মৃত্যুপ্রিয় বালিকার গান

সূর্য্যমুখী




শরীরের ভাঁজে লুকিয়ে থাকে যে মৃতদেহ- আমারই জমজ; মুখ তুলে স্বপ্ন দেখে একটিশীতের সন্ধ্যা, ঘোলাটে অন্ধকার। অপরপ্রান্তে তখন ভৈরবঘাট থেকে ছাড়ছে এক বিষণ্ণ ইস্টিমার; ছেড়ে যাচ্ছে মশলার শহর, কুমারী লবঙ্গ আর আটপৌরে শেয়ালকাঁটার ঝোপ। মানুষের ডানায় ভর করে পৃথিবীতে নেমে আসে দুরের অশ্বারোহী- নেমে আসে এলোপাথাড়ি শোকের কাফন। আমি স্বপ্নের নামে কানপাতি নীল হৃৎপিণ্ডে- শুনি, মৃত্যুর মতন কোমল আর নির্জন এক শালিকের গান। ঘুম আসে না, মৃত্যুও; তৎসম ডানায় ভর করে উড়ে আসে জলজ আয়নার ঘ্রাণ।

তোমাদের সম্মিলিত কোরাস আমার না, আমি স্বপ্ন দেখি একটি বিষণ্ণ তালপাতা, গড়াই মাঝির ভিটে অথবা আরক্ত সুপারির বন। বাবলাতলায় শীতকাল নামলে হাতড়ে ফিরি একঝুড়ি স্বপ্ন- ইকারুসের ডানা। যেন অবিকল নয়নতারা- তারও আগে জাদুর আয়না; যেন কোমল মৃত্যুর হাত ছাড়া আর কোন ভালোবাসা অবশিষ্ট নেই। নেই ফুলতোলা বালিশের ওয়ার, পরিচিত বিছানার পাড়; ঘুম ভাঙলে রোজ হাত ফসকে গড়িয়ে পরে জীবনের পাতা। অথচ একদিন মৃত্যুর হাতধরে পৃথিবীভ্রমণে যাবো বলে তুলে রেখেছি তাবৎ শালিকের ডানা।

‘হে কবি, কাক ও কুকুরের নিঃশর্তভ্রমণ সঙ্গী। সন্ধ্যা হলে ডুবে যাও সূর্যমুখীর বনে আর দীর্ঘতর অপেক্ষার জন্য বুনে নাও ব্যক্তিগত নদীর কিনার;কোনদিন, কোনদিন কি যাপিত জীবনের ঝুল বারান্দায় নেমে আসবে না প্রতীক্ষিত রাজহাঁসের ডানা অথবা কোমল মৃত্যর ঘ্রাণ? নখের কোণজুড়ে এঁকেছিলে যে দূরের বাতিঘর, নিলামে উঠার পূর্বেই কি খুঁজে নেবে না তার একান্ত ইতিহাস?’ ফিসফিস করে বলে উঠে পশ্চিমের বাতাস।

অতপর এক হাজার রাত পর পৃথিবীর বুকে নেমে আসে স্বপ্নের ইকারুস- মৃত্যুর ডাকনাম। আর দ্বৈপায়নের তীর ঘেঁষে ফিরে আসে কৈবর্ত্য বালিকা; ভুলে যাওয়া জোছনার অকাল বৈধব্য। ফুরিয়ে আসে অলৌকিক আপেলবাগান, কামিজের প্রতীক্ষা, আমলকীর বন অথবা জীর্ণ ইঁদারা। ফুরিয়ে আসে দুঃস্বপ্নের প্রহর একান্ত মৃত্যুর আলিঙ্গনে।

ফিরে আসে স্বপ্নের দিন- ইতিহাসের ধারিবাহিকতা। গাঢ় শীতকাল। জানালার পাশে হাত ধরে বসে থাকে আমলকীর বন। অপেক্ষাজুড়ে নির্জন নাম; খোসা ছাড়ানো পৃথিবীর ইতিহাস। এভাবেই শুরু হয় মৃত্যুপ্রিয় শালিকের গান। স্বপ্নের হাত ধরে নেমে আসে কোমল মৃত্যুর ঘ্রাণ; প্রগাঢ় স্রোতের আরক্তিম আলিঙ্গন। এই প্রেম, এই সমর্পণের কথা বলেছিল জোছনার ঢেউ? ভাসানের আগেই খুঁজে ফিরে জলের অতল; কেউ কেউ হয়ে যায় অবাধ প্লাবন। আজন্মের সাধ মুখ খুঁজে মৃত্যুর বুকে।

‘যেন এর চেয়ে বেশি ভালোবাসেনি মানুষ’ – বলে উঠে পুরনো ভিটার চন্দ্রবোড়া।