছি। মানে ওঁর কাছে বলা যেত আর কী! আবার পায়ে চোট পেলে বলেছি, ওষুধ দাও।’
(খুব ভুগত ছেলেটা। সারাক্ষণ এটা নয় ওটা লেগেই আছে।)
‘লেগে থাকতাম ওঁর সঙ্গে। জানি না কেন। কই রাজনীতির কোনও কথা তো হত না! একসময় বেকার ঘুরে বেড়াতাম। আমাকে বলতেন, এভাবে বসে থাকলে হবে? কী আশ্চর্য ভাবুন, অথচ এই লোকটাই নাকি জীবনকে সিরিয়াসলি নেয়নি। কতজনকেই না এরকম বলতে শুনেছি আমি। অথচ আমাকে বলল, টিউশানি জোগাড় করে দিচ্ছি, পড়ানো শুরু কর।’
(শুরু করল। তবে চাকরি বাকরির ধার ধারল না। মানে ওই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চাকরি বাকরি ওর আর হল না। চাগাড়ও ছিল না তেমন। এদিকে বাড়ি থেকে চাপ দিচ্ছে, একটা আশা থাকে তো...বেশ কষ্টেই ছিল কিছুদিন। আমি বলতাম, দেখ না কিছু না কিছু হয়ে যাবে। ভেঙে পড়তে নেই।)
‘ ভেঙেও পড়নি। টাকার পিছনেও ছুটিনি। হ্যাঁ, পরে এটা ওটা করে সেই কর্পোরেটের সামনেই মাথা ঝোঁকাতে হয়েছে বটে। সেখানে এমন অনেক কিছুকে প্রমোট করি রোজ, যেগুলো মন থেকে চাই না। মনে হয়, ভুল করছি, এতে মানুষের ভাল হচ্ছে না। কিন্তু চাকরি টেকাতে গেলে সেসব না করেও উপায় নেই। এসব থেকে বেরিয়ে যেতে খুব ইচ্ছে করে, মাঝে মধ্যেই মনে হয় এবার পালাই, কিন্তু পারি না। একটা জাঁতাকল তো! কিন্তু মাঝেমধ্যে একটা সংকট, একটা দ্বন্দ্ব টের পাই। তখন ভাবি, কোত্থেকে এল এসব? আমি তো কোনওদিন রাজনীতি করিনি। কখনও শ্রেণির সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে দেখতে শিখিনি। আমার বন্ধুরা অনেকে করেছে। তাদের মুখে এসব সংকটের কথা শুনেছি। তারা এখন সব অন্য রাজ্যে চাকরি করে আর রেস্টুরেন্টে মদ খাওয়ার ছবি দেয় ফেসবুকে। আমি ভাবি, আমার মনে তাহলে এসব আসে কেন? কেন সব পেয়েও বিন্দাস থাকা যাকে বলে, সেরকমটা থাকতে পারি না...’
(পারে না! ঠিক শুনছি তো? পারে না সত্যি?)
‘সত্যি নিজের কথা ভেবে অবাক হই। এক এক সময় মনে হয়, আমাকে কেউ নিজের ইচ্ছেমতো ভিতর থেকে পালটে দিয়েছে। অস্বীকার করার ইচ্ছে আর না করতে পারার কষ্ট, এসব তো কেউ আমাকে শেখায়নি। আবার শিখিয়েওছে মনে হয়। আমি এখনও পারিনি। কিন্তু অস্বীকার করা যে যায় না তা নয়। অন্তত একজনকে তো তা করতে দেখেছি। আমিও যে কোনওদিন পারব না তাও নয়। আর যদি নাও পারি, এই দ্বন্দ্বটা দিয়ে যেতে পারব। এটাই পাওনা। আমি বুঝতে পারি, উনি আমাকে একটাও লিফলেট দেননি। কিন্তু কারও কারও জীবনটাই একটা লিফলেট। এরকম স্মরণসভাতেই তা ফিরি হয়, হাতে পাই।’
পেল তাহলে শেষমেষ। উফফ... প্রাণ খুলে হাসতে ইচ্ছে করছে এখন জানেন। বেশ গুছিয়ে বলেছে ছেলেটা। ছোঁড়া একদিন কর্পোরেটের পায়ে পড়ল দেখে খারাপ লেগেছিল একসময়। যোগাযোগটাও কমে গিয়েছিল। আজ দেখছি কমেনি। আসলে কী জানেন, একসময় রাজনীতি থেকে বসে গিয়ে খুব খারাপ লাগত। আরও খারাপ লাগত চাদ্দিকের এই বসে যাওয়া দেখে। খুব ইচ্ছে করত, লিফলেট লিখে বিলি করি। লোককে বলি, কী ভুল হচ্ছে। নামতে নামতে আমরা কোথায় যাচ্ছি...কিন্তু সময়টাই তো বদলে গেল। এসব করে কী লাভ হত বলুন? আজ মনে হচ্ছে অন্তত একটা লিফলেট তো দিয়ে যেতে পেরেছি। আমি রাজনীতি করা ছেলে। কর্মী। একজন রাজনৈতিক কর্মী এর বেশি আর কীইবা করতে পারে বলুন?
আর এখানে থাকার কোনও দরকার নেই। এখন অনেক কথাবার্তা চলবে। ওসব আর শুনে কী হবে? আপনারাও তো মশাই হাতের কাজ সরিয়ে রেখে এতক্ষণ ধরে এসব শুনছেন। আমার ইচ্ছে পূরণ আর আপনাদের সাধ মেটানো গল্প তো এক নয়। তবু বলতে ইচ্ছে হল। বললাম। আপনাদের অনেকটা সময় নষ্ট হল না তো!