এক ফোঁটা দুই ফোঁটা ...

পঙ্কজ বিশ্বাস



এক.
ঘাসের গায়ে যেমন সারারাত শিশির জমে, জলের ঘন ভার একসময় নীচে গড়িয়ে পড়ে ...। কিংবা, সকালের হলুদ নরম রোদে কোমলভাবে শুকিয়ে যায় ...। ঘাস কি তাকে ছুঁয়ে যাওয়া সেই বিন্দু বিন্দু জলের কথা মনে রাখে! জলের সঙ্গে সেই মিলিত যাপন, হোক তা কয়েক প্রহরের, একেবারেই মিলিয়ে যায়? ... ঘাস কথা বলে না। কিন্তু আমাদের মিনু দিদি কথা বলে।
‘ও যখন প্রথম বার রাঙাদাদুর বাড়ি উঠেছিল, আমি আর টুম্পা দাদুর কাছে ‘শেষের কবিতা’র নোটস্‌ নিচ্ছিলাম।’ টুম্পাই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। দাদুর ভাইয়ের ছেলের ছেলে। সুজয়। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। কল্যাণী ইউনিভার্সিটি। রেগুলার।
‘আমি তাকাতে পারি নি জানিস তো! ও যখন নাম জানতে চাইল, বলতে গিয়ে দেখি জিভে আটকে গেছে। কথা সরছে না।’ … দিদির বাংলা অনার্সের ছাত্র আমরা। ততদিন জেনে গেছি কাহাকে পূর্বরাগ বলে।
তখন ল্যান্ড ফোনের যুগ। সেইদিনই সওয়া আটটা নাগাদ ও ফোন করেছিল আজও দিদি মনে করতে পারে। ‘কতক্ষণ কেটেছিল ঠিক মনে নেই। ওই কথা বলল। ‘কাল দেখা করতে পারবে?’
টুম্পার মদতেই এসব। কোনও উপায় ছিল না, বেচারা এমন করে ধরেছিল। তবে মিনু দি দেখা করেছিল। সারারাতের অনিদ্রার ছাপ নিয়ে দেখা করেছিল গানের ক্লাসে যাওয়ার পথে। যদিও তেমন কিছু কথা হয় নি। একটা চিঠি গুঁজে দিয়েছিল হাতে। ‘আমিও কাঁপা হাতে তার উত্তর দিলাম। ওই বাড়িতে মেনে নেবে না। আমার ফ্যামিলি খুব কনজারভেটিভ এইসব।’ তারপর? ... দিদি কপালে জমে ওঠা ঘাম মুছে বলল, ‘তারপর আবার কি ... ওই যা হয় ... ।’
‘হয় মানে, পুরোটা বলোই তো!’
‘ওই আর কি। এমন নাছোড় ছিল, শেষে রাজিই হয়ে গেলাম। বাড়িতে জানাজানি হল। মা-ও আপত্তি করল না...।’
‘তাহলে কি এমন অসুবিধা হল, যে ...’
দিদি বিব্রত বোধ করে। আমরাও এককাট্টা। বলতেই হবে। ‘আসলে আমি বাবা মা সেবার পুজোয় ঠাকুর দেখতে বেড়িয়েছি। একটা আবছা গলি দিয়ে হাঁটছি। এমন সময় টুম্পা আর ওকে খুব বিশ্রী অবস্থায় দেখতে পাই। মা-ই দেখায়।’
শুনে আমরা তো থ। বলো কি দিদি! ‘হ্যাঁ, ওই দেখে আমি সেন্সলেস হয়ে গেছিলাম। জ্ঞান ফিরলে দেখি চারদিক অন্ধকার। আমার বেঁচে থাকার কোনও মানেই আর খুঁজে পেতাম না। কি ভয়ঙ্কর দিনই না গেছে!’
দিদি ঘেমে ওঠে। সারা মুখে যেন শ্রাবণের কালো ছায়া নেমে আসে। খুব আলতো করে নিজের মনে মনেই বলে ওঠে, ‘নিজের কাছের লোকদের কাছ থেকে এতবড় অপমান! ... আমি স্বপ্নেও ভাবিনি ... স্বপ্নেও ভাবি-বি-নি ...’
কে জানে এই স্বপ্ন, ভুল স্বপ্নের শেষেই আলাদিনের প্রদীপ থাকে কি না। যা কিনা সব অসম্ভবকে আলোয় ভিজিয়ে দেয়!
মিনু দি ‘রাধাবিরহ’ খণ্ডটা আজও নাকি উজাড় করে পড়ায়।

দুই.
মনে আছে আমি তোকে চিঠি লিখতাম।
চিঠি লিখতাম, কেননা, তোর কাছে দাঁড়ালে আমার সব কথা কেমন ভাষা হারা হয়ে যেত। আমার শব্দের অভিধান কেমন শুকিয়ে যেত। ফোন করলে কাকু রিসিভ করতেন। ওত কৈফিয়ত আমার ধকে সইত না। অথচ আমার কত কথা বাকি! আমার বিকেলের আকাশে একফালি মেঘ যেতে যেতে ওই ছাদের সমকোণে দাঁড়িয়ে গেল। নড়ছে না। তুই মেঘ পিয়নের খামে করে চিঠি পাঠালি বুঝি! ... টবের ফুল সারা সকাল কেমন মুখ গুমরে আছে। তোর কি মন খারাপ? ... এইসব।
তো আমার চিঠি লেখা ছাড়া আর কি উপায় ছিল বল। আর তুই তো জানিস না আমার চিঠি লেখার গল্প। একটা চিঠি লিখতে আমার কত দিস্তে কাগজ নষ্ট হত। নষ্ট হত এটা বলা ঠিক না। আসলে অনেক শব্দ ভেঙে ভেঙে আমি তোর কাছে পৌঁছাতে চাইতাম। অনেক মেঘের টুকরো ভাঙতে ভাঙতে যেমন একসময় হাতি ঘোড়া হয়ে ওঠে ...
আমার ডায়ারির পাতায় আজও সেই দিনটার কথা লেখা আছে জানিস। ১২ অক্টোবর বুধবার। কলেজে শারদ উৎসব। কমার্স বিল্ডিং-এর ওপরের ঘরে অনুষ্ঠানের আয়োজন। তুই বারান্দার রেলিং-এ বান্ধবীদের সঙ্গে ... ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’। আর আমি অবাক হয়ে তোকে দেখছি। ‘যাঁহা যাঁহা নিকসয়ে তনু তনু-জ্যোতি। / তাঁহা তাঁহা বিজুরি চমকময় হোতি।।’ বিশ্বাস কর সেই প্রথম আমি রবি ঠাকুরের গান বুঝলাম, সুনীলের নীরা বুঝলাম, জন ডান বুঝলাম।
‘শোন্‌ আমার বাড়িতে এইসব একদম পছন্দ করে না। আমার বাবা জানলে পর অনেক দূর জল গড়িয়ে যাবে।’ এই ছিল আমার কথার পিঠে তোর বলা কথা। তোর প্রথম বলা কথা। কেয়ার করি নি। শেষে শুধু জানিয়েছিলাম, ‘আমি তোকে ছাড়া বাঁচ্‌ ... বো ... না।’
তবু এই দ্যাখ বেঁচে আছি। দিব্যি বেঁচে আছি। শুধু মাঝরাতে শুতে গেলে আকাশের তারা গোনা একটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। তারা গুনতে গুনতে হিসেব করি তোর গলা শুনি না কত দিন, তোকে চোখে দেখি না কতদিন ...। তারাদের দূরত্ব যুঝতে যুঝতে তোর আর আমার মাঝখানে ঘনাতে থাকা দূরত্বের ইতিহাস ও কারণ নির্ণয় করতে থাকি। এসব এখন প্রিয় নেশা। হয়তো নিয়তি।
আর আরও হাস্যকর তোর এফ.বি ওয়ালে গিয়ে ফ্যামিলি ফটোতে লাইক করা। কতগুলি রঙচঙে বেলুন উড়িয়ে দেওয়া!

তিন.
তাবৎ রাজকন্যাদের হারিয়ে দিল চাষার মেয়েটি। একবুক ভালোবাসাই ছিল সে মেয়ের রাজপুত্র লাভের একমাত্র জাদুকাঠি। ঠাকুমার মুখে ঘনিয়ে ওঠা এ গল্পের নায়িকা তো পাড়ার তপুদি-ই। সে তার কালোহরিণ চোখের মায়া দিয়ে বেঁধেছিল পাড়ার রাজুদাকে। বাড়ির লোকের রি-রি ‘বাড়ির ওপর বাড়ি’, বংশ, তপুদির গায়ের রঙ! সেই দেবদাস-পারোর চিরায়ত কাহিনি। রাজুদার সঙ্গে একদিন ভর সন্ধ্যেতে তপুদি গ্রাম ছাড়ল। রাজুদার মা শাপ-শাপান্ত করে গেল তপুদির বাড়িতে। তপুদির বাড়ি থেকে ঠোকা হল অপহরণের কেস। পাড়াময় সে এক ধুন্ধুমার কাণ্ড। শেষে, এসব ক্ষেত্রে যা হয়! তবে রাজপুত্রের হাতে চাষার মেয়ের রেঙেছিল কপাল। আর আমাদের তপুদির?
মা বলে, ‘তোদের রাজু দা আজও জ্যোৎস্না মেখে সেই পুকুর ঘাটে অপেক্ষা করে।’
‘কেন মা, কিসের অপেক্ষা?’
‘তপা যদি জল থেকে উঠে আসে। ওর নাম ধরে। সেই রাতে এক আগুন শরীর নিয়ে জলের ভিতর থেকে যেভাবে ডেকেছিল।’