নীলশূন্যতায়

পীযূষকান্তি বিশ্বাস




যে রং আমি কোনদিন ছুঁয়ে দেখিনি, স্বচেতনার সাথে বারবার এড়িয়ে যেতে চেয়েছি যার উজ্ব্ল রশ্মি, তার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের কাছে অধরা রইয়ে গেছি , নিজেকে অতি ক্ষুদ্র প্রতীত হয়েছে , তার তীব্রতা মাপতে দেখেছি জলজ্যান্ত রুপকগুলি কিভাবে বেগুনী হয়ে আসে । এর জন্য প্রতিসরণের আশ্রয় বা প্রতিফলনের দ্বারস্থ যদিও হইনি যা আমাকে যান্ত্রিক বিমূর্ততার দিকে আমাকে ঠেলে নিয়ে যেতে চায় , সেখানে দেখা বা না দেখা বা কোন অভিব্যক্তিই যেমন দৃশ্যকল্প হতে পারছে না তেমনি ভিতর ও বাহির এক সমান্তরালে এনেও আর যে অবয়বটা সামনে এসে দাড়াচ্ছে সেটা ভার্চুয়াল একটা মূর্তি । অথচ আমি ছুঁয়ে দেখতে চাইছি তার রক্তমাংস, শুঁকে নিতে চাইছি তার গন্ধ, চোখ ভরে দেখে নিতে চাইছি তার রূপ আর রং । অতি কালো বা অতি আলো যা কিছুই অতি, তাকে ছুঁতে গেলেও এক দুর্বার সাহস লাগে, অন্ধকারময় খনিজের ব্যুহ ভেদ করে আসাও সেখানে পর্বতপ্রমান অভিপ্রায় । এক মুহূর্তেই ঝলসে ওঠে চোখ । অন্তরে তাক লেগে যায় । কারন বা অকারন, উচিত বা অনুচিত, ঠিক ঠাহর হয় না । একের পিঠে এক, দুইয়ের পিঠে দুই লাগিয়ে হঠাৎ জানি মনে হয়, গণিতের হিসাবগুলোও স্মৃতির খাতা থেকে তুলে এনে যেই ফরমুলায় ফেলে দেখছি , এমন একটা এক্স যা নিজে রিয়েল ইন্টিজার, আর এমন একটা ওয়াই যা কোন সাইন নেই , যে কোন সংখ্যার সাথেই যোগবিয়োগ গুনভাগ করো, মূলত একই ফলাফল দেয় অথচ সহস্রবার গণনার পর এই দেখছি ভাগশেষে নীল পড়ে আছে আর একটা শূন্য যেন কিছুতেই মিলছে না ।

তো ঘটনাটা এই, সেদিন পলতা স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছি । ঐন্দ্রিলা ঘাড় ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, দুর্বোধ্য , সমস্তটাই দুবোর্ধ্য । কিচ্ছু বোঝা গেলো না । হেঁয়ালি । কি নীল, কি লাল, কি মাংস, আলো, কি শূন্য আর কি বা তাদের অংক? ধুস ! এই সব গোঁজামিল দিয়ে প্রেম হয় নাকি ? উজ্বল একজোড়া বাতাবী লেবু খেতে হলে এসিডের বিক্রিয়া ক্ষমতা নিয়ে এত পবেষণার কি আছে ? এত কিসের পরিমাপ ? চায়ে চুস্কি লাগানোর জন্য চাই এই উদগ্রীব চুমুক । ঠোটের লালাভ উস্কানিতে মানুষ আগুন-নদী পার করে যায় । তো আমি এক্কেবারে চুপ । নিশ্চুপ । কানের পাশে বাহাত দিয়ে একটু চুলকিয়ে বললাম, কি করি, একটা চুমু খাই তাহলে ? হাতটা আলতো করে গ্রীবার উল্টোদেশে যেই হাত চালান করেছি, রাণাঘাট লোকাল থেকে হুড়মুড় করে হঠাৎ করে শতশত লোক নেমে পড়লো । প্লাটফর্মে লোকে লোকারণ্য । ভীড়ে ভীড়ে চারপাশ মানবসমুদ্র । ঐন্দ্রিলার চোখের ভিতর আমি দেখতে পাচ্ছি আসন্ন শতাব্দীর অভিসম্ভাবী ব্যস্ততা, বাড়ি ফেরার তাড়া, অফিস যাত্রীদের মরীয়াপণ । ছুটে যাওয়া হকার, টিকিটহীন যাত্রী, পাইকারী সব্জী বিক্রেতারদের হাঁকাহাঁকি, সমস্তই যেন মুহূর্তকে অতি-প্রাকৃতিক করে তোলে । তারাই যেন কবিতার কথা বলে ওঠা চিত্রকল্প । অজস্র টানা ব্রাসের পাশে শূন্যতর প্রাঙ্গণ, যেখানে মানুষ ছাড়া কোন মননই শিল্পকর্ম হয় না । অথচ যে উদ্দেশ্য আজ আমি আর ঐন্দ্রিলা এই প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছি, এক অচেনা ভবিষ্যৎ যাত্রার শুরুর জন্য, আর যেটা আমাদের সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল একটা প্রেমকাহিনীর সূত্রপাত, আমরা বুঝতে পারছিলাম অনতিদূরে যেখানে গঙ্গা যখন দুপারেই ভাঙ্গছে, আচমকাই আমাকে পলতা গেটের দিকে ঠেলে দিয়ে, সে পিঠ থেকে হাতটা সরিয়ে নিলো । আমার হাত থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল সে, ব্যাঙ্গালোর গিয়ে চিঠি দিও কিন্তু । ভুলে যেও না প্লীজ। তোমার দেওয়া ডায়েরীতে আমি দিনযাপনের কথা লিখে রাখবো, তুমি ছুটিতে এসে পড়ে নিও । গার্ড তার হুইসিল বাজিয়ে দিলো । চা-ওয়ালা কেটলির ঢাকনা খুলে গরমজল পরখ করছে, পানবিড়ি-ওয়ালা একটা আধা খালি প্যাকেট থেকে অন্য প্যাকেট সিগারেট ভরে রাখছে । বেংগল লটারী-ওয়ালা এখনো মনোযোগ সহকারে খবরের কাগজে কি যে দেখে যাচ্ছে , টিকিট চেকার বিনাটিকিটের যাত্রীদের সংগে ভাড়া নিয়ে বচসা করছে । আমি পলতা গেটে দাঁড়িয়ে ঐন্দ্রিলার চলে যাওয়া দেখছি, মনে হলো এই একটা চিত্রকল্প, ভগ্ন হৃদয়ের আনচান আর কর্মজীবনের টানাপোড়েন । কোনদিন বাড়ি ফিরবো বলে যে কথা আমি ভাবছি, মূল সূত্রে যে তার একটা বাড়ি প্রয়োজন সেই কথা ভেবে হাতটা ছেড়ে দিলাম ঐন্দ্রিলার । ভীড়ের মধ্যে মিশে গেলো ঐন্দ্রিলা । রাণাঘাট লোকাল ছেড়ে গেলো । দুম হয়ে তাকিয়ে থাকা । হরমোনের বিক্রিয়া শেষ হতে না হতেই মাংসপেশীতে রক্তচাপ কম হয়ে এলো, ঘড়ির কাটা আরো কিছুক্ষন বনবন করে ঘুরে গেলো, ধীরে ধীরে প্লাটফর্মে ভীড় সাফ হয়ে গেলো । বাতাসে ঐন্দ্রিলার শরীরের হাল্কা গন্ধ ছড়িয়ে আছে, বিকেল শুরু হবে আর কিছুক্ষন পরে । চলে যাওয়া ট্রেনের দিকে একটা শূন্যতা নিয়ে তাকিয়ে থাকি, প্লাটফর্ম থেকে যেন সব রং মুছে যায়, টিনের শেডে যেন শত শতাব্দীর ধুসরতা নেমে আসে ।

আসলে , ঐন্দ্রিলা আমাকে সি-অফ করতে এসেছিলো । আমি যাচ্ছি ই টি আই, ব্যাঙ্গালোর । এখানে বায়ুসৈনিকদের ট্রেনিং হবে । প্লাসটু পরীক্ষার পরপরই পেয়ে যাই আপয়েন্ট লেটার । তখন ভালো করে গোফ ওঠেনি আমার । কৈশোর অতিক্রান্ত এই কিছুদিন । ঐন্দ্রিলা একটু সাহসী, একই বয়সের । একটু বেশী ম্যাচুয়র্ড । যাবার আগে আমাকে একটু বিদায় বলার ইচ্ছা তার। কি প্রেম , কি চাকরি, কি
সংসার, ঘর, জামা কাপড়, সামাজিক অবস্থান, পাওয়ার পলিটিক্সের ব্যাপারে আমার কোন বুদ্ধি হয়নি । আমি শুধু এইটুকু বুঝি আশেপাশে অনেক কর্মরত মানুষ, তারা সবাই ব্যস্ত । সকালে রুটির খোঁজে বেরিয়ে পড়ে, সন্ধ্যার আকাশে যখন গোধুলি লাল হয়ে আসে, কিচির মিচির করা পাখিগুলো ঘরে ফিরে যায়, ফিরে যায় সমস্ত ট্রেনগুলি নিজ নিজ কারশেডে, মানুষেরও নিজস্ব এমন একটা আস্তানা দরকার হয় , ফিরে আসার জন্য । এইটুকুই বুদ্ধি তখন । মানুষ আশ্রয় চায় । আমার তো ফেরার কোন জায়গা নেই । কোথায় ফিরি ? গল্পে ফিরি ? কোন গল্প ? পাঠক একটা বোধগম্য গল্প চান, সেই গল্প যার ভিতর প্রোটিন সমৃদ্ধ মাংস থাকবে, থাকবে মেদ বর্জিত কল্পলোক, এমন কোন পদার্থ থাকবে যা রসহীন শব্দবন্ধে জোগাবে ম্যাজিক মশালা । রন্ধন পর্যায় শেষ হয়ে এলে খাদ্যের উপরে জমবে এক গাঢ় লাল আস্তরন, পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে গেলে প্রভূর পদপ্রান্তে এসে মানুষের অবসরযোগ্য অবস্থানকে এক বাড়ির নাম নেবে । শূন্যতর পৃথিবীর ক্যানভাস থেকে মাতৃভূমি উঠে এসে ডাকবে, আয়, খোকা আয় । খোকারে, বাড়ি আয় ।

মোট কথা, ঐন্দ্রিলা একদিকে মুহূর্তে হেটে দিলো । একটা সিদ্ধান্ত । আমাকেও পথ হেটে যেতে হবে একদিকে। ক্লান্ত হবার আগে, বিকেল গড়িয়ে যাবার আগে আরো খানিকটা আলো মেখে নিতে হবে গালে, মুখে, মাথায়, এই রক্তে। পলতা গেট ডাকছে আমায়, পলতা গেটের সামনে বায়ুসৈনিকদের ক্যাম্প থেকে এক অজানা ভবিষ্যৎ ডাকছে আমায় । বিশাল প্লাকার্ডে যুদ্ধ-বিমানের ছবি, হেলমেট হাতে নিয়ে নামছে বিমানের ক্যাপটেন । নীল প্রচ্ছদের আকাশটা মনে হচ্ছে আরো দূরের মেঘমল্লার । রহস্যময় । টাচ দ্যা স্কাই উইথ গ্লোরী । দুরন্ত এডভেঞ্চার আর অদম্য সাহসের অনুল্লেখিত কাহিনীর দুর্বার কুজ্ঝটিকা । নাকের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া সাই সাই সুপারসোনিক মিগ টোয়েন্টি থ্রী । পাকস্থলীতে রিমঝিম, প্যানক্রিয়াসে তোলপাড় , দমকে দমকে রক্তে আড্রিনালীন বিভোর । নীল , ঘন নীল এই আকাশ । শূন্যের মাঝে ঝাপ দেওয়া আকাশ । আকাশ ছাড়িয়ে আকাশ । রঙের বাহারে হার মানিয়ে দেওয়া স্বপ্নঘুমের মেঘ । ঘরের স্বপ্ন, বাড়ির স্বপ্ন মানুষকে দূরে ঠেলে দেয় । দূর এতটা দূর, এই নীল এতটা বিস্তৃত, এক্সটেন্ডেড টু দ্যা লিমিট , এক শূন্যতর অবস্হানে যা আলোর তীব্রতাকে একগোছা ব্রাস হাতে তছনছ করে । তার রং কে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলে । ক্যানভাসে তখন পড়ে থাকে থকথকে নীল, নীলাভ আকাশ, আর একরাশ শূন্যতা ।

ঐন্দ্রিলা ফিরে গেছে । পিছে ফিরে দেখার দরকার নেই, আমি এই প্লাটফর্মে বসে থাকি, বিকেলের রোদ্দুরকে ভেঙ্গে যাওয়া দেখি । প্রিজমে ফেলে দেখি তাদের বেনীআসকলা । বিখরে যাওয়া রং, ফেলে আসা স্কুল, এক সঙ্গে কাটানো দিন, দিনের পর দিন অনেক স্তর ধুলো পড়ে যাওয়া পলতা গেট । ঘড়ির দোকানে দম দিচ্ছেন দোকানী, শিয়ালদহ থেকে আগত ট্রেনের জানকারি দিচ্ছেন স্টেশন মাস্টার, সিগ্ন্যাল ঝুলে আছে তার সবুজ নিয়ে । কৃষ্ণনগর লোকাল আসছে । অগুন্তি মানুষ তার বাড়ি ফিরে যাচ্ছে । ঐন্দ্রিলারও কি বাড়ি আছে ? আমিও কি ফিরে যাবো ঐন্দ্রিলার কাছে ? নাকি আকাশ ছুঁয়ে দেখবার জন্য পাড়ি দেবো ব্যাঙ্গালোর ? কোন দিকে যাই আমি ? কি সেই যাত্রা, কি সেই গতি, কি সেই বেগ । লাইনে পাতা আছে রেলের মিটার গেজ, লৌহবন্ধনীতে দূরন্ত ট্রেনের চাকার ঘর্ষণ যেন চিৎকার করে ওঠে । এর সামনে যে কোন মুহূর্তেই ঝাপ দেওয়া যায় । আত্মসমর্পন করা যায় । কিন্তু কেন ? দ্যা ঊডস আর ডার্ক এন্ড ডিপ, এন্ড আই হ্যাভ প্রোমিসেস টু কিপ । মাইলস টু গো বিফোর আই স্লিপ । বাড়ি ফেরার জন্য একটা বাড়ি চাই । একটা আশ্রয়, নিজস্ব ভূমি, নিজস্ব পরিসর যেখানে নিয়মের গূড় ফরমূলা আচমকাই যেন উন্মোচিত করে ইউরেকা মোমেন্ট । শূন্য থেকে উদয় হবে অতি বেগুনী রশ্মি, আলোকিত করবে বিশ্বচরাচর, গাছ থেকে আপেল পড়বে, আর পৃথিবীর টানে আপন মনে বেজে উঠবে অভিকর্ষজ সূত্র । আজ, আমি অচেনা, অজানা শূন্যতার দিকে পা বাড়াবো । টাচ দ্যা স্কাই উইথ গ্লোরি । নীল, ঘন নীল নিয়ে আমি শুরু করবো যাত্রা । মনের শিশুপল্লবে ভরে উঠেছিলো যে বাগীচা, পৃথিবীর প্রয়োজনে তাকে ছেড়ে দিতে হবে সবুজের অধিকার । বীজকে তো কোথাও শুরু করতেই হয় । তাকেও অংকুরোদ্গমের বীজ হতে হয় । বৃক্ষ হয়ে ওঠার আগে যোগ-গুন-ভাগ করে যে যার মত গুল্মলতার বৈশিষ্ট নিয়ে দিব্যি খুশী আছে , তারা খুশী থাক । ঘড়ির কাটা অগুন্তি দিন পার করে যাবে, সময়কে বৃদ্ধ করে এগিয়ে যাবে মানব সভ্যতা, প্রিজম ভেঙ্গে বেরিয়ে আসবে অকৃত্রিম রং । শত শত ঐন্দ্রিলা গর্ভবতী হবে । মহীরুহ হবার তাড়নায় বরং আমি তখন এক অভিসম্ভাবী ফলাফল নিয়ে উদ্বিগ্ন , আতঙ্কে দিন কাটাছি সদ্য কৈশোর পার করা মাকুন্দ যুবক । দুই নাম্বার প্ল্যাটফর্ম থেকে সাই সাই করে বেরিয়ে গেলো তিনটে বত্রিশের কৃষ্ণনগর গ্যালপিং ।