ছোট্ট দুই পূজারী

হামিম কামাল




। এক।

গল্প আমি খারাপ বলি না। কিন্তু মুখটা খুললেই বন্ধুরা সব উঠে দাঁড়ায়। না, সম্মান জানাতে নয়। পালাতে বরং। রটেছে- দুকথাকে আমি অকারণে ষোলো কথা বানিয়ে কানের পোকা নাড়িয়ে দিই। রটনা কাজেও এসেছে। এখন অনেকের সঙ্গে কোথাও একত্রিত হলে, মান বাঁচাতে গিয়ে যতোটা পারি নিজেকে চুপ করিয়ে রাখি। তাই যখন থাকি একা, মনের ওপর চেপে থাকা ভরেরা হুড়মুড়িয়ে একসঙ্গে নামতে গিয়ে হই হট্টগোল বাঁধিয়ে দেয়। হট্টগোলটা আবার আমার খারাপও লাগে না। লাগতো, যদি না শক্তির রূপান্তরের কৌশলটা জানতাম। কী সেই কৌশল? উত্তরটা ঘুরিয়ে দেওয়া যাক। কৌশলটা অবলম্বন করেছি বলে আজকাল দেখা হলেই বন্ধুরা বলে, খুব বাঁচলাম বন্ধু, খুব বাঁচলাম। চালিয়ে যেও, তুমি এটাই চালিয়ে যেও। কলমের খাপ খোলো, কিন্তু মুখ খুলো না।
লিখতে বসে উড়ো উড়ো শুনতে পাচ্ছি, গল্প বলে যাওয়াটাই নাকি একমাত্র কাজ নয়। যখন মুখের ভাষাকে কাগজে লেখা হচ্ছে, ওটা একটা দলিলের রূপ পাচ্ছে, তখন বিষয়টা বিশেষ রকম গুরুত্বপূর্ণ। মানুষকে আমি চোখ খেটে বলে দিতে শুনেছি, নাহ, ওই কথা তো আমি বলিনি? আপনি ভুল শুনেছেন। কিন্তু বিশেষ কিছু নারকীয় ব্যতিক্রম ছাড়া মানুষকে এমন বলতে আমি শুনিনি, নাহ, এমন কিছু লিখিনি আমি মোটেই। অমন কিছু আমার মনেই পড়ছে না। তো, এমন ভয়ানক দলিল যখন রাখতে হচ্ছে ভাষায়, কাজটা সুচারু হওয়া চাই। আমার বেশি কথার ধাত। চারুতার ধার তাই ইচ্ছে থাকলেও ধারতে আমি পারি না। যারা কথা বেশি বলে, তারাই এর করুণ মর্ম জানে। অভ্যাস নেই বলে অনভ্যাসের ছাপ কিছু থেকে যাবে। কিন্তু কথা দিচ্ছি, চারুতা বজায় রাখার চেষ্টা আমার থাকবে। আর সবশেষে আমি তো জানি, চেনা অচেনা পাঠককূল আমাকে ক্ষমা করবেন এই কারণে; লেখার সাধ্যমে মাত্র কয়েক মিনিটের সম্বন্ধ যে লোকের সঙ্গে, তার ওপর রাগ পুষে রেখে লাভ কী?
আমি আসলে একটু ভীত। বিভ্রান্তও। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শিক্ষিত মানুষজন তাদের তথাকথিত কুসংস্কারমুক্ত মনের গৌরবে নিজ মতের আপাত সীমার বাইরের সব কিছুই অবিশ্বাস করেন। দেখুন, ভগবান-চিন্তার অতিসাধারণ সৃষ্টিতাত্ত্বিক রীতিতে আমারো আছে দ্বিমত। যুক্তিতে, বাস্তব জ্ঞানের সামর্থে আমার যথেষ্ট আস্থা। ভক্তি শ্রদ্ধাও। এই ভক্তি শ্রদ্ধা আমি অন্য কোথাও অপচয় না করে জমিয়েছি। আর রাশিকৃত ওই মনসম্পদটা নিয়ে এখন তাই আমার ভেতর অবচয়চিন্তা দেখা দিয়েছে। তাই বোধয় বহু ঘটনার মধ্যে অলীক যোগসূত্র কল্পনায় আমার খুব আনন্দ হয়। আপনাদের সেই আনন্দের ভাগ দিতে খানিকটা চেষ্টা করবো। স্রেফ আনন্দের ভাগ, আর কিছু নয়। আর ওই আনন্দও আসবে বিষাদের হাত ধরে। রহস্যঘন পৃথিবীর প্রাকৃতিক নিয়মানুসারে যা ঘটে থাকে আরকি। যাহোক, অনেকেই ভাবতে পারেন, গল্প ফাঁদবার আগেই দশ কথা বলে আপন মত চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অথবা এও ভাবতে পারেন, এ ধারার ভূমিকা একেবারেই নিষ্প্রয়োজন। তাদের মতের ওপর শ্রদ্ধা রেখে আমি জিভ কেটে এই ক্ষান্ত দিলাম।
ওহ, মার্জনা করবেন, আসলে কথা আরো খানিকটা না বাড়িয়ে পারছি না। একটুখানি শুনেই ফেলুন না। জানেন তো, প্রত্যেক মানুষের মনে অবিরত রাসায়নিক বিক্রিয়া চলছে আর গাদের ওপর গাদের স্তর পড়ছে তো কেবল পড়ছেই। ওসব তো মাঝে মধ্যে মনের খোল উঠিয়ে আলো খেলিয়ে, হাওয়া খেলিয়ে শুকিয়ে তুলতে হয়। নয়ত মনের ভার সওয়া হয়ে পড়ে বড় কঠিন। আমি তেমনই আমার কিছু গাদ হালকা করবো।
আপনারা যারা কীটপতঙ্গ ভালোবাসেন তারা নিশ্চয়ই ভীষণভাবে নিজেদের সংখ্যালঘু মনে করেন। এ বিষয়ে আমি নিশ্চিত। কারণ, মানুষের সমাজে যখন ওই ভালোবাসা আপনারা প্রকাশ করতে যান, একেবারে নিকটজনের কাছ থেকেও অপদস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে প্রভূত। কখনো কখনো তো আপনার কোমল মন দলে মলে আপনাকে অপমানের শূলে চড়াতে পরিপাশের আর বাকি থাকে না। হয়ত পদে পদে হতে হয় ঠাট্টার পাত্র। খুউব জানি। কারণ এমন ব্যথার ভেতর দিয়ে আমি নিত্য যাওয়া আসা করছি। সর্বশেষ ঘটনাটির কথা বলা চলে। তা শুনে, যারা আমার মতোন তারা এর মর্ম টের পাবেন। আর বাকিরা বলবেন- এ বড্ড বাড়াবাড়ি। তা হলো, সর্বশেষ, একটা আরশোলাকে বাঁচানোর প্রশ্নে দ্বিমত হয়ে আমার বাবার সঙ্গে বচসার এমন চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছিলাম যে পরবর্তী এক মাস তিনদিন আমাদের কথা বন্ধ ছিল। হয়েছিল কী- হিমিয়ে আসতে থাকা বর্ষাভেজা এক রাতে, আমি কাঁথা বের করবো বলে আমাদের পুরনো রঙওঠা আলমারির কপাট খুলেছি, এমন সময় কাথার উষ্ণ কোণ থেকে একটা খয়েরি বড় আরশোলা পিড়পিড়িয়ে বেরিয়ে এসে সশব্দে মেঝেতে পড়ে গেল। সন্দেহ নেই ওটা পালাতে গিয়েছিল। আর অভিজ্ঞরা জানেন, আরশোলা যখন পালাতে যায়, বড় ধরনের প্রাণসংহারী বোকামোগুলো তখনই করে। তবে, এক্ষেত্রে পতঙ্গটা বোধয় বেঁচেই যেত, যদি না আমার বাবার চোখে পড়ত। কাছেই বাবা দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং বিষয়টা দেখে ফেললেন। ভুল আমারই। বলে উঠলাম- খবরদার! দুহাত দূরত্বে ছিল জুতোর আলনা। আমার খবরদারের শায়েস্তাবিধানে তৎপর বাবার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। আলনার একদম ওপরের তাকে রাখা আমারই চটি জোড়ার এক পাটি নিয়ে চটাস্ করে মারলেন চাটি মেঝেতে। ঘটনা ঘটে গেল। আমার বাবা তার ধর্মীয় আচারনিষ্ঠার জায়গা থেকে নারী জাতটাকে আগাগোড়া মুড়িয়ে রাখার পক্ষপাতী। কিন্তু ঈশ্বরের পরিজন জ্ঞানে একটা প্রাণকে বাঁচার উপায় করে দিতে ইচ্ছুক নন। আরশোলাটিকে ওই বর্ষার রাতে তাই অতর্কিতে প্রাণ হারাতে হলো। আর আমার আদিখ্যেতাকেও করা হলো চটিপেটা। আরো কত অপবাদ! থাক, বলবো না। ওসবের আর কিছুই বলবো না। বরং এবার বলব সেই প্রেমের গল্প। প্রেমের বিপরীতে প্রেমের বিশুদ্ধ লেনদেনের স্বীকৃতি হিসেবে প্রকৃতি ছিনিয়ে নিয়েও আবার ফিরিয়ে দিয়েছিল একটি সম্বন্ধ। এবং সেই সম্বন্ধের ভার প্রকৃতি নিজেই করেছে বহন। অথবা, কে জানে।
যার বুকে কীটের প্রতি ওই প্রেম জমা- সে আমার বন্ধু। আর যিনি ফিরে এসেছিলেন যাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল প্রকৃতি, তিনি বন্ধুর জগৎবিধাত্রী মা।
আধুনিক কথাসাহিত্যিক থেকে শুরু করে গুণী চলচ্চিত্রকার অনেকের কাজে আমি দেখেছি, যা তিনি মূলত দেখাতে চান, শুরুটা তার খানিকটা পাশ থেকে হয়। আমিও চিন্তা করেছি তাই করবো।


। দুই।

প্রথম সহস্রাব্দের শেষ দশকের মাঝামাঝি কোনো এক বছর (১৯৯_)। কাঁদুনে মেঘের আড়ালে বেলা বেশ চড়েছিল। নিচের জনপদে দাঁড়িয়ে তা বোঝার কোনো উপায় ছিল না। মনে হচ্ছিল ভোর, বড়জোর। বৃষ্টির অবিরত ধরাপতনের একটা সাধারণ নাগরিক আশীর্বাদ আছে। আশীর্বাদপ্রার্থীর আপদ বিপদের ধার সে ধারে না। জলাবদ্ধতার কথা বলছি। তো, সেদিনের রাস্তায় ওই জলাবদ্ধতা বেশ এক রকমের সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছিল। কেমন সৌন্দর্য? যারা পুলের জলে দাপানো শিখেছেন, তারা জানেন স্বচ্ছ জলের নিচে নিরাপদ সীমায় যখন মেঝের কাঁপা কাঁপা ছবিটা দেখা যায়, তখন ভরসায় মেশানো সুন্দরের চমৎকার এক অনুভব মনকে ঘিরে ধরে। তাই না? এই দেখো, স্বভাবটা আসলে আমার ভালো নয়। আবারো ব্যক্তিগত অভিমত চাপিয়ে দেওয়ার একটা প্রচ্ছন্ন চেষ্টা আমার কথায় প্রকাশ পাচ্ছে। থাক, এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমতের জায়গা থেকে সুন্দর পদবাচ্য হয়ে থাকুক। ওই রাস্তার কথায় ফিরে যাই। জলডোবা পিচঢালা সড়কের ওপর গাছের ছায়া, এর ওপর যখন বৃষ্টির ফোঁটা এসে জলের ওপর পড়ছে, একেকটা রাজার মুকুট তৈরি হচ্ছে। আবার মিলিয়েও যাচ্ছে অবলীলায়। জমে থাকা ওই জলকে আবদ্ধ মনে হলেও আসলে তা নয়। লক্ষ করলে বোঝা যায়, কোথাও কোনো সূক্ষ্ম জঠর ছিদ্রের দিকে জল এগিয়ে চলেছে। ওপর থেকে কেবল জলের দিকে তাকিয়ে থাকলে বোঝা যায় না। কিন্তু নর্দমা থেকে উঠে আসা বিচিত্রদর্শন বস্তুগুলো জলডোবা রাস্তার ওপর দিয়ে নীরবে পরিপাটি গাম্ভীর্য বজায় রেখে যেভাবে জীবন্ত প্রাণির মতো হেঁটে চলেছে, তা দেখে জঠরছিদ্রগামী ওই চোরাস্রোতটা টের পাওয়া যায়। তো, হেঁটে যাওয়া ওই বস্তুনিচয়ের ভেতর কী কী আছে? আছে লেবেল তোলা ঘনায়িত দুধের কৌটা, কাঁঠালের ছেঁড়াখোঁড়া ক্ষয়িষ্ণু কাঁটালো ত্বক, নানান রঙের পোয়াতি পলিথিন। আছে মৃত প্রাণির গলিত জট পাকানো নাড়িনধর, অগণিত গলিত বেরঙা গাছের পাতা, সংবাদপত্রের টুকরো ছিন্নাংশ। আছে বর্ণনাতীত আরো অনেক কিছুই। ওদের গতিপথ অনুসরণ করে আরো বেশ কিছুদূর এগোলে, অদূরে সরু চৌরাস্তার ঠিক মধ্যখানে একটা লাল পতাকা ওয়ালা সরু বাঁশ গেঁড়ে দেওয়া খোলা ম্যানহোল পড়বে চোখে। চারটি রাস্তা ধরেই হেঁটে আসতে থাকা জীবন্মৃত আবর্জনার দল ওই ম্যানহোলের চারধারে ঘড়ির কাঁটার দিকে বারকয়েক ঘুরপাক খেয়ে, ওই অন্ধকার বৃত্তাকার গর্তপথ ধরে পাতালের পথ গুনছিল। এমন সময় দক্ষিণ দিকের এক চারতলা দালানের তৃতীয় তলার জানালা থেকে একটা কাগজের পিণ্ড এসে পড়ল ওই পাতালগামী জলের উপরিতলে। এরপর সবেগে পূর্বসুরীদের পশ্চাদ্ধাবন ছাড়া পরিণতি আর কী-ই বা হতে পারে।
তো, কী চলছে ওই তৃতীয় তলায়?
জানালার গোবরাটের ওপর ভেজা শরীর নিয়ে, ভাবলেশহীন চোখ মেলে তাকিয়ে আছে একটা প্রায় নির্জীব কাকপাখি। ভেতরের ঘরটা মোটের ওপর অন্ধকার। নগরের বিদ্যুৎ আকাশের বিদ্যুৎ দেখে পালিয়েছে। প্রায় আলোহীন ওই ঘরে জানালাঘেঁষা বিছানার ওপর ঝুঁকে বসে খালি গায়ের শ্যামলরঙা ছেলে নিপু আঁকছে ঠোঁটখোলা এক বৃষ্টিখেকো পাখি। নিপুর চোখের মনি কালো, বাকিটা খুব সাদা। কালো মনিটা সাদা কাগজের এমাথা-ওমাথা ঘন ঘন যাতায়াত করছে। সাদা কাগজের ওপর ভীষণ মনোযোগ দিয়ে পেন্সিলে কাটছে একেকটা আঁচড়। তখন দুই ঠোঁটের মধ্য দিয়ে লাল জিভটার ছোট্ট অংশ বেরিয়ে আসছে। রবারের ডলুনিতে যখনই কাগজ যাচ্ছে ছিঁড়ে, বা আঁক বাঁক পছন্দ হচ্ছে না, রাগত কিশোরের হাতের মুঠোয় তা পিণ্ডে পরিণত হচ্ছে। এরপর উড়ে গিয়ে বাইরের বাতাসে খানিকক্ষণ ভেসে থেকে হচ্ছে নরকগামী। কিছু সৌভাগ্যবান পিণ্ড বাইরে না পড়ে জানালার শিকে একবার মাথা ঠুকে মেঝেতে গড়াচ্ছে।
ওদিকে রান্নাঘরের মাটির কলস থেকে হাতের রুপালি জগটায় জল ভরবে বলে এগোচ্ছিল নিপুর নিভাদি। দরজাপথে ভাইকে অমন ক্রুদ্ধ, অঙ্কনশীল দেখে তার কৌতূহল হলো ভীষণ। জল ভরে খাবারঘরের চারপেয়ে টেবিলটার ঠিক মধ্যখানে রেখে, সদ্য রান্না হওয়া সজল সরস সবজির পাত্রগুলোর জ্যামিতিক সুসজ্জা আরো খানিকটা বাড়িয়ে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে নিভা এলো ভাইয়ের ঘরে। কপালে আর নাকের ডগায় বিন্দু বিন্দু ঘাম। আলোর কাছে এসে দাঁড়ানো ছাড়া ওই মুক্তোবিন্দু আলো ছড়ায় না।
চোখের সামনে যখন বড় বোনটি দণ্ডায়মানা, তখন নিপুর শিল্পকর্ম ঝটিতে চলে গেল আড়ালে। এখনই তা দেখার অধিকার কারো নেই। ভাইদের এমন লুকোনোর প্রচেষ্টা কোনো কালের কোনো দেশের বোনদের কাছেই আমল পায়নি। এখানেও তাই হতে চলেছিল। একপলক বাইরের বৃষ্টি দেখে শিল্পকর্ম উদ্ধারের উদ্যোগ করার ঠিক আগমুহূর্তে নিভার চোখের কোণে পড়ল এক লাল বিষপিঁপড়ার সারি। সারিটা জানালার একটা আধভেজা কোণ থেকে দেয়াল ধরে সুড়সুড়িয়ে এগোতে এগোতে নিপুর দেয়ালঘেঁষা বিছানার তোষকের আড়ালে কোথাও হারিয়ে গেছে।
কতক্ষণ ধরে পিঁপড়াগুলোর এক্সোডাস এমন নিরুপদ্রবভাবে চলছিল তা তো বলার উপায় নেই। তবে তার মতো এমন মানবের মহৎ ত্রাণকর্ত্রী চলে আসার পর তো আর এমনটা চলতে দেওয়া যায় না।
নিভাদি ছোট্ট নিপুকে ছেড়ে দিয়ে পিঁপড়ার ওই চলন্ত সারির কাছে মুখটা এগিয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ কেবল দেখে গেল তাদের। ততক্ষণে নিপুরো নজর কেড়েছে ওরা। নিভাদি গিয়ে ঘরের এক কোণে দাঁড়ানো পুরনো ধাতব শো-কেসের ওপর থেকে ধুলো ঝাড়ার বিবর্ণ কাপড়ের টুকরোটা হাতে নিলো। এরপর স্বভাবসিদ্ধা হালকা পায়ের চলায় জানালার কাছে এসে যেই সারিটাকে মিশিয়ে দিতে যাবে, কচি শ্যামল একটা হাত তার কব্জিটাকে খপ করে ধরে ফেলল। খানিক আগের ক্রুদ্ধ নিপুর চোখে এবার অনুনয়। পিঁপড়ার এই নির্দোষ সারিটিকে নিশ্চিহ্ন হতে সে দেবে না। প্রাণের গভীরে জমা প্রাকৃতিক সহানুভবের জারক রসে জারিত তার হৃদয়মন উদ্বাস্তু কীটগুলোকে রক্ষায় প্রয়োজনে শক্তিপ্রয়োগে প্রস্তুত হয়ে উঠলো। বলল, না! ওদের মারবে না তুমি!
কেন! আশ্চর্য নিভা। কামড়ালে তখন মজা টের পাবি।
কামড়াবে না ওরা!
কথা দিয়েছে তোকে? একশোবার কামড়াবে।
না!
নিপুর ওই না এর ভেতর নাবুঝের টিমটিমে একটা ক্ষোভ অনেকটুকু অনু ভব জড়ো করে এমনভাবে জ্বলছিল যেন ফুঁ দিলে তা নিভতে পারে বটে, কিন্তু তাতে ইলিয়ে ওঠা ধোঁয়ায় নিপুর কিশোর মনের সাজানো ঘরটার হাওয়া বহুক্ষণ ভারাক্রান্ত হয়ে থাকবে। সংকটের এমন মুহূর্তে ছোট ভাইটিকে এ নিয়ে বাড়তি ওটুকু ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে, কষ্ট দিতে বোনের মন সরলো না। ঘনায়মান একটা কালো সম্ভাবনার কথা না-বলে কয়ে মনে ঢুকে পড়ায় একটা মৃত্যুশীতল অস্বস্তিকর হাওয়া তাকে পেয়ে বসলো, মুহূর্তে। একইসঙ্গে ছোট ভাইটির জন্য করুণার্দ্র দরদে মনপাত্র পূর্ণ হয়ে উঠল। বলল, আচ্ছা পাগল, মারবো না।
বোনের ওপর যথেষ্ট অনাস্থাবান দেখা গেল নিপুকে। ছাড়ল না হাত। নিভা তখন কপট রাগের সঙ্গে কব্জিতে এঁটে বসা নরম সাঁড়াশিটা শক্তি প্রয়োগে খুলতে চাইলো।
বললাম তো মারব না!
এরপর কণ্ঠটিকে আরো শান্ত, আদুরে করে তুলে বলল, সত্যি বলছি ভাই। বিশ^াস কর?
এবার নিপু হাত ছাড়ল। বিদ্যুৎ এসে গেছে। চলতে শুরু করেছে পাখা। শরীরের পেছনে আড়াল করা নিপুর শিল্পকর্ম আসন্ন যুদ্ধের সম্ভাবনায় আগেই হয়েছিল হাতছাড়া। এবার পাখার বাতাস ভেসে উঠে যেন হাতে পায়ে হেঁটে একেবারে নিভার সামনে এসে এলিয়ে পড়ে থাকল। নিভা তুলে নিলো কাগজটা। একের ওপর এক চাপের পর এবার আর কিশোর মনটা মানলো না, প্রত্যক্ষ যুদ্ধেও সরলো না। কিন্তু ছুঁড়ল এমন এক অস্ত্র, পৃথিবীতে দুর্বলের ভাণ্ডারে জমা এরচেয়ে বড়, শক্তিশালী আর কার্যকর অস্ত্র একটিও নেই। তা হলো, কান্না। এমনই সেই বুকভাঙা কান্না যে আঁৎকে উঠে হাত থেকে কাগজ ফেলে ঝুঁকে ভাইকে জড়িয়ে ধরল নিভা।
দেখব না ভাই! দেখব না। ইশ্, আমার ভাইটার মন খুউব খারাপ হয়ে আছে, খুউব খারাপ। জানি তো! আমি দিদি কি আর জানি না? সব জানি, স-ব জানি!
দিদির বুকের ভেতর মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল নিপু। কান্নার একেকটা ঢেউ দমিয়ে দিতে গিয়ে ছোট শরীরটা দুলে দুলে উঠল থেকে থেকে। নিভা তখন আরো গাঢ় করে জড়িয়ে ধরল নিপুকে। পারে তো পাঁজরের ভেতর লুকিয়ে ফেলতে চায়। নিপুর ছোট করে ছাঁটা চুলের সুসজ্জাকে স্বীকৃতি দেওয়া কচি দুটো কান তখন আড়াল হওয়া মুখের প্রতিনিধিত্ব করছে।
চল, চল ভাই! বাবা বোধয় আসবে না। খেয়ে নিই আমরা, চল।
নিপু আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে সুবোধ কিশোরের মতো মাথাটা একবার হেলিয়ে বিছানা ঘষটে নেমে এলো মেঝেতে, সঙ্গে নেমে এলো বিছানার চাদর। মেঝেতে গড়াচ্ছে তখন হাতে আঁকা বৃষ্টিখেকো চাতক। আজকের এই অসহ্য বৃষ্টি সব সে একাই খেয়ে নেবে। এক ফোঁটাও আর এই ডুবন্ত শহরে পড়তে দেবে না। বৃষ্টিতে গোটা শহর সদ্য জেগে ওঠা চরের মতো কেবল খানিকটা দেখিয়ে জলডোবা হয়ে আছে। এ বর্ষায় যা হয়েছে বিগত দশ বছরে তা আর হয়নি, লিখেছে পত্রিকায়।
ছোট ছোট হাতে ভাতের নলা বানিয়ে মুখে পুরে নিপু বলল, বাবা আসবে না কেন?
আসবে না বলেছি নাকি! বলেছি, বোধয় আসবে না। মানে আসতেও পারে, নাও পারে।
আসতে নাও পারে কেন?
না-ও পারে বলেছি নাকি!
এই মাত্র বললে শুনলাম!
বলেছে! কপট রাগ নিভার। অবশ্যই আসবে। যদি তুই ঘুমাস, তাহলে।
নিপু আর কিছু না বলে বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। আরো এক নলা ভাত নিলো মুখে দৃষ্টিবদল না করেই। নিভা আরো এক চামচ বেগুনের ঝোলে ভিজিয়ে দিলো নিপুর ভাত। এবার সেদিকে তাকিয়ে নিপু নিশ্চুপ। আর ওদিকে নিজ ভাত কেবল মেখেই চলেছে নিভা, মুখে তোলার নাম নেই।
এমন সময় মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল নিপু, আর মা?
কথাটা প্রায় শোনাই যায় না, এমন। তাতে কী হয়েছে, নিভা ঠিকই শুনতে পেয়েছে। আর শুনেও নিজেকে চুপ করিয়ে রাখবে, সে কি এমন দিদি? মাথাটা একবার ওপরনিচ দুলিয়ে চেষ্টাকৃত স্পষ্ট স্বরে বলল, আরে মা তো অবশ্যই আসবে, জানিস না তুই? হুম, আসবে তো। মাকে একবারে আনবে বলেই তো বাবা আর আসছে না আজ। মানে, হয়ত, আসছে না আজ। একজন কাউকে সঙ্গে থাকতে হয় না! কেউ একজন তো সঙ্গে থাকে। নয়ত রাগ করে ডাক্তাররা। আর-
আরো কিছু যেন ছিল বলার; নিভার শেষ বাক্যের সুরটা হলো এমন। নিপু আগের মতোই শান্ত চোখে ভাতের নলা তুলল মুখে।
ধীরে ধীরে পাতের ভাত কমে এলো দুজনারই। রান্নাঘরের শ্যাওলাধরা স্যাঁতস্যাঁতে এক কোণে ছোট্ট চৌবাচ্চা, কিছু এঁটো বাসন-কোসন ওখানে জমা হয়ে আছে। এর ঠিক ওপরে এসে থেমেছে প্লাস্টিকের এক সবুজ ঢিলে কল। ঘোরানো ছাড়াই সরু নালে দিনভর জল ঝরছে। কল ঘুরিয়ে ঠাণ্ডা জলের ধারায় পালা করে হাত ধুলো ভাই বোন। এরপর আবার স্নানঘরে ঢুকে হাত মুখ পায়ে জল ঢেলে আলনা থেকে জায়গায়-জায়গায় রোঁয়াঝরা একটা সাদা তোয়ালে টেনে বের করে হাতমুখ আলতো চেপে চেপে মুছে নিলো। এরপর বাবা মায়ের ঘরের প্রায়ান্ধকার কোণে এসে জানালার কপাট খুলে দিয়ে বসলো হাঁটু গেড়ে।
ঠাকুরঘর নেই, এটা ঠাকুরকোণ। সামনে লাল জমিন আর সোনালী পাড়ের শাড়ি জড়ানো লক্ষ্মী আর স্বরস্বতীর ছোট্ট দুটো প্রতিমা রাখা। মধ্যখানে দেবাদিদেব শিবের একটা হাতে আঁকা রঙিন ছবি। তার সামনে ছোট পেতলের আগরবাতিদান। পাশের তাকের ওপর থেকে আগরবাতির প্যাকেট নামিয়ে দুটো বের করে আনলো নিভা। নিচের তাক থেকে দিয়াশলাইয়র বাকশো থেকে কাঠি বের করে ধরালো আগুন। এরপর আগরবাতি দুটো জ¦ালিয়ে বাতিদানের নকশি ঢাকনির ছিদ্রতে দিলো সাজিয়ে। দিয়াশলাইয়ের কাঠিটা এক ফুঁ-তে নিভিয়ে পাশেই রেখে দিলো। ততক্ষণে এঁকেবেঁকে উড়ে সুগন্ধ ছড়াতে লেগেছে আগরবাতির ধোঁয়া। দুচোখ বন্ধ করে হাত জোড়া বুকের কাছে এনে জড়ো করলো নিভা। বোনের দেখাদেখি ভাইও করলো তা-ই। এরপর শুরু হলো বিড়বিড়িয়ে ত্রোস্ত পাঠ। মন্দ্রগম্ভীর স্বরে চলল দেবতা আর দেবীর বন্দনা। বন্দনা শেষে নিভা আরোগ্য কামনা করলো মায়ের; ভাষায়। আর ওদিকে ভাষাহীন সমর্পণে চুপটি করে বসে থেকে নিপু কেবলই ভাবলো আকাশপাতাল। মাকে ছাড়া বুকটা তার ভীষণ ফাঁকা ঠেকছিল থেকে থেকে। কিন্তু প্রার্থনায় বসলে দিদির মতো নিবিষ্ট মনে কেবল মায়ের জন্যেই প্রার্থনা করতে পারে না নিপু। তার অল্পে তুষ্ট কিন্তু সদা বিচরণশীল মন কত কিছুই যে চায় ঘুরে ফিরে! আর শেষতক কোনটা যে তার সবচেয়ে বেশি দরকারি, তাই ঠিক বুঝতে না-পেরে অস্থির হয়ে পড়ে আরো। তখন ভরসার আশায় নিভার দিকে তাকিয়ে দেখে, নিভার বন্ধ চোখ দুটি ভেজা। দেখে তারো কান্না কান্না পায়। বড় বড় চোখ দুটো ফিরিয়ে নিয়ে আবার দেবাদিদেবের ওপর স্থির করে নিপু। পেছনে দেবতাত্মা অপূর্ব হিমালয়! যে কান্নাটা গলা অব্দি এসে চোখের পাতায় উত্তাপ ছড়াতে চেয়েছিল, ততক্ষণে আবার তা পেটের থলেতে উপুড়। এভাবেই একসময় প্রার্থনা শেষ হয়।
নিভে যাওয়া দিয়াশলাইয়ের কাঠিটা জানালাপথে বাইরে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো নিভা। রুপালি কালো দুপুরের আলো ভিজিয়ে দিয়ে বৃষ্টি তখনো ঝরছেই। বোনের দিকে না তাকিয়ে কেবল আড়চোখে লক্ষ্য রেখে একইসঙ্গে উঠে দাঁড়ালো নিপু। শিব আর তার মেয়ে দুটির সামনে তখনো নৃত্যরতা আগরবাতির ধোঁয়া।
বিছানায় শুয়ে ঠাণ্ডা হয়ে আসা কোলবালিশটা আঁকড়ে ধরে নিপু আরামে চোখ দুটো বুজতেই হঠাৎ ঘাড়ের কাছে কামড়। সর্বনাশ! সেই বিষ পিঁপড়া! নিপু সাবধানে ঘাড়ের কাছে আঙুল বোলালো, অবুঝ কীটটা আবার টুকরো না হয়ে যায়। পিঁপড়াটাকে অবশেষে খুঁজে পেল নিপুর সাবধানী আঙুল। আঙুলের ডগা দিয়ে মৃদু ঠেলে ত্বকের ওপর থেকে তার দাঁত সরাতে বলল যেন। পিঁপড়াটা শুনলো তার কথা। দাঁত সরিয়ে নিলো। তখন তর্জনি আর বুড়ো আঙুলের ডগায় ধরে, পাশ ফিরে জানালামুখী হয়ে দেয়ালঘেঁষা ভেজা তোষকের শেষপ্রান্তে কীটটাকে ছেড়ে দিলো নিপু। ওই অবস্থাতেই ঘাড় ফিরিয়ে দরজার দিকে দেখ নিলো একবার, দিদি লুকিয়ে সব দেখে নিচ্ছে কিনা। না, কেউ তাকিয়ে নেই। ঘাড় ফিরিয়ে আবার আগের দৃষ্টিবিন্দুতে তাকালো নিপু। পিঁপড়াটাকে যেখানে ছেড়েছিল, কিছু নেই আর সেখানটায়।
সন্ধ্যায় ঘুম ভাঙল নিপুর। পাশ ফিরে চোখ মেলে দেখে, ঘরের এক কোণে বেতের আরাম কেদারায় বসে পা দোলাচ্ছে ছোটকাকা। গোঁফে চশমায় প্রথমে বাবা বলে ভ্রম হয়। পরে স্বাস্থ্যের কৃশ রূপ দেখে ভ্রমটা কাটে। নিপুর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লো ছোটকাকা, একবার। হাতটা তেমনি তোলা থাকল কিছুক্ষণ। অপর দিক থেকে কোনো সাড়া না-পেয়ে অবশেষে নামিয়ে নিলো। এসময় ঘরে এসে ঢুকলো নিভা। চোখজোড়া ভীষণ লাল হয়ে আছে। কেঁদেছে বুঝি খুব? কাছে এসে নিপুর গালে একবার ঠোঁট ছুঁইয়ে বলল, এখনই তোকে জাগাতাম নিপু। স্নানঘরে যা ভাই! হাতমুখ ধুয়ে আয়। আমাদের বেরোতে হবে।
নিপুর ঘুমঘুম ভাবটা আবার ফিরে আসছিল। বেরোতে হবে শুনে কান হলো খাড়া। জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করল, কোথায়? গলায় আলস্যের টান। তার এই কোথায় এর উত্তর নিভা দিলো না। আবার বলল, যা-না ভাই। হাতমুখ ধুয়ে আয়। দেখিস না, কাকা অপেক্ষা করছে? আর নিচে গাড়ি দাঁড়িয়ে। যা?
নিভার কণ্ঠ কান্নাভারি, খানিকটা জড়ানো, একটা আরোপিত খুশির ঢঙে ভঙ্গুর। সব মিলিয়ে এমন যে, লুকিয়ে রাখা বিপন্নতাটুকু কিশোর মনের আয়নাতেও দিব্যি ধরা পড়ল। দিদিকে তাই আর কোনো প্রশ্ন করতে বাধলো নিপুর। সবসময়ের মতো নিজের সঙ্গে বিছানাটাকেও নামিয়ে মেঝেতে পা রাখলো নিপু। ছোট ছোট পা ফেলে গেল স্নানঘরে। খানিক বাদেই পাওয়া পর হুস হাস জলপতনের শব্দ। এরপর ভেজা হাত পা মুখ নিয়ে বেরিয়ে এলো। স্নানঘরের সামনেই বিছিয়ে রাখা অর্ধচাঁদের আকারের পাপোশে পা রেখে একটা হাল ছেড়ে দেওয়ার ভঙ্গি করল হাত পা নাচিয়ে। উফ্ কেন যে মনে থাকে না!
কী ব্যাপার? বলল ছোটকাকা।
এখানে পা মুছতে মানা। তাকিয়ে নিপুর জবাব।
কেন রে? পা মুছতে মানা- মানেটা কী? কী বিষয়?
তুমি তো জানো না। ভূতের পাপোশ এটা!
ভূতের পাপোশ! সর্বনাশ! কী করে বুঝলি? কাকার ভয়ার্ত প্রশ্ন।
বাইরে নিয়ে একবার ঝেড়ে এনে রাখো, দেখবে একটু পরেই আবার, আবার ভরে গেছে বালিতে। ভূতের না তো কী। কোন জামাটা পরবো? শেষ প্রশ্নটা নিভার দিকে তাকিয়ে।
নিভা হাতের আধভেজা তোয়ালেটা নিপুর কাঁধের ওপর রেখে আবার গিয়ে দাঁড়াল কাঠের আলনাটার কাছে। নিপু তোয়ালে চেপে হাত মুখ মুছে নিতে নিতে নিভা মায়ের শাড়ির সারির পাশ থেকে ভাইয়ের প্রিয় সুতির নীল ফতুয়াটা সভাঁজ বের করে সশব্দে একবার ঝাড়ল। আলনার নিচের দিকে, যেখানে বাবার পাজামা, লুঙি এসব থাকে, সেখান থেকে সাদা একটা পাজামা বের করে ঝাড়া হলো সেটিও। এসময় শান্ত স্বরে স্বগোতোক্তির মতো বলল দিদি, বৃষ্টির দিন, সব কিছুতেই পিঁপড়া। পরার আগে এভাবে ঝেড়ে নিবি। এরপর কণ্ঠে আরোপিত হলো সুর। সবসময়। স-বসময়। আর ঝাড়বি জুতো। উল্টো করে ঝাড়বি পরার আগে। কেমন তো নিপু?
পোশাকগুলো বিছানায় রেখে কাছে টেনে নিলো নিরুত্তর ভাইকে। শরীরে তোয়ালে পেঁচিয়ে রেখে কৌশলে পরিয়ে দিলো ফতুয়া পাজামা দুটোই। তোয়ালেটা নিভা ছাড়ানোর সময় আড়চোখে বারবার ছোটকাকাকে দেখছিল নিপু। ঘোর সন্দেহ তার, বই পড়ার ভান ধরে ছোটকাকা আসলে তার দিকেই তাকিয়ে আছে আড়চোখে। ভাগ্যিস, তোয়ালে তার সম্মান বজায় রেখেই খুলে এসেছে। দিদির হাতেই অভয়। নিজ হাতে ভয়।
দিদি গাল টিপে ধরে চুলটাও আঁচড়ে দিলে এরপর মুক্তি পেল নিপু। এরপর, নিজ চুল আঁচড়াতে থাকল বিছানার কাছে দাঁড়িয়ে। জানালার দিকে মুখ। চৌকাঠ ছাড়িয়ে আরো অনেক দূরে তার দৃষ্টি।
মেঝেতে গড়াচ্ছে বৃষ্টিখেকো চাতকের ছবিটা। তুলে ভাঁজ করে পকেটে ঢোকালো নিপু। মা-কে দেখাবে।
নিচতলার সিঁড়ির শেষ কটা ধাপ এক লাফে নেমে দরজার বাইরে তাকিয়ে নিপুর মুখ ঝলমলিয়ে উঠল। গুটিসুটি মেরে বসে থাকা কোনো বড় বড়সড় খরগোশের মতো একটা বেবি ট্যাক্সি রাস্তায় দাঁড়িয়ে। রংটা আবার বাঘের মতো হলুদ কালোয় মেশানো, যদিও ডোরাকাটা নয়। চালকের আসনে বসা লোকটা ঝাড়ুর শলা ভেঙে চিবোচ্ছিল। নিপুকে দেখে তার মুখের ভেতর শলাকাটার ওঠানামা থেমে গেল। ওদিক সিঁড়িতে জুতোর শব্দ তুলে ধীরে ধীরে নিপুর পেছন পেছন নেমে এলো নিভা আর সুবীর কাকা। তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে চোখে উচ্ছ্বাস আর প্রশ্ন নিয়ে পেছনে তাকালো নিপু। দেখতে পেল, ওদের দুজনার মুখই অন্ধকার হয়ে আছে। কী ব্যাপার? খানিকটা দমে গেলেও প্রশ্নটা না-করে পারলো না। আমরা কি এই বেবি ট্যাক্সিতে যাবো?
হ্যাঁ নিপু। এই বেবিতে যাবো আমরা। বললো সুবীর।
বেবি ট্যাক্সির ভেতর একপাশে দিদি আর আরেক পাশে ছোটকাকাকে রেখে মধ্যখানে আয়েশ করে বসলো নিপু। একবার ভাবলো পায়ের ওপর পা তুলে দেয়। দিলোও। কিন্তু ট্যাক্সিটা চলতে শুরু করতেই ঝাঁকুনির উপর্যুপরি চোটে আর ওই আসন আর বজায় রাখতে পারলো না। নামিয়ে নিয়ে দিদির দিকে তাকালো। শুকনো হাসলো দিদি। আর সঙ্গে সঙ্গে হাসির মতো ভঙ্গি করে মাথা নিচু করে চোখ ঢাকলো হাতে। আসলে সে কাঁদছে। ওটা হাসি নয়, বুঝলো নিপু। কান্নার আগে মুখটা বিকৃত হয়ে উঠেছিল। কান্নার মেঘচাপা শব্দটা বৃষ্টি আর রাস্তার শত কর্কশ শব্দের আড়ালে গেল হারিয়ে। খুব দ্রুতই আবার সামলে উঠল নিভা। চোখ মুখে সোজা হয়ে বসে আবার তাকাল নিপুর দিকে। বাক্সময় চোখে তাকিয়ে আছে নবীন কিশোর।
কোথায় যাচ্ছি আমরা? এখনো কিন্তু বলোনি। অনুযোগ নিপুর কণ্ঠে।
ওহহো, তাই তো ভাই! জিভ কেটে হাসলো নিভা। এই হাসিটুকুই নিপু চাইছিল। কিন্তু কিভাবে নিয়ে আসা যায় তা কোনোমতেই বের করতে পারছিল না। নিভা বাইরের দিকে তাকিয়ে আরো একবার চোখের কোণ মুছে বলল, আমরা হাসপাতালে যাচ্ছি নিপু! হাসপাতালে যাচ্ছি আমরা।
মাকে আনতে? নিপুর প্রশ্ন।
হ্যাঁ ভাইয়া! মাকে আনতে যাচ্ছি আমরা। শেষদিকে নিভার কণ্ঠ আবারো বিকৃত হয়ে উঠল। বিস্মিত নিপুর মাথার ওপর দিয়ে সুবীর ওই কাঁধে রাখল হাত। কাঁদিস না নিভা, কাঁদিস না। অন্তত-; এরপর হঠাৎ কথার ধারা বদলে ফেলে পাশ থেকে জড়িয়ে ধরলো নিপুকে। কিরে নিপু? এই দেখ্, এই আমার দিকে তাকা। ওই, শুনতে পাচ্ছিস? ট্যাক্সির ছাদের ওপর কেমন শব্দ করে বৃষ্টির জল পড়ছে? শুনতে পেলি? মনে হচ্ছে না ছোট ছোট অনেকগুলো বাঁদর? আর হাতে অনেকগুলো ঢাকের কাঠি? শুনছিস?
ট্যাক্সির ছাদের ওপর বৃষ্টির বিন্দুছেদি শব্দ অবিরল উৎপন্ন হচ্ছে। ট্যাক্সির স্বচ্ছ কাচের ওপর অবিরাম নড়ছে জল সরানোর ওয়াইপার লাঠি দুটো। চালকের মাথার পেছনের চুলগুলো শামুকখোলের মাথার মতো চক্রাকার। তার কপালের কাছে ঝুলছে একটা আয়তাকার কাচ। তাতে ট্যাক্সির ছাদের বিম্ব। ছাদে পেটানো লোহার বেড়া আর প্লাস্টিকের আবরণের মধ্যকার ফাঁকে একটা গোটানো সংবাদপত্র আটকে রাখা। আয়তাকার কাচে তার ছবি ফুটে উঠেছে। বড় বড় লাল অক্ষরের শিরোনাম, দালাল লেখা একটুখানি অংশ কেবল দেখা যায়।
বৃষ্টির ছাঁট এসে দুপাশ থেকে নিভা আর সুবীর দুজনকেই ভিজিয়ে দিচ্ছে। নিপু দুজনের শরীরের উষ্ণতায় আছে বেশ। ছোটকাকা নিভাদিকে বলল, ফিতে খুলে প্লাস্টিক নামিয়ে দে নিভা। নয়ত ঠাণ্ডা লাগবে। একদম ভিজে যাচ্ছি। বলেই আর অপেক্ষা নয়। নিজ অংশের বৃষ্টিরোধক প্লাস্টিকের ফিতে খুলতে লেগে গেল। নিপু তাকিয়ে দেখছিল। মনে হলো, এরচেয়ে কঠিন কাজ আর নেই। ফিরে নিপুর দিকেও একবার তাকালো গিঁট খুলতে ব্যর্থ সুবীর। নিপুর ভর্ৎসনামাখা দৃষ্টি দেখে বলল, হয়েছে কি, গতকাল রাতেই নখ কাটলাম। নখ অবশ্য রাতে কাটতে হয় না, তাও কাটলাম। সময় পাই না তো! যেটা হয়েছে, হ্যাঁ-
চেষ্টা তখনো অবিরত;
নখটা বেশি কাটা পড়ে যাওয়ায় গিঁট খুলতে ব্যথা পাচ্ছি আঙুলে, বুঝলে কাক্কু? এটাই হয়েছে সমস্যা। নইলে- ঠিক এই সময়ে গিঁট খুলে গেল। আবরণ নেমে পড়তেই এবার আরেকবার গিঁট বাঁধার ঝক্কি। দ্বিতীয়টা ছোটকা ভালোই সামলালো। অপরদিকে দিদির কাপড়জামার একপাশ ভিজে সেঁটে আছে। সেদিকে ওর নজর নেই। একদৃষ্টি তাকিয়ে আছে সামনে। ছোটকাকার ডাকে কোনো সাড়া সে তখনো দেয়নি। ছোটকা নিপুর কোলের ওপর দিয়ে ঝুঁকে নিভার মাথার কাছে প্লাস্টিকের গিঁট খুলতে শুরু করলো। তখনো খুব শান্তভাবে যেন মাটিতে অবতরণ করলো নিভাদি। একবার ছোটকার দিকে, আরেকবার তার চঞ্চল হাতের দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলো কী ঘটছে। এরপর নিজেই হাত লাগালো। তখন সোজা হলো ছোটকা। এর নিপুও নিঃশ্বাস ফেলতে পারলো।
ফিতে লাগানোর পর বাতাস ঢুকে পালের মতো ফুলে উঠতে থাকলো ওই বৃষ্টিরোধক। দণ্ডে বাঁধা পাশফিতায় পড়ছিল টান। নিপু ভাবছিল ফিতেগুলো একবার খুলে যেতে পারলে কিন্তু বেশ হয়।
বেবি ট্যাক্সিটা দেখতে দেখতে বিরাট এক ফটকের সামনে এসে থামল। নিপু বুঝতে পারলো না, আগে থেকেই কী করে খবর পেয়ে তাদের অপেক্ষায় দিব্যি দাঁড়িয়ে আছে বাবা? বাবার চোখ মুখ আগের চেয়ে অনেক বেশি ফোলা ফোলা লাগছে। চুলও এলোমেলো। পরনের হলদে শার্টটার হাতা বরাবরের মতোই গুটিয়ে কনুইয়ের ওপর তোলা। নিচের সাদা পায়জামাও সভাঁজ গোড়ালির ওপর; অবশ্য, এটা বরাবরের মতো নয়। চামড়ার কালো স্যান্ডেল জোড়া বৃষ্টিতে ভিজে নতুনের মতো চকচকে দেখাচ্ছে। পা জোড়া অল্প ফাঁক করে পায়ের পাতা দুটো গাছের দ্বিখ-িত শাখার মতো কোণে রাখা। ট্যাক্সিটা এসে যখন থামলো, চালকের সামনের ওই অর্ধস্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে এর ভেতরটা একবার দেখতে চাইলো বাবা। ছোট কাকা যেদিকে বসেছিল, সেদিকটা পড়েছিল বাবার দিকে। একপাশের প্লাস্টিকের পর্দাটা সরাতেই বাবা ঝটিতে তাকে একবার দেখলো শুধু। পরমুহূর্তে ট্যাক্সির অপর পাশে তার দৃষ্টি চলে গেল। ওপাশ দিয়ে নিভা নেমে এসেছে। জলকাদা মাড়িয়ে ওরা দুজন ছুটে গেল দুজনের দিকে। জড়িয়ে ধরার আগমুহূর্তে একবার পরস্পরকে দেখে নিলো ওরা।
নিভাদি ছোট্টবেলার মতো বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাবার। আর বাবাও সবটুকু মমতায় গাঢ় আলিঙ্গনে বাঁধলো মেয়েকে। পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে থাকল ছোটকাকা। নিভা একসময় বাবার বুক থেকে মুখ তুললে, তাকে এক হাতে ধরে রেখে অপর হাতে সুবীরকে কাছে টেনে জিজ্ঞেস করল বাবা, নিপুকে আনিসনি? কার কাছে ও?
সুবীর যেন একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। ঠিক ওই মুহূর্তে কেটে গেল ঘোর। বলল, নিপু এসেছে তো! ওই তো, ওই- বলে ট্যাক্সির সবুজ পর্দাটা উঁচিয়ে ভেতরটা দেখালো বাবাকে। ওই তো ও। কিরে নিপু? ভেতরে বসে থাকবি? নামবি না?
এতোটাক্ষণ কেউ এসে কেন তাকে ডাকছে না, এই অভিমানে নড়েনি নিপু। এবার তার ওই অভিমান চড়ে উঠল আরো। ছোটকাকার মুখের দিকে একবার মাত্র তাকিয়ে অভিমানী চোখজোড়া সামনে ফেরালো আবার। ছোটকাকা মাথা বের করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বাবাকে কিছু একটা বলে থাকবে। নিভার কপালে চুমু খেয়ে এরপর বাবাই এগিয়ে এলো ট্যাক্সির কাছে। পর্দাটা সরিয়ে দেখতে পেল, তার দিকে নিপুর ভ্রুক্ষেপ নেই বটে, কিন্তু মনটা যে পড়ে আছে তা স্পষ্ট। বাবা ট্যাক্সির ভেতর খানিকটা ঢুকে যেই ধরতে হাত বাড়ালো, নিপু গেল সরে। সরে গেল, কিন্তু দৃষ্টিপথটা বদলালো না। বেরিয়ে এসে নিভার দিকে তাকিয়ে উদ্বগ্ন চোখে বাবা বলল, নিপুকে বলেছিস কিছু? মায়ের কথা?
না বাবা। নিভার সংক্ষিপ্ত উত্তর।
নিচের ঠোঁট কামড়ে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ভাবলো বাবা। এরপর আবার পর্দাটা সরিয়ে মুখটা ভেতরে নিয়ে ডাকলো ছেলেকে। নিপু? রাগ করেছো বাবা? রাগ করে না। এসো, আমার কাছে এসো। তোমাকে কত আদর করি না আমি? এসো। মায়ের কাছে যাবে না নিপু?
এতোসব কথা শুনেও নিপু নড়ল না। তবে ভিজলো কিছুটা। এরপর আবার তার দিকে হাত বাড়াতে আর সরে গেল না। ধরা দিলো। বাবা নিপুকে কোলে তুলে বুকে চেপে এগিয়ে চলল বড় ফটকের দিকে। ফটকটা পেরিয়ে ভেজা প্রশস্ত হাঁটাপথ ধরে সোজা চলল। সামনে হাসপাতালের মূল ভবন। বিশাল ভবনটার কেচিমুখো দরজার সামনে এসে দাঁড়াল কিছুক্ষণ। পেছন থেকে ওরা এসে তার পাশে দাঁড়ানোর পর ভেতরে বাড়ালো পা। পুলিশি পোশাক পরিহিত ক্ষুব্ধ চেহারার কিছু মানুষ ওখানে পাহারায় ছিল। এগিয়ে এসে বাবার মুখটা দেখতে পেয়ে ওরা সরে গেল। একজন মাথাটা নাড়ল ওপরনিচ। এটুকুতেই বাবাকে নিয়ে নিপুর গর্ব হলো খুব।
হাসপাতালের নিচতলায় অসংখ্য শুয়ে বসে থাকা মানুষ। আর তাদের ভেতর দিয়ে পথ করে আসা যাওয়া করতে থাকা আরো সব মানুষের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির দিকে এগোল ওরা। নিপু ঘাড় ঘুরিয়ে মেঝের মানুষগুলো দেখে নিলো, ওটুকু সময়ে যতোটা দেখা চলে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে বা মেঝেতে পিঠ এলিয়ে শুয়ে থাকা মানুষগুলোর চোখগুলো ভীষণ প্রাণহীন, ভেজা, অস্বচ্ছ। সারা দেহে রাজ্যের সমস্ত মানুষের ক্লান্তি এসে বুঝি ওদের শরীরে ভর করেছে। হাত পা নাড়ছে ওরা এতোই ধীরে, যেন হাওয়ায় ব্যথা দিচ্ছে ওদের এবং ওরা তা সইতে প্রস্তুত নয়। প্রতি মুহূর্তে ওদের কাছে এসে এসে থামছে বুকখোলা সাদা ঢোলা এপ্রন পরা সুন্দর সব ছেলে আর মেয়ে। কারো ঘাড়ে ঝোলানো স্টেথস্কোপ, কারো বা এপ্রনের পকেটে। ওরা এসে থামলে শুয়ে বসা লোকগুলোর কেউ কেউ সম্ভ্রমে উঠে বসার চেষ্টা করছিল। তখন ওই তরুণ তরুণীরা আবার ধরে শুইয়ে দিচ্ছিল তাদের। কারো চোখে ফুটে উঠছিল গাঢ় কৃতজ্ঞতা। কারো কারো চোখে অস্বস্তি, উপেক্ষা। শুয়ে বসে আর চলাচল করতে থাকা মানুষ ছাড়াও আরো এক ধরনের মানুষের বিচ্ছিন্ন সব সারি ওখানে। ওই একেকটা সারি মেনে ওরা এগোচ্ছে একেকটা আলো ঝলমলে ঘরের দিকে। ওসব ঘরে রোগীদের ওপর নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানোর টাকা জমা নেওয়া হচ্ছিল। আর ওই সমস্ত পরীক্ষার ফল ইতোমধ্যে পাওয়া হয়ে গিয়ে থাকলে বিরাট এক খামে করে তা তুলে দেওয়া হচ্ছিল রোগীর স্বজনদের হাতে। বিরাট ঘরটায় সবাই সবার সঙ্গে কথা বলছিল। কারো কথা আলাদা করে বোঝার কোনো উপায় ছিল না। সবার স্বর একত্রিত হয়ে একটামাত্র মন্দ্রধ্বনি গোটা ঘরে অনুরণিত হচ্ছিল কেবল।
এসব দেখতে দেখতে, শুনতে শুনতে, বাবার কোলে তরঙ্গিত হতে হতে নিপু পৌঁছে গেল সিঁড়ির কাছে। ভেবেছিল এই জায়গায় এসে বাবা তাকে কোল থেকে নামিয়ে দেবে। মনে মনে এটাও দেখে ফেলেছিল নিপু- এক সিঁড়ি টপকে পরের সিঁড়িতে সে পা রাখছে, বাবা আর ছোটকাকার মতো। ওরা যা পারে, তা কি আর সে পারে না! শুধু করার দেরি। দেখা স্বপ্নে পড়ল ভঙ্গ। বাবা তাকে না নামিয়ে সিঁড়ি ভেঙে অবলীলায় ওপরে উঠতে শুরু করল। আর এই দৃশ্যটা নিপুর চোখে গাঁথা হয়ে থাকল। পেছন পেছন আসতে থাকল ছোটকাকা আর নিভাদি।
ছোট্ট একটা মোড় নিয়ে দ্বিতীয় দফার সিঁড়ি ভেঙে উঠে আসার পথে নিপু আরো অনেক আত্মীয় স্বজনকে দেখতে পেল। বাবাকে ফের দেখতে পেয়ে কেঁপে কেঁপে উঠে দাঁড়িয়ে সবল আহাজারিতে বাতাস অচল করে তুলল ওরা। ওদের সিঁড়ি ভাঙা শেষ হলে, দূরের নিবিঢ় পরিচর্যা ঘরের কেচিমুখো দরজার সামনে থেকে ছুটে এলো বড় মাসি। তার চোখ দুটো ভীষণ রকম ফোলা। নাকের ডগা লাল হয়ে আছে। বাবার কোল থেকে মাসি একরকম ছিনিয়ে নিলো নিপুকে। নিঃশব্দ কান্নার ঢল কোন বাঁধে এতোটাক্ষণ জমে ছিল কে বলবে। নিপুকে বুকে নিয়ে ওই বাঁধ তার ভেঙে গেল। মাসি পিসিদের ভেতর চলতে থাকলো কোলবদল। নিভাকেও একে একে সবাই জড়িয়ে ধরছে, আউড়ে চলেছে যতো স্মৃতিবাক্য।
এতো কিছুর ভেতর নিবিঢ় পরিচর্যা ঘরের কেচিমুখো দরজার কাছে দাঁড়ানো নিরাপত্তারক্ষী লোকটি কাঁচু মাচু মুখে একটা কিছু বলতে ভিড়ের দিকে এগিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছিল আবার। যেন বাধা পাচ্ছিল অদৃশ্য কোনো দেয়ালে। মাথাটা তার ঠুকে যাচ্ছিল বারবার। অবশেষে একটা কোনো ভরসা পাওয়ার মতো মুখ খুঁজতে লেগে গেল তার চোখ এবং পেয়ে গেল বাবা আর ছোটকাকাকে। বাবা তখন একটা থামের সঙ্গে মাথা ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে। নিরাপত্তারক্ষীর দিকে তাই ছোটকাই এগিয়ে গেল।
লোকটা বলল, আসলে স্যার, কী বলবো, নিজেরও তো খারাপ লাগে। মানে, এটা তো আইসিইউ, বুঝতেই পারেন। ভেতরে জটিল সব রোগী আছে। কাঁদলে তাদের কষ্ট বাড়ে। বাড়ে না বলেন? এখন, কী করবো বুঝতে পারছি না। একজন মারা গেছে, শোক তো হবেই। স্বজনরা শোক তো করবেই, করবে না! সরে যেতে কিভাবে বলি। কিন্তু আবার না বলেও যে পারছি না স্যার। আমার অবস্থাটা একবার ভাবেন?
সুবীর হাত তুলে বলল, চিন্তা করবেন না। সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি ওদের। আপনি আপনার দায়িত্ব করছেন।
লোকটা হাতজোড় করে বলল, অনেক ধন্যবাদ স্যার। মনে কষ্ট নেবেন না স্যার। আমি নিরুপায়। কিন্তু চাকরি করি, কী করবো বলেন। ভেতরে রোগীরা সারাক্ষণ ভয় পায়। সবারই তো আপনজন আছে। আমিও তো মরবো স্যার একদিন। মরবো না?
দিদির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে নিপু দেখল, ছোটকাকা ওই পুলিশ রকমের লোকটার কাঁধে হাত রেখে আরো কী যেন বলল। এরপর ঘুরে দাঁড়িয়ে মাসি পিসিদের ভিড়ে এসে মাথা নুইয়ে দুহাত পাখির ডানার মতো মেলে ধরে সবাইকে খানিকটা দূরে সরে যেতে ইশারা করল। অনেকেই তার সংকেতটা বুঝতে পারলো না। তখন বলল, এটা আইসিইউ তো, ভেতরে আরো অনেক রোগী। চলো, আমরা একটু দূরে যাই। আরো একটু দূরে। চলো চলো!
উপস্থিত অন্যান্য রোগীর আত্মীয় স্বজনেরা ছোটকাকার দিকে খুব আগ্রহ আর প্রশান্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকল। কেউ কেউ তার কাছাকাছি এসে মুখটা দেখে গেল একবার। ছোট কাকাও কেমন চিবুক উঁচিয়ে চললো। কারো দিকে একবার ফিরেও তাকালো না। কিন্তু চোখের কোণ দিয়ে ঠিকই লক্ষ করে গেল সবাইকে। কান্নার রোল নিবিঢ় পরিচর্যা কেন্দ্র থেকে এভাবে সরে গেল খানিকটা। কিন্তু তার তীব্রতা কমে আসার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। সবার বিলাপের ভাষায় নিপু অনেক আগেই বুঝে গেছে, মা বড়ঘুম ঘুমিয়েছে। বাহ্যত কোনো ভাবান্তরই যেন হলো না তার। সবলবাহু এক পিসির কোলে থাকতে থাকতে ঘেমে নেয়ে গিয়েছিল নিপু। নামতে পেরে তাবৎ কোল থেকে বাঁচতে একদৌড়ে একটা মোটা থামের আড়ালে লুকিয়ে গুপ্তচরের চোখে খুঁজে বের করতে চাইলো নিভাকে। এসময় একটা হাত তার ফতুয়ার পকেটে, ছবিটার ওপর চলে গেলো। ওটা আছে তো?
নিপু দেখল, বাবা একজন বয়েসী ডাক্তারের সঙ্গে শান্ত মুখ করে খুব আলাপ করছে। থেকে থেকে মুখটা ছাদের দিকে তুলে ভাবছে কী সব। পরমুহূর্তে নিচের দিকে তাকিয়ে কী সবের যেন ফিরিস্তি দিচ্ছে। ডাক্তারের চোখে চশমা, তাতে ছাদের টিউববাতির ঝিলিক। পায়ে তার কালো চকচকে জুতো। ওই জুতোর পাশে বাবার জল শুকোনো মলিন স্যান্ডেলজোড়া কেমন অসহায়।
মাকে দেখতে এসে নিপুর রাত গভীরে হাসপাতালের করিডোরের টানা বেঞ্চিতে বসে দিদির কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ার উপক্রম। ঘুমটা জমাট হওয়ার আগে শুনতে পেল, গভীর রাত, তাও আবার ঝড়ঝঞ্ঝার; অ্যাম্বুলেন্স অনেক ভাড়া হাঁকছে। অতো ভাড়া দেওয়ার সামর্থ এ মুহূর্তে বাবার যেমন নেই, তেমন নেই আর কারো। চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটাতে বরং ধার করতে হয়েছে প্রচুর। সুতরাং নিরুপায় সিদ্ধান্ত, রাতটা মা-কে হাসপাতালেই রাখা হবে। তবে এর জন্যে কার যেন হাত পা ধরার ব্যাপার আছে। কে যেন কার হাতে পায়ে ধরলোও। তবে নিছক হাত পা ধরে হয়নি কাজটা। হাতের ভেতর বড় মেসোর অনেক কাগজ গুঁজে দিতে হয়েছে বলে প্রকাশ। তো যাক, রাতের জন্য মৃতের তীর্থতুল্য শীতলঘরে মায়ের থাকার একটা ব্যবস্থা তো হলো!
এসব শুনতে শুনতে নিপু স্বপ্ন দেখতে থাকল, বাবা ওই চকচকে জুতোর লোকটার হাতজোড়া ধরে অনেক অনুনয় বিনয় করছে। লোকটা ঘন ঘন মাথা নাড়ছে দুপাশে, যেন কিছু একটায় একমত নয়। বাবা ঝুঁকে লোকটার পা জোড়া জড়িয়ে ধরতে চাইলে লোকটা চট করে সরে গেল কিছুদূর। এরপর মাটি থেকে এক হাত উঁচুতে উঠে উড়তে থাকল, যেন তার ডানা আছে। এরপর শত শত লোকের ভিড়ে মিশে গেল ডাক্তার, বাবা, সবাই। জমাট সেই ভিড়ের ভেতর মানুষকে ঠেলে জায়গা করে নিয়ে এগিয়ে চলল এপ্রন পরা তরুণ তরুণীরা, কী সুন্দর তারা দেখতে একেকজন। একসময় ঘুরতে ঘুরতে একে অপরকে হারিয়ে ফেলল তারাও। চারদিকে দেখা গেল মানুষের অগনিত পা, আর ওপরে তাকালেই অজস্র নাকের ফুটো। সেইসব ফুটো দিয়ে বেরিয়ে আছে বড় বড় লোম। হঠাৎ দেখল, একটা সবুজ খোলা মাঠে বাবার পেছন পেছন দৌড়ুচ্ছে নিপু। আর মাটি থেকে এক হাত ওপরে তাদের সঙ্গে সঙ্গে উড়ে চলেছে চকচকে জুতোর ডাক্তার।
বাবা দৌড়ুতে দৌড়ুতে চিৎকার করে উঠছে লোকটার দিকে তাকিয়ে, শুনুন! শুনুন! আমার কাছে অনেক টাকা আছে। অনেক টাকা। এই যে! এই যে ভাই!
বাবার কণ্ঠটা যেন বহুদূর থেকে আসতে আসতে প্রতিধ্বনিত হতে হতে একসময় পথটা ভুলে হারিয়ে গেল। এরপর কোথায় যে আরো কী কী হতে থাকলো কিছুরই কোনো আগপাশতলা থাকল না। একসময় আপনা থেকেই নিপুর চোখজোড়া গেল খুলে। দেখল, চারপাশ আলো করে দিদির কোলের ওপর সকাল হয়ে আছে। তখনো তিন দিকে ছড়িয়ে যার যার মতো ঘুমোচ্ছে সবাই। দিদির চোখজোড়া কেবল খোলা, রক্তাভ। আশপাশে কোথাও বাবা বা ছোটকাকে দেখা গেল না।
খানিক বাদে, পাউরুটি কামড়ে ছিঁড়ে মুখে নিয়ে দাঁতে কলা কেটে এরপর একসঙ্গে চিবোতে চিবোতে বাবার পাশে পাশে হেঁটে হাসপাতালের ফটকের দিকে এগোতে থাকল নিপু। সকালে ওঠার সময়ও আকাশ ছিল ঝলমলে, কিন্তু দেখতে দেখতে কালো হয়ে আসছো আবার। ফটকের কাছে আরো কিছুক্ষণ দাঁড়াতে দাঁড়াতেই ঠাণ্ডা বাতাস আসা শুরু হলো। দূরে কোথাও বৃষ্টি চলছে, বাতাসে ওজোন নেমে গেছে। দেখতে দেখতে আকাশটা ওখানে আরো কালো হয়ে উঠল। তাদের দেখতে পেয়ে, একটা বেবি ট্যাক্সি রাস্তার ওপারের কাঁঠাল গাছের তলটা ছেড়ে সড়কদ্বীপের একটা ফাঁক ধরে এলো এগিয়ে। কাছে এসে দাঁড়াতেই নিপু দেখল, চালকের আসনে ঝাঁটার শলা ভেঙে চিবোনো গতকালের লোকটাই।
দেখতে দেখতে কাকাও চলে এলো কোথা থেকে। এরপর বাবার সঙ্গে গম্ভীর মুখে জুড়ে দিলো আলাপ। ট্যাক্সিচালক ভাবলেশহীন মুখে তাদের আলাপরত মুখে দিকে তাকিয়ে থাকল পুরোটা সময়। এরপর বাবা এলো নিপুর কাছে।
নিপু, আমরা এই বেবিট্যাক্সিতে চড়ে তোমার নানুবাড়ি যাব। পারবে না বাবা?
কল্পনাতীত আকস্মিক এমন সৌভাগ্যযোগে মুখে খাবার নিয়ে নিপু বাক্যহারা। ডাগর চোখগুলো আরো বড় হয়ে উঠেছে বিস্ময়ে। একবার ট্যাক্সিটার দিকে, আরেকবার বাবার মুখের দিকে তাকাতে থাকল পরপর। ট্যাক্সিওয়ালাও ভুরু দুটো নাচিয়ে মাথা দোলাতে থাকল তার আনন্দটুকু টের পেয়ে। ছোটকাকা হেসে তাকে দেখিয়ে বাবাকে বলল, মানে, পাগল একটা।
বাবা আর কাকা এরপর আবারো গম্ভীর আলাপে পড়ল ঢুকে। আবার সেই টাকা আর টাকা। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গাড়ি, কাঠ, মাঠ, মাটি, অন্তেষ্টি, শ্রাদ্ধের আলাপ আর পুরোহিত। সেখান থেকে আলাপ আবার টাকায় গড়ালো। এরপর আবার গাড়ি, কাঠ, মাঠ, মাটি, অন্তেষ্টি, শ্রাদ্ধের আলাপ এবং পুরোহিত। এভাবে একটা অনিঃশেষ চক্র বুঝিবা চালিত হয়ে গেছে। নিপু ওই চক্রের বাইরে দাঁড়িয়ে কেবল দেখতে থাকল, শুনতে থাকল, আর তার ছোট্ট মাথাটা বাঁই বাঁই ঘুরতে থাকল। এমন সময়, লালকালিতে উল্টো করে অ্যাম্বুলেন্স লেখা একটা সাদা গাড়ি এসে থামল ওদের সামনে। ফুটপাতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকার কারণে গাড়ির জানালা দিয়ে নিপু একটা কাঠের আয়তাকার বাকশো দেখতে পেল, সাদাও নয় আবার ঠিক হলুদও নয়। আর দেখতে পেল, তার ওপর একটা হাত রেখে পাশে তার দিদি বসে আছে। গাড়ির একদিকের পুরোটা জুড়ে রাখা ওই বাকশো। বাকি তিনদিকেই জড়ো হয়ে বসেছে দুই মাসি, এক পিসি, আর- আর মাসির ছেলে বিভব।
বিভব কখন এলি?
শুনতে পেল না বিভব। নিপুর দিকে একবার তাকিয়েই আবার মাথা নিচু করল। বুঝি আর কথা বলবে না। নিভা আর বিভব ছাড়া বাকিরা ঘন ঘন চোখ মুছছে। হঠাৎ জানালার বাইরে তাকিয়ে নিপুকে দেখতে পেল নিভা। মুখে মৃদু হাসি ফুটল তার। এরপর নিপুকে ডাকল হাতছানি দিয়ে। নিপু ধীর পায়ে কাছে গিয়ে দাঁড়ালে বলল, যাবি আমার সঙ্গে? মাকে নিয়ে যাব আমরা। যাবি?
নিপু নিচু গলায় বলল, আমি তো বেবি ট্যাক্সিতে যাব!
শুনে নিভা হেসে ফেলল। আচ্ছা বেশ তো। তুই তাহলে বেবি ট্যাক্সিতে চড়েই যা। আমি গাড়িতে করে মাকে নিয়ে যাই।
মায়ের সঙ্গে যেতে খুব করে চেয়েছিল নিভা, কিন্তু নিষেধ করলো সুধীর। বলল, এই গাড়িতে থেকো না তুমি, না না, এই গাড়িতে তুমি থেকো না। তুমি বরং নিপুকে দেখো মা! আমিই যাবো তোমার মায়ের সঙ্গে। অনেক ঝামেলা হতে পারে পথে! ওসব ঠেকাতে আমার থাকাটা দরকার। আর নিপুকে দেখার মতো তোমার ওপর ছাড়া আর কার ওপর এখন ভরসা করবো আমি, বলো? কথা শোনো? লক্ষ্মী মেয়ে না আমার? চোখ মুছে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নেমে ট্যক্সিতে উঠে নিপুকে জড়িয়ে বসল নিভা। নিপু, নিভা আর ছায়া মাসি। সামনে চালকের পাশে জায়গা করে নিয়ে বসল সুবীর। ছায়া ভীষণ স্থূলকায়া হওয়ায় খানিকটা চাপাচাপি। মাসি একবার নিপুকে নরম সুরে বলল, নিপু, আমার কোলে উঠবে তুমি? বা তোমার দিদির?
নিপু বলল, না। আমি তো সিটে বসে যাব।
মাসি এবার নিরস্ত। আচ্ছা বেশ, সিটে বসেই যাও।
ট্যাক্সি চলতে শুরু করার সঙ্গে বৃষ্টির কোনো যোগ নিশ্চয়ই আছে। গতদিনের মতো আজো গাড়িটা চলতে শুরু করামাত্র ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। ট্যাক্সির প্লাস্টিকের ছাদে শব্দ হতে থাকল মজার, পট পট পট পট! আর এঞ্জিন একটানা শব্দ করতে থাকলো, কিট কিট কিট কিট! গর গর গর গর! বৃষ্টিতে সামনের কাচটা ঝাপসা হয়ে আসতে থাকল ঘন ঘন। আর কালো ওয়াইপার দুটো হেলে দুলে নাচতে থাকল অবিরাম। থেকে থেকে রাস্তার একেকটা খানাখন্দে পড়ে লাফিয়ে উঠছিল ট্যাক্সিটা। সঙ্গে সঙ্গে চড়ামৃদু আর্তনাদ তুলছিল সবাই, শুধু নিপুই অবিচল। কণ্ঠে কোনো কাতরধ্বনি নেই। তার মতো বীর আর দুটো হয় নাকি! এদিকে তার ট্যাক্সিটাও বীরোচিতভাবে একটার পর একটা অন্য ট্যাক্সি আর মিনিবাসকে পেরিয়ে চলেছে। কী আনন্দ! এমন সময়ে তাদের ট্যাক্সিটাকে হুশ করে পেরিয়ে গেল সাদা অ্যাম্বুলেন্স। সামনের বাম্পারের সঙ্গে একটা ধাতব লাঠিতে বাঁধা পড়ে উড়ছে একটা সাদা পতাকা, বৃষ্টির জলে তার জমিন কিছুটা ভারি। ওড়ায় টান নেই। অ্যাম্বুলেন্সটাকে এগিয়ে যেতে দেখে নিপুর দুঃখ হলো, বাবার সঙ্গে যদি থাকা যেত ওই গাড়িতে! এসময় সামনে গতিরোধক পড়ায় অ্যাম্বুলেন্সের গতি কমে এলো খানিকটা। তখন ট্যাক্সিটা কাছাকাছি চলে আসায় মনে আবার আশা জেগে উঠল নিপুর। হয়ত পেরোতে পারবে। কিছুক্ষণ গাড়িতে গাড়িতে টেক্কা আর হারজিতে মেতে থেকে নিপু এবার তাকাল পথের দুপাশে গাছের দিকে। ঝড়ে মাতাল বৃষ্টিতে ভেজা গাছগুলোর কা- কী কালো আর পাতাগুলো কী সবুজ! অর্ধস্বচ্ছ কাচের মধ্য দিয়ে দেখে মন ভরছিল না। এদিকে দিদি কিংবা পিসির পাশ থেকে সবুজ প্লাস্টিকের পর্দাটাও সরানোর উপায় নেই। এভাবে কিছুক্ষণ যেতেই প্রকৃতি বোধয় খানিকটা প্রসন্ন হলো নিপুর ওপর। ঢাকার উত্তরপ্রান্তে আসতে আসতে বৃষ্টি খানিকটা ধরে এলো। সরিয়ে দেওয়া হলো পর্দা। পথের দুপাশে গাছের ঘনত্ব এখন বেড়েছে আরো। একসময় তা এতোই বেড়ে গেল যে সবুজের পেছনে সবুজ, মাটিতে সবুজ, আকাশে সবুজ; দেখে নিপুর মনে হলো গাড়িটা বুঝি জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পথ করে এগোচ্ছে। থেকে থেকে পথের ওপর পড়ে থাকছে ছোট বড় গাছের ডাল। দিনের আলোয় গতিরোধকের কাজ করছে ওসব। একসময় বন হালকা হয়ে এলো, দুপাশে ক্রমে বাড়ল ধূসর সাদা বেলে মাটি। এরপর স্ফীতজল তুরাগ নদ পড়ল সামনে। ফেরির জন্য ওদের কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হলো। দেখা গেল অপেক্ষমান বাহনের ভিড়ে সাদা অ্যাম্বুলেন্সটাও আছে।
ট্যাক্সি থেকে নেমে খোলা হাওয়ায় কিছুক্ষণ হাত পা খেলিয়ে নিলো নিভা আর নিপু। সুবীর চলে গেল কাছের এক টঙ দোকানের আড়ালে।
এসময় নিপুর হাত আবার গিয়ে পড়ল পকেটে তার ছবিটার ওপর। এতো হুল্লোড়ের ভেতর কখন যেন দুমড়ে গেছে ওটা। তাতে অবশ্য ছবিটা বুঝতে মায়ের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আর সমস্যা যদি হয়েও থাকে, সে-তো থাকছেই বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য।
নদ পেরিয়ে আবার আগের মতো যার যার গাড়িতে চাপলো সবাই। আরো নিবিঢ় কিন্তু আলোকিত ভাওয়াল গড়ের শালবন পেরোলো এবার ওরা। শালবনের ভেতর দিয়ে ইট বিছানো পথ ধরে ঝাঁকুনি খেতে খেতে গাছগাছালি, ঘাস ঝোপ ঝাড়, এসবের ফাঁকে ফাঁকে শাপলায় ভরা রুপালি সব সরোবর পেরিয়ে অবশেষে একটা গ্রামের কাঁচা রাস্তায় উঠে এলো গাড়ি। মাটির বুকে ভারি গাড়ির চাকার দাগ পড়ে আছে। দেখিয়ে মাসি বলল, তোদের মা কেমন আমাদের আগে চলে গেছে।
দেখতে দেখতে নিবিঢ় গাছপালার ফাঁকে চিরচেনা সপ্রাঙ্গণ মাটির দোতলা বাড়িটার কাছে চলে এলো নিপুরা। প্রাঙ্গণের বাইরে, যাওয়া-আসার সরু মেটে রাস্তার একপাশে এক টুকরো জায়গা নিয়ে কচু শাকের কোমল সবুজ ক্ষেত। অপর পাশে বিরাট এক কদম গাছ। টিয়েসবুজ মখমলের জমিন নিয়ে পাতার ডালাগুলো বাতাসে এপাশ ওপাশ করছে কেবল। তার পাশ ঘেঁষে নরম মাটিতে চাকা দাবিয়ে থেমে গেল বেবি ট্যাক্সিটা। মাথার ওপর কদমের ডালি নাড়াতে থাকল হাওয়া। নেমে বাড়ির দিকে এগোতে থাকল মাসি। নিভা আসছে না দেখে পেছন ফিরে বলল, এসো নিভা!
নিভা সঙ্কোচে দাঁড়িয়ে থাকল দেখে মাসিও পড়লো দাঁড়িয়ে। মোটা শরীরটা দুলিয়ে কাছে এসে নিভার পিঠে হাত রাখলো। প্রাঙ্গণের অপর পাশে সাদা অ্যাম্বুলেন্সটা দাঁড়িয়ে। রুপালি মাটির ওপর এনে রাখা হয়েছে আয়তাকার কফিন। স্বজন সজ্জন প্রতিবেশীরা যেন শেষবারের মতো দেখতে পারে মুখ, তাই ওপরের ডালাটা খানিকটা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেখতে এসে সবাই দাঁতে আঁচল কাটছে, বিকৃত হয়ে উঠছে চোখ মুখ, কেউ আর সরছে না। পুরনো সখী, শিক্ষয়িত্রী, গুরু মা আর ধর্মবোনের ভিড়ে জট এতে ক্রমেই জমাট হতে থাকল।
খানিকবাদে নারীদের রেখে কেবল পুরুষসমেত শ্মশানের দিকে চললো গাড়ি দুটো। বৃষ্টিস্নাত ঝোপালো সবুজ শ্মশান। ঢোকার মুখের তোরণ ক্ষয়িষ্ণু, লেখার ওপর সবুজ শ্যাওলার স্তর পড়েছে। ভেতরে আকাশের দিকে চিৎ হয়ে শুয়ে এক রুপালি জলাশয়। চারধারের স্বল্পজল ফুঁড়ে মাথা তুলে আছে সবুজ ঘাস। আর চার পাশ ঘিরে আছে বড় বড় গাছেরা সব। একটা লটকনের গাছ বুদবুদের মতো অসংখ্য লটকনে ভরে আছে। জলাশয়ের এক কোণে লাল ইটের এক কালী মন্দির। নিম্নাঙ্গে কেবল এক টুকরো নোংরা কাপড় জড়িয়ে সিঁড়ির ওপর পা ছড়িয়ে বসে আছে ছোট্ট এক ছেলে, হাতে মিছরির বড় দানা। একেকবার জিভ ছুঁইয়ে তাকাচ্ছে ওদের দিকে, চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে ওপরনিচ। খুব ভালো করে একবার নিপুকে লক্ষ করে কী যেন বলে উঠল; বুঝি গালমন্দ কোনো। নিপু চোখ ফিরিয়ে নিলো সঙ্গে সঙ্গে। ফিরে তাকালো আবার। একইসঙ্গে অভিযানের আনন্দঘন এবং আনন্দ জর্জর দীর্ঘ সময় কাটলো এরপর। বহুক্ষণ শ্মশানময় ঘুরে বেড়ালো নিপু। কত কিছুই যে চোখে এলো তার। দেখল শ্মশানে ছোট্ট একটা কুঁড়ে ঘর বানিয়ে থাকে জনা পাঁচেকের এক পরিবার। তাদের চেহারাগুলো বেশ অদ্ভুত রকমের। একটা চোখ বড় তো আরেকটা ছোট, নাকের সামনের অংশ বেশ মোটা। ছেলেগুলোর হাতের হাড় বেশ চওড়া, যেন অনেক শক্তি ধরে। মেয়েদের বাহু মাংসল। বাড়ির বাইরে মোড়া পেতে এরা নিজেদের ভেতর গল্প করা ছাড়া আর কারো সঙ্গে কথা বলে না। নিপু আরো দেখতে পেল একটা প্রশস্ত লাল মেঝের থান, মাথার ওপরে শনের ছাউনি পাতা। ছাউনির ওপর ছায়া ফেলে রেখেছে বয়েসী অশথ। অশথের সূঁচমুখো গোলাকার পাতা বাতাসের সাড়া কেঁপে কেঁপে দোলে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না, ঘাড় ব্যথা হয়ে যায়। থানের এক কোণে গুটিসুটি হয়ে বসে আছে এক সাধু। কপালে, দুচোখের পাশে আর পেটে তার অগনিত ভাঁজ। নিম্নাঙ্গে লাল কৌপিন জড়ানো তার। কালোয় সাদায় মেশানো লম্বা চুল, দাড়ি। চুলে চূড়ো খোঁপা বেঁধে রাখা। আর তল পেট অব্দি নেমে আসা আসা দাড়ির পেছনে তারা গলার বিচিত্র সব মালা পড়ে চোখে। নিপু সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই চোখ বুজে রাখা সাধুর পিঙ্গল চোখজোড়া গেল খুলে। তাড়াতাড়ি সটকে পড়ল ভীত বালক। এগোতে এগোতে বিশেষ এক জায়গায় পৌঁছুল অবশেষে নিপু। সেখানে ছোট ছোট মন্দিরের মতো বেশ কিছু কাঠামো, ভেতরটা ফাঁকা। ফাঁকা জায়গাটায় ঘাসের ভেতর থেকে মাথা তুলে রেখেছে পেটসমান উঁচু নামফলক। গোটা ফলক জুড়ে শ্যাওলার স্তর এমনভাবে পড়েছে যে নামগুলো পড়ার আর উপায় থাকেনি। অনেক বড় বড় ঘাস এ জায়গাটায়। দুটো লাল রঙ্গনের গাছ দেখে মুগ্ধ হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকতে হলো তাকে। কিন্তু এক্ষেত্রেও, খানিক বাদে ঘাড় নামিয়ে ফিরে আসতে হলো।
চারদিকে ঘুরে যখন দাহ করার ভিটার কাছে এসেছে, দেখে চিতা সাজানো হয়ে গেছে। মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি লম্বায় আড়ে সাজিয়ে যেনতেনভাবে একটা বিছানা তৈরি করা হয়েছে যেন, তোষকবিহীন। নিচে খানিকটা দূরে মায়ের দেহটা একটা সাদা কাপড়ে আগাগোড়া মুড়িয়ে নামিয়ে রাখা।
মায়ের শরীরটা ওই নিষ্ঠুর-দেখতে বিছানার ওপর শুইয়ে দেওয়া হলো। আর তখন ফতুয়ার পকেটে ফের হাতটা রাখলো নিপু। ওটা কি আর দেওয়া হবে না? মা তো ঘুমোচ্ছে কেবল। ঘুমটা ভেঙে দিলেই হয়? তারপর মা দেখুক, ভুটকো চাতক ঠোঁট হা করে আস্ত আস্ত সব মেঘ গিলে খাচ্ছে। দেখে কী অবাকই না হয়ে যাবে মা। বলবে, বাহ, আমাদের নিপু কী সুন্দর আঁকতে শিখিছে! শিখবে না? ও যে আমার ছেলে। আমার হীরের টুকরো ছেলে। তারপর ওই যে প্রায়ই যা বলতো আরো? নিপু একদিন অনেক বড় শিল্পী হবে। অনেক বড়। এই, তোমরা কেউ ওকে কিছু বলবে না! আমার নিপু পড়বেও না, লিখবেও না। ও শুধু ছবি আঁকবে। বুঝেছ? পারবে তোমরা? পারবে এমন আঁকতে? পারবে এমন হাতি, পুতুল, হাতপাখা আর বাঘ আঁকতে? পারবে এতো সুন্দর সব হাত পা ওয়ালা পাখি আঁকতে? এই যে মেঘ খাওয়া চাতক! কী কল্পনা রে বাবা! এ কি একজনমে হয়? হয় না। কে এসেছে এটা? আমার পেটে কে এসেছ তুমি? মনে হয় তোমাকে আমি চিনি! মনে হয় তোমাকে আমি আরজনমে পূজা দিয়েছিলাম! কী, তাই না? তারপর? পারবে এমন পাহাড় ঝরণা হরিণ? কী নিভা? পারবি আঁকতে?
না মা!
কিরে বিভা! স্বাক্ষর? পারবি তোরা?
না মাসিমা!
না মাসিমা! নিপুর মতোন কী আর পারি!
অজান্তেই নিপু একবার হেসে উঠল মায়ের বলা এতোসব বার্তাকথার স্মৃতিশান্তি করে। মায়ের এসব কথা শুনে শুধু তারই নয়, যারাই থাকত আশপাশে, সবার হাসতে হাসতে গালে ব্যথা ধরে যেত। গোটা পরিবার এক হলে সবাই উৎফুল্ল থাকত বেশ, এ ধরনের আলাপ-সালাপ তখনই হতো বেশি। হাসতে হাসতে বাবা বলতো, মায়া, সত্যিই তোমার তুলনা হয় না।
পীত রোগী মায়া বহুদিন ছিল বিছানায়। তাই তার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মতো সূক্ষ্ম অনুভূতি থেকে শুরু করে বাহ্যিক আচরণ- সবই ওই শুয়ে থাকার সঙ্গে সবার খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছিল। এই যেমন, এমন একটা অনুরাগরসসিক্ত আলাপ-প্রলাপের পর, নিপু খাটের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে মায়ের নরম পেটে কেবল মাথাটা রেখে শিরশায়া হয়ে থাকতো। ওর সরু হাত দুটো বিছানার প্রান্তে অদ্ভুতভাবে ঝুলে থাকতো তখন। তবু এভাবে থাকাটা তার যেমন প্রিয় ছিল, তেমনই প্রিয় ছিল মায়ের। তবে ধড়ের ভরের একটা বড় অংশ তখন পেটের ওপর এসে পড়ত বলে মা খুব বেশি সময় তা সহ্য করতে পারতো না। একসময় বলে উঠত, ওঠ্ বাবা ওঠ্, এখন ব্যথা পাচ্ছি, তখনই কেবল মাথা তুলতো নিপু।
তো যে মা তার ছবির এতো বড় সমঝদার, সে কী আর উঠবে না? আচ্ছা, একটা পিঁপড়া কামড় দিলে তো মাকে উঠতেই হবে, তাই না? পিঁপড়ার কামড়ের পর কি আর ঘুমিয়ে থাকা যায়। যায় না তো। একটা লাল পিঁপড়া। ওহ, পিঁপড়াগুলো সব বাসায় পড়ে আছে। কোনোভাবে একটা যদি মাকে এখন দিতো ধরে কামড়ে, আর দেখতে হতো না। কোনোভাবেই মায়ের ঘুম না ভেঙে পারতো না।
ভাবতে ভাবতে নিপু কখন যেন শুইয়ে রাখা মায়ের খুব কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তার হাতে ভাঁজ করে রাখা সেই ছবি। ছবির ভাঁজের সূক্ষ্ম ডগায় তখন পা আঁকড়ে মাথা বের করে রেখেছে এক লাল বিষ পিঁপড়া। নিপু কিন্তু তখনো তা দেখেনি। ছবিটা মায়ের বুকের কাছে নিয়ে রাখতেই পিঁপড়াটা যখন মরদেহ জড়ানো কাপড়ের ওপর নেমে পড়ল, মুহূর্তের জন্যে ওটাকে দেখতে পেল নিপু। দেখেই চেঁচিয়ে উঠল, দিদি!, দিদি! লাল পিঁপড়া। বাবা! মা এবার জেগে উঠবে! এবার ঠিক ঠিক জেগে উঠবে!
পিঁপড়াটা ততক্ষণে একটা ভাঁজের আড়ালে ফাঁক পেয়ে সেঁধিয়ে গেল আরো ভেতরে। আর নিপুর চোখের আয়নায় মা যেন একবার নড়ে উঠল! ততক্ষণে পাশে এসে দাঁড়িয়ে পিঠ জড়িয়ে কাঁধে হাত রাখা বাবাকে স্বাক্ষী মানতে চাইলো নিপু। কিন্তু বাবার চোখের একমত হওয়ার কোনো চিহ্নই ফুটল না। বাবা যেন ব্যাপারটা লক্ষ্যই করেনি, গুরুত্বই দেয়নি কোনো। বাবা মলিন হেসে নিপুকে আরো খানিকটা কাছে টানলো। ওই হাসিটা দেখে নিপু স্পষ্ট বুঝে গেল, বাবা তাকে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু এটা কী করে হতে পারে! কী করে হতে পারে যে বাবা তাকে বিশ্বাস করলো না! এ পর্যন্ত এমন কোন কথাটা আছে যে সে বলেছে আর বাবা অবিশ্বাস করেছে? কোনোদিন তো এমন হয়নি? তাহলে আজই কেন এমন হতে যাবে?
বাবা নিপুকে আদর করে বলল, নিপু, বাবা, একটু পেছনে এসো। তোমার কাজ আছে।
একটা কাঠের দণ্ডের মাথায় আগুন ধরিয়ে বাবার দিকে এগিয়ে দিলো কেউ। কেঁপে উঠল নিপু। যেন অন্তর্তন্তুতে বয়ে নিয়ে আসা কোনো অতীত স্মৃতির গ্রন্থিতে পড়ল দাঁত। নিভাদি কোথায়, নিভাদি? নিপুর সমস্ত কাজের ভাবনার চিরটাকাল বিশ^স্ত সাথী নিভা সেদিনই তার পাশে ছিল না। নিপু অস্থির হয়ে চারপাশে নিভাকে খুঁজে বেড়ালো। বিড়বিড় করে ডাকতে থাকল, দিদি! দিদি!
বাবা তাকে টেনে নিলো কাছে। নিপু শরীর মুচড়ে বেরিয়ে যেতে চাইলো। প্রথমবারের মতো তার চোখে এলো জল। ঝটিতে তাকালো মায়ের দিকে। মনে হলো, আরো একবার বুঝি নড়ে উঠেছে মা। কিন্তু তার কথা বিশ্বাস করবে না কেউ।
তোমাকে আগুন দিতে হবে বাবা! শান্ত কণ্ঠে বলল সুধীর।
না! নিপু একপিণ্ড ভেজা ক্রোধ ছুড়ে দিয়ে কাঁধ থেকে বাবার হাতটা সরিয়ে দিলো। আবার বলে উঠল, না। ভেজা কণ্ঠটা উঠে দাঁড়াত পারছে না আর। বুঝি ওটারই আগে মৃত্যু হয়েছে।
ছবি আঁকা কাগজটা রেখেই মায়ের শরীরের ওপর আড়াআড়ি শুকনো কাঠের গুড়ি বসানো হতে থাকল। একটা সহজভেদ্য খাঁচার মতো তৈরি হলো। বাতাস খেলে গেল তার ভেতর। ভাঁজ করা কাগজটা বাতাসে উড়ে গিয়ে একটা কাঠখণ্ডে আটকে গেল। এরপর আরো কাঠের টুকরো লম্বি, পাশশোয়া করে দেওয়া হতে থাকলো। ভেতরটাও হয়ে উঠল এমন এক কারাগার, কারো পক্ষেই আর বেরোনোর উপায় থাকল না। কাগজটাকে আর দেখা গেল না কোনো ফাঁকে।


। তিন।

আবার এলাম আমি। ওরা বলে, আজকাল কারো আর গল্প কবিতা পড়ার সময়-টময় নেই। বড় কথাও তাই ছোট করে বলার চেষ্টা থাকে। আর এদিকে আমি একরত্তি কথাকে টেনে কতদূর পর্যন্ত নিয়ে এলাম।
নিপুর আঁকা ছবিটা যখন চিতার কারাগারের ভেতর ছটফট করছিল, বেরোতে চাইছিল কেবলই, তখন ধরেই নিই না কেন, ওদিকে ওদের শহরের বাসায় অবতারণা ঘটেছিল আরেক অদ্ভুত নাটকের? কারণ প্রতিবেশিরা বলেছিল, অদ্ভুত সব শব্দ ওরা ঘরের ভেতর থেকে ভেসে আসতে শুনেছে। অবশ্য, যে বাড়িতে কেউ মারা গেছে, সে বাড়ির দেয়ালে কান পাতলে মানুষের কল্পনাপ্রবণ মগজ কত শব্দই তৈরি করে। তাবৎ অনুভূতির কেন্দ্র যখন মগজই, তখন স্বপ্ন আর বাস্তবতার পরস্পরের ওপর উপরিপাতিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে অনেক কিছুই দেখা যায় যা আদতে নেই, অনেক কিছু শোনা যায় যা আদতে কোনো কম্পনে তৈরি হয়নি।
আলোর ঝিলিকও নাকি দেখেছে একজন। তবে তার সঙ্গে অন্যেরা কেউ একমত হলো না।
আমার বন্ধু নিপুর সঙ্গে ওদের ওই বাড়ির ছাদে আমি তখন একটা দোলচেয়ারে বসে গম্ভীর মুখে শরীর এলাদোলা করছি। নিপু আধাআধি শেষ হয়ে গিয়ে রড বেরিয়ে থাকা একটা খুঁটির গায়ে হেলান দিয়ে উদাস চোখে পুব দিকে তাকিয়ে ছিল। তার পেছনে অস্ত যাচ্ছিল সূর্যটা। বলল, সে রাতে ধর্, লক্ষ্মী আর স্বরস্বতীর প্রতিমা দুটো নড়ে উঠল হঠাৎ। খুব ধীরে একে অপরের দিকে ফিরে মুখোমুখি দাঁড়ালো। স্বরস্বতীই মুখ খুলল প্রথম। লক্ষ্মীকে বলল, আমাদের এই ছোট্ট দুই পূজারীর জন্য খুব, খুউব খারাপ লাগছে আমার। আহা, ছোট্ট দুটি ভাইবোন, ওদের ভারি ভালোবাসি আমি। আচ্ছা বোন লক্ষ্মী, পিঁপড়ের জ্ঞান আর সঞ্চয়ের ধর্মের ভেতর তো স্বরস্বতী আর লক্ষ্মী বর্তমান। নয় রে? পিঁপড়েটা নেমেছে, সুতরাং এর ভেতর আমাদের জন্যও একটা কোনো সংকেত অবশ্যই আছে। নয়? এরপর লক্ষ্মী বলল, তাই তো, সংকেত থাকাই তো উচিৎ। আর জানিস দিদি, আমারো ভীষণ ভীষণ মন ভার ওদের জন্য। একটা কিছু করা চাই। ওদের পুণ্যযোগ তো কম নয়। যথেষ্ট। যথেষ্ট মানে, যথেষ্টর ওপরও যথেষ্ট। চল চল দিদি, মায়ের কাছে যাই। এই পরিবারে পরে যে ধাত্রী প্রতিমাটি আসছে তার ভেতর মায়ের আগমণ ঘটুক। খুব করে যদি বলি, নিশ্চয়ই মা শুনবে। এরপর দুই প্রতিমার নড়াচড়া গেল থেমে। হতে পারে না এমন? আমরা বাসায় এসে প্রতিমা দুটোকে মুখোমুখি পেয়েছিলাম। আমাদের হাতেই হয়েছিল কিনা বলতে পারি না। লাভ কী ভেবে।
থামল নিপু। পরের অংশের হাল আবার ধরছি অধম। এই গল্পের শুরুর দিকে যা করেছিলাম, মূল অংশ দেখানোর আগে খানিকটা পাশ থেকে আলো ফেলা শুরুর ওই ব্যাপারটা, মনে আছে? ওটাই ফের কাজে লাগাই।
পরের বছরের শুরুর দিকের আলোকোজ্জ্বল একটি দিন। সরু দেখতে, পুরনো এক পাঁচ তলার বাড়ির গোবরাটে অশথ জন্মানো দোতলায় চলছে উৎসব। মরিচবাতির সরু তিনটি তার ওই বাড়ির ফটক থেকে শুরু করে প্রায়ান্ধকার সিঁড়িঘরের মাথা অব্দি পৌঁছেছে। তাই দেখে উৎসব ঘিরে দানধ্যান-সম্ভাবনা টের পেয়েছে এলাকার ভিখারীরা। ফটক থেকে সড়কে নেমে যাওয়া ছোট ঢালটার ওপর ভিড় করে আছে সবাই, বসতে কিংবা দাঁড়াতে চাইছে পছন্দনীয় জায়গায়। আর এই নিয়ে বেঁধেছে গোলমাল। একে অপরকে করছে যাবতীয় আড়ভাষায় তীব্র আক্রমণ। চলছে লড়াই নারীতে-পুরুষে; নানান জাতের এবং পদের তাদের বিকলাঙ্গতা। দেখার মতো রগড়। তাই দেখতে এলাকার ছিন্নমূল শিশুরাও এসে জড়ো হয়েছে। এমন সময় ওই ফটকের মুখ বরাবর রাস্তায় একটা হলুদ কালো বেবি ট্যাক্সি এসে থামল।
যেন জাদুমন্ত্রের কাজ। মুহূর্তে বিবাদ থেমে যে যার মতো হাসিমুখে ফটকের দু পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। ট্যাক্সি থেকে নেমে এলো নিপু, নিভা আর সুবীর। সুবীরের মুখটা গম্ভীর। নিপুর চোখজোড়া আনন্দে বাঙ্ময়। নিভার চোখে আলো বড় কম। একটা উদ্বেগের মেঘ সে আলোকে আড়াল করে রেখেছে।
দুপাশের ভিক্ষুকদের কাউকেই নিরাশ করলো না সুবীর। সবাইকে দিলো কিছু না কিছু। প্রাণভরে নাকি দোয়া করবে সবাই। কেউ কেউ তখনই তুলে দিলো ফরিয়াদি হাত আকাশের দিকে।
দোতলায় ওরা এসে ঘরে ঢুকতেই হুল্লোড় করে উঠল অনেকে। উপস্থিত সবাই পরিচিত আত্মীয় পরিজন। মাপা হেসে তাদের দিকে তাকালো নতুন কিছু মানুষ, মাথাটা একবার দোলালো ওপর-নিচ। পাশের ঘরে গিয়ে নিপু দেখল এক কোণে চারটা কলা গাছ শোয়ানো। দাঁতের খিলাল দিয়ে আঁচড় কেটে তাতে নিজেদের নাম লিখছে ছোট দুটি ছেলে, এদের চেনে না নিপু। ঘরের একটি কোণে ফুলের মালা ঝোলানো বিছানায় দুই পা তুলে বসে আছে এক রূপসী নারী, মাথার ওপর জড়িদার পাতলা উড়নি তার। চোখে চোখ পড়তেই হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকল। ডাকে সাড়া দিয়ে নিপু ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল বিছানার কাছে। দূরে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ছিল নিভা; ওই মুহূর্তে নিজেকে আড়াল করে নিলো।
নিপুকে ধরে বিছানায় বসিয়ে চিবুকে হাত দিয়ে আদর করলো সুবেশা। চারপাশের কলকোলাহল হঠাৎ এলো থেমে। ভেতরের মানুষেরা ছাড়ল ঘর আর ভেতরে ঢুকল এসে সুধীর। বিছানার কাছে এগিয়ে এসে নিপুর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে কণ্ঠে দরদ ঢেলে বলল, তোমার নতুন মা নিপু! দেখো মাকে!
নিপু মাকে দেখে নিয়েছিল আগেই। বাবা বলার পর আর তাকাতে না পেরে মাথা নিচু করে তাকিয়ে থাকল হাতের ওই রুপালি রাখিটার দিকে। নিপু ওটা দেখছিল না, তবু সুধীর ভাবলো তার ছোট্ট নিপু বুঝি ওটাই দেখছে, দেখছে আর মনে মনে চাইছে; বলছে না। হাত থেকে রাখিটা খুলে বাবা নিপুর হাতে পরিয়ে দিলো। জিনিসটা হাতে নিয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল নিপু। হাতটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নাড়িয়ে দেখল একবার, ঘরের আলোয় রাখিটা ঝিলমিল করছে।
আরো কিছু আনুষঙ্গিক ধর্মাচরণ ছেড়ে নতুন মাকে নিয়ে রাতেই বাসায় এলো নিপুরা। বাবা মা ধীরে ধীরে তাদের ঘরে চলে গেলে নিভা নিজ ঘরে ঢুকে নিঃশব্দে দরজা বন্ধ করে দিলো। নিপু চলে এলো সামনের বসার ঘরে। ওদের পেছনে আরো এসেছে ছোটকাকা, পিসি, ছোট মেসো আর মাসি। পিসি স্নানঘরে গেছে। মাসিমা বসে আছে মেসোর পাশে, দরজার দিকেই মুখ। আর এসেছে বিভব। ঘরের মধ্যখানে চায়ের টেবিলটার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে নিপুর ছবি আঁকা খাতা থেকে কাগজ ছিঁড়ে শাপলা ফুল বানাতে ব্যস্ত। নিপু এসেছে বুঝতে পেরে তার আঙুলের গতি কমে এলো। তবু সংকোচে মুখটা তুলে তাকাল না। ছোটকাকা তার প্রিয় পুরনো সেই আর্মচেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে আছে। নিপু ধীরে ধীরে চায়ের টেবিলটার কাছে হেঁটে গেল। সাদা একটা শাপলা ফুল তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। বলছে, আমাকে নাও, আমাকে নাও! ডাঁটার কাজ আছে থেমে। বিভবের হাতের ওপর পাকানো কাগজটা খুলে একটা নলের আকার নিচ্ছে। ধীর আঙুলে আবার তাকে পাকাচ্ছে বিভব, এরপর আবার দিচ্ছে নলের আকার। এমন সময় করিডোর ধরে দিদির কণ্ঠ ভেসে এলো, নিপু!
ডাক শুনে ঘুরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে নিপু বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। দেখতে পেল, নিজ ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে দিদি। তার মাথার পেছনে আলো বলে মুখটা পড়েছে অন্ধকারে। অন্ধকারের পটে কালো হয়ে ফুটে আছে তার স্ফীত অবয়ব। মায়ের স্বর্গলাভের পর সে হয়েছে এমন। খেতে বসলে নাড়াচাড়া করে উঠে যেত, মুখে কিছু দিতোই না প্রায়। কিন্তু ঘুম তার খুব বেড়ে গিয়েছিল। বাবার বিয়ের সম্ভাবনার কথা সে বেশ ক মাস ধরে শুনে আসছিল। কিন্তু বিষয়টা সহজভাবে নিতে পারেনি। তখন যেমন, এখনো তেমনই। আর চূড়ান্ত এই দিনে তার মনে হলো, পৃথিবীতে নিজ অবস্থান, স্বপ্ন কল্পনার মূল্য আর দায়িত্ব সম্বন্ধে নতুন ধারণার বীজ তার মনের মাটিতে রুঁয়ে দিয়েছে ঈশ্বর। এবার তাতে জল ঢালার, অঙ্কুরোদগম হলে পরিচর্যার পালা।
নিপু বাবা মায়ের ঘরটা পেরিয়ে কাছে এসে দাঁড়ালে তার সামনে বসে পড়ে সরু বাহু দুটি ধরে ভেজা দৃঢ় কণ্ঠে নিভা বলল, আমি তোর দিদি, আমিই তোর মা। তাই না বল?
নিপু ওপরনিচ মাথা দুলিয়ে জানালো তার সায়।
নতুন মায়ের কোনো দরকার আছে তোর বল?
নিপু এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে জানালো উত্তর।
তাহলে; নিভা আরো কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেল হঠাৎ। তার চোখজোড়া অনুসরণ করে পেছনে তাকালো নিপু। দেখল, ঘরের দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়িয়েছে তাদের নতুন মা। পূর্ণ চোখে তাকিয়ে আছে তাদের দিকে। দিদির ঘরের আলো গিয়ে পড়েছে ঠিক তার মুখের ওপর। অবিকল দুর্গা যেন।


৯ অগাস্ট, ২০১৭

**
প্রিয় বন্ধু রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী বিক্রম দাসকে উৎসর্গিত।