আমি অসম প্রেমে বিশ্বাস করি

সারাজাত সৌম




সত্যি! সত্যিই আমি অসম প্রেমে বিশ্বাস করি। জানি এমন প্রেমে কোনো বাঁধা থাকে না। না শরীরে—না মনে, থাকে শুধু একে অন্যের ভেতর অফুরাণ প্রবেশাধিকার। সে যদি মানুষ হয় বা না হোক, কিংবা অশরীরী যে কেউ—যে কোনো কিছুরই বস্তুগত আকাঙ্ক্ষা থাকে অপরিসীম। আর তাদের সবার মাঝেই একই রূপ বিরাজমান। তারা মুক্ত (আক্ষরিক অর্থে যাদের ধরা যায় না) আর স্বাধীন জীবনে বেঁচে থাকে আজীবন স্ফুর্তি নিয়ে। যেন সে রোজ আসে আবার যায়! প্রায়শ গাছের সাথে কথা হলে আমি তাকে বলি, তুমি এমন বোবা কেন? খসখসে কিংবা মসৃণ, কখনো কখনো ছুঁয়ে বলি তুমি এমন কেন? তারপর সে যা বলে তা কেবল আমিই বুঝি এমনকি সেও আমার কথা। এটা মহাআনন্দের—পুলকিত এক অনুভবও বটে, উভয়ের দিক থেকেই! এটা অপ্রকৃতিস্থ আমাদের জীবন-যাপনেরই অংশ। কারো মাঝে কোনো ঈর্ষাও থাকে না। কতোদিন আর মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকা যায় বলো? এই সব লতা-পাতা, ফুলের সাথে একটু দুষ্টুমি করেও তো জীবন বুঝা যায়। পাঁপড়ির গালে চুমু খেলে সে তো লাল হয়ে উঠে কিন্তু রাগ করে না। নাকি করে, মাঝে মাঝে আমিও বুঝি না। সে যাই হোক। এবার মানুষের প্রেমে পড়বো বলে যেই তোমার কাছে গেলাম। তখনই চারদিক থেকে নানা প্রশ্ন আর প্রতারণার বিষয় এসে আমার মাথাটাকে বিগড়ে দিলো। এটা চাই, ওটা চাই! কতোটুকু হলে আর চাই না। এখন কে বলবে এসে আমাকে এই ঘোরগ্রস্থ সময়ের ভেতর—যে, আমি আর কিছুই চাই না। এটা বড্ডো বিপদজনক—বিস্মৃতির রাজ্যে বিরাজমান আমাদের এই মন। বলি, তুমিই কী তোমার নিয়ন্ত্রক—নাকি অন্য কেউ। যেন আমাদের সমূহ আশকারা থেকে এখনই ছুটি নিয়ে পালাবে এক পাগল আর তার আলখাল্লা থেকে অসংখ্য মৌমাছি অন্তত একটি প্রেমময় ঋতুর অবগাহনে। জীবন কী এমনই—নাকি এমন না! এই বোধ নিয়ে যতোবার আমি মানুষের কাছে ফিরে ফিরে গিয়েছি, তারা আমাকে পাগল বলেই সাব্যস্ত করেছে হরহামেশায়। ইচ্ছে বলে এই যে আমার প্রাণ, আমি তাকে কোথায় জেনো ফেলে এসেছি রাগে—বৈরাগে। জানি আমার সেই ছোট্ট কুকুরটার চোখে এখনো বৃষ্টি দেখার আনন্দ তাড়া করে। যেন এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে সে আর তার চঞ্চল দিনগুলো নিয়ে। যেন আমার চোখের ভেতর সে আজও তরুণ লেজ দুলিয়ে হাটছে। আহ! আমাদের এক সঙ্গে থাকা দিনগুলি। সে জীবন তো নিঃসাড় নিরালায় চলে গেছে । একটা দানবীয় ট্রাক যেদিন তাকে আচমকা উড়িয়ে নিয়ে গেলো হাওয়ায়, সে থেকে আর দেখা হয় না আমাদের। আমি তখন অনেক কেঁদেছি। হয়তো না বুঝেই, না জেনেই। কিন্তু জীবনের এই চংক্রমন তো বারবার ফিরে আসে মনে! নানা কারণে, নানা ভাবে করুণা করে—নয়তো ভালোবেসেই আসে। তবুও হেঁটে যাচ্ছি। ক্লান্তি মেঘের মতো এখন আমাকে এমন এক জায়গায় পৌঁছে দিয়েছে, যেখান থেকে তুমি ছাড়া আর একটি সাঁকোও নেই যে পাড় করবে আমাকে। সেই মুখ—মথের মতো উড্ডিন আর রঙ্গিন। আমাকে গান শুনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বনে—পাতায় রং মেখে কোনো অপেরার দিকে! এই প্রেমে কে কার প্রতিবেশি, কে জানে। চারপাশে মৃদু হাওয়া—পাখির সুরের মতো মিহি তার গান। কোথাও কী শুনেছি এরও আগে—তা তো মনে পরছে না! তবু চেষ্টা করছি জল থেকে উঠে আসা মাছেদের মিছিলে ডুবে গিয়ে তাদেরকে এই গান শুনাতে। অথচ তারা ভাবছে আমি শিকারী। মানুষের মতো ভয়ংকর আর তাদের জীবন নিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ছি চারদিক। মৃতদের পাশে যেমন কেউ আর থাকতে চায় না, ফিরে যায় নিয়মে—অনিয়মে। কেবল ফিরে ফিরে এই দৃশ্যই তো মূর্ত হয় উঠছে এই জগতে। আর তখনই আমি অনুভব করছি, যেন আমার কানের পাশে এক অদ্ভুত থালার মতো কান এসে জোড়া লেগে যাচ্ছে! হয়তো আমি পিছনের কিছুই দেখতে পারবো না আর। দেখতে চাইও না। ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে দেখি ভয়ংকর সে সময়—মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে আজ। প্রত্যেকের হাতেই একটি করে ভূতুড়ে মেশিন, নানাভাবে নিজেদের পাল্টে দেবার অহমিকা। যেন বৃষ্টি হচ্ছে—অথচ কোথাও বৃষ্টি নেই। এমন নুপুরের শব্দে আমার প্রায়ই বিভ্রম হয়। আর আমি তাকে তখন তাবৎ পাতাগুল্মের ভেতর খুঁজতে থাকি। আকাশ থেকে ছুটে আসছে কোটি কোটি মরমী শব্দ! কেউ কী আজ মাইক বাজাচ্ছেন? সত্যিই তো, মানুষ মরে গেলে সবাইকে জানাতে হয়। তিনি আর নেই আমাদের মাঝে। মানুষটি কিছুক্ষণ আগেই পাখা মেলেছে পশ্চিমে...

প্রভূত আঁধার—এই যে অসম সব কিছু। আমি তারে খুব ভালোবাসি। তারপর কেউ ফিরে যাবে ঘরে—কেউবা ভাগড়ে আবার কেউ কেউ পানশালায়। অতিরিক্ত মদে—প্রাণে! গাঢ় সেই সবুুজ আলোর নিচেই আমার রব। হ্রদের কিনাড়ে বসে বাঁশি বাজাচ্ছেন এখনো। কে আছো শান্ত বলো, আমার সব কিছু খুলে নাও তোমার মসৃণ হাতে। যদি তুমি পাথরের ভাষা বুঝে থাকো—যদি বুঝতে পারো সকল জীব ও জড়ের আর্ত নিনাদ। প্রতিটি মুহূর্তেই আমি প্রশ্ন নিয়ে ফিরি। ইচ্ছার অধিক ইচ্ছার সাথে খেলা করি আমিই তো রোজ। ভাষা বদলে যায়। ইচ্ছেরাও তো বদলে যায় নিয়ত। এমন ছায়া পড়ে আছে সবখানেই! বিড়ালের ইচ্ছার মতো যদি পড়ে থাকতো মাছের শরীর আর ইঁদুরের ইচ্ছার মতো পাকা ধান এমনকি মানুষের বিশাল আনন্দ—এখানে—ওখানে। জানি—এই মানুষই তখন চিৎকার করে বলে উঠতো, সুখি হওয়ার মতো এইসব বিষয় কী পানসেই না লাগে আমাদের। কিন্তু আমি তো মিলেমিশে থাকতে চাই এইসব মূর্ত—বিমূর্ত দৃশ্যের ভেতরে। তবু সেখানেও আছে মৃত্যুর ভয়। তৈরী করা এইসব ছকেই ফিরে আসে জীবন আবার ফিরে যায়! যদি মানুষেরা ভালোবাসে নিজেদের তবে অন্যেরা তার বিপরীত! তবু তোমাকেই দেখতে পাই—তুমি আসো নিরব কোনো গাছের কুঠরে একজোড়া পতঙ্গের মতো—আমার ইচ্ছার মতো—দেখো, আমরাও তখন নেচে নেচে গান গাই আর নিজেদের শরীর ছুঁয়ে নিজেরাই চমকে উঠি বারবার। দূর থেকে দেখতে পারি মানুষের নানাবিধ যন্ত্র—অস্ত্র আর বেঁচে থাকবার নিত্য নতুন ব্যবহারিক কৌশল। আমি তো বলছি না, মানুষ ভালো না বাসুক—বলছি না, তারা দূরে থাকুক। অথচ সে তার ইচ্ছাটাকেই মেরে ফেলেছে ভালোবাসার ভান করে এমনকি যুদ্ধ করে। এখনো তো বাঁচা যায়—সুদীর্ঘ তার চিন্তায়। তবে কে আছে এই ধ্যানের মতো স্থির আর পরিচ্ছন্ন। যা ছুঁয়ে দিলেই আমি বা আমরা পেয়ে যাবো নানা জীবের জীবন। ছুটি কাটাতে যাবো উড়ে উড়ে ফরেস্টে। সাঁতার কাটবো অতল জলের ঢেউয়ে। সুরভি ছড়িয়ে বসে থাকবো ফুলের উপর। আর শীতকালে সাপের শরীরে হেলান দিয়ে রোদ পোহাবো বনের। ভালোবেসে কখনোবা চুমু খাবো নারী—চুমু খাবো পুরুষ। শিশু হয়ে ঘুমিয়ে পরবো যখন তখন—যার তার কোলে। এখনো তো এভাবেই বেঁচে আছি—হে আমার অসম প্রেম । তুমি কেবল জয়ী হও—নত হও মৃত্যুতে আমার।