ইচ্ছেডানা

ইন্দ্রনীল বক্সী



রঙিন মার্বেল , সাহেব বুলবুল ও নটিলাস





পাখিটার ঘাড় থেকে ঝুঁটি সবটাই কালো , অথচ নাম কেন সাহেব ? সাহেব মানে তো ফর্সা ...!ফুরুৎ ফুরুৎ এডাল ওডাল কেমন লাফিয়ে বেড়াচ্ছে ! ইলেক্ট্রিকের তারে গিয়ে বসছে , ওর শক লাগে না ! বৃষ্টিতে ভিজে গা ফুলিয়ে কেমন ঘাড় ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছে মাতব্বরের মতো । বৃষ্টিতে ভিজলে ওর মা ওকে বকে না ... কি ভালো কি ভালো ! পাখিদের স্কুল নেই , পড়া নেই বৃষ্টিতে ভেজা আছে , ডালে ডালে ,তারে তারে ঘোরা আছে ! ... আমার থেকে বুলবুল ভালো আছে ...
মাঠের এদিকে অনেকটা ঝোপঝাড় , এদিকে আসা বারন । সাপ টাপ আছে নাকি ! কিন্তু ঋজুদা আর তিতিররা তো আফ্রিকার জঙ্গলেও চলে যায় !যেখানে রক্ত খাওয়া শেৎসি মাছিরা থাকে !গোরিলা আছে , ব্ল্যাক প্যান্থার আছে ... আমাদেরও অভিযান এই আমাদের আফ্রিকায় , একটা গুপ্তধন আছে , ননাইয়ের খবর এইখানেই কোথাও চিঙ্কুদা তার চাইনিজ রঙীন মার্বেল পুঁতে রেখেছে , এইখানেই ... ওই ঢিপিটাতে ? হতে পারে , আমার পকেটে খুরপি ... বাবার বাগান করার সরঞ্জাম থেকে লুকিয়ে পকেটে করে নিয়ে এসেছি । খুঁড়ছি খুঁড়ছি ... ননাই একবার করে উঁকি মেরে দেখে নিচ্ছে ঝোপের ফাঁক দিয়ে ,কেউ আসছে না তো ! ...কৈ মার্বেল !...মার্বেল কৈ ! ... হাত ব্যাথা করছে ... একটা পুরানো বেল্টের বাতিল বকলেশ উঠে এলো । মার্বেল পাওয়া গেল না , চিঙ্কুদার চাইনিজ মার্বেল ...
...ম্যানড্রেকের জাদু বাড়ির মতো আমারও একটা বাড়ি চাই , লোথারের মতো বন্ধুও , টিনটিননের কুট্টুসের মতো একটা কুকুর চাই , বেতালের তুফানের মতো ঘোড়া ... গুপি বাঘার জুতো চাই.... । ক্যাপ্টেন নিমো আমায় টুপি খুলে দেবে , আমিই হবো নটিলাসের পরবর্তী ক্যাপ্টেন। যেদিন প্রথম সমুদ্রে ডুব দেবো , মা ফুলকপির সিঙাড়া করে দেবে...



যৌবন – মৌবন ও পাথুরে সংলাপ





“ তুমি বলেছিলে তাই ... পাথুরে পথ রয়ে গেছে অনায়াসে , এ পথের দুধারে রডোড্রেনডন নেই ! কৃষ্ণচূড়ার অবিরাম পড়ে থাকা । জুলাই অগাস্ট ভিজে ওঠে পায়ের পাতা, বর্ষাতি ভেদে শরীর স্বচ্ছ হয়,
চুঁইয়ে পড়ে চিবুক বেয়ে ...কত মুগ্ধতা ছড়িয়ে আছে পাথরের আনাচে কানাচে ...“

স্কুলছুটদিন , গেরুয়া বিকেল ...গুনে গুনে তুলে রাখা সময়ের ম্যাজিক বক্স । অসংলগ্ন দিনকালের অন্তহীন সংলাপ ইথারে জমা হয়ে হয়ে ফসিল হতে থাকা কাব্য , এসব জড়িয়ে রয়েছে নেশার মতো এক কূয়াশা ঘেরা বনাঞ্চল । শহর থামেনি , ছুটে গেছে উর্ধ্বশ্বাস ... কারা থেকে গেল বন্দরে , চ্ছিন্ন ! প্রবাল দ্বীপের মতো অঙ্গজরা প্রবাসী ডানা মেলে একদিন ... একদিন হারিয়ে গেল !

ফিরে এসো প্রবাল দ্বীপেরা ! ফিরে এসো ফসিল কাব্যের সংলাপেরা ...ফিরে এসো অর্বাচীন সেই সব মুগ্ধতা ... আবার শুরু থেকে শুরু করি এক্কা দোক্কা ... সবজে মাঠের হলদে ফড়িংখেলা ।


অবাধ্য লিলিথ ও নিষেধের গাছ




বাধ্যতার ...বশ্যতার উঠোন পেরিয়ে গেছে সেই কবে ...লিলিথ , প্রথম নারী । নিষেধ মাড়িয়ে চলে যাওয়া মেয়েরাই তো নিষিদ্ধ ...অন্ধকার ! দৈত্য সহবাসে বেড়ে উঠেছে আত্মস্পর্ধার অসংখ্য গাথা । অন্ধকারের রানী সেতো , অর্ধেক আকাশের প্রথম দাবীদার ! নির্বাসন থেকে আলোয় এসো লিলিথ ! নিষিদ্ধ গাছ , নিষিদ্ধ গাছের সে ফল ইভ ও আদমের কামড়ে পবিত্র হয় নি , তোমার বাগানে এনে রেখো সে গাছ ... প্রতিদিন সে নিষেধের ফল খাক প্রতিটি মানব মানবী ।
আদমের সেই শৌখিন পাঁজর বেজে বেজে উঠুক অদম্য বাঁশির সুরে , মেয়েরা মানবী হয়ে উঠুক নিরিবিলি নিজস্ব আয়নায় । চলকে যাক সভ্যতার এযাবত দর্প পেয়ালা ...
ইচ্ছেগুলো পাখনা পাক তোমার হাত ধরে লিলিথ , অবাধ্যতার ,অবশ্যতার মিছিল জেগে উঠুক এ পৃথিবীর আনাচে কানাচে – অলিতে গলিতে ।

আঙ্গারা ও গন্ডোয়ানা

জুড়ে যাক টেটনিক সব , জুড়ে যাক আঙ্গারা ও গন্ডোয়ানা ল্যান্ড । টেথিসের নোনা আদীম বাতাসে পাল তুলুক রাষ্ট্রহীন , মহাদেশহীন পৃথিবীর নাবিকেরা । এক প্রান্তে থাকুক মহাসমুদ্র , আর এক পাশে শুধুই মাটি পাথরের ,গাছ গাছালির , প্রানীকুলের মহাচারনভূমি ! রাজা নেই , রাজত্ব নেই , সীমারেখা নেই ... নেই ট্রয়ের যুদ্ধ , নেই বাস্তিলের পতন ... নেই অসউইচের মৃত্যু উপত্যকা ! মাচ্চুপিচ্চুর রহস্য উপত্যকায় মেষপালকেরা ফিরে আসুক ব্যাস্ততাহীন অলস আড়বাঁশি নিয়ে ।যৌনতায় ফিরুক খাজুরাহোর পাথর প্রতিমারা।
মায়া - ইনকার সুর্য সময় নিয়ন্ত্রক হোক বয়ে চলা মুহুর্তের ক্ষণ প্রতিক্ষনের ।



অনায়াসে প্রেমে পড়ুক অসংখ্য বিম্বিসার , প্রেমে উন্মাদ হতে দেখিনি কাউকে কতদিন হলো ! বর্ষাবন জুড়ে নামুক না ঝির ঝির বৃষ্টির দিন । সংকলিত হয়ে উঠুক অব্যক্ত সমস্ত কবিতারা , অভিশাপ মুক্ত হোক রাশহীন কলমের স্পর্ধা , পড়ে বাঁচি , শুনে বাঁচি , দেখে বাঁচি ...
হরিপদ কেরানীর তিনবাটির টিফিন বক্সে ভরে অফিসে অফিসে সংক্রমণ হোক, আটপৌরে গুমরে থাকা ইচ্ছের প্রবল জ্বর – জ্বর প্রলাপের খেরোর খাতায় আঁকা থাক একদিন ঠিক রোদ্দুর হয়ে ওঠার লাল নীল কালির নকশা । শুনলেও যে কথা পাপ হয় সেকথা বাজুক তীব্র স্বরে রাস্তার মোড়ে , ইচ্ছেরা শুধুই ইচ্ছাধীন হোক ।
হোকা না কলরব ! মেলে ধরি আমার তোমার নিমিত্তের ডালপালা ... মধ্যবিত্তের মধ্যবর্তী ছায়াপথ পেরিয়ে নক্ষত্রছটার আলোক সরণীতে । ... এসো , দিক ভুল করি , অনিশ্চিত করে তুলি গন্তব্য ।