রাশিয়া

অদ্বয় চৌধুরী

আন্তোন চেখফ (১৮৬০ - ১৯০৪)

১৮৮৩ সালের জানুয়ারি। ভিক্টোরিয়ান রাশিয়া। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে আধুনিকতার আগুয়ান অবয়ব, অমোঘ হয়ে উঠছে তার উপস্থিতি। আধুনিকতার এক অনুষঙ্গ হিসাবে প্রিন্ট মিডিয়ার উত্থান ও ব্যাপ্তি ঘটছে রকেটিয় গতিতে। ন্যূনতম সভ্য জীবনধারণের ক্ষেত্রে খবরের কাগজ পাঠ হয়ে উঠছে অন্যতম শর্ত! জীবনধারণের শর্তের সাথে সাথেই দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে মূল্যবোধের। বিশেষত পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ত বদলে যাচ্ছে। ভেঙ্গে পড়ছে পুরনো ভাবনা-চিন্তা, গড়ে উঠছে নতুন ধ্যান-ধারণা। মূল্যবোধ, আকাঙ্ক্ষা, চাহিদা, আদর্শ, ভাবনা— প্রতি ক্ষেত্রেই প্রজন্মগত ব্যবধান ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। এমনকি, মানুষের বিখ্যাত হবার, ‘খবর’ হয়ে ওঠার আদিম ও অকৃত্রিম প্রবণতা এক হাস্যকর পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে।
এইরকম এক পরিস্থিতিতে আন্তোন চেখফ রুশ ভাষায় এই ছোট গল্পটি লেখেন যার শিরনাম ইংরেজি তর্জমায় ‘জয়’। এই গল্পটি চেখফের সাহিত্য-জীবনের প্রথম দিকের সৃষ্টি। তখন তিনি মূলত রোজগারের তাগিদেই নিয়মিত ছোট ছোট সরস গল্প লিখছেন যেগুলিকে গল্প না বলে স্কেচ বলা যায়— রাশিয়ার ষ্ট্রীট লাইফের সেটায়ারিকাল ক্রনিকল্। ভিক্টোরিয়ান যুগের অন্তিম পর্যায়ে অবস্থানরত রাশিয়ার পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক— এক কথায় সামগ্রিক চিত্র হল এই গল্পটি। আসলে এ হল সামাজিক ক্ষতচিহ্নে আঁকা এক নান্দনিক চিত্র। কৌতুকের রঙে চোবানো। গল্পটির আপাতসরল কৌতুকময় মোড়কের ভিতরে লুকিয়ে থাকা সামাজিক অবক্ষয়ের ফলে সৃষ্ট এক সংকটময় পরিস্থিতির প্রতি গভীর উদ্বেগ সংকেতবাহী হয়ে ওঠে চেখফের স্বকীয় লিখনশৈলীতে। তবে এই সামাজিক সংকট কোন এক বিশেষ সময় বা স্থানের নয়। এ হল চিরন্তনী। এবং, এখানেই গল্পটিও চিরন্তনী হয়ে ওঠে।
কৌতুক ও উদ্বেগের এই সুষম বণ্টন অনুবাদে বজায় রাখার চেষ্টা হয়েছে। সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে, মূল গল্প থেকে কোনভাবেই বিচ্যুত না হয়ে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাক্যের গঠন ও বিন্যাসে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আসলে, যে কোন অনুবাদের ক্ষেত্রে লেখকের সৃষ্টি তো হল বাঁশ আর খড়ের তৈরি কাঠামো, তার উপরে মাটি লেপার কাজটা তো অনুবাদকের! এই গল্পটির ক্ষেত্রে আশা করি সেই মাটি ধুয়ে যায় নি এই ভরা বর্ষায়!

******************

উল্লাস

রাত বারোটা।
উত্তেজিত মুখে আর উসকোখুসকো চুলে মিতিয়া কুলদারোফ বাবা-মায়ের ফ্ল্যাটে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে এবং ঘরময় দৌড়ে বেড়ায়। বাবা-মা ইতিমধ্যে শুয়ে পড়েছিলেন। বোন বিছানায় শুয়ে শুয়ে একটা উপন্যাসের শেষ পাতাটা পড়ছিল। আর ইস্কুল-পড়ুয়া ভাইয়েরা ঘুমের দেশে তলিয়ে গেছিল।
“কোত্থেকে এলি রে তুই?”— অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে বাবা-মা। “কি হয়েছে তোর?”
“আহ, জানতে চেও না! আমি কখনো ভাবিনি! না, আমি ভাবতেই পারিনি কক্ষনো! এ... এ যে এক্কেবারে অবিশ্বাস্য!”
জোরে হেসে ওঠে এবং হাতলওয়ালা চেয়ারটায় বসে পড়ে মিতিয়া। এতোটাই আনন্দে বিহ্বল হয়ে পড়েছে যে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না সে।
“এ অবিশ্বাস্য! তোমরা কল্পনাও করতে পারবে না! দেখ দেখ!”
একটা লেপে নিজেকে জড়িয়ে তার বোন বিছানা থেকে এক লাফে দাদার পাশে পৌঁছে যায়। ইস্কুলের বাচ্চাগুলো উঠে পড়ে।
“ব্যাপারটা কি? তোকে তো চেনাই যাচ্ছে না!”
“কারণ আমি ভীষণ খুশী, মা! তুমি জান, এখন গোটা রাশিয়া আমায় চিনে গেছে! সমস্ত রাশিয়া! আগে শুধু তুমিই জানতে যে দমিত্রি কুলদারোফ বলে একজন রেজিস্ট্রেশন ক্লার্ক আছে, আর এখন পুরো রাশিয়া জানে! ও মা! হে ভগবান!”
মিতিয়া লাফিয়ে ওঠে, ঘরময় ছটফট করে, তারপর আবার এসে বসে চেয়ারে।
“কেন? কি ঘটেছে? ঠিক করে বলতো আমাদের!”
“তোমরা একেবারে জংলী পশুদের মতো দিন কাটাও। তোমরা খবরের কাগজ পড় না, কি ছাপা হয়ে বেরোচ্ছে তা নিয়ে মাথাই ঘামাও না। অথচ কত কত জব্বর জিনিস আছে কাগজে। যদি কোন কিছু ঘটে, মুহূর্তে তা সব্বাই জেনে যায়। কিচ্ছুটি গোপন থাকে না! আমি যে কি ভীষণ খুশী! হে ভগবান! শুধুমাত্র নামীদামী লোকেদের নাম খবরের কাগজে ছাপা হয়। কিন্তু তুমি কি জান, এখন তারা আমার নামও ছেপেছে!”
“কি বলছিস রে? কোথায়?”
বাবার মুখ বিবর্ণ হয়ে যায়। মা পবিত্র ছবির দিকে একবার তাকিয়ে নিজের বুকে ক্রস আঁকেন। ইস্কুলপড়ুয়া ভাইয়েরা বিছানা থেকে লাফ কেটে নেমে পড়ে। চলে আসে দাদার কাছে যে অবস্থায় শুয়েছিল সেই অবস্থাতেই— রাতে শোয়ার ছোট জামা পড়ে।
“হ্যাঁ গো! আমার নাম বেরিয়েছে! এখন গোটা রাশিয়া জুড়ে আমি পরিচিত! কাগজটা রেখে দাও মা। স্মৃতি হিসাবে! মাঝেমাঝে আমরা পড়ব! দেখ দেখ!”
মিতিয়া পকেট থেকে কাগজের একটা কপি বার করে বাবাকে দেয় এবং নীল পেনসিলে দাগানো একটা অংশ আঙুল দিয়ে দেখায়।
“পড় এইটা!”
বাবা তাঁর চশমাটা চোখে লাগাতে থাকেন।
“পড়ে ফেল!”
পবিত্র ছবিতে চোখ বোলায় মা। ক্রস আঁকেন। বাবা গলা খাঁকারি দিয়ে পড়তে শুরু করেন: “২৯শে ডিসেম্বর রাত এগারোটার সময় দমিত্রি কুলদারোফ নামে একজন রেজিস্ট্রেশন ক্লার্ক...”
“দেখলে! দেখতে পেলে! পড় পড়!
“...দমিত্রি কুলদারোফ নামে একজন রেজিস্ট্রেশন ক্লার্ক লিটল্ ব্রনাইয়ার কোজ়িহিনের বিল্ডিংয়ে অবস্থিত মদের দোকান থেকে ফিরছিল মাতাল অবস্থায়...”
“এটাই আমি। আর সেমিওন পিত্রোভিচ... একদম পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেওয়া আছে! পড়তে থাকো! শোন!
“...মাতাল অবস্থায়। সেই অবস্থায় সে পিছলে যায় এবং পড়ে যায় ইভান দ্রোতফ নামক ইয়ুইনোফস্কি জেলার দুরিকিনো গ্রামের এক চাষি স্লেজ-চালকের ঘোড়ার নীচে। ঘোড়াটা ভয় পেয়ে গিয়ে কুলদারোফকে পাড়িয়ে তার গায়ের উপর দিয়েই যাত্রী-সমেত স্লেজ গাড়িটিকে নিয়ে প্রচণ্ড গতিতে দৌড়াতে থাকে। গাড়িটিতে তখন স্তেপান লুকফ নামে মস্কোর দ্বিতীয় গিল্ড-এর এক ব্যবসাদার সওয়ার ছিলেন। কয়েকজন কুলি থামায় গাড়িটিকে। কুলদারোফকে প্রথমে অজ্ঞান অবস্থায় থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ডাক্তার তাকে পরীক্ষা করেন। তার মাথার পিছনে যে চোট লেগেছিল...”
“এটা লেগেছিল ঘোড়া আর গাড়ির মাঝের ডাণ্ডাটা থেকে, বুঝলে বাবা। যাক গে, তুমি এগোও! বাকিটা পড়ে ফেল!”
“...তার মাথার পিছনে যে চোট লেগেছিল তা খুব একটা মারাত্মক নয় বলেই দেখা যায়। ঘটনাটি যথাবৎ অবহিত করা হয়। আহত ব্যক্তিকে শুশ্রূষা করা হয়...”
“ওরা বলেছে মাথার পিছনটা ঠাণ্ডা জল দিয়ে ধুতে। তুমি এখন পড়ে ফেলেছ তো? যাক! তাহলে দেখলে। এখন এটা গোটা রাশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে! দিয়ে দাও ওটা আমায়!”
মিতিয়া কাগজটা কেড়ে নেয়, ভাঁজ করে এবং পকেটে ভরে নেয়।
“আমি মাকারোফদের কাছে যাব এবং এটা দেখাব... ইভানিৎস্কিদের দেখাতেই হবে। তারপর, নাতাসিয়া ইভানোভনা আর আনিসিম ভাসিলিচকেও দেখাতে হবে... তাড়াতাড়ি যেতে হবে আমায়! চললাম!”
ফুল বসানো টুপিটা মাথায় দিয়ে বিজয়ীর উচ্ছ্বাসে ভাসতে ভাসতে রাস্তায় নেমে আসে মিতিয়া।

************

টীকা
রেজিস্ট্রেশন ক্লার্ক হচ্ছে রুশ সিভিল সার্ভিসের সর্বনিম্ন পদ।