ইচ্ছেউড়ান

সুমী সিকানদার



.একটা আরম্ভের জন্য অপেক্ষা করা যাক। একটা শুরুর মূহুর্ত চাই। হতে পারে একা ধুসরিম কংক্রিটের চওড়া পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে । হতে পারে পল্লবহীন বৃক্ষের বন্ধুহীনতাকে স্পর্শ করতে করতে। আচমকা কেটে যাওয়া ফোনে তোমার কন্ঠ আমার নাম ধরে ডাকতে থাকে মন্দ্র উচ্চারনে। আমি যেন চাপকলের উচ্ছ্বসিত জলের কোলাহল থেমে যাওয়া স্থিরবিন্দুতে অব্যক্ত জেগেই থাকি। কেটে যাওয়া ফোনটা আর একবার আসুক। জলের কথা ফুরানো কি সোজা কথা ! আরম্ভের সময়টা ঘনিয়ে আসুক একসকাল থেকে পরবর্তি সকালের আগ পর্যন্ত। সোডিয়াম আলোয় নেমে পড়ুক কিছু নির্ঘুম লিরিক তাকে আপাতত এক গ্যালারি সুর দিতে হবে। আনপ্ল্যাগড শ্রোতারা বিয়ন্সের তালে তালে ওয়েভ করুক শিশিরশিশির। তোমার ছদ্ম নাম ধরে কেউ ডাকুক না ডাকুক, আমার খুব ডাকতে ইচ্ছে করে ।

সন্ধ্যা হলেই সব কিছু বদলে দিতে ইচ্ছে করে। যেন ভুলভাল যা কিছু ইচ্ছা কি অনিচ্ছায় তাকে পালটে ফেলি। যেন ক্লাস নাইনের প্রিটেস্টের অংক পরীক্ষাটা ঠিক ঠিক দেয়া হয়েছিলো সেবার । হলে গিয়ে চলছিলো তুমুল যোগ বিয়োগের কোলাহল আর পেন্সিলের ধুলো ঘষাঘষি। পেছন থেকে মিত্রা ডাকলো শুনতে না শুনতেই ঢং করে বেল পড়েছিলো তার কাঁসা রঙের ঢং মতো। । আমি সরলঐকিকউপপাদ্যের চোটে খেয়ালই করলাম না দুই ঘন্টা কোথা দিয়ে এসে কোথা দিয়ে চলে গেলো। বাড়ি ফিরেও এমন হয়নি যে, দেখা গেলো হতচ্ছাড়া পরীক্ষাটা দুপুরের বদলে সকালেই হয়ে গেছে আর আমার দেয়া হয়নি। বিকেলের আয়োজনে পাড়ায় ফুলটোক্কা খেলা চলছে। চোখ বেঁধে ফুলটক্কা খেলতে হয়। আমাকে চোখ বাঁধা মাত্রই সুরাইয়া জিজ্ঞেস করলো ‘’ তুই আজ অংক পরীক্ষা দিয়েছিস তো? দেখলাম না কেন ? ‘’ সেবার আন্ডার টেইকেন দিয়ে তবে বোর্ড ফাইন্যলে বসতে হয়েছিলো।ভুল রুটিন লিখে পরীক্ষাটা মিস করেছিলাম আমি।

ব্যাকডেটেড ফ্যাশনের সুটকেস খুলে বসে আছেন তিন্নি। দরজা বন্ধ করার দরকার ছিলো না , কেউ তার ঘরে উঁকি দিতো না। তবু দরজা বন্ধ করে সুটকেসে একটানা চেয়ে আছেন। সেখানে খুব গুছানো ছোট ছোট জামা ন্যাপকিন,, ঘরে সেলাই করা কাঁথা , বিবস, প্রথম ঝুমঝুমি, প্রথম পানিবন্দুক প্লাস্টিকের (ছেলেবাচ্চার খেলনা মানেই বন্ধুক থাকবেই।) । কিছু দামি ঝলমল শাড়িও আছে । এই সমস্ত শাড়ি তার ঝলমল জীবনের আশীর্বাদক ভাবনা থেকে কেনা। আশির্বাদের আয়ু তো এক রাতের মরিচবাতি বেগুনিআলো। সারারাত টিমটিম জ্বলে বাতাসে তরাসে এ ওর সাথে ধাক্কা খায়। স্বপ্নেরা তার ছায়া সমেত হেলে বেড়ায় দালানটি ঘিরে। গায়ে হলুদে রাত জাগতে আসা বন্ধুরা ঘুমিয়ে পড়তেই হলুদের কন্যা ধীর পায়ে জানালার পাশে এসে বিমুগ্ধ নয়নে এই সব জাগতিক আলোর কথা বলা দেখে , কিছু যেন শুনতে পায়। মাঝরাত জুড়ে আগুনরূপ কী যে সুন্দর। নাকি নিজের বিয়ের সুখী আলো দেখতে এতটাই ভাল লাগে সে তিন্নি জানে না।

সেই আলোর ম্লান হয়ে যাওয়া কে ঠেকানো গেল না কিছুতেই । দুই দিনের নিউমোনিয়ায় সব ফেলে রেখে এক জনমের আশির্বাদ মাথায় নিয়ে সন্তান চলে গেল। তিন্নি জলের ভারে নুয়ে পরা চোখে চেয়ে আছেন সুটকেসের অন্তরে। ছোট ছোট জামা গুলোতে বোতাম নেই ফিতে লাগানো। কতবার তিনি সন্তানের বুকে পিঠে পাউডার দিয়ে সেই ফিতেওয়ালা জামা পরিয়েছেন মনেমনে । পেটে যেন গ্যাস না হয় আলতো করে চাপড় দিয়েছেন থেমে থেমে। নক্ষত্রের চেহারা ভাল করে দেখার আগেই সে মিলিয়ে গেছে অন্য নক্ষত্রে। স্পর্শ যদি না থাকে স্পর্শক তবে কাজ করার সুযোগ পায় না। স্তব্ধ হয়ে শোনে শিশুর রেখে যাওয়া অস্ফূট ধবনি সারারাত।

তিন্নির স্বামী বিখ্যাত ডাক্তার অথচ আড়ালে ড্রাগ এডিক্ট । ছাত্র বয়স থেকেই তার এই নেশার কথা বিয়ের আগে যত্ন করেই লুকিয়েছিলো পরিবারের মরুব্বিরা। যেন বিয়েটাই প্রেসক্রিপশন । তবু জেনে যাওয়া সত্যটা কে মেনে এবং মানিয়ে নিতেই এসেছিলো এই সন্তান। বিশাল পৃথিবীতে শত শত সন্তানের ঠাসাঠাসিতে একজন মানব সন্তান তো তার নিজের হতে পারতো। তার নাম রাখা হতো মায়ের অক্ষরের ধাঁচে মায়ের অবয়বে। সেরকম কিছু শেষ পর্যন্ত ঘটেনি। ভালোবাসা সব সময় দেয় না, অনেক সময় সব বুঝে নিয়ে ফেরৎ চলে যায়।

অনেকক্ষণ ধরে আস্তে করে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছেন তিনি । আধাঘন্টা হয়ে গেছে বাথ্রুমে আটকে আছেন । ধাক্কাতে ধাক্কাতে এক সময় মেঝেতে বসে পড়লেন এবং কাত হয়ে শুয়ে পড়লেন বয়স্ক দিদাম মানে দাদু । কেউ দরজা খুলছে না , নাকি তিনি নিজেই খুলতে পারছেন না ,সেটা ঠাহর করতে পারছেন না। যখন জ্ঞান ফিরে পেলেন তখন তিনি নিজের বিছানায় পরিস্কার কাপড়ে । সামনে ডাক্তার, তার ছেলের বন্ধু।
‘’খালা আপনি দরজা লাগাবেন না আর বাথরুমে গেলে। কেউ আপনার সাথে যাবেন সব সময়।‘’
‘’আমি তো দরজা লাগাই না বাবা । দরজার ছিটকান তো বিষন শক্ত।‘’এটকু বলতে চেয়ে চুপ হয়ে গেলেন কারণ পাশেই তার পুত্রবধূ বিস্ফোরিত নেত্রে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

ছেলের সংসারে ভিসা তার ফুরায় না , আরো কতকালের আয়ু তিনি চেয়ে এনেছেন তার পুণ্যকর্মের জরিমানায় তা তিনি জানেন না । ভগবান যদি এ যাত্রা তাকে নিজের কাছে ডেকে নিতেন। রাতে ছেলে ফিরে এলে মাকে মৃদু ভর্ৎসনার সুরে বলছেন’’ মা কতবার বলেছি ভেতর থেকে দরজা লাগিও না তুমি কেন কথা শোনো না? মিতিল কে তো ডেকে নিতে পারো । পুত্রবধু এখনও চুপ কথা নেই। এক শতাব্দীর ভাষাহীনতা পেয়ে বসেছে তাকে।
‘’আমিই তো দজ্জা লাগিয়ে দিয়েছিলাম বাইরে থেকে বাবা’’ , মিতুলের বকবক শুরু। ‘’মা বল্লো যে । আর দিদাম তো খাবার ঘরের পাশেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হিসু করে দিলো । তাই তো মা বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে দিতে বলেছে। দিদাম কি দুষ্টু বলো?? ‘’
মিতুল ছ’ বছরে অন্য বাচ্চাদের তুলনায় পঞ্চাশগুন বেশী কথা বলে। আজ যদি সে একটু কম কথা বলতো। ছেলে চট করে তার জন্মদাত্রীর হাতটা ধরলো । মা ততোক্ষণে চোখ প্রবলভাবে বন্ধ করে ফেলেছেন। ভয়ে বিড়বিড় করছেন ‘’ঠাকুর, আমার এই চোখ আর এই জীবনে খুলো না ঠাকুর। ম্যালা দেখিসি।‘’
তীব্র মুঠো ছেলে ছাড়েনা। লজ্জায় দু;খে অপমানে যে নিজেও মাটিতে মিশে যাচ্ছে। একজন মা সন্তান ধারণ এবং জন্মদান পর্যন্ত যত সীমাহীন বেদনা সহ্য করেন তা নিঃশর্ত। তিনি আগাম জানতে পারেন না আর সেই কষ্ট কত গুন বেশী পরিমানে সন্তানের কাছ থেকেই ফিরে আসবে।এ সব টুকুই অভিজ্ঞতা। ফুলের ছোট ছোট নিঃশ্বাসে চেয়ে থাকা ভঙ্গিমার মতো।

উনিশের শুরুতেই মা হতে হচ্ছে তাকে।একেকটি মুহূর্ত তার একেক যুগে গিয়ে ঠেকেছে। তীব্র ব্যাথায় বোধ যায় যায়। মনে হচ্ছে হচ্ছে সে আঙ্গুলে সুতো পেঁচিয়ে রাখা গোছা বেলুনের এক বেলুন । হয়তো তার গাত্র বর্ণ নীল হয়তো বেগুনি। যে কোন অসর্কতায় হাত ছুটে ঐ দূরের ফিরোজা রঙ আকাশে পৌছে যাবে সমস্ত গ্যাস সমেত। সন্তানটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ঝুলন্ত সেতু হয়ে পেটের মধ্যে ঝুলে রইলো সকরুণ জলের শব্দে । কাজেই ছুরি ধরা প্রস্ততিতে ভার্টিক্যালি মাত্র দুই ইঞ্চি কাটবেন বলে ডাক্তার মুখের রেখা ঢেকে মাস্ক পরে নিলেন । ব্লাড বের হচ্ছে দেখে বাঁ হাতে সোকার দিয়ে সে জায়গা চেপে সোক করতে থাকলেন , খুব মেকানিকালি। যারা অহরহ জীবনের প্রথম কান্নাকে কানে শোনে তারা হাসির আওয়াজ কম পায়। যন্ত্র হয়ে যায় যত্রতত্র।

রাত ভর হবুমায়ের কাংক্ষিত ব্যথার অপেক্ষায় থাকা বাবা জানতেন না শিশু কৃত্রিম ভাবে আসছে। তিনিও ওষুধ সমেত তড়িঘড়ি ফিরছিলেন হাসপাতালে। লাগোয়া বারান্দায় কৃষ্ণচূড়া ছাওয়া কেবিনটা খুব পছন্দ হয়েছে। সন্তান আসার পর দুজনে মিলে সেই বারান্দায় বসে চায়ে ডুবিয়ে ডুবিয়ে মেরি বিস্কিট খাবেন ভেবে খুব পুলক বোধ করছেন । পিতার সাথে সন্তানকে দেখার আসন্ন ভাবনায় থেকে থেকে মা’ও এক সময় ঘুমিয়ে পড়েছেন।

হরতালের দুপুরে নিঝুম চওড়া রাস্তাটার এক পাশে সাইকেল আর অন্যপাশে সদ্য পিতৃত্ব ছাড়পত্র পাওয়া হালকা পাতলা মানুষটি পড়ে রইলেন অনেকক্ষণ। মাথায় সামান্য আঘাত একটু রক্ত স্থিমিত স্পদন। কেউ দেখতে পেলো না দুই শালিক বাদে। মনে আছে ছেলেবেলায় ‘ওয়ান ফর সরো টু ফর জয় ‘সুর করে বলা হতো । আজ কিন্তু দুটো শালিকই ছিলো কিন্তু কোথাও কোন আনন্দটুকরো পড়ে ছিলো না পথে । বাসের হেল্পার একদিনের ড্রাইভার হবার ট্রায়াল দিতে রাস্তার নেমেই এক ধাক্কায় শেষ করে দিলো দুই বাসিন্দার সবটুকু অপেক্ষা দুই ভুবনের । এইসব ছোটখাট সাইকেল ধাক্কা দিতেই পারে বড় বড় মুরুব্বী পরিবহন। জীবনের কোন লাইসেন্স যখন নেই, তখন সামান্য বাসের হেল্পারের লাইসেন্স খুঁজে সময় নষ্ট করেন না কর্তা ব্যক্তিরা।

এদিকে পোস্ট অপারেটিভে নতুন মায়ের আধা ঘুম আধা জাগরণ।হঠাৎ সিস্টার দরজা খুলে টাওয়েল মোড়ানো এক আলোকিত স্পর্শ নিয়ে ঢুকলেন। পোস্ট অপারেটিভের অন্ধকার ঘরের মেঝেতে কোত্থেকে মাখনের মত রঙ আলতো হয়ে গলে পড়লো যেন। সেই আলোয় মা প্রথম তার গোলপানা সন্তানের মুখ দেখলেন। এ কী সত্যি? নাকি সত্যেরও কিছু বেশি। ধীরে ধীরে ঘুমে তলিয়ে যান মা। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে নির্দেশ দেন ‘‘শোনো একটা বেবিকট বানিয়ে দাও গো , গোল গোল কাঁচাবাঁশের। ত্রপামনি ছোটছোট হাত দিয়ে ধরে ধরে দঁড়াতে শিখবে।‘ (ইতিমধ্যেই মেয়ের নাম রাখা হয়ে গিয়েছে ‘ত্রপা’।)।

জীবনের কোন কোন আরম্ভ শেষতক দেখার সময় পায় না। বাবা আর দেখতে পেলেন না তার শিশুসহ বাঁশের বেবীকটকে। তিনি ট্রানজিট পয়েন্ট থেকে ঠিক সময়েই নেমে গেলেন অন্য রঙের স্টেশনে অচেনা জার্কান শহরের বুনো ঘ্রাণে।ঘ্রাণটা এই খানে এতদূর ছড়ালো কখন !

নিজের সাথে মুখোমুখি আর জীবনের সাথে মুখোমুখি যখন এক রেখায় এসে দাঁড়ায় তখন যাকে আঁকড়ে ধরে সেটাই তো বর্তমান। বর্তমানেই ঝুঁকে থাকি কখনও অতীত কখনও ভবিষ্যৎ কে সমঝোতা করে। ইচ্ছে করে এই মাত্র যে কয়েনটা উপরে আসমানকে স্পর্শ করতে ছুঁড়ে মারলাম তা মাটিতে হেড নাকি টেল কোন পাশে পড়বে তা আগাম জেনে নিতে। ইচ্ছে করে কোন আকাংক্ষার আসমুদ্র হিমাচল দুরত্বকে ঘুচিয়ে দিতে । বদলে দেবার ক্ষমতা থাকলে থামিয়ে দেয়া যেতো সেই মুহুর্তকে ,যখন চলে যাবার ছাড়পত্র পেয়ে তাড়াহুড়ায় ফিরে গেছিলেন জন্মদাতা পিতা জন্মের মতো।