অনিবার্য হেঁটে চলা

রুমা মোদক



ঊল্টো পথে চলা
শৈশবের আমিটা না চাইতেই পেয়ে গেছি স্টিলের একখানা স্যুটকেস। পাশের সম্পন্ন ঘরের ঘোষেদের মেয়েটি যেমন নিয়ে হাঁটে। হাতলে ঝুলে থাকা অহংকার পিছু ছাড়েনা তার। আর আমার স্যুটকেসের ভিতরে একগাদা বই নয়, স্বপ্নরা বন্দী। যাবে কই? তালায় আটকানো স্বপ্নগুলোর কোন পথ নেই আমার অনুগামী হওয়া ব্যতীত। তারই নির্দেশিত পথে কৈশোরটা মুক্ত হয়ে যায় নিষেধের বেড়াজাল থেকে। মা পায়ে পরায় না বিধি বিধানের শৃংখল।খেলার সাথীদের সাথে আর রচিত হয় না কোন যোজন দূরত্ব। হারায় না আমার পাড়াময় দুরন্ত ছুটে চলা।
যৌবনের প্রেমিক প্রথম ঠোঁট ছুঁয়ে জানায়, আজীবন হাতটা ধরে রাখবে, সংকটে - সম্পন্নে। এই ঘটমান বর্তমানে ঘুমের মধ্যেও তার ভরসার স্পর্শ টের পাই কপালে।
ছাত্রীবেলায় যখন খাতার পাতা ভর্তি করে সবাই জীবনের লক্ষ্যে লেখতো ডাক্তার হয়ে দাতব্য চিকিৎসায় দেশের মানুষের জীবন আমূল পাল্টে দেয়ার স্বপ্ন,কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে উন্নতির শিখর ছুঁয়ার প্রত্যাশার খুব সাদামাটা শিহরণহীন বৃত্তান্ত, তখন আমার ইচ্ছেডানায় লুকিয়ে থাকা স্বপ্নেরা বলে দিতো আমার গোপণ বাসনাদের। ঘটমান বর্তমানে বাসনার কলম ছুঁয়ে সত্যি জন্ম নেয় অপু- দুর্গা। বেড়ে উঠে কুমু- কুসুম- মাধবীলতা।মনের অলিন্দে ডানা মেলা ইচ্ছেপাখিদের অবিরাম কিচিরমিচির,কোথাও থমকে যাওয়া নেই, হোঁচট খাওয়া নেই।সম্রাজ্ঞী হওয়া নয়, রাজকন্যাদের মতো ঘোড়ায় চেপে আসা রাজপুত্রের আকাংক্ষা নয়। বিত্ত-বৈভবের জৌলুস নয়, নয় অসম্ভবকে সম্ভব করার কোন অলৌকিক বাসনা।টানাপোড়েনের দুশ্চিন্তাহীন সাধ্যের চৌকাঠ না ডিংগানো কিছু সাধারণ স্বপ্ন, সাধারণ মেয়ের।
জীবনটা যদি ইচ্ছেপাখির ডানায় ভর করে উল্টে যায়, সব বর্তমানকে অস্বীকার করে বেমালুম। এর চেয়ে বেশি কিছুই প্রত্যাশা ছিলোনা আমার জীবনের কাছে।
" অবরুদ্ধ খাঁচায় যে পাখির অস্থির হাহাকার,ক্ষোভের অগ্নিদণ্ডে হয়তো সে দেখতে পায় যেন সে ডানাকাটা "
ইচ্ছেপাখিরা স্বাধীন। আমাদের এইসব সামাজিক জীবন সত্তার নিয়ন্ত্রন শাসিত, পরাধীনতার সীমান্ত ছুঁয়ে তারা উড়ে যায় অধরা আকাশে,বারবার।তার ডানামেলা পাখার ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে বেঁচে থাকা অজস্র মূহুর্ত জুড়ে।আমার জীবন পড়ে থাকে অপূর্ণ ইচ্ছের ঘেরাটোপের আচ্ছন্ন বেদনায়।আমার ইচ্ছেপাখিদের প্রবেশাধিকার বারবার হুমড়ি খেয়ে পড়েছে মুখ থুবড়ে, ইচ্ছে পাখিরা উড়ে গেছে।আমি স্বপ্নভংগের বিষন্ন বেদনায় আঁচল পেতে বসেছি তাদের ফেলে যাওয়া ছায়ার আয়তন গুণতে।এক---দুই-----তিন------ফ রাতে থাকে জীবনের আয়ুরেখা, মাপা হয় না ইচ্ছেদের দৈর্ঘ্য প্রস্থ।বড় বেয়ারা এই ইচ্ছেপাখিরা। এতো যে বাঁধা, এতো যে বিপত্তি, থমকে পড়া, ফিরে যাওয়া,তবু হার মানা নেই।
পাক ধরা চুলের শুভ্র আভা গায়ে মেখে,কপালের ভাঁজ থেকে বারবার সমস্ত ক্লান্তির ছায়া বেমালুম গায়েব করে তারা বারবার হানা দেয়। এই ইচ্ছেপাখিরাই বুঝি বাঁচিয়ে রাখে একটা জীবনকে।ইচ্ছেপাখিরা বেয়াড়া না হলে জীবন বুঝি আর জীবন থাকে না। যতোই সে বাঁধা পেয়ে ফিরে যাক বারবার, ফিরে যাক ফিরে যাক অনন্ত অসীমের পাণে আমার জীবনকে অসার্থকতার বেদনায় সিক্ত করে,অধরা জেনেও তবু আমি অপেক্ষায় থাকি তারা ফিরবে আবার, ফিরবেই আমার কাছে, নানারূপে, নানারংএ বারবার। ইচ্ছেপাখিরাই যে প্রতিস্থাপিত হয় জীবনের অন্যনামে।
"দুপায়ে শিকল বাঁধা পাখি, তবু সে গলা ছেড়ে কণ্ঠ খুলে গায়"
অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাসে ডুবে থাকি দিনমান।সাফল্যের প্রচলিত সংজ্ঞার ফিল্টারে ছেঁকে নিজেকে আবিষ্কার করি পরাজিত সৈনিক এক,ধুঁকে ধুঁকে কাটিয়ে দেয়া জীবনের ভার পিঠে নিয়ে চলি দুর্বহ।আমার কলম জন্ম দেয়নি কোন অপু-দুর্গা। প্রতারক প্রেমিকের হাত স্বেচ্ছা বাঁধা পড়েছে অন্য নারীর বাহুডোরে,কৈশোর বন্দী হয়েছে কঠোর নিষেধের বেড়াজালে,শৈশব পায়নি সেই স্যুটকেসের মালিকানা। জীবন জুড়ে কেবল অসফল আঁকিবুঁকি, অনিচ্ছার,অনীহার।
তখনই একদিন দেখা তাঁর সাথে, চামড়া যতোটা কালো হলে প্রকট হয় এথনিক পরিচয়, ততোটাই নিয়ে সে বসে আমার মুখোমুখি। আচ্ছা, তোমার ইচ্ছেপাখিরা কী কখনো হুমড়ি খেয়েছে তোমার মায়ের প্রেমিকের গায়ে? আমি থমকে যাই, চমকে তাকাই।কী অসভ্য প্রশ্ন!মৃত স্বামীর সাথে জলন্ত চিতায় ভস্ম হওয়া ঐতিহ্য যে মায়েদের, তাদের প্রেমিক? অকাল বৈধব্যের কঠোর সংযমে জীবনের পর জীবন কাটিয়ে দেয়ার যে উত্তরাধিকার মায়েদের প্রেমিক? শোনো মেয়ে তোমাদের সাথে আমাদের বিস্তর ফারাক জীবনবোধের। তবে এ কালের বিচারে প্রগতি- অপ্রগতির দ্বন্দ্বে অবদমনের কষ্ট থেকে এ মুক্তির প্রত্যাশা খুব অস্বাভাবিক লাগে না। মুঠো খুললেই যেখানে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে বিশ্ব, হাজারটা ডাক নিয়ে হাত বাড়ায়-----। কিন্তু আমাদের মায়েদের কালের সাথে তার যোজন দূরত্ব।
মাথার চুল যতোটা কুঁকড়ো পেঁচিয়ে জড়িয়ে রাখে সুষ্পষ্ট জাতিগত পরিচয়, ঠিক ততোখানি স্পষ্ট পরিচয় নিয়ে সে জানায়- জানো মাত্র আট বছর বয়সে মায়ের প্রেমিক ধর্ষন করেছিলো আমাকে? হতবাক বিস্ময় অক্টোপাসের মতো বেষ্টন করতে চায় আমাকে,ধুসর অর্থহীন হয়ে যায় নিজের অন্ধকার সন্ধ্যাগুলি। সেই যে একটা সন্ধ্যা, একমুঠো ঘুমের ওষুধ নিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম বারান্দার ওপাশে-----, ব্যার্থ জীবনের আক্ষেপে।তারও আগে একটা ভীষন ভালো লাগার মতো সন্ধ্যার সাথে তুলনার আক্ষেপে, যেদিন প্রেমিক লিখেছিলো "একটু দাঁড়াবে বারান্দায়,কনে দেখা আলোয় দেখবো তোমাকে----"। কী ভীষন সমস্ত তোলপাড় করা আকর্ষন সে আহবানের,অসম্ভব এড়ানো।এমন করেও ডাকে কেউ? একটা কনে দেখা সন্ধ্যা,পলকের নজর বিনিময়। তারপর পুরো রাত শয়নে স্বপনে জাগরণে কেবল তারই পুনরাবৃত্তি।তারও আগে কাটানো একটা সন্ধ্যার তুলনার আক্ষেপও ছিলো প্রতারিত হওয়ার দু:সহ যন্ত্রণা নিয়ে,সেই যে একটা প্রিয় স্বপ্নের মতো সন্ধ্যা, দুই টাকার বাদাম চিবুতে চিবুতে হাতে হাত রেখে সবুজ ঘাসের গালিচায় আগামীর অনিঃশেষ বিভোরতা। আর আরো একটা অচেনা সন্ধ্যা। বিভীষিকার মতো ভয়াবহ সন্ধ্যা,যে সন্ধ্যায় স্বপ্ন বিশ্বাস সব ভেংগে চুরমার করে দিয়ে প্রেমিক উপগত হয় আমাতে, ইচ্ছার বিরুদ্ধে আধিপত্যের জোর নিয়ে, সুযোগের সুযোগে।বিপুল শিহরণময় স্পর্শের অপেক্ষা হত্যার চেয়ে দুর্বিষহ হয় প্রতারিত হওয়ার যন্ত্রনা, এই মানুষটার কাছে সমর্পণ করেছিলাম নিজের অমূল্য স্বপ্ন, এর হাতে রেখেছিলাম ভরসা আর নির্ভরতার আগামী? নিজের প্রতি নিজের ধিক্কারে অনাগত জীবন দুর্গমতা নিয়ে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলো ইচ্ছেপাখিদের।
ফেলে দেয়া ওষুধগুলো দাঁত কেলিয়ে হাসে।ভাগ্যিস বেঁচে থাকার ইচ্ছেপাখিরা সেদিন প্রচণ্ড লড়াই করেছিলো হরণের সর্বগ্রাসী বেদনার সাথে। তাইতো আজ বেঁচে থাকা অমূল্য মূহুর্ত বড় তুচ্ছ,পলকা আর মূল্যহীন করে দেয় নিজের অভিজ্ঞতাকে তাঁর অভিজ্ঞতার কাছে। বেঁচে থাকার ইচ্ছেপাখিরা তুমুল টেনে তুলে এনেছিলো বলেই না জীবন আজ আপেক্ষিকতার পরিমাপে অমূল্য আস্বাদের হয়ে উঠেছে।
"ভয়ের অন্ধকার ছেড়ে আমি উত্থিত হই"
চেপে যাওয়ার মতো,প্রকাশ্যে না বলে দেয়ার মতো সেই দুর্ঘটনা প্রকাশ করে দিয়েছিলাম বলে, ধর্ষক লোকটির জেল হয়েছিলো, খুন হয়েছিলো আমারই স্বজনদের হাতে। সত্যকে প্রকাশ করে দেয়ার দুর্বিনীত সাহস আর ধর্ষকের খুন হয়ে যাওয়ার অপরাধবোধ, দুয়ের দ্বন্দ্বে ছিন্নভিন্ন আমি নির্বাক নিশ্চল কাটিয়েছি জীবনের মূল্যবান বছর কয়েক।সেখান থেকেই জেগে উঠেছি আমি, ফিনিক্স পাখির মতো জীবনের দুর্ঘটনার দুঃসহ অভিজ্ঞতা ঠেলে। সে জানায়।
আহা,পরাজিত হবার বিপুল বিষন্নতায় নিমজ্জিত দিনগুলি আমার। আত্মবিশ্বাস হারানো জীবনকে নিরর্থক ভাবার দিনগুলি আমার!বুকের গহীনে গোপণ স্বপ্নের তাড়ায় ইচ্ছেপাখিরা অদম্য ডাকে, আমি ক্লান্ত পদক্ষেপ রাখি কতো দরজায় দরজায়,ঘনায়মান আঁধারে ঢেকে যাওয়া স্বপ্নের ক্যানভাসে কেউ একফোঁটা রংএর আঁচড় কাটে না।কেউ আশ্রয় দেয়না, প্রত্যাখ্যানের বেদনা প্রবল হত্যা করে, করতেই থাকে স্বপ্নদের।ভাগ্যিস ইচ্ছেপাখিরা হাল ছাড়েনি তবু।প্রবল পরাজয়ে তবু তাদের ডানার ছায়া ধরে আবার হাঁটি, আবার দাঁড়াই, আবার হাঁটি। জানি গন্তব্যে পৌঁছানো অনিশ্চিত জেনেও এই হেঁটে চলাই অনিবার্য জীবন।
"আশ্চর্য সুন্দর ভোরের ভিতর আমি উত্থিত হই"
অতিক্রান্ত দেড়যুগে আমূল পাল্টে গেছে পৃথিবী, তালেবানী নৃশংসতা থেকে অকল্পনীয় নির্মমতার আইসিস, বোকো হারাম। চোখের সামনে বদলে যেতে থাকা আমূল দুনিয়া দেখতে দেখতে নিজেকে দেখি,হেরেছি কই? জীবনের পথে অবিচল হাঁটতে থাকার নাম জীবন,বেঁচে থাকার লড়াই জারি রাখার নাম জীবন।
কোন একদিন কলম থেকে জন্ম নেবে অপু-দুর্গা, কুমু- কুসুম- মাধবীলতা, এই স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখার নামই জীবন।
আমার বেঁচে থাকার ইচ্ছেপাখিদের ডাক অগ্রাহ্য না করার নাম জীবন।
(আফ্রো- আমেরিকান কবি মায়া এঞ্জেলোর জীবনের ছায়া ও কাব্যাংশ অবলম্বনকৃত)