ইউথেনেশিয়া

বেবী সাউ



মৃত্যুর কথা লিখবো ভাবলে, আমি, ঘুমের মধ্যে তুমুল জেগে থাকি। মশামাছির শব্দ এসে কানে বাজে। মৃতজ্যোৎস্নায় স্নান সেরে সাজতে বসে দলমা।বেডরুম থেকে দেখা যায় বলে আমি আর নচিকেতাকে জাগাই না। ঘুমোক, আরো ঘুমোক বেটা! ক্লান্তিতে গলা ফোটেনা। গান বেরোবে কোথা থেকে! আগুনের খোঁজে নন্দীগ্রামের নিখোঁজ কানাই কতদিন পরে ফিরেছে।কতদিন চালচুলোহীন কথকের রাত্রিজাগরণ। জাগরণ মানেই যে কোজাগরী হবে কে বলেছে কবিকে? কে এত আস্কারা দেয় শব্দের জাদুপাশে মোহিত করে ভেকধর্মী প্রেমিক সাজতে! সাইনাস বেড়েছে। কটক যাওয়ার পথে যেটুকু অবসর এফএম বাজছে জোরে। মুকেশ আম্বানি প্রেমের হাত ধরে তুলে ধরছেন জিও। আর তখনই আমার চোখ রীতি রেওয়াজ ভুলে ভর্তি করে তুলছে ঘুমের পাঁচালী।


ছোটখাটো ভুল নিয়ে প্রত্যহ আমি মানুষ সাজার ভান করি। হাততালি দেয় ক্ষুধিত পৌরুষ। সমগোত্রীয় জীব নিয়ে কখনোই আমার কোন ক্ষুধা উত্পন্ন হয়নি নাকি স্পৃহা। তারচেয়ে নির্লিপ্ত থেকেছি নিজের শার্ট প্যান্ট কুর্তির কাছে। কাজল ছাড়াও হাঁটার মধ্যে যে অপারগতা তুমি তাকে স্বাধীনতা বলে ভাবো। ভাবো, কোন ত্রিকালজ্ঞ ঋষি এসে যদি ভাঙিয়ে দেয় ঘুম। রসাতলে যাবে এই যাজক বৃত্তি। তুকতাক। বিপত্তারিনীর ধাগা। আর তখনই নচিকেতা জেগে ওঠেন। ঝোলাঝুলি নিয়ে, গলায় প্যাশনের রুদ্রাক্ষ। রুদ্রপুরে তখন হত্যা চলছে। মৃত গাছের সোফা ঘিরে তোমার দরদাম আমাকে উৎসুক করে তুলছে। ভাবছি, প্রফিট এবং জিএসটি ব্যাপারে মৃত্যু কতটা ব্যয়সাপেক্ষ। নির্মোহের বাজারে আগুনটা বেশী জরুরী নাকি দেহদাহ।

সেসব কথারা সারাটা সময় শুধু অপেক্ষা করে গেল, শহরের কোন বেঞ্চ ফাঁকা পেলনা। তাবলে কী আর রাতের উপন্যাস নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই! ঘুমের ঝাঁকে পেরিয়ে পড়া প্রজাপতির দল, মহিমান্বিত অসীমদা, তাদের পুঁতে পুঁতে ফুলেছে নার্সারি খুলে ফেলেছেন। দশজনের প্রেম হাত এসে বুলিয়ে দিচ্ছে আহাউঁহু। তখনই আমার মাধবীলতার ঝোঁক পড়ল। ভাবলাম ঘুরে আসা যাক খানিক। ভাবলাম সমস্ত অর্ফিয়ুস নিশ্চয়ই বেনিয়াতোলা লেনের কেরানী না। বাবার মতো তো সুর্বণরেখার তীরে পেতে বসতে পারে কাঁটাহীন ছিপ। আর অসংখ্য মানুষ সেই মাছের লোভে যুগ যুগ শুধু অপেক্ষাই করে যাবে। ভেবে নেবে এইবার, লাস্ট মোমেন্টে, ঠিক উঠে আসবে নোলক পরা আদি কন্যা। তার নৌকোতে বসেই প্রমোদভ্রমণ হবে খানিক। কুঞ্ঝটিকা তৈরী হলেই জন্ম নেবে মহাভারত আবার। স্থান নেই, নাকি পাক নাহ্ হিন্দু শুধু বড়ুর শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন। আর আমি গামছা শুকোনোর বাহানা করে সেইযে বেরোব কদম ফুলের খোঁজে, বাঁশি নিশ্চয়ই এসব ছলের বয়েস পেরোবে না।

আলোচনা নেই, সম ধাতুর যোগ নেই। গবেট মূর্খতা নিয়ে এইযে মাঝদুপুরের দরিয়াতে ভেসে উঠছে প্যাভেলবের ঘন্টা। ছন্দ পাত্র কাল ভেঙে কুমারীর আঙুল ছুঁয়ে যাচ্ছে শিহরণ। কোন পানপাত্র নেই। হুইস্কির গন্ধে ভরে আছে আমন্ড বাদাম অয়েল। আর চূর্ণবিচূর্ণ ঢেকুরের শব্দ নিয়ে বুড়ি দাইমা শুরু করছে কোন তেত্তাকালের নচিকেতার গল্প--- সে নাকি গাঢ় ঘুমের মাঝে যমের ছবি দেখেছে।

আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে কিছুটা পিছু পিছু খেলা গেল! ব্যাকওয়ার্ড কাউন্টিং। পিছোচ্ছি ক্রমশ। এগোচ্ছি আবার । ক্রুশবিদ্ধ যীশুকে ছাড়িয়ে পৌঁছালাম পাণিনি র কাছে। মৃত ভাষা বলে রাষ্ট্রীয় আয়োগ মুখ ফিরিয়েছে যাকে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্ট নিয়ে কাজ। পাণিনি স্থির হয়ে আছেন আলোর কাছে। কেরোসিন নেই। দিপদিপ করে জ্বলছে আগুনের হলুদ রঙ। মাঝে মধ্যে দুয়েকটা নীলশিখা। লাফিয়ে ওঠে তিনি আমাকে ধরিয়ে দিলেন তালশাঁস। তালশাঁস ফলাও করে আনন্দবাজারে ছাপতে হবে ভেবে আমি পৌঁছলুম মহম্মদের কাছে। শান্তি আহা শান্তি! মক্কা ঘিরে তৈরী হয়েছে জলসরোবর। বালি নেই লেশমাত্র। এবার বুঝি চৈতন্য আসবেন সময়কে বাঁধতে! নাকি গুপ্তঘাতকের হাতে ভেসে উঠবে নীল সমুদ্র।

তুমি ঝগড়া থামিয়ে অপেক্ষায় আছ ঝড়ের। আমি চৌকাঠে পেতে ধরেছি শ্যাওলা রঙের দোপাট্টা। গল্প ফুরোচ্ছে না, আরম্ভকে টানবো কোথা থেকে! এসব মানা সহজ না বলে তুমিও এই রাতদুপুরে ঝুলন্ত ছেড়ে বের করছ মাউথ অর্গাণের সুর। ভয়ে ভয়ে আছি শহরের সমস্ত ইঁদুর যদি পনেরো আসার আগেই মাদুর পেতে কোর্টের সামনে বসে পড়ে! যদি স্কুটি পেরোনোর মত রাস্তাটুকুও ঘিরে ফেলে বিক্ষোভ! কথা বলা বন্ধ করে দেবে নিশ্চয়ই? আলতিমাস স্পৃহাহীন চোখে আমার দিকে চোখ পেতে আছে। মাউস কাজ করছেনা বলে শাটার ডাউন হয়ে আছে ডেস্কটপ। ডারউইনের ভিডিও ক্লিপ নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বান্ধবী। করুণাপরবশ হয়ে আমি, এবার যদি রিপনের বাঁশিটুকু পাঠিয়ে দিই পার্বত্য উপত্যকায়, নিশ্চয়ই বেজে উঠবে "সুজলাং সুফলাং"! ততক্ষণে সেলফি মোড পেরিয়ে সার্থক হবে এই মৃত্যুর অধিকার আর আমার অজস্রবারের ইঁদুরজন্ম।