...এবং ইচ্ছেনদী ও উজ্জ্বলস্নান

নীতা বিশ্বাস



শুধু জমিটুকুই। বিঘে দশেক। ফেরত পেয়েছে ধনঞ্জয় মাইতি। গত বারো বছরের অসহ্য দিনলিপি বইতে বইতে সংসারটি তার হারিয়ে যাবার স্তুপ হয়ে উঠেছে। সেই স্তুপ থেকে রাত্রিময় কান্নার অন্ধকার উঠে আসে প্রতিনিয়ত। মাথার অলিতে গলিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে সর্বনাশী বিলাপ। পাকে পাকে পাক দিয়ে ছোবল উঁচিয়ে দাঁড়ায় ওর ভাগ্যবাগানে। প্রতি ছোবলে ধনঞ্জয় কত যে হারিয়েছে আজ পর্যন্ত! শুধু পরিবারের সম্মানটুকু বুকের নিভৃতে আঁকড়ে রাখতে চেয়েছিল। বুঝতে চায়নি টাকার সঙ্গে সম্মানের জম্পেশ গাঁটছড়ার শাশ্বত সত্যটা। রেস্ত চলে গেলে মানসম্মানও যে তার সহগামী হয়, একথাটা বোঝেনা ধনঞ্জয়ের মতো কিছু মানুষ এখনও। বিপর্যয়ের সাতকাহন দেখে একদিন যুদ্ধের সাইরেন বাজিয়ে দিলো ধনঞ্জয়ের বোউ। বাছা-হারানো বাঘিনী হয়ে নরম সরম বোউটা বেরিয়ে পড়লো রাস্তায়। উঠোনে পড়ে রইলো ধনঞ্জয়ের বিরুদ্ধে তার তীব্র অভিযোগের ফলা টি আর তিন বছরের যমজ মেয়েদুটি। নিত্য আধপেটা শাক-ভাতের জন্য স্বামীর ঘর কোন বোকামেয়ে করে? ফলাবিদ্ধ ধনঞ্জয় নিজেকে ফালা ফালা করে ব্যবচ্ছেদ করেছে। আর ভেবেছে বিঘে-কয়েকের মালিকানার জমিদারী-সম্মান বজায় রাখতে পরিবারকে আধপেটা রাখবার অধিকার তাকে কে দিয়েছে! এই বোঝাটা বুঝতে বড় দেরি করে ফেলেছিল ধনঞ্জয়। বোউ সাবিত্রী সেই যে এককাপড়ে বেরিয়ে গেছে, আজও ফেরেনি। ধনঞ্জয়ের অত সাধের ‘সম্মান’ কে বিশবাঁও জলে থুয়ে সাবিত্রী বেরিয়ে গেছে তার সত্যবানের খোঁজে। অপারগতায় খান খান হতে হতে ধনঞ্জয় তার মেয়েদুটোকে একটু একটু করে বড় হয়ে উঠতে দেখছে শুধু। ওর জমার খাতায় এখন শূন্যের দাপট।
#
শরিকী জমির ন্যায্য প্রাপ্য নিয়ে যে এত টালামাটাল একদিন ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে ওর ভালোমানুষীর ওপর, ভাবতেও পারেনি বোকা ধনঞ্জয়। নিজেকে চাষা বলে তো ভাবেনি কোনোদিন! তিনপুরুষ ধরে জমিদারী একসাথে ছিলো বলে যে জমি ভাগ হবেনা কোনোদিন একথা কি ভাবা উচিৎ ছিল না তার! একালে ঠিকমত বাঁচতে হলে যে সবসময় নিজেকে আপডেটেড রাখতে হয়! দিনকাল থেকে পিছিয়ে পড়ে থাকা ধনঞ্জয়ের মনে এসব চিন্তা উঁকি দিতে জানেনা। তাই ঠকে যাওয়া ওর কপালে অনিবার্য। বারো বছরের কোর্ট-যুদ্ধ তার কাছ থেকে নির্বিঘ্ন সংসারটি কেড়ে নিয়েছে। আজ জিতে জমি ফেরৎ পাওয়ার পর কোনো সেলিব্রেসনের কথাও তার চিন্তায় আসে না। গ্রামে তার কিছু শুভানুধ্যায়িরা তার আনন্দে আবীর হাতে আনন্দ জানাতে এলে, তাদের আনন্দের সম্মান রাখতেই না বলতে পারেনা ওদের। ‘সম্মান’ শব্দটা তাকে আজ বড্ড ভাবায়। জোর করে বংশের সম্মান রক্ষা করতে গিয়ে মানুষ নিজের সম্মান খুইয়ে কেমন ভিখারী হয়ে যায়! বোঝেনা সম্মানের নাম করে যা সে লোকের চোখে টিঁকিয়ে রাখতে চাইছে তা বংশের ঠাটবাটের অহঙ্কার আর চালবাজির আব্বুলিশ। শূন্যঘরে তখন খিদের বৃন্দগান হাততালি বাজায়।
#
মা-হারা মেয়েদুটো কিন্তু মরেনি। কি মন্ত্রে যে ওরা বারো বছরের যুদ্ধ লড়েও অল্পে অল্পে ডাগর লাউডগাটি হয়ে বেড়ে উঠেছে! আধখালি পেটেও! আজ জমি ফেরত পাওয়ার উল্লাসের হররায় ও ভালো করে চেয়ে দেখলো মেয়েদুটোর দিকে। বুক শুকিয়ে গেলো ধনঞ্জয়ের। কি করবে এদের নিয়ে ধনঞ্জয়ের মতো এক ফক্কাবাজ বাবা! এখন
দিনকালের যা দুর্নাম রটছে মুহুর্মুহু বাতাসে! মাথার ছাতা হতে পারবে কি বোকা সোকা বাবাটা ওদের! তবু তারা বড় হয়ে ওঠে শরীরে মনে। বউবিহীন ঘরে ধনঞ্জয় আজ মেয়েদুটোর মৃত্যুকামনায় ঈশ্বরের পায়ে প্রার্থনা রাখে। এখানেও ওদের সম্মানের প্রশ্ন এসে টোকা মারে ওর মাথায়।
বারোটা বছরে জমির সাথে ধনঞ্জয়ের আরো কত কী যে গেছে! বউ গেছে। জমিতে হাল দেবার বলদ দুটো বিক্রী হয়ে গেছে। শান্তির ঘুম ফেরার হয়ে গেছে। দুশ্চিন্তায় শরীর ভেঙে গেছে। মনোবল হারিয়ে গেছে। চাষজমির বদলে এতদিনের পড়ে থাকা অচাষযোগ্য জমিতে কি করে ধানের বীজেরা ভ্রূণ হয়ে উঠবে! বীজধানই বা কোথা থেকে কিনবে! নিজের সম্মান বিকিয়ে আর কত ধার দেনা করবে! ফাঁকা উঠোনে বলদ-বিহীন হাল খানার অলস চাউনি দেখে ধনঞ্জয়ের বুক ভয় হতাশা কান্নার মিশ্ররাগ নামিয়ে দেয় জলপ্রপাতের মতো। জমি যাওয়ার পরে ওর পপাতধরণিতলে হবার বেশিসময় লাগেনি। হাঁড়ি কলসি দেরাজ কিছুই ভরা ছিলোনা তেমন। থাকলেও তা আর কতদিন চলে!
বন্যা নামে সারারাত ধনঞ্জয়ের চোখে বুকে। তোকে কি দিয়ে ফলবতী করবো মা! হাল খানা দেখ একলা পড়ে আছে কেমন। জমিখানাও কি কাঁদলো ধনঞ্জয় মাইতির সাথে! নাকি হাঁসলো গোপনে! মা ধরিত্রীর মালিক কি কেউ কখনো হতে পারে! মালিক গিরি ফলিয়ে তোর বুকে কত ফলার আঁচড় পড়েছে মা। ক্ষমা করিস। আর ও পাপকর্ম করবোনা। হাল টা পড়ে আছে, বলদ দুটোকে রাখতে পারিনি মা। কি খেতে দিতাম ওদের, বল? এবার এ হালও আমি ছেড়ে দেবো।
হাল ছাড়লেই হবে! বলদ নেই তো কি? বাবাকে চমকে দিয়ে হাল তুলে নিয়েছে ধনঞ্জয়ের দুই যমজ মেয়ে। এতদিন দুঃখ টেনেছি। এবার হাল টানবো। সে তো আর দুঃখ-কষ্টের চেয়ে বেশি ভারি নয়! জোয়াল খানি কাঁধে জুতে নিয়ে দিব্যি হাল দিয়ে নিড়েন দিয়ে দুই মেয়ে চকচকে করে তুলেছে জমি। মেয়েদুটির মরণকামী বাপ দেখছে আর ভাবছে, কোথা থেকে গায়ের জোর এসে মেয়ে দুটোর হাত ধরেছে! তবে কি মনের জোরই গায়ের জোর!!! ভাঙামন ধনঞ্জয় জোয়াল বওয়া দুই মেয়েকে দেখে উঠে দাঁড়ায়। উৎসাহ এসে ওর কাঁধে হাত রাখে। ধরিত্রীমাটি যে কর্ষণ চায়, শষ্যের ভ্রূণ পেটে ধরতে চায় তা কি বোঝে না ধনঞ্জয়!
#
হালে জোয়ালে নিবিষ্ট দুই বোন হঠাৎ করে চমকে ওঠে। একি? এরা কারা? কখন এলো?
মেয়ে-বলদ দেখে বিষ্ময়ে গ্রাম কে গ্রাম কখন ভেঙে পড়েছে জমির চারধারে, ওরা বুঝতেও পারেনি। ও ছেলেগুলো আবার এদিক পানে আসচে কেন? এরা তো গ্রামের লোক নয়! ভিডিও ক্যামেরা খুকু টুকু দুইবোনের জোয়ালটানা বিভিন্ন পোজের ছবি বিভিন্ন এ্যাঙ্গেল থেকে তুলতে ব্যাস্ত। সুন্দর জামাপ্যান্ট পরা স্মার্ট একটা ছেলে ভয়ে দাঁড়িয়ে পড়া খুকু টুকুর কাছে এসে দাঁড়ায়। হাতের মাউথপিস ওদের মুখের কাছে বাড়িয়ে দেয়। ওদের কাছে সব বৃত্যান্ত শুনে নেয়। ছেলেটার চোখে অপার বিস্ময়। প্রশ্ন করে, এবার কী ধান বুনবে তোমাদের জমিতে? বাবার কাজ যেন নিজেরাই হাতে তুলে নিয়েছে এভাবে উত্তর দেয় ওরা। বীজধান তো নেই। কিনতেও পারা যাবেনা এবছর। বাবার টাকা তো আর নেই। মামলাতে সব শেষ হয়েছে। কেউ কি আর খালি হাতের বাবাকে টাকা ধার দেবে, বলেন! এখন চট করে খানিক শাক-সব্জী লাগিয়ে দিইচি। বিক্কিরী করে খানিক টাকা হলে তবে বীজধান কেনা। বাপকে দেকিয়ে দিই, পারি। আমরাও পারি। বাপের তো মন ভেঙে গেচে। মন ভাঙা তো কোমর ভাঙা! সবুজ ক্ষেত দেকলে আবার যদি নিজেই দাঁড়িয়ে ওঠে! শুদু তো জমি নয়, বাপকেও তো আমাদেরই দেখতে হবে। বলেন!
-নিজের ওপর এত বিশ্বাস তোমাদের?
-যারা মা বিনে নিজে নিজেই বড় হয়, তাদের তো নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখতেই হবে, বলেন! বিশ্বাসই আমাদের মত গরিবের একমাত্তর ধন। ওটি গেলে আর তো কিছু হবার নয়!
সামনে দাঁড়ানো ওদের বিশ্বাস-হারানো বাবা মেয়েদের কথা শুনে অবাক! এরকম করে ভাবতে আর বলতে শিখলো কবে তার মেয়েরা! পরিস্থিতিই কি ওদের এসব ভাবতে শিখিয়েছ! বলতে শিখিয়েছে!
-আচ্ছা ধরো, তোমরা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারলে, নতুন করে শুরু করলে। বীজধান পেলে সরকারের কাছে। ধান এলো জমিতে। তারপর? কি স্বপ্ন তোমাদের?
-আছে তো নিজেদের এক স্বপ্ন। যখন তখন হাত বাড়ায়। এদিকটায় খানিক স্থিতু হলে... কিন্তু সে স্বপ্ন কি আমাদের দেখতে আছে, বলেন তো দাদা!
খুকুর কথা কেটে টুকু বলে, কেন দেখতে নেই! আমারো তো আছে স্বপ্ন। সেটা আমি দেখবোই। তোরও আছে? খুকু বোনের মুখের দিকে তাকায়। বিষণ্ণ এসে বসে ওর চোখে। কেউ তো আমাদের এরম করে জিজ্ঞেস করেনি কুনোদিন! স্বপ্ন ওদের মনে মনেই বেড়ে উঠেছে। আর কী আশ্চর্য! দুই যমজ বোনের স্বপ্নই এক হয়ে যায়। ওরা সেই পড়ে পাওয়া দাদাটিকে তাদের আশ্চর্য স্বপ্নের কথা, পরম ইচ্ছের কথা বলে দিয়ে শান্তি পায়।
#
হাতের গুণ নাকি ইচ্ছের জোর! ধনঞ্জয়ের খেতমাঠ ভরে উঠেছে মরশুমের শাকসব্জীর বাহারে। তার ফেলনা মেয়েদুটো এ কী করেছে তার জন্য! জোয়াল টানার কষ্ট থেকে শুরু করে... ওরই চোখের ওপরে। ঈশ্বর ওদের আবেদন শুনতে পেয়েছে। কেমন ভরিয়ে দিয়েছে, ছড়িয়ে দিয়েছে ভালোবাসার উপাখ্যান গাছে গাছে!
মাঠভরা নিমগ্ন সবুজের দিকে তাকিয়ে ধনঞ্জয় মাইতি নিজের শরীরেরেও সবুজ শুনতে পায়। পেঁপে গাছটার মত ঋজু হয়ে ওঠে তার শরীর। মালিকানার অহঙ্কার উড়িয়ে দিয়ে চাষির অহঙ্কার মেখে নেয় শরীরে। এবার নিজের সর্বস্ব নিয়ে নেমে পড়ছি। তোর বুকে আমি আমন ফলাবোই। তুই দেখে নিস মা!
#
ধনঞ্জয় আর তার দুই মেয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখে গতরভারি আমনের বুকে দুধ নেমেছে। ক-ত-দি-ন তার এই বন্দি জমিতে এমন মনভরা সুখ অনুপস্থিত ছিলো! যে মেয়ে দুটির জন্য ও মৃত্যু প্রার্থনা করেছিল, আজ তাদের মধ্যে ধনঞ্জয় মা বসুন্ধরার স্নেহ ভালোবাসা আদরের প্রতিমূর্তি দেখতে পেয়ে আনন্দে লজ্জায় মুখরিত। পোয়াতি ধানশিষ আজ ওই বাপ বেটির বুকে কী যে স্বপ্ন-আহ্লাদের চৈ চৈ বুনে দেয়! খুকু টুকু’র স্বপ্ন ওই ধানের শিষে বসে দুলে দুলে ঢেউ খেলে হাসছে।
# ধনঞ্জয় মাইতি কোথায় গো। তুমার নামে রেজিস্টারি চিঠি আচে। চুড়ান্ত মোবাইল ফোনের যুগেও এ গ্রামে কখনো কখনো ডাক-পিওনের পদধুলি পড়ে। ডাক-পিওনের ডাক শুনে ভয় এসে সাপটে ধরে ধনঞ্জয়কে। আবার বুঝি ফেরত পাওয়া জমি কেউ কেড়ে নিতে এলো! নাম সই করে রেজিস্ট্রি চিঠিটি ছাড়িয়ে নেয় ধনঞ্জয়। কিন্তু খামের ভেতরের চিঠির লেখাগুলো বুঝে ওঠা সাধ্যে কুলোয়না। মিড-ডে-মিলের হারাণ স্যারের কাছে খুকু-টুকু ছোটে চিঠির মর্মোদ্ধারের আশায়। চিঠি পড়ে তিনি এক আশ্চর্য খবর দেন তাদের।
#
আজ ধনঞ্জয় মাইতির জোয়াল বওয়া মেয়ে দুটো রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রীর কাছে যাচ্ছে। সরকারী লোক পাঠিয়ে দিয়েছেন তিনি ওদের সদরে নিয়ে যাবার জন্য। প্রেস-রিপোর্টারের কাছে গ্রামের এই দুটি মেয়ের ছবি দেখে আর ওদের ভবিষ্যত-স্বপ্নের কথা শুনে আর দেরি করেন নি তিনি। ওদের থাকা-খাওয়া আর স্বপ্নের ওয়েটলিফটিং এর কোচিং এর দায়িত্ব সব সরকারের। এরকম আশ্চর্য কথায় বাপ আর মেয়েদের চোখ অথৈ...। চোখের জলও এত আনন্দের হয় ওরা জানতো না। উঠোনে রাখা হাল খানির দিকে তাকায় ওরা। ওমা তার চোখেও যে হিরের দানার মতো জ্বলজ্বল আনন্দ!
#
এশিয়ান গেমসে প্রতিযোগির চান্স পেয়ে খুকু-টুকু ভাবছে ভাগ্যিস হাল-জোয়ালের বলদ ছিলোনা! জোয়ালটাই তো আমাদের স্বপ্ন-উড়ানের পাখা! আমাদের ইচ্ছেনদীর গান...