‘ যা হলেও হতে পারতো’

অমর্ত্য মুখোপাধ্যায়



গৌরচন্দ্রিকা
খুব ছোটোবেলায় — নাকি প্রতিশোধ স্পৃহার বশে ‘ছেলে’বেলায় বলবো? — পড়েছিলাম দামোদর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃন্ময়ী উপন্যাস, যেটি কপালকুণ্ডলার অন্তিম পরিণতি পাল্টে দিয়েছিল। তার পর বেশ ছেলেবেলায় প্র.না.বি.-র, মানে প্রমথ নাথ বিশীর ‘যা হলেও হতে পারতো’ সিরিজে লেখা গল্প শারদীয়া দেশ-এ পড়েছি। তাদের বেশ কয়েকটি, যতদূর মনে পড়ছে, বঙ্কিমের উপন্যাসের অংশ নিয়েই ছিল। সব কটাই বঙ্কিমের উপন্যাসের পরিণতিকে, বিশেষতঃ নায়িকাদের পরিণতিকে, অসমাপিকা ক্রিয়া হিসেবেই ধরেছে। অবিশ্যি প্র.না.বি. নিজেরও কয়েকটি ‘যা হলেও হতে পারতো’ সিরিজের গল্প লিখেছেন, তাদের কয়েকটি আবার ডিস্টোপিয়া। সেগুলো অবিশ্যি একটু বেশি বয়সে পড়েছি। যেমন, ‘পঞ্চম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস’, ‘চাচাতুয়া ইত্যাদি। ‘পঞ্চম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস’ গল্পটি শুরুই হয়েছে এই কথাটি দিয়ে — ‘সকলেই জানেন যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান অস্ত্র ছিল আণবিক বোমা আর চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধের একমাত্র অস্ত্র ছিল লাঠি-সোঁটা ও ইঁট-পাটকেল। এসব প্রাচীন ইতিহাসের অন্তর্গত। এবারে পঞ্চম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস লিপিবদ্ধ হইতেছে’। এই ইতিহাস খুবই শোকাবহ। কেন না এতে কেবল মানব সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গিয়ে পশুরাজ্যের প্রতিষ্ঠার কথাই লেখা হয় নি; এক মানবী (পরে নাম জানা যাবে ‘উঁচকপালী’) শিকারের উদ্দেশ্যে লোকালয়ে প্রবিষ্ট তীর-ধনুধারী ‘নিরীহ দংশন’ নামে এক নখদন্তহীন ব্যাঘ্র-যুবার প্রেমে পর্যন্ত পড়েছে। যেহেতু উভয়েই রাজকুমারী/রাজকুমার তাই এই সম্বন্ধকে কেন্দ্র ক’রে পশু আর মানুষদের মধ্যে পঞ্চম বিশ্বযুদ্ধের শেষে তাদের বিয়েও হয়েছে। যদিও মানুষদের কেউ কেউ পশুদের দ্বারা শ্যালকসম্বোধনের সম্ভাবনায় দুঃখিত, তবুও অনেক মানুষই এই পশুপ্রাধান্যের যুগে নিজদের সন্তান-সন্ততির মধ্যে দ্রুত পশুত্বের লক্ষণ আসতে দেখে খুবই আনন্দিতও হচ্ছে। অবশেষে উভয়ের শুভবিবাহ সম্পন্ন হওয়ার পর ‘উঁচকপালী' ও ‘নিরীহ-দংশনের’ মিলনের পর যে সন্তান জন্মায় তার ‘শিং, লেজ, ক্ষুর, লোম। ভাব ও ভাষা অকৃত্রিম পশুর মতো হইল, মানুষের সাথে রক্ত-সম্বন্ধের কোন চিহ্নই প্রায় রহিল না। ‘মহামানব’ নামে ব্যাপ্টা‌ইজড্ এই শিশু ‘যথাকালে ... পিতামহ ও মাতামহ দুজনেরই রাজ্যের উত্তরাধিকারী হইয়া সসাগরা পৃথিবীতে নিঃসপত্ন রাজ্য ভোগ করিতে লাগিল। তাহার শাসনগুণে মানুষ ও পশুর মধ্যে যেটুকু ভেদ ছিল ঘুচিয়া সব দিব্য একাকার হইল। ... সমস্ত ভেদাভেদ বর্জিত হইয়া পৃথিবী অখণ্ড শান্তি ভোগ করিতে লাগিল। যতদূর জানা গিয়াছে, ইহাই শেষ বিশ্বযুদ্ধ’ । এটি যদি ‘যা হলেও হতে পারে’-র গল্প হয় — মানে আরও দুটি বিশ্বযুদ্ধের পরে — তবে ‘চাচাতুয়া’ গল্পটি আবার এক ‘যা হলেও হতে পারতো’ মুসলিম প্রাধান্যের, বলতে-না-পারলেও-আরবী-ভা ায়-কথনকামী বাংলাদেশের গল্প, যেখানে বোষ্টমদাস নামের এক ‘রাধাকৃষ্ণ বলো রে ভাই’ বলা কাকাতুয়াকে কেবল ‘আল্লাতাল্লা বলো মিঞা’ বলতে হয়নি, হিঁদুর বাড়ি জবরদখল করা এক মুসলমানের বাড়িতে স্থান পেতে চাচাতুয়া নাম নিতে হয়েছে। কারণ কাকা হিন্দু শব্দ। ১ দুঃখের কথা ব্লগজিনে, বিনোদন হিসেবে, যা লিখি মন থেকে লিখি। বুড়ো বয়সে সব মনে থাকেও না। প্র.না.বি.-র রিমেক গল্পগুলির একটি যে বিষবৃক্ষের কুন্তনন্দিনীকে নিয়ে এ ছাড়া আর কিছুই মনে পড়ছে না।
আরও পরে, একাদশ শ্রেণির সহায়ক পাঠে প্রথম পড়লাম ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের অনুবাদে, সীতার বনবাস নামে ভবভূতির উত্তর রামচরিত-এর অনুবাদ। সেখানেও ছিল ‘যা হলেও হতে পারতো’-র উপাদান। পরে দেখলাম ঔপনিবেশিক আমলে যখন রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বাঙালির ‘ইতিহাস-উৎসাহ’ বা ‘ইতিহাসবুভুক্ষা’২ জাগ্রত হয়েছে, তখন ভূদেব মুখোপাধ্যায় আধুনিক স্বপ্নলব্ধ ভারতবর্ষের ইতিহাস লেখা ছাড়াও আরও অনেক প্রখ্যাত ঐতিহাসিক বা অর্থনীতিবিদ হয় নিজেদের লেখা সারস্বত, দৃষ্টবাদী ইতিহাসের বাইরে কল্পিত, ‘যা হলেও হতে পারতো’ গোত্রের ইতিহাস লিখছেন, যা ততটা ঐতিহাসিক উপন্যাসের চেয়ে ঔপন্যাসিক-ইতিহাস (‘fictive history’)-এর কাছাকাছি। এদের মধ্যে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় অ্যাকাডেমিক ইতিহাসের নিয়ম মেনে নিজের প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাসে ভারতের গৌরবগাথা বিষয়ে যে কথা বলতে পারেন নি তা লিখলেন ময়ূখ, ধর্মপাল, পাষাণের কথা ইত্যাদি বইতে। কিম্বা যে কথা কিম্বা সিভিলিয়ান-অর্থনীতিবি রমেশচন্দ্র দত্ত নিজের ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাসে বলতে পারেন নি ৩ তা লিখলেন মাধবীকঙ্কন, বঙ্গবিজেতা, রাজপুত জীবন সন্ধ্যা, মহারাষ্ট্র জীবন প্রভাত ইত্যাদি বইতে। আর আমাদের বাংলা সাহিত্যের প্রথম সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তো ‘বাঙালির ইতিহাস চাই, নহিলে বাঙালি কখন মানুষ হইবে না’ এই প্রত্যয় থেকে বাংলা তথা ভারতের হৃতগৌরবের কথা জানাতে একটি সম্পূর্ণ ইতিহাস লিখতে ব্রতী হয়েছিলেন। কিন্তু ‘বাঙ্গালীর উৎপত্তি’ আর ‘বাঙ্গালীর ইতিহাসের ভগ্নাংশ’ ইত্যাদি লেখা ছাড়া এই কাজে আর বিশেষ উৎসাহ পাননি। বরং ঔপন্যাসিকের বা লেখকের সার্বভৌমত্বের সুযোগ নিয়ে, ‘যা হলেও হতে পারতো’ ঢঙের এক আখ্যান লিখতে ইতিহাসের এক বিস্মৃত অধ্যায় থেকে সম্রাট আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে এক রাজপুত রাজার সাময়িক বিজয়ের গল্প লিখেছিলেন রাজসিংহ উপন্যাসে। সেখানে রূপনগরের রাজকন্যা চঞ্চলকুমারীর দর্পচূর্ণ কততে মবারকের নেতৃত্বে আসা মুঘল বাহিনীর বিরুদ্ধে এক গিরিবর্ত্মের যুদ্ধে রাজসিংহের সাময়িক বিজয়ের কথা লেখা হবে। কিন্তু ইতিহাসের যে তথ্য লেখক তাঁর সার্বভৌমত্বের মাধ্যমে আসতে দেননি সেটা হোলো এই যে কয়েকদিন পরেই আওরঙ্গজেবের আর এক সেনাপতির হাতে রূপনগর দুরমুশ হয়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথ অবশ্য সায়েব ঐতিহাসিকদের হাতে ‘সমাজশক্তি’-প্রধান এই দেশের কেবল রাজনৈতিক ইতিহাসলিখনের প্রবণতাকে বহু লেখায় আক্রমণ করলেও কেবল ‘যা হলেও হতে পারতো’ ঢঙের fictive history-র মাধ্যমে দেশের এই আত্মগৌরব সন্ধানের প্রবণতাকে বহুভাবে হেয় করেছেন। ‘ঐতিহাসিক চিত্র’ প্রবন্ধেই তিনি বলেছেন দেশপ্রেমের জাগরণ সত্য, বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের মাধ্যমেই করতে হবে —
‘একথা কেহ না মনে করেন, গৌরব অনুসন্ধানের জন্য পুরাবৃত্তের দুর্গম পথে প্রবেশ করিতে হইবে। সে দিকে গৌরব না থাকিতেও পারে— অনেক পরাভব, অনেক অবমাননা, অনেক বিকারের মধ্যে দিয়া বাঁকিয়া চুরিয়া ভারতবর্ষের সুদীর্ঘ ইতিহাস বহিয়া আসিয়াছে। অনেক স্থলে সেই একহাঁটু প্নকের ভিতর দিয়া আমাদিগকে হাঁটিতে হইবে। তবু আমাদিগকে এই পঙ্কিল জটিল পথের দিকে আকর্ষণ করিতেছে কে ? জাতীয় আত্মশ্লাঘা নহে, স্বদেশের প্রতি নবজাগ্রত প্রেম। আমারা দেশকে প্রকৃতরূপে প্রত্যক্ষরূপে সম্পূর্ণরূপে জানিতে চাই — তাহার সমস্ত দুঃখদুর্দশাগতির মধ্যেও তাহাকে লক্ষ্য করিতে চাই— আপনাকে ভুলাইতে চাই না।’ ৪
কিন্তু যে কবি এক সময়ে বলেছেন যদিও শিশুর সঙ্গে আলাপের ছলে, যে ‘জগতে দুরুকম পদার্থ আছে। এক হচ্ছে সত্য, আর হচ্ছে আরো-সত্য’; কিম্বা এমন কথা বলতে পেরেছেন যা ঘটেছে তা সত্য হতে পারে কিন্তু যা ঘটেনি তা আরো সত্য; কিম্বা ‘এ পৃথিবীতেও তার (‘আরো-সত্যির’) অভাব নেই। তাকিয়ে দেখলেই হয়। তবে কিনা সেই দেখার চাউনি থাকা চাই’, ৫ তাঁর তরফে এই কাল্পনিক ইতিহাসের বিরোধিতাকে বাকি বহু সমসাময়িক চিন্তক যে মানেন নি তার কারণ হোলো সায়েব ঐতিহাসিকরা যে ভাবে ইউরোপীয় রাজারাজড়াসেনা-র হাতে ভারতীয়দের পরাজয়গুলিকে কিছু কারণের ফলে ঘটা যা হয়ে গেছে তার আপতিকতার (contingency) দিক থেকে না দেখে, ইউরোপীয়দের উৎকর্ষ বা ঔপরিকতা তথা ভারতীয়দের অপকর্ষ বা অধরিকতার প্রমাণ হিসেবে দেখতেন, এবং তাঁদের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ হিসেবে গ্রিস/রোমের যুগের থেকে উনিশ শতকী ইউরোপের ইতিহাসের ছেঁড়া, ফালি ন্যাকড়া বা কানি গুলিকে এক টানা, খেম সেলাই দিয়ে এই ধারাবাহিক ঐতিহ্যকে তাঁদের জয়গুলির আকর-কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন, কিম্বা কার্য Y-কে ব্যাখ্যা করতে কারণ X1 X2 X3 ... X9 X10 -এর মধ্যে বাছাই করে ইচ্ছে মত তাদের গ্রহণ-বর্জন করেছেন তার ফলে তাঁদের ইতিহাসও ‘narratives’-ই ছিল। বঙ্কিম এই ‘narrativization’-এর কারণেই কমলাকান্তকে ইউরোপীয় ইউরোপীয়দের ইতিহাস সম্পর্কে বলিয়েছেন, ‘উহাও নভেল বটে’।৬
অবশ্য যাঁরাই এরকম আখ্যানায়িত বা narrativized, কল্পিত ইতিহাস লিখেছেন তাঁরা ইতিহাসের এক ক্ষুদ্র, বিস্মৃত, বা আপেক্ষিকভাবে নগণ্য ইতিহাসের ঘটনা বেছে নিয়েছেন। কারণ তাতে ইচ্ছাপূরণের বা কল্পনার ইচ্ছেডানা মেলবার সুবিধে অনেক বেশি। যাঁরা পুরো ইতিহাসের ধারা পালটে সব চেয়ে বড় ইতিহাস-নির্মাতা, যুগন্ধর বা historic ঘটনাগুলিকে অন্য রূপ দিতে চান, যেমন একটি রাজনৈতিক দল-পরিবার বা তাঁদের তাঁবেদারদের লেখা ইতিহাসবইলেখকরা ঝিলম নদীর যুদ্ধে অ্যালেকজাণ্ডার-কে পুরুর কাছে হারিয়ে দেন, তাঁদের সঙ্গে তমালের ইচ্ছাপূরণের তথা ‘ইচ্ছেডানা’-র কোনো সম্পর্ক থাকার কোনো সম্পর্ক না থাকলেই ভালো হবে। যেমন দেশভাগের ইতিহাস কী আমরা রাতারাতি পাল্টাতে পারি? গল্প ফাঁদতে পারি কিভাবে মাউন্টব্যাটেন, জিন্না নেহরু, আর রাউলাটের হৃদয় পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশভাগ রদ হয়ে যাওয়ার চতুরঙ্গ নভেলেট? কেবল যেটা পারি সেটা কোনো গ্রামের, এলাকার, এমনকি বাড়ির, বা লোকের বয়ানে দেশভাগবিদ্বিষ্ট বা দেশভাগপ্রতিরোধী কোনো মাইক্রো ইতিহাস তৈরি করতে, যেমন করেছেন উর্দু সাহিত্যিক সদত হাসান মণ্টো ‘টোবা টেক সিং’ গল্পে লাহোরের পাগলাগারদে, যেখানে নবসৃষ্ট ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বন্দীবিনিময়ের মত উন্মাদবিনিময়ের কথা শুনে পাগলরা হিন্দুস্থান আর পাকিস্তানের সম্বন্ধে নিজ নিজ ‘trope’ তৈরি করে। আর জেলের মধ্যে পনেরো বছর দাঁড়িয়ে থাকা বিষান সিং যখন শোনে যে তার টোবা টেক সিং হিন্দুস্থানে চলে গেছে তখন জেলেরই এক জায়গায় অনড় দাঁড়িয়ে থেকে সে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়, অদূরে কাঁটাতারের বেড়ার ওপাশে হিন্দুস্থান আর এপাশে পাকিস্তানের মধ্যে নো-ম্যান্স-ল্যাণ্ড, টোবা টেক সিং-এর মতো।৭ প্র.না.বি-র ‘ইয়াসিন শর্ম্মা এন্ড কোং’ গল্পে অভিন্নহৃদয়, অত্যাগসহন বন্ধু ইয়াসিন আর গোপাল দেশভাগের পর আর কোথাও উভয়ের পক্ষে নিরাপদ থাকার জায়গা না পেয়ে, আতস কাঁচ দিয়ে র‍্যাডক্লিফ লাইন খুঁজে, তার দুদিকে বাড়ি তৈরি ক’রে বসবাস শুরু করে আর র‍্যাডক্লিফ লাইনের দুধারে বসে প্রাণভরে গল্পগুজব ছাড়াও উভয় দিক থেকে আসা শরণার্থীদের পোশাক দেওয়া নেওয়ার ব্যবসা শুরু করে। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয় না।৮ সৃজিত মুখার্জি তাঁর ‘রাজকাহিনী’ ছবিতে নাচওয়ালি আর তাদের মহলকে বসিয়ে দেন পার্টিশনের একেবারে উপরে। কিন্তু এসবে কি পার্টিশন অকৃত হয়েছে? ইচ্ছেডানা মেলতে হবে সীমিত আকাশে। আসলে অনেক সমাজতত্ত্ববিদ, ঐতিহাসিক যে কথাটা বলে গেছেন তা হোলো ভারতের ইতিহাস কোনো সমতল, আনুভূমিক ব্যাপার নয়, সেটা ক্রমোচ্চবিন্যস্ত, বহুস্তরীয়, যার ফলে এক অংশের জয় প্রায়ই কেবল আরেক ভৌগোলিক অংশের নয়, এক লোকসমাজের পরাজয় ও লজ্জার স্বাক্ষর।৯ এটা না মনে রাখলে কি উৎকট ব্যাপার ঘটতে পারে দেখা যাক।
আমার গল্পের গরু গাছে
১৮ই জ্যেষ্ঠ বিক্রম সম্বৎ ১৫৮২। এক মাসের কিছু বেশি হোলো পাণিপথের যুদ্ধ হয়ে গেছে। জহির-উদ্-দিন-মুহম্মদ-ব বর তাঁর মাত্র বারো হাজার সৈন্য নিয়ে দিল্লির সুলতান ইব্রাহিম খাঁ লোদীর এক লক্ষ সৈন্যকে বিনষ্ট করেছেন দিল্লীর বাইরে পাণিপথের প্রাঙ্গনে। এতে মহারাণা সংগ্রাম সিংহ তথা সঙ্গর অভীষ্ট সিদ্ধ হয়নি। তিনিই কাবুলের এই বিস্ময় বালক যার শরীরে একইসঙ্গে চেঙ্গিস খাঁ আর তৈমুর লং-এর রক্ত বইছে, আর যে মাত্র বারো বছর বয়সে খুল্লতাতর দ্বারা অপহৃত পিতৃরাজ্য পুনরাধিকার করেছে, তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন দিল্লির সুলতানদের শাহীর ভিত কাঁপিয়ে দিতে। তাঁর ইচ্ছে ছিল ওই মানুষটি আসার পথে আফগান এলাকার ধনসম্পত্তি লুটেপুটে নিয়ে, ইব্রাহিম খাঁ লোদীকে দুর্বল করে দিয়ে নিজের এলাকায় ফিরে যাবে। হয় নিজের তাগিদে, নয়তো ‘সেনাপতি গরম হাওয়া’-র তাড়নায়। যেরকম ওর পূর্বপুরুষরা করেছিল, আরো অনেক আগে হূণদের অধিপতি অ্যাটিলা। আর নীরক্ত সুলতানী বাহিনীর উপর তার পর আক্রমণ চালিয়ে তিনি ভারতে আট শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা মুসলিম উপদ্রবের জড় দূর করবেন। কিন্তু এই জহির-উদ্-দিন, যে একা হাতে এক বাঘের জীবন নিয়ে বাবর তথা শের-এর অভিধা পেয়েছে, অপূর্ব রণকৌশলে এক দিনে সকাল থেকে দুপুর চার ঘণ্টার মধ্যে লোদীর এক লক্ষ বাহিনীকে নিকাশ করেছে, সে নাকি হিন্দুস্থানে কোনো লুঠপাট চালায়নি, এই যুক্তিতে যে ভারত তার মাতৃকুল আর পিতৃকুল দুদিক থেকেই বিজিতভূমি, আর এই মহাদেশের সেই ন্যায্য উত্তরাধিকারী। সে নাকি এই ন্যায্য উত্তরাধিকার ফিরে পেতে চায়। উপরন্তু তার নাকি অভিযোগ যে সঙ্গ তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েও পাণিপথের যুদ্ধে কোনোরকমের সাহায্যই করেন নি। অথচ বাবর নিজে তাঁকে চুক্তিমত কল্পি, ঢোলপুর এবং আগ্রার অধিকার ছেড়ে দেয় নি। যদিও বিক্রম সম্বত ১৫৭৪-এ খাটোলির আর বিক্রম সম্বত ১৫৭৫- এ ঢোলপুরের যুদ্ধে দুবার তিনি ইব্রাহিম লোদিকে হারিয়েছিলেন। সঙ্গর কপালে আরো বেশি ভাঁজ পড়েছে যে কারণে সেটা হোলো তাঁর এবং মেবারের রাজগুরু কপিলেশ্বর স্বামী বলছেন যে বাবরকে ডাকা অন্যায় হয়েছিল। তিনি এ বিষয়ে অনেক কথা বলেছেন, কিন্তু তার মধ্যে মোদ্দাটা হোলো বাবরকে দেশ থেকে তাড়ানোর দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হবে।
৫ই ফাল্গুন বিক্রম সম্বত ১৫৮৩
রাণা সঙ্গ চিন্তান্বিত। দুঙ্গারপুর, যোধপুর এবং মেরতার রাজাদের সহযোগিতায় বিক্রম সম্বত ১৫৭৬-এ মান্দাসোরের দুর্গ অবরোধ এবং গুজরাট জয় করার পর, মেহমুদ লোদির মত অনেক পলাতক আফগান রাজাকে তাঁর প্রতি সমর্থনে বাধ্য করার পর, হাসান খাঁ মেওয়াতির অধীনস্থ মেওয়াতি মুসলমানদের স্বেচ্ছা-সমর্থন পাওয়ার পর তিনি ভেবেছিলেন সুযোগ এসেছে। আফগানদের আরো বড় বিপদ বিবেচনা ক’রে বাবর হুমায়ূন-কে পাঠিয়েছিলেন পুবের দিকে। কিন্তু ইতিমধ্যে সঙ্গ যে আগ্রার দিকে এগোচ্ছেন সেই খবর পেয়ে বাবর নাকি হুমায়ূনকে আবার ডেকে পাঠিয়েছেন। ইতিমধ্যে রাজপুতানার সাত রাজ্যের আমেল তৈরি হয়েছে। ভারতে এই প্রথম বিদেশীর বিরুদ্ধে ভারতের প্রতিরোধের জন্য রাজারা একত্রিত হয়েছেন। কিন্তু পাণিপথের যুদ্ধে বিদেশীর রণকৌশলে অনিচ্ছাতেও মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। বারো হাজার সৈন্য নিয়ে ইব্রাহিম খাঁ লোদীর এক লক্ষ সৈন্যর মোকাবিলা সহজ কথা তো নয়ই, খুবই অসম্ভব কথা ছিল। কিন্তু অজস্র গরুর গাড়ি সামনে রেখে, তাদের ফাঁককে গোচর্ম দিয়ে ভর্তি ক’রে, প্রতি ফাঁকে অশ্বারোহী ধনুর্ধর আর পিছনে কামান রেখে, লোদীর সেনাবাহিনীর দুই পার্শ্ব আর পশ্চাৎ অশ্বারোহী তলোয়ারবাজ দিয়ে আক্রমণ ক’রে আর সম্মুখভাগ কামান দেগে বিশৃঙ্খল ক’রে দিয়ে কামাল দেখিয়েছিলেন বাবর। আগ্রার দিকে যেতে যেতে সঙ্গ ভাবছেন তিনি এই লোকটির সঙ্গে এঁটে উঠতে পারবেন তো?
১৩ই ফাল্গুন বিক্রম সম্বত ১৫৮৩
আজ সঙ্গ তৃপ্ত। প্রায় এক পক্ষকাল আগ্রার উত্তরে, দিল্লী থেকে প্রায় ষাটক্রোশ দূরে থান গেড়ে বসেছিলেন তিনি। আর বসে বসে চরের মুখ থেকে শত্রুর খবর সংগ্রহ করছিলেন। শুনেছিলেন রণক্লান্ত বাবরের সৈন্যরা বিদ্রোহ করেছিল। তারা এই গরম দেশ ছেড়ে কাবুলে ফিরে যেতে চায় অন্য পথে। কিন্তু চতুর বাবর, যিনি শিরাজিকে তার প্রিয় তুর্কি কবিতার চেয়ে ভালোবাসেন, সেই সিংহহৃদয় বাবর তাঁর শিরাজির ও তার পাত্রের জগৎশ্রেষ্ঠ সংগ্রহ সবার সামনে ভেঙে ফেলে আবার সৈন্যবাহিনীকে উদ্দীপিত করেছেন।
যুদ্ধ হোলো খানোয়া নামে দিল্লী থেকে প্রায় সত্তরক্রোশ দূরের এক গ্রামে। প্রথমটা সঙ্গর সৈন্যরা বাবরের রণকৌশলে পিছু হঠছিল। বিশেষ ক’রে রাণার হস্তীবাহিনী কামানের অপরিচিত গর্জনে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। যুদ্ধের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রাণার ঘনিষ্ট সঙ্গী শিলহাদি তার ৩০০০০ সৈন্য নিয়ে বাবরের দিকে চলে গিয়ে, তার বিশ্বাসঘাতকতায় অবস্থা আরো খারাপ ক’রে দিয়েছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তেই সুদূর বঙ্গদেশ থেকে কপিলেশ্বর স্বামীর এক মন্ত্রশিষ্য দিব্য উপাধ্যায় এসে যোগ দেয়। এরা রণপা নামে এক অত্যদ্ভুত দ্বিযষ্টি চ’ড়ে সড়কি চালিয়ে বাবরের গোলন্দাজদের গলা গেঁথে ফেলে। আর ‘পাশ’ নামে এক অত্যদ্ভুততর রজ্জু-অস্ত্রে অশ্বারোহীদের পা বেঁধে ফেলে। এরপর রাণার সুসজ্জিত, সুশিক্ষিত বাহিনীর পক্ষে আর বাবরের সেনাদলকে পর্যুদস্ত করতে অসুবিধা হয়নি।
কপিলেশ্বর স্বামী ত্রিকালজ্ঞ। তিনি একটা অদ্ভুত কথা বলেছেন খানোয়ার বিজয়ের কথা শুনে। আজ খানোয়ার রণাঙ্গনে পরাজিত না হলে নাকি বাবরের মাধ্যমে নাকি ভারতে প্রায় দুশো বছরের এক মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হতো। আর সেটা তার নিজের অবক্ষয়ের কারণে ভবিষ্যতে ভারতে ফিরঙ্গ নামী আরো পরাক্রান্ত এক শক্তির আগমনের সুবিধা ক’রে দিতো। চারশত সাতাশ বছরের পর এক নির্বাচিত একনায়ক তথা নরেন্দ্রর দরকার লাগতো ভারতে আবার হিন্দুরাজ্য ফেরাতে। সঙ্গ নিজেই নাকি অনাগতবিধাতা হয়ে সেই সঙ্কটের মূল উপড়ে নিয়েছেন। এই খবর জেনে এত উল্লসিত হয়েছেন রাণা সঙ্গ যে বাবরের দেওয়া সন্ধির প্রস্তাব মেনে নিয়ে তাঁকে দেশে ফিরে যেতে দিয়েছেন। লোকটির অনেক গুণ যে! শিরাজি খেয়েও কেবল দুই পূর্ণবয়স্ক মুঘল সৈন্যকে নিয়ে ছফুট দীর্ঘ পরিখা পার হতে পারে না, তুর্কি ভাষায় অসাধারণ কবিতাও নাকি লিখতে পারে। নিজে কবিতার পরম ভক্ত সঙ্গ কবিকে প্রাণে মারতে রাজি নন।
পুনশ্চ: সুধী পাঠককে জানিয়ে রাখা ভালো খানোয়ার যুদ্ধে রাণা সংগ্রাম সিংহ বাবরের হাতে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত হন। তিনি বাবরের পরাক্রমের আন্দাজই করতে পারেন নি। আর মহামতি বাবরের আমি পরম ভক্ত, আসলে সব মুঘল সম্রাটেরই ভক্ত। আমি দুই ইংরেজ ঐতিহাসিকের একটি ধার করা উদ্ধৃতি মানি যে ঈশ্বরও এদের অভিশাপ দেওয়ার আগে দুবার ভাবতেন। ১০


গ্রন্থঋণ:
১। প্রমথ নাথ বিশী, প্র.না.বি-র নিকৃষ্টতর গল্প (কলকাতা: মিত্র ও ঘোষ, ১৯ ... ), পৃ: ১-১০; ১১-২১।
২। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ঐতিহাসিক চিত্র’, আধুনিক সাহিত্য, রবীন্দ্র-রচনাবলী ১২৫তম রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তী উপলক্ষে প্রকাশিত সুলভ সংস্করণ (কলিকাতা: বিশ্বভারতী, ১৩৯৪/১৯৮৭), পৃ: ৫৯৯।
৩। R. C. Dutt, The Economic History of India under Early British Rule: From the Rise of British Power in 1757 to the Accession of Queen Victoria in 1837, Vol. 1 (London: Kegan Paul, Trench Trübner, 1902); Dutt, The Economic History of India in the Victorian Age: From the Accession of Queen Victoria in 1837 to the Commencement of the twentieth Century, Vol. 2 (London: Kegan Paul, Trench Trübner, 1904).
৪। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘ঐতিহাসিক চিত্র’, পৃ:৬০০।
৫। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘পরী’, ‘আরো-সত্য’, যত্র গল্পসল্প, রবীন্দ্র-রচনাবলী উপর্যুক্ত সংস্করণ, ত্রয়োদশ খণ্ড, পৃ: ৪৯৩-৯৬।
৬। উপরের দ্বিতীয় সূত্র দেখুন।
৭। Saadat Hasan Manto, ‘Toba Tek Singh’, tr. Harish Trivedi, যত্র E. V. Ramakrishnan (ed.), Indian Short Stories 1900-2000) (New Delhi: Sahitya Akademi, 2000), pp. 185-94।
৮। প্র.না.বি-র নিকৃষ্টতর গল্প, পৃঃ ১২৬-১৩৩।
৯। Ashis Nandy, At the Edge of Psychology: Essays in Politics and Culture (Delhi: Oxford University Press, 1993), pp. 47-48.
১০। S.M. Edwardes and H.L.O. Garrett, Mughal Rule in India (New Delhi : Atlantic Publishers and Distributors, 1995) , p. 350.