যদি

সুদীপ চট্টোপাধ্যায়



আলোর একটা বিন্দু প্রতি সেকেন্ডে একলক্ষ ছিয়াশিহাজার কিলোমাটার বেগে ছুটে চলেছে।তার থেকে গতিশীল আর কিছু নেই। ধরা যাক আছে। ধরা যাক একটা পাখি, যার নাম ইচ্ছে, মানবসভ্যতার শুরু থেকেই ছিল, এখনও আছে। আমরা এও ধরে নিলাম ওই পাখি নিজের খেয়ালে উড়াল দেয় এই পৃথিবী থেকে সমস্ত আকাশবস্তুতে তথা মহাবিশ্বে এবং অবশ্যই আলোর গতিবেগের দ্বিগুণ গতিতে।
এখন আমরা কিছুক্ষণের জন্য এই অবিশ্বাস্য গতিবেগসম্পন্ন পাখিটির থেকে মনকে সরিয়ে নিয়ে যাব ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দের ২৩শে জুন, বাংলার তৎকালীন রাজধানী মুর্শিদাবাদের দক্ষিণে ভাগিরথীর তীরে পলাশীতে। সেখানে তখন লেখা হচ্ছে বাংলার ভবিষ্যৎ। হাতবদল হচ্ছে বাংলার। একটি বিদেশি জাতির হাত থেকে আর একটি বিদেশি জাতির অধীনে যাচ্ছে বাংলা, সম্পূর্ণরূপে। মাত্র এগারো ঘণ্টার যুদ্ধ। ষড়যন্ত্রমূলক, বিশ্বাসঘাতী।
ওই এগারো ঘণ্টা ধরে সূর্যের যে আলো এবং তার প্রতিফলন মেখেছিলেন মির্জা মোহাম্মেদ সিরাজ উদ-দৌল্লা, সেই আলো তো সিরাজকে ছুঁয়ে সেকেন্ডে একলক্ষ ছিয়াশিহাজার বেগে পাড়ি দিয়েছিল পলাশী ছাড়িয়ে, মুর্শিদাবাদ ছাড়িয়ে, বাংলা ছাড়িয়ে, ভারত ও পৃথিবী ছাড়িয়ে, অভিকর্ষবলকে মান্যতা না দিয়ে অসীম শূন্যের দিকে। সেই গতি তো আজও অব্যাহত। আজও এই মহাবিশ্বের কোথাও সেইসব আলোকবিন্দু(যার মধ্যে তরঙ্গ ও কণা দুইয়েরই ধর্ম বিদ্যমান)ধাবমান। কিন্তু সেই যুদ্ধের ফল তো আমাদের অভিপ্রেত ছিল না, এখনও নয়। তো, আমরা এই ২০১৭-তে দাঁড়িয়ে কি পারি না সেই ২৬০ বছর আগে ঘটে যাওয়া যুদ্ধের ফলাফলকে পালটে দিতে! যে সময় হত্যা করা হয়েছিল সিরাজকে, ঠিক তার আগে যে আলো বা ফোটোন সিরাজকে ছুঁয়ে পাড়ি জমিয়েছিল অসীমের উদ্দেশ্যে, এই মহাবিশ্বের কোথাও না কোথাও সে এখনও গতিশীল। এখন, আমাদের ইচ্ছেপাখি যদি আলোর দ্বিগুণ গতিবেগ নিয়ে আজ থেকে তার পিছু ধাওয়া করে, ঠিক ১৯৫ বছর পর ধরে ফেলবে তাকে, দাঁড়াবে তার সম্মুখে। তখন সে, দেখার নিয়ম অনুযায়ী, ওই আলোর পথ ধরে দেখতে পাবে বন্দি সিরাজকে, ঠিক হত্যার আগের মুহূর্তের সিরাজ।
আমাদের তো বরাবরের ইচ্ছে সিরাজকে বাঁচিয়ে তোলার, তাঁকে বিজয়ী দেখার। অথবা এমন কোনও উপায় আবিষ্কার যার ফলে হল না কোনও যুদ্ধ। ঘটল না কোনও রক্তক্ষয়, কোনও প্রাণহানী। তো, সেই ইচ্ছে পাখিকে দিলাম না হয় এমন কোনও ক্ষমতা, যার ফলে সে ওই আলোকবিন্দুর সামনে দাঁড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল বিগত পালাশীর যুদ্ধকে, স্থাপিত হল সন্ধি।ক্লাইভ ফিরে গেলেন তাঁর সৈন্যসামন্ত নিয়ে। কিন্তু ঠিক তার পরের যে আলো মৃত সিরাজকে ছুঁয়ে পাড়ি দিয়েছিল মহাকাশে, সেই আলোও তো কিছুক্ষণ পরে ওই ইচ্ছেপাখির চোখে পড়বে, তখন সে দেখবে সিরাজ মৃত। আবার একটু উড়ে গিয়ে সে যখন প্রথম আলোর সামনে আসবে, দেখবে সিরাজ জীবিত। এভাবে চলবে এক অদ্ভুত খেলা। জীবিত ও মৃত অবস্থার থাকবে না কোনও গুরুত্ব। থাকবে না ব্যাক্তির কোনও একক অবস্থান। সে হয়ে উঠবে অনেকটা কোয়ান্টামের মতো। আলোর নির্দিষ্ট অবস্থান অনুযায়ী সেই পাখি একজনকে কখনও জীবিত কখনও মৃত দেখবে। আবার সময়ের থাকবে না তেমন গুরুত্ব। কয়েকশো বছর আগে যে মানুষ মৃত। আলোর রেখা ধরে তাকেই আমরা দেখব জীবিত। আমরা জানি আলোর থেকে বেশি গতি পেলে কোনও বস্তুর সমস্ত ভর এনার্জিতে পরিণত হয়, ফলে সে আর ম্যাটার রূপে অবস্থান করবে না, কিন্তু ইচ্ছে তো বাস্তবের বা বিজ্ঞানের কোনও নিয়মের ধার ধারে না। সে এতটাই স্বাধীন। তাই বাস্তবে যা কোনওদিন ঘটা সম্ভব না, তা কল্পনায় অবশ্যই হতে পারে। তাই আমরা ইচ্ছেডানায় ভর করে মানবসভ্যতার পূঁতিগন্ধময় কলঙ্কিত ইতিহাসকে মুছে ফেলে, সৃষ্টি করতে পারি ইতিবাচক মিলনান্তক ফলাফল, যা এক সুন্দর স্বাস্থ্যকর মানবসভ্যতাকে নির্দেশ করবে