ইচ্ছে আগোছালো

শতাব্দী দাশ



উমনো ঝুমনো মেয়ে নাটক নাটক খেলছিল উপরতলায়। ওদের নাটকের ওয়ার্কশপ, সে ভারি মজার। মায়েরা নিচে অপেক্ষমান। একজন উঁকি দিয়ে এসে খবর দিলেন, ''স্যার বলছেন- যে যার প্রিয় পশু হয়ে দেখাও দিকিনি, তার ডাক নকল কর দিকিনি! শুনে এক মেয়ে বলেছে, তার প্রিয় পশু পক্ষীরাজ। স্যার ঘাবড়ে বলছেন- পক্ষীরাজের ডাক তো শুনিনি কখনো!''
যে মায়ের হাতের খবরের কাগজ অমনি প্রজাপতি হয়ে গেল, সে নির্ঘাৎ জানে , কোন সে মেয়ে ! এইসব হাবিজাবি ইচ্ছেদানা কোন মগজে সার-জল পায়, সে জানে। ছুটি হলে সে মেয়ে নেমে আসে। উঁকি-দিয়ে-আসা গার্ডিয়ান চিনিয়ে দেয়, 'এই তো, এই তো সেই মেয়ে! ' সবাই হো হো হেসে ওঠে। পক্ষীরাজ বুঝে পায়না লজ্জা পাবে কিনা! মা বলে, 'আমি তো জানতাম, তুই-ই। আর কেউ হতেই পারেনা! ডাকটা কেমন, শুনিয়ে দে তো!' ছোটো বাহুদুটো তখুনি ডানা হয়ে যায়। ডানা হাওয়া কাটে। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে ছোট শরীর ঈষৎ ওঠে নামে। মিহি গলা কাঁপিয়ে পক্ষীরাজ হ্রেষারব তোলে।
ক্লাস ফাইভের মুস্তাকিন একদম প্রথম দিনই ব্যাপার খোলসা করে দিয়েছিল। ভরা ক্লাসে বলে দিয়েছিল, আর কিচ্ছু নয়, সে ফুটবলারই হবে। সে 'বড় ক্লাবে' খেলতে চায়। সেইদিন থেকে তাকে দু আঁজলা বেশি ভালবাসেন যে ম্যাডাম, তিনি জানেন, মুস্তাকিন বড় হতে হতে যুবভারতীর আরো কিছু পলেস্তারা খসবে, ময়দানে চুনী গোস্বামীর মূর্তিতে শ্যাওলা ধরবে। 'বড় ক্লাবগুলো ' তাদের অন্ধকার নিয়ে কর্পোরেট আলোয় হারিয়ে যাবে। কিন্ত ক্লাস ফাইভের মুস্তাকিন বৃষ্টি পড়লে বল খোঁজে। ছুটির পর বল চাইতে এলে স্যার মস্করা করে জিজ্ঞেস করেন, 'বলতে পারবি বলের কটা তল?' মুস্তাকিন এসব বোঝে না। সে বোঝে সবুজ মাঠ, বল আর গোলপোস্ট। রোজ রোজ গোলপোস্টে বল ঢোকাতে পারলেই তাকে খুঁজে নেবে কেউ না কেউ। 'বড় ক্লাব' থেকে ডাক আসবে। সহজ ইচ্ছে আর সহজতর বিশ্বাস নিয়ে বৃষ্টির মাঠে দাপায় মুস্তাকিন।
আটাশ বছরের জিয়ার ভারি ইচ্ছে ছিল, অঙ্কুশের- সাথে একটা ছবি তুলবে। সিনেমার অঙ্কুশ। সে ছবি তাদের বসার ঘরের শেল্ফের মাথায় এখন। নতুন কেউ এলেই আটাশ বছরের জিয়া, যার মনের বয়স বাড়ে না খুব একটা কোনো জিনগত গোলমালে, বারবার চেষ্টা করে অতিথির চোখ ওই ছবির দিকে ফেরাতে। 'টিভিটা চালিয়ে দাও তো মা। এই যে তুমি , টিভির সামনের ছবিটা... দেখেছ?' ছবিতে পৃথুলা জিয়া তার বিসদৃশ মুখটি আলো করে বসে আছে। পিছন থেকে কাঁধে হাত রেখেছে নায়ক। 'আমাকে তো ওরা স্টুডিওতে নিয়ে গেছিল, রিয়ালিটি শো-এর শুটিং-এ, জানো? এমনিতে হয়ত দেখা করত না, যখন শুনল জিয়া বলে একটা অসুস্থ মেয়ে....' জিয়ার অসুখ, অক্ষমতা তখন তার ইচ্ছেপূরণের দরজা । সেই মুহূর্তে জিয়ার সেসব নিয়ে খারাপ লাগা নেই। সরু গলির একফালি ঘরে আটকে পড়া জিয়া জানে,শরীরে জোয়ার ভাঁটা আসে যায়, বহুদিন হল। শরীরের ইচ্ছে পায়। রাতের নীল আলোয় যুগল-ছবি থেকে নেমে কেউ তাকে আদর করে যায়।
অগস্ত্য চার বছর নিরুদ্দেশ ছিল। শহরে ছিল না। কলেজে ছিলনা। ফেসবুকেও না। সে বন্দুকের নলে দিনবদল খুঁজতে গেছিল। দুহাজার ছয় কি সাত সাল নাগাদ সত্তরের অসমাপ্ত অভ্যুত্থানের দরজায় কড়া নাড়তে গেছিল । নেতা মরে গেলে, নেত্রী ধরা পড়লে ওরা বাড়ি ফেরে ভাঙা ভাঙা ইচ্ছে প্যাক ক'রে। এসে দ্যাখে,বন্ধুরা থিতু হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলছে। ডিস্ট্যান্সে গ্র্যাজুয়েশন করতে করতে, কন্টেন্ট লিখতে লিখতে অগস্ত্য তাও ইচ্ছেকে জিইয়ে রাখে। একদিন, একদিন সুযোগ আসবে। ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে। যুদ্ধের পর কী হবে , লাল ভোর আসবে কিনা, সেইসব এখন আর জোর দিয়ে সে বলতে পারে না। সে শুধু চায়, যুদ্ধটা বাধুক এবার । একটিও প্রাণ গেলে, তার যাক। কিছু একটা তাৎপর্য জোর করে সেঁটে দিতে চায় সে তার চার বছর পিছিয়ে পড়া জীবনে।
ভিক্টোরিয়ায় ঝিলপাড়ে যারা ফ্যাঁচফ্যাঁচ করছে একে অপরের বাহু জড়িয়ে, তারা শুধু চায় বিয়ে করতে। এই যে বাড়িতে মানছে না, এই যে ওরা দুজনেই সদ্য বাইশ-তেইশ, এই যে দুদিন দেখা না হলে মন বেয়ে শরীরও উচাটন- এমন টানটান চিত্রনাট্য তো বিয়েতেই শেষ হয়, তাই না ? চুমু থেকে জেগে, ওরা নুড়ি-কোড়ানো কোনো বালিকাকে দ্যাখে। হেসে ফ্যালে। কে না জানে প্রেমে পড়লে না-হওয়া সন্তানের নাম দিতে ইচ্ছে হয়!
তারা দ্যাখে নুড়ি-কোড়ানো বালিকার বাবা-মায়ের ভীষণ সুখী মুখ। এরকমই তো হতে চায় তারা! এরকমই শান্ত, তৃপ্ত। প্রাচীন পরী হাসে তাদের ইচ্ছেদের প'ড়ে। বালিকার বাবা-মারও এরকম বোকাসোকা ইচ্ছে ছিল, যখন তাদের প্রথম আসা যাওয়া এ'তল্লাটে। এখন মাঝেসাঝে আসে তারা প্রয়োজনে। একজনের শিশুর কাস্টডি। অন্যজনের মাসিক মোলাকাতের বন্দোবস্ত। মোলাকাতের জায়গাও তো চাই! অগত্যা ফেলে আসা পথঘাট, মাঠপ্রান্তরে আগের মতো আসে তারা। এরা বিচ্ছেদ চেয়েছিল ততটাই গভীর আর একরোখাভাবে, যতটা জেদী ইচ্ছেতে তারা একদিন বিয়ে করে ফেলেছিল। আরে , এক মিনিট! এই নুড়ি-কোড়ানো বালিকাটিই তো ইচ্ছে হলে পক্ষীরাজ হয়ে যায় আর তাই তার মায়ের হাতের জীর্ণ খবরের কাগজ কখনো সখনো হয়ে যায় প্রজাপতি ।
*************
ঈষৎ দূরত্ব থেকে নানা কিসিমের ইচ্ছেদের এই যে তুমি দেখলে , প্রকৃতপক্ষে তুমি কিন্তু জানো, কোনোকিছুই সেভাবে তোমাদের কারো হাতে নেই। ইচ্ছে আর সত্যির মাঝের জিকজ্যাক রাস্তাটা তুমি বিলক্ষণ চেনো। যেমন ধর, হয়ত কোনো দিন ট্রেনের জানলা দিয়ে দেখতে চেয়েছিলে খালি-গা শিশুদের হাত নাড়া, মাঠে চরে বেড়ানো হৃষ্টপুষ্ট গাভী, কড়াই-তোলা বধূ, সূর্যমুখী ফুল। তার বদলে দেখে ফেললে ছাই ছাই রঙা মেঘ , যে মেঘ হাতির মতো শূঁড় তুলল আর তারপরেই তার বৃংহন! আকাশের গায়ে তার লম্বা বাঁকা দাঁত ঝিকিয়ে উঠল। এইসব দেখবে সেদিন, তুমি তা ভাবো নি তো! তোমার হাতে ছিলই না। তবু দেখে ফেললে। বললে 'বাহ্'!
কিংবা ধর, কোনো বসন্তদিন। কল্যাণপুরের প্ল্যাটফর্মের গায়ে যে গাছটা, সেখানে পলাশ ফুটেছে নির্ঘাত, ভাবতে ভাবতে চলেছ। দেখবে বলে গলা বাড়িয়ে দিলে জানলা থেকে যাওয়ার পথে? দেখতেই পাবেনা। কেউ একজন হ্যাঁচকা টান মেরে বলবে হিসহিসিয়ে , ''গলা বাড়িওনা, কাল রাতে জানো কী হয়েছে?'' কী বা এমন হল? রাতের শেষ ট্রেনে ফিরছিল যে পার্লারের মেয়ে, কেউ অ্যাাসিড মেরেছে তার মুখে। প্ল্যাটফর্ম থেকে। না-দেখা পলাশ ফুল তো আগুন হয়ে যায় তখন! আগুন তোমারও মুখ পুড়িয়ে দেয়। গা ঝলসে দেয়। চামড়া নিমেষে গুটিয়ে, কুঁকড়ে যায়। এরকমই তো হয়, যখন কিছু ইচ্ছে কর তুমি। কোনো মানে নেই তোমার ইচ্ছের কিংবা ঘটনাপ্রবাহের। শুধু গোঁয়ার দিন রেললাইন বরাবর হু হু ছোটে । তারপরের দিনটাও। পরের দিনটাও। যে দৃশ্যপটে খোদাই করা আছে তোমার নাম , তুমি তাতেই বাঁচবে, তা-ই মাখবে গায়ে,তা-ই দেখবে। নাহলে বুজে ফেলতে পার চোখ, আবেশে বা অসহায়তায় । কিংবা আদৌ খোদাই করা আছে কি কিছু কোথাও? নাকি অনুপুঙ্খ বিন্যাস খুঁজছ এমন এক পৃথিবীতে যেখানে অবিন্যাসই একমাত্র বিন্যাস? "I am searching clarity and meaning in a world that fails to offer both." -তাই নয় কি?
অসঙ্গতির পৃথিবীতে ইচ্ছেপূরণের ছোটোখাটো পরিধি বুঝতে পারলেই বুঝি নিরাসক্তি আসে! ক্ষুদ্রতার ধারণা থেকে মৃত্যু-ইচ্ছা জাগে? সেও তো একরকম তীব্র ইচ্ছে। ফ্রয়েড যাকে বলেছেন, থানাটস বা ডেথ ড্রাইভ। কীটস নাইটিংগেলের গান শুনতে শুনতে মরে যেতে চেয়েছিলেন । পাখিটির গান তাঁকে নশ্বরতা, রোগব্যাধি আর ফ্যানি ব্রাউনের প্রত্যাখ্যানের ঊর্ধ্বে অবিনশ্বরের কাছাকাছি কোথাও নিয়ে গেছিল, যেখান থেকে ক্ষয়ের পৃথিবীতে ফিরতে তাঁর আর ইচ্ছে করছিল না। রবীন্দ্রনাথ জেনেছিলেন মৃত্যু প্রেমাস্পদ,শ্যামসমান ; তার কাছে জীবনের সাবলীল আত্মসমর্পণ। 'বেল-জার'-এ আবদ্ধ সিলভিয়ার দেশে মধুর গ্রীষ্ম আসে মৃত্যুর আরাম নিয়ে- ''A summer calm laid its soothing hand over everything, like death.” জীবনানন্দের কবিতাতেও থাকে 'বিপন্ন বিস্ময়ে' ক্লান্ত কেউ, তাই 'মরিবার হল তার সাধ'।

আবার এভাবেও ভাবা যেতে পারে। অর্থ বা বিন্যাস যখন নেই-ই , সুদূর, চকমকি সব অসম্ভব ইচ্ছে পোষার সেই কি সঠিক উপলক্ষ নয় ? ইচ্ছেপূরণের আশা ঘুচে গেলে ইচ্ছেরা নির্ভার, নিরাবলম্ব হয়ে যায়। তখন মুক্তি। ঘুম সাঁতরে গিয়ে তখন ফুরফুরে ইচ্ছের বেলাভূমিতে বসা যায়। তখন ট্রেনে এমন কারো সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে, যে নেমে যাওয়ার আগে দুছত্র প্রথম পাতায় লিখে দিয়ে দেবে তোমায় বুকমার্ক সহ একটা বই। বিকেলের নাম হয়ে যেতে পারে ঘরে-ফেরা। মৃত বন্ধুর নামের পাশে সবুজ আলো জ্বলে উঠতে পারে গভীর রাতের 'অ্যাক্টিভ নাউ' সারণীতে। সবাই অকারণ হেসে উঠতে পারে প্যারাসিটামল ছাড়া মাথাধরা কমে যেতে পারে বরফপাহাড়ে ফুলও ফুটতে পারে আরেকবার মিছিলে বৃষ্টি নামতে পারে ধর্ষিতাকে দেখে পুলিস কেঁদে ফেলতে পারে যৌথ খামার নেমে আসতে পারে হয়ত হয়ত হয়ত পারে হয়ত নয়। কিন্তু কোনো বর্ষার সকালে টুপ করে মরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত ইচ্ছেরা নড়াচড়া করে। 'নড়ে চড়ে হাতের কাছে, খুঁজলে জনম ভর মিলে না'। ইরস বা বাঁচার ঈপ্সাকে লড়িয়ে দেয় ইচ্ছেরা থানাটসের সাথে।
ইচ্ছেরা তো বদলেও যায় সময় আর বোধের সাথে সাথে। এই পরিবর্তনের দ্রুতি, এই সাধ-সাধ্যের টানাপোড়েনে খেই হারিয়ে ভিক্টোরিয়ার প্রাচীন পরী এই গোধূলিবেলায় কী বা ইচ্ছা করতে পারে আর? শুধু এর ওর তার এই মুহূর্তের ইচ্ছেরা টুপটাপ ঝরে পড়ুক, যার যার নির্জন করতলে।