মায়ামদমিদমখিলং

নভেরা হোসেন




আমরা কে কে যে
কজন বা কত
ভুলে হ’য়ে গেছি আমাদের মতো

(মা’র সঙ্গে বাক্যালাপ, শামীম কবীর)


২ অক্টোবর ১৯৯২
ঘরের ভেতর কার্বন পোড়া ঘ্রাণ। বেশ ঝাঁজালো গন্ধ, নাসিকারন্ধ্র দিয়ে প্রবেশ করে মস্তিষ্কের নিউরন পর্যন্ত চলে গেছে মনে হয়। দুকান দপ্দপ্ করছে। কারা যে এসব করে অথবা কখন করে টের পাই না। দিনের প্রায় চব্বিশ ঘণ্টাইতো ঘরের মধ্যে থাকি। অবশ্য কী-বা বুঝতে পারি? গত চারদিন ধরে বাড়িওয়ালা কেন যে বেসিনের কল বন্ধ করে রেখেছে কে বলতে পারে? আর এ বিষয়ে তাকে কিছু বলেও কোনো লাভ আছে বলে মনে হয় না। এর অজস্র প্রমাণ আছে। গত এপ্রিলে যখন ফ্রিজের স্ট্যাবিলাইজার কাজ করছিল না তখনই সন্দেহ হয়েছিল এর পেছনে লালগুল্ফবিশিষ্ট চতুর বাড়িওয়ালার হাত আছে। কিন্তু কাউকে কোনো কথা বিশ্বাস করানো এত কঠিন! চাচার ধারণা ফ্রিজের কলকব্জা বিকল করে আমি নিজেই বাড়িওয়ালার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছি। ঘরের ভেতরের গুমোট আবহাওয়ায় আর থাকা সম্ভব না। বেরোতেই হল। বাইরে ঝিরঝিরে বাতাস, একটু শীত শীত। পুলওভারটা আনা দরকার ছিল। রাস্তায় একদম শুনশান্। রাত আটটা বাজতে না বাজতেই লোকজন সব সটকে পড়েছে নাকি? মোড়ের দোকানে ভিড় নেই। সত্যি কথা বলতে-কী চাইছিলাম কারো সাথে কথা বলতে। গত কিছুদিন ধরে ঝিম ধরা সময়টা একদম ছিবড়ে বানিয়ে ছেড়েছে। সহপাঠীদের সাথে কথা বলতে এমন ক্লান্ত লাগে। ওদের সাথে কদাচিৎ দেখা হলে চোয়ালের মাংস ঝুলে পড়ে, জিভে স্বাদহীন অনুভূতি। মাসরুর একমাত্র বন্ধু যার সাথে কথা বলা যায়। ওর সিক্সথ সেন্স খালি ভালো না, নাইনথ্, টেনথ্ পর্যন্ত সেন্সও আছে। যদিও ইউনিভার্সিটি ওকে ছাড়িয়ে দিল অনিয়মের দোহাই তুলে। ডিজগাস্টিং।

৩ ডিসেম্বর
গত কয়েকদিনে যা ঘটল! কী বলব এমনটা ইহজনমে ভেবেছিলাম বা ভাবতাম বলে মনে হয় না। চারপাশে যেমন সব দেখছি একটু সন্দেহ হয় অ্যাসাইলাম্গুলো কি তুলে দেয়া হলো নাকি? ঢাকা সিটিতে শুনেছি সরকারি, বেসরকারি মিলিয়ে গোটা পনেরো প্রতিষ্ঠান এসব জনসেবামূলক কাজ করছে। তাদের কাজকর্ম রীতিমতো আমাকে থ বানিয়ে দিল। ফার্মগেট ওভারব্রিজ পার হতে গিয়ে জঘন্য। পেছন থেকে এসে একেবারে জাপটে ধরল। না, কী? টাকা চাই- দু-বেলা না খেয়ে আছে। কোটের কোণা ধরে রেখেছে। টাকা না দেয়া পর্যন্ত নো ছাড়াছাড়ি। ইউনিভার্সিটি এলাকা হলে অন্য কথা ছিল। মৃণালদা, মিল্টনরাতো বন্ধু, তস্য বন্ধু হলেও কাগজের নোটের ব্যাপারে ফকিরিবাদের চর্চা করে আসছে বহুদিন। আর তাছাড়া উপায় তো নাই। দেড়শো টাকার পি ডি কিনতে হচ্ছে আড়াইশো টাকায়। রেশনিং চলছে সব জায়গায়। সেদিন দেখি বর্ষা-বাদল জুটি পাবলিক লাইব্রেরির চিপার সিঁড়ি থেকে উড়তে উড়তে এল। বর্ষার গাঢ় কালো চোখদুটো আমাকে দেখে কেমন অদ্ভুত আচরণ করতে লাগল যেন বিয়েত্রিচের দান্তে স্বয়ং দাঁড়িয়ে। ঐ পরিস্থিতিতে নিজের ব্যক্তিত্ব যত প্রখর হোক না কেন, তা জঘন্য। উল্টাপাল্টা হয়ে যায় সব। আমিও সচরাচর যা করি না তাই করলাম বর্ষার হাত দুটো স্পর্শ করলাম। এতে আমার কী দোষ হল বুঝতে পারলাম না। বাদল তো বটেই বর্ষাও এমন ব্যবহার করল আমি যেন কুষ্ঠ রোগী। গায়ে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা। ছ্যাৎ করে উঠল। বুঝি না ওরা আমাকে বুঝতে ভুল করছে নাকি আমি করছি ভুলটা? এমনিতে এসব নৈতিকতার বালাই আমার নাই কিন্তু রিফ্লেকশন বলতে যা বোঝায় তার ক্ষেত্র পার্ফেকশন কিছুটা হলেও আছে, মানে তাই তো জানা ছিল। না এখন দেখছি শাহেদের ডজ থিওরিটা সত্যি হয়ে যাচ্ছে। হা ... হা ... হা ...


৮ ডিসেম্বর
ড্রিপ ড্রপ ড্রিপ ড্রপ ড্রপ ড্রপ ড্রপ
বাট দেয়ার ইজ নো ওয়াটার ...
মাথার যন্ত্রণাটা আবার বেড়েছে। গত তিনদিন পেন্কিলার, ট্রাঙ্কুলাইজার সমানে খাচ্ছি। কোনো পরিবর্তন নাই।


১ জানুয়ারি, ১৯৯৩
হ্যাপি নিউ ইয়ার টু মি। চিয়ার্স। থ্রি চিয়ার্স।

২৪ জানুয়ারি
আজ কার যেন জন্মদিন! সেঁওতির? কী জানি। আমার নিজের না তো? মনে নেই। বুয়েটের হল থেকে কবে এই ছাপরা মসজিদের গলিতে এলাম? কতদিন? মাস? এ-কি এই শতাব্দীর ঘটনা? কাল বাসে যেতে যেতে দেখলাম ডেড হোয়াইট স্কিনের এক তরুণীকে। ঝলমলে পোশাক, চোখে-মুখে দুরতিক্রম্য আহ্বান। একি আমার জন্য? ফাক্ ইট। আজকাল কী সব ট্র্যাশ্ মাল পড়ে ধাঁধাই শুধু দেখছি। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার রুমে ফিরে ভাত খাওয়ার সময় দেখি নতুন বুয়া আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। না হে এ দৃষ্টি অপরিচিত নয়। খুব বেশি পরিচিতও নয়। গতকল্য যে তরুণীকে দেখলাম এ তার চোখ। পাণ্ডুর বর্ণ, ভাবলেশহীন চোখ। কী আশ্চর্য! এটা কী করে সম্ভব? মেমোরি ক্যান বি ডিসেপ্টিভ্। হ্যাঁ, তা-ও তো মিথ্যে নয়। কিন্তু নিজের চোখকে কী করে ধুলো দিই? মনে হচ্ছে এ দু-জন মেয়ের মধ্যে কোনো একটা যোগাযোগ আছে কোথাও। এক্ষেত্রে শাহেদের ডজ থিওরি বোঝার দরকার হয় না। ক্লোনিং! শুনেছি কোন করা হচ্ছে বা হয়ে গেছে। হ্যাঁ মানুষ। কিন্তু এরা যে এত তাড়াতাড়ি যত্রতত্র শহরগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছে মালুম হয় না। যাক এ বিষয়ে গভীর পড়াশোনা ছাড়া সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।


১৩ ফেব্রুয়ারি
রোদন ভরা এ বসন্ত সখী কখনো আসে নি বুঝি আগে। এসেছে, হ্যাঁ এসেছিলই তো, কিন্তু কোথায় সে কাদম্বরী, কোথায় সে শকুন্তলা?
এসেছিল মনে। হ্যাঁ মনে মনে এসেছিল, মন তাকে তৈরি করেছিল। মনই মনকে তৈরি করে। আর কঙ্কালটা সবার জন্য সাধারণ। আমার মনেও বসন্তের ছোঁয়া লাগল। ভোরবেলা ঘর থেকে বেরিয়ে ‘পথে পথে দিলাম ছড়াইয়া ...’ কলিম শরাফী? কিছু মনে পড়ছে না। চারপাশে একেবারে গৈরিক বসন্ত। বিকালে মেলায় গেলাম। বইমেলায় এবার প্রথম। টিএসসি থেকে বাংলা একাডেমী; সারি সারি দোকান, বই-পুস্তক, গান, চিৎকার, রঙ, চারিদিকে রঙিন শাড়ি পরা তরুণী, কিশোরী, প্রৌঢ়া ...
গাঢ় বাসন্তি শাড়িতে ছাইবর্ণ বিমূর্ত জলরঙ, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, পোড়া কাঠের তৈরি এক মেয়ে হেঁটে গেল সামনে দিয়ে। অবয়বে আফ্রোদিতির ছাপ নয় একটা অচেনা দৃষ্টি, কিছুটা বিষণ্ণ, উদাসীন। চোখে একটা ঝিলিক কিন্তু তা স্বল্প সময়ের মধ্যেই মিলিয়ে গেল। তার চোখের দৃষ্টি বৃরে কথা মনে করিয়ে দিল। নিজের মনের মধ্যে যেন ডুবে আছে, চারপাশে কী হচ্ছে দেখছে না, একটা ধ্যানের মতো কিন্তু কোথায় যেন একটা বিপ্তিতা। বিকালের হালকা গোলাপি আলো তার সব শূন্যতাকে শুষে নিচ্ছে কিন্তু এ মেয়ে তো নেশায় একদম চুর। কোনো হুঁশ নাই। আহ! কী সব ভাবছি। অচেনা সব মানুষ দেখলে মস্তিষ্ক সক্রিয় হয়ে ওঠে আর পরিচিতরা মনে বিতৃষ্ণা জাগায়, তাদের চুলের ভেতর বিষাক্ত কেউটে ওত পেতে থাকে। ওদেরকে আমি ঘেন্না করি। সবকটাকে।
ব্লা ... ব্লা ... ব্লা ... ব্লা ... ব্লা ...


২৬ ফেব্রুয়ারি
জোসেফের কথা খুব মনে পড়ছে। অদ্ভুত ছেলে। বড় একটা ভুল হয়ে গেছে। ক্ষমা অতীত ভুল। একটা সড়ক ধরে যাচ্ছিলাম দুজনে, দুবন্ধু। কবেকার কথা মনে নেই। ঊননব্বই, আটাশি, সাতাশি। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে বিকলাঙ্গ মনের যত কথা! সে শুনতো আমার কথা। প্রতিটা শব্দ, বর্ণ—গোগ্রাসে গিলত, এর মধ্যে কোনো ফাঁকি ছিল না। যা ছিল তাকে বলা যায় প্রেম। একই লিঙ্গের প্রতি প্রেম। না এ প্রেমকে সহজে কেউ ভালো চোখে দেখে না। অথচ এ সম্পর্ক চলে এসেছে সৃষ্টির আদি থেকে। এই ঘনিষ্ঠতা সবসময়ই আছে কিন্তু তা যেন কেউ দেখতে পায় না, দেখতে চায় না। একথা জানাজানি হলে তাদের জন্য অসহনীয় হয়ে ওঠে ঘর ও বাইরের বাতাস। আমার প্রতি জোসেফের এ টান, আমারও তো ছিল কিন্তু তবু তাকে আমি চরমভাবে আঘাত করেছি, পাশ থেকে বন্ধুর লাশ নয় বন্ধুকেই ফেলে দিয়েছি। মোটরবাইকে পিষে মেরেছি যেন তাকে। ধুলোর মতো ছেলেটি ধুলোয় মিশে গেছে আর জানতে পারি নি তার খোঁজ। আসলে জানতে চাই নি, আগ্রহ বোধ করি নি। বলা যায় একপ্রকার ভুলেই থেকেছি। দুহৃর্দর মতো ব্যবহার করেছি। এটা ভাবলে আশ্চর্য লাগে যারা আমাকে সত্যিকারের বন্ধু ভেবেছে, অনুভব করেছে, সহযাত্রী হয়ে চলেছে বন্ধুর পথ ঠিক তাদের প্রতিই বিকর্ষণ। অথচ যেখানে অনেক ছলচাতুরী, ভুলুক-ভালুক অসারতা, মনের দূরত্ব- সেইসব মানুষ, কথার দিকে বারবার ছুটে গেছি। এ হয়তো মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। লাকা সাহেব ভালো বলতে পারতেন, সলিমুল্লাহ্ সাহেবও ফুটনোটসহ মুগ্ধ করে রাখতে পারবেন মনে হয়। কিন্তু তাদের থেকে ভালো আমি জানি, বিশেষত এই বিষয়ে। জোসেফের স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত আধুনিক অবয়বের সামনে গেলে নিজেকে আয়নার ভেতর দেখতে পেতাম। ও ছিল আবলুস কাঠ দিয়ে বাঁধানো স্বচ্ছ এক আয়না। ওর চোখের দিকে তাকালে বুঝতে পারতাম আয়না আমাকে দেখছে, আমি দেখছি তাকে। এ লিভিং মিরর। কিন্তু আয়নায় নিজের আরিক প্রতিচ্ছবি দেখতে ভালো লাগত না। জোসেফের কাছে লুকানোর কিছু ছিল না। ও বুঝে নিত স্বাভাবিক নিয়মে। নিজের ত্রিশঙ্কু দশাটি দেখতে চাইতাম না ওর আরশিতে। সেজন্য ওকে এক পর্যায়ে অসহ্য লাগত। ইচ্ছে করত ঢিল মেরে চৌচির করে দিই আয়নাটি। সাতসকালে ঘুম থেকে উঠেই তিতুমীর হলে এসে হাজির হতো জোসেফ। কায়েৎটুলি থেকে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসত প্রায় প্রতিদিন। আমার তখন ঘুমে দিশেহারা অবস্থা। প্রজেক্টের কাজে পুরো রাত জেগে চারটা পাঁচটার দিকে ঘুমাতে যেতাম। ভোর আটটার মধ্যে জোসেফর উপস্থিতি। মাঝে মাঝে মনে হতো জোসেফ কেউ নয়। কে সে? আমারই মনের ভুল না-তো? দিনরাত কার সাথে যেন কথা বলতাম। হলের ছেলেরা বলত আমার স্ত্রু ঢিলা হয়ে গেছে, চাঁনখারপুলে গিয়ে টাইট দিয়া আনতে হবে।
হা ... হা ... হা ...


১৯ এপ্রিল
এপ্রিল ইজ দ্য ক্রুয়েলেস্ট মানথ্। উনিশ সংখ্যাটা বরাবরই বেশ জটিল লাগত। মৌলিক সংখ্যাগুলোর মধ্যে উনিশ সংখ্যাটি অনেক ভাবিয়েছে গণিতবিদদের আমি ঠিক সেজন্য এ তারিখটি নিয়ে ভাবতাম না। এ অন্য বিষয়। বাবার অন্তর্ধান দিবস। শৈশব থেকেই দেখে আসছি এ দিনে বাড়িতে মিলাদ, কোরান-তেলওয়াত। কণা ফুপু আসত রংপুর থেকে। সারাদিন বাড়িতে ফকির খাওয়ানো, দান-খয়রাত এসব চলত। দাদীর কাছে শুনেছি রেডিও পাকিস্তান থেকে যে কয়জন অফিসারকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল তারা অনেকেই ফিরে এসেছে। কিন্তু বাবাকে ধরে নেয় রাস্তা থেকে। নিখোঁজ হওয়ার দিনটিতে সন্ধ্যায় কী করে যেন বাবা রাস্তায় পাকিস্তানি মিলিটারিদের সামনে পড়ে যায়, সঙ্গে আইডি কার্ড ছিল না। বাসার সবাই বহুরাত পর্যন্ত বাবার ফিরে আসার জন্য অপো করেছিল কিন্তু ভোর রাতের দিকে খবর আসে লালবাগ মোড় থেকে যাদের অ্যারেস্ট করা হয়েছিল তারা কেউ আর বেঁচে নেই। তাদের ডেডবডি কামরাঙ্গি চরের দিকে পাওয়া যাচ্ছে। একজনের বাসা থেকে চাুষ ডেডবডি দেখার খবরও পৌঁছে যায় বাসায়। মা কখনো বিশ্বাস করতে পারে নি বাবা ফিরে আসবে না। সে সবসময় বাবার জন্য অপো করত, এখন পর্যন্ত করে। মার এই ওয়েটিং ফর গোডো থিমটা আমার মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছিল। উই টু আর ওয়েটিং ফর গোডো, ওয়েটিং ফর নাথিং। হ্যাঁ এই অপেক্ষা, এ গোডোর জন্য অধীর ব্যাকুলতা, নাথিং এর জন্য দিন গোনা হয়তো আমার ব্যক্তিত্বকে শূন্যবাদী করে তুলেছিল। জানতাম পিতা ফিরে আসবে পুত্রের কাছে। স্বপ্ন, স্বপ্ন, তা হয়ে গেছে দুঃস্বপ্ন। বিধ্বস্ত ওয়ারশ শহরে লোকজন সব পালাচ্ছে, চিমনি থেকে ধোঁয়া উড়ছে, শীতে কুঁকড়ে যাওয়া বৃদ্ধ টেনে নিয়ে যাচ্ছে ভারি লটবহর। ছোট গ্রাহাম নগ্ন পায়ে এলোমেলো ঘুরছে, গেটোর ভেতরে এঁটো গন্ধ, লাশ পচা গন্ধ। গ্রাহাম তার বাবাকে খুঁজছে। নাতাশা তার বাবাকে খুঁজছে। জাফর পানাহি, আনন্দ, রোকেয়া... সবাই তাদের বাবাকে খুঁজছে... ফাস্ট ফরওয়ার্ড... সেভেনটি ওয়ান, সেভেনটি টু, এইট্টি টু, নাইনটি, নাইনটি টু...। না মাথাতো সদরঘাট হয়ে গেল। জট খুলি কী করে?
মাথার ভিতর
স্বপ্ন নয়- প্রেম নয়- ভালোবাসা নয় কোনো এক বোধ কাজ করে।
আমি সব দেবতারে ছেড়ে
আমার প্রাণের কাছে চলে আসি
বলি আমি এই হৃদয়েরে:
সে কেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়।
অবসাদ নাই তার? নাই তার শান্তির সময়?
কোনোদিন ঘুমাবে না? ধীরে শুয়ে থাকিবার স্বাদ
পাবে নাকি পাবেনা আহলাদ ...

জীবনানন্দ দাশ এমন সব সময়ে এসে উপস্থিত হয়। ইচ্ছে করে আবার তাকে ট্রামের নিচে ফেলে দিয়ে আসি। এবার সুইসাইড নয় শর্ট স্টোরি অ্যাবাউট কিলিং।


মে ডে ১৯৯৩
ইভা ব্রাউন, ইভা ব্রাউন মাথার ভেতর ঘুরছে। ব্রেডের স্বাদও কেমন তিতকুটে। ময়দার বদলে শুনেছি ভুসি দিয়ে ব্রেড তৈরি হচ্ছে, পচা ডিমের গন্ধ, উৎকট। সকালের নাস্তাটা মাটি হয়ে গেল। রুমমেট তপনও নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। স্ট্যুপিড্ গাইস সব। কিন্তু ওরা আমাকে নির্বোধ বলে। কোত্থেকে যে এত সাহস পায়? তপনের শরীর থেকে শোল মাছের গন্ধ আসছে এবং ওর শরীরের নিচের অংশ মাছের মতো লাগছে। অদ্ভুত ব্যাপার কোমরের নিচ থেকে পুরোটা আঁশ দিয়ে গাঁথা। ভেরি স্ট্রেঞ্জ! ভুল দেখছি না তো? এরকম সব সিনেমায় দেখা যায়। মানুষের পূর্ব-পুরুষ জল থেকে ডাঙায় এসেছে আবার জলে ফিরে যাবে। এ-তো হিন্দু মাইথলজিতেও আছে। চুরাশি লক্ষ যোনিপথ ঘুরে পরমাত্মায় মিশে যাওয়া। এখন কোন্ স্তরে আছি কে জানে? আরও কয় লক্ষ বছর ঘুরতে হবে কে জানে? হু নোজ? গড নোজ? নাউ হু ইজ দ্য গড দেন্? হা।

এমন মানব জনম আর কি হবে/ মন যা চায় ত্বরায় কর এই ভবে।
মন কিছু চায় না। এই কিছু চায় না যে সেটা চায় বটে। হা ... হা ... হা ...


২৫ অগাস্ট
অগাস্টাস দ্য গ্রেট এম্পার্রা। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি। মেয়েটির কথা মনে পড়ছে। হাসপাতালের বেডে ছোট মুক্তোর মতো, রেশম কোমল মেয়েটি। কে তুমি কালো রাতে এসেছো আলো হাতে বালিকা? ফোঁটা ফোঁটা স্যালাইন হয়ে ঝরে পড়ছি ওর-ই শরীরে। না এ তৃষ্ণা জলের না। মনটা খুব অস্থির লাগছে, হাসপাতালের মেয়েটি, কেবিন নম্বর ১২০। কার কন্যা এটি, কার জানি না। কিন্তু নিজের আত্মজার মতো লেগেছিল হাসপাতালের চকিত দর্শনে। কেমন হয় সে অনুভূতি? অনেক অনুভূতি বাস্তবে এক্সপিরিয়েন্স্ না করেই অনুভব করা যায়। অনেকটা তেমন। ভবিষ্যৎ বা সম্ভাব্য অনুভূতি বর্তমানে অনুভব করা বা যা কখনোই ঘটবে না এমন। কোনোদিন যাইনি নবগ্রাম, কোনোদিন! অজানা কারণে মন ইদানীং উচাটন হয়ে ওঠে। পোয়েটিক হয়ে যাচ্ছি না তো?
হা হরতন হো ক্যুইট।


৭ জানুয়ারি ১৯৯৪
তিনদিন ধরে কানাওলার মতো ঘুরছি। সাথে জুয়েল, র‌্যানিভাই, আদিত্য, নবী। নবীর গানের দরাজ গলা কিন্তু তাল, লয় কম। তাই গেয়ে আসর জমায়। আর ওদের সাথে থাকতে হলে একই জলে পা না ডুবিয়ে উপায় নেই। জলে না ডুবেও উপায় নাই। আর নিজের যে ইচ্ছা নাই তাও নয়। লালবাগের খান সাহেবের আস্তানা! আজিমপুর এতিমখানা ছাড়িয়ে সোজা চলে গিয়ে ডানে মোড় নিতে হল। কিছুটা যাওয়ার পর বামে সরু গলি। কালো থকথকে ময়লা দিয়ে ড্রেনগুলো পূর্ণ। কিছু ময়লা গলির ওপরেও রাখা। এসব ডিঙিয়ে কাঠের দরজায় নক্ করতেই বেশ তাগড়া এক ছেলে এসে দরজা খুলে দিল। খান সাহেবকা কাস্টমার? মাথা নাড়তেই ছেলেটি আমাদের চার-পাঁচটা ঘরের ভেতর দিয়ে নিয়ে গেল আখড়ায়। ঘরটিতে সাদা রংয়ের বেতের চেয়ার পাতা, মাঝে গোল টেবিল, কেমন একটা বোটকা গন্ধ। প্রথমে গা গুলিয়ে এলো, তবে কিছুণ যেতেই সহনীয় হয়ে গেল গন্ধটা। খান সাহেব নিজে এলেন আমাদের সাথে কথা বলতে। উঁচু, লম্বা, ধবধবে সাদা, মুখে লাল চাপ দাড়ি, শরীর থেকে বেশ একটা সুগন্ধ আসছিল জর্দার সম্ভবত। রোগা পটকা এক ছেলে সবুজ রঙের কাচের বোতলে করে দেশি দিয়ে গেল। জুয়েল সাথে করে কমলা নিয়ে এসেছিল তাই চিপে দিল খানিকটা। খান সাহেব বহুৎ আচ্ছা লোক, ওনার চোখের সুর্মাটাও ভালো লাগল। ফেরার পথে হল ঝক্কি। উঠতে পারছিলাম না। পা যেন একেবারে গেঁথে দিয়েছে কেউ মেঝের সাথে। উঠতে পারি না। সবাই মহা খাপ্পা, ওরা নিজেরাই কিছুটা বেসামাল তার ওপরে এই বিপত্তি, শেষে দুজনে মিলে ঘাড়ে করে রাস্তা পর্যন্ত নিয়ে এল। তারপর কিছু মনে নেই। মাঝ রাতে রুমের মেঝেতে নিজেকে আবিষ্কার করে অবাক হয়ে গেলাম। এরা কি আজকাল মিথাইল এর বদলে ইথাইল অ্যালকোহল দিচ্ছে নাকি? সারা শরীর ব্যথা। মুখে বিস্বাদ। পাশের বিছানায় সেঁওতি শুয়ে আছে। ওর চোখে-মুখে রক্তের মতো কী যেন লেগে আছে। মেঝে থেকে উঠে ওর পাশে বসলাম। সেঁওতি পাশ ফিরে শুলো। ঠোঁট স্পর্শ করতেই কেঁপে উঠল মেয়েটি। খুব কাছে থাকতে ইচ্ছে করে ওর কিন্তু কাছে গেলেই তীব্র বিকর্ষণ। না, আজ সেঁওতিকে ভীষণ আদর করলাম। প্রায় পিষে ফেলার দশা। মাঝে মাঝে ওকে হাত-পা বেঁধে আদর করতে ইচ্ছে করে। রক্তিম হয়ে উঠল আমার হারানো দেসদিমনা। এ কী এ-তো সেঁওতি নয়, পথে দেখা সে মেয়েটি। না, সে-ও না। কেউ না। কেউ-ই নেই ঘরে। ফাঁকা ঘরে ফ্যানের খটখট শব্দ বেজে চলেছে শুধু।


৩ মার্চ
কিছুদিন ধরে কানের ভেতর সারাক্ষণ খুটখুট শব্দ হচ্ছে। ভেতরের ইঞ্জিনের শব্দ বাইরে চলে আসছে কেন বুঝি না। কোনো কুয়োর ভেতর টু শব্দ করলে যেমন প্রতিধ্বনি হয় টু-উ-উ-উ-উ-উ তেমন শব্দটা। সারাণ দুকান চাপা দিয়ে থাকি। ক্রমাগত বাড়তে থাকে টু শব্দ। না, অসহ্য যন্ত্রণা। রাস্তায় বেরোলে গাড়ির শব্দের সাথে কানের ভেতরের শব্দ মিলে ভো সাউন্ড তৈরি করে। ফার্মগেটে ইএনটি স্পেশালিস্টের কাছে গেলাম। কানে বিভিন্ন মাত্রার কম্পনাঙ্ক মেপে দেখল। একেক গ্রেডের শব্দ মাথার মধ্যে দিয়ে ঢুকে সাঁ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। যাওয়ার সময় নার্ভে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে যাচ্ছে। তবে হিয়ারিং টেস্টের রেজাল্ট নরমাল এলো।


২৭ জুন
আজ একটা বিশেষ দিন। আজ আমার আর সেঁওতির তৃতীয় বিবাহ বার্ষিকী। সেঁওতির সাথে বিয়ের তিন বছর হয়ে গেল, এটা অতিরিক্ত। এতদিনেও আমার সাথে তার স্বাভাবিক সম্পর্ক হলো না। খুব কম দেখা হয়। কোর্ট ম্যারেজ করেছি না যেন খুনের আসামী।। ওদের বাসায় গেলে দরজা খুলতে চায় না। খুব হৈ চৈ করলে ড্রইং রুমে বসতে দেয়। বাজখাঁই গলার মা-টা চোখে-মুখে চরম বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। সেঁওতির কথা জিজ্ঞেস করলে বলে বাসায় নাই অথচ আমি জানি ও বেডরুমে আছে। আমার জন্য অপো করছে। সেঁওতি এমন একটা মেয়ে যার অস্তিত্বের অধিকাংশ জায়গা জুড়ে আমি। হলে থাকতে ওর সাথে প্রতিদিন দেখা হতো। এ মেয়ে মারাত্মক ধরনের। ওকে যদি এভাবে ঘরে আটকে রাখে তাহলে নিশ্চিত সেঁওতি একদিন ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়বে। সেঁওতি কি সত্যি সেদিন পড়েছিল রাস্তায়? অনেক কাক একসঙ্গে উড়ে গিয়েছিল মাথার ওপর দিয়ে। মাঝ রাস্তায় থকথকে একখ- মাংসপি-। ছড়ানো-ছিটানো রক্তের ছোপ। না এ সত্যি নয়, আমার কল্পনা। সেঁওতি নয় ও ছিল নাসরিন। নাসরিন লাফিয়ে পড়েছিল পাঁচতলার ছাদ থেকে। ক্যারাটে জানতো, ব্ল্যাক বেল্ট পেয়েছিল। কালো ছিপছিপে মেয়েটি, চোখগুলো খুব তীক্ষ। উচ্ছল, প্রাণবন্ত- তবু কোথায় যেন একটা বিষণ্ণতা। অথচ আমার সাথে দেখা হলে খুব প্রগলভ হয়ে উঠতো। বলতো তুমি এমন একটা ছেলে, যার জন্য পৃথিবীও তার পায়ের চাকা বদলে নিতে পারে।


২০ সেপ্টেম্বর ১৯৯৫
রেজাল্ট বেরিয়েছে শুনলাম। গোল্লায় যাক। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি দিয়ে ভাত হয়তো জুটবে। কিন্তু ভাত রিকশা চালালেও জুটবে, বিড়ি বান্ধলেও জুটবে। তবে সব ভাতের স্বাদ হয়তো এক নয় যেমন সব মানুষের মন আলাদা। বুঝি না আমাকে কেন বারবার মনোজগতে নিয়ে যাওয়া হয়। সমস্যাটা কী? লোকজনের আর কাজ-কাম নাই ধরে ধরে সবাইকে পাগলা গারদে ভরে রাখছে। আমার তো মনে হয় ফুকোর থিওরি সঠিক। দেয়ালের কোন পাশে কে আছে তা কে বলতে পারে! মানে তা বলার অধিকার কে কাকে দিয়েছে? স্বাভাবিকতার সীমা কোথায় শেষ আর অস্বাভাবিকতার সীমা কোথায় শুরু কে বলতে পারে?


২৮ ডিসেম্বর
লাস্ট ডেজ্ অফ পম্পেই। দিন শেষ হয়ে আসছে। আলো নিভে আসছে। টাইম মেশিনে চড়ে একদম পৃথিবীর শেষ দিনে পৌঁছে গেছি যেন। প্রকাণ্ড সূর্য মাথার খুব কাছাকাছি। এইচ.জি.ওয়েলস, টাইম মেশিন। না এ-তো সায়েন্স। পৃথিবীর নিজ কক্ষপথে ঘোরাটা ধীরে ধীরে কমে আসবে। এত আস্তে ঘুরবে পৃথিবী যে রাত পেরিয়ে দিন শুরু হতে কয়েক ল বছর লেগে যাবে। আবার ম্যামথ্দের যুগ শুরু হবে, হিম যুগ। বড় বড় সব প্রাণী কিন্তু গায়ে শক্তি নাই। ঘুম আসছে গভীর ঘুম। বেলাল একবার হিপ্নটাইজ্ করেছিল। একটা চেনওয়ালা ক্রশ মুখের ওপর ঘোরাতে ঘোরাতে আধ-ঘুম, আধ-জাগরণ দশা। চলে গেলাম সাব্কনসাস স্টেজে। কথা বলছি, বেলালের সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি কিন্তু হাত-পা অসাড়। কোনো শক্তি নেই, ভরশূন্য অনুভূতি, গ্রাভিটেশনহীন দশা। আব্বাকেও দেখতাম এম. ইউ আহমেদের কাছে যেতে। ওনার অনেক রোগী সম্পূর্ণ কোমা থেকে ফিরে এসেছে। তারা এসে বর্ণনা করত মৃত্যুর আগের অবস্থা—দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। অসহ্য যন্ত্রণা, শ্বাস-কষ্ট, শূন্যে ভেসে বেড়ানো, আগুনের হল্কার অনুভূতি, লাল-নীল আলো। একটা জার্নি। তারপর আবার ফিরে আসা। মেডিক্যাল সায়েন্সের কিনিক্যাল ডেথের বিষয়টা আমার কাছে ধাঁধার মতো লাগে। বিশেষ করে সুস্থ হওয়ার পর রোগীদের অভিজ্ঞতার বর্ণনা- ওসব হয়তো মৃত্যু সম্পর্কিত তাদের পূর্ব ধারণাজাত জ্ঞান থেকে তৈরি হয়। ঐ অবস্থায় সে মৃত্যুভীতি থেকে মৃত্যু-সম্পর্কিত ধারণাগুলোকেই এক্সপিরিয়েন্স করে হয়তো। আর এসব ঘটে তার অবচেতন মনে। কিন্তু আমি হাসপাতালের বেডে কেন? সারা শরীর সাদা চাদর জড়ানো। গায়ে জেলখানার মতো ডোরাকাটা পোশাক। কে পরালো? কিছু বুঝতে পারছি না। দূরে সাদা পোশাকের নার্স। এরা কি জানে না হাসপাতালে এলে সকলেই আর ফিরে যেতে পারে না। অথবা সেই অন্ধকূপ যেখানে ঝাঁপ দিলে আর ফেরা হয় না। বেশ কয়েকজন নার্স মাথার কাছে জড়ো হয়েছে। একজন টিকালো নাকের নার্স বাম হাতটা চেপে ধরল। সিডাটিভ কিছু? প্যাথেডিন হলে ভালো হয়। পা থেকে মাথা পর্যন্ত ইলেকট্রিক শক্। এসব কবেকার লেখা?
মনে করতে পারছি না। এখন কি ঘুমাচ্ছি না লিখছি? আমার না একটা কবিতার বই ছিল? গায়ত্রী সন্ধ্যা? বিনয় মজুমদার, সে-ই মাথায় ঢুকিয়েছিল। গায়ত্রী, গায়ত্রী। গায়ত্রী সন্ধ্যা। কী মানে হয় এ নামের?

তৎ সবিতুবরেণ্যং ভার্গো দেবস্য ধীমহি।
ধিয়ো যে ন: প্রচোদয়াৎ-
কী অর্থ এই সন্ধ্যাহ্নিক মন্ত্রের?
আলো নিভে গিয়ে অন্ধকারে পরিভ্রমণ না মহাশূন্যে ... মহা ... মহাগহ্বরে?