জলের সাক্সোফোন

ফেরদৌস নাহার



ক.
যখন সূর্য, তখন প্রাণ। একটা লুকোচুরি খেলা চলে সারাবেলা। অন্ধরাত সূর্যের প্রসব শেষে সকালের আলো দেখছে। এখন সে বারো ঘণ্টার জন্য তা দেখতে পাবে। আলোর সাথে মিশতে পারবে। পৃথিবীর সব রং ঘষে ঘষে লাগাতে পারবে, ছবি আঁকতে পারবে। খেলা খেলা সারা বেলা, এই তো সামান্য চাওয়া। আকাশ, সমুদ্র, নদী, জল, গাছ, পাতা, ফুল, পাখি, ফড়িং, প্রজাপতি সব্বাইকে ডেকে এনে একসঙ্গে কোরাস গাইতে গাইতে ঘুম ভেঙে যায়। এটাই তার সকাল।
চাওয়ার মতো সকাল না হলে একদম ভালো লাগে না তার। সেসব সকাল কি তাহলে নাটক নভেল কিংবা স্বপ্নে পাওয়া যায়! বাস্তবে পাওয়া যায় না? তা আবার উত্তর আমেরিকার জীবনে! বন্ধুরা বলে, নো ওয়ে! তাহলে নতুন করে ভাবতে হবে। কেউ কেউ তাকে আহ্লাদ করে ভ্লাদিমির নবোকভ বলে ডাকে। মোটেও না, সে কোনো লেখক নয়। তাছাড়া নবোকভের চেয়ে প্রায় পঁয়ষট্টি বছরের ছোটো। যদিও তার প্রিয় একটি উপন্যাস ললিতা। কিন্তু জীবন যাপনে মোটেও হামবার্টের মতো নয়। হয়তো তার নভ নামটাই তাকে নবোকভ বানিয়ে দিয়েছে।
এবারের শরতে বাহান্ন পেরুল, একাকী গভীর মেঘ-রোদের জীবন। স্মার্ট ব্যাচেলার। স্বপ্নচারী পুরুষের যাবতীয় লক্ষণ নিয়ে আজও হাঁটে পৃথিবীর বুকে। কখনো বেশ সঘন, কখনো আনমনা। নিশ্চয়ই কিছু একটা খোঁজে।
খ.
মনে পড়ছে, বাড়িটা ছিল স্টেশনের পাশে। মানুষটা ছিল স্টেশনের ওপারে। বাড়ির বাউন্ডারির উপরে পর পর দশজন ব্রিটিশ রাজের উর্দি পরা, বন্দুক কাঁধে দাঁড়িয়ে থাকা সিপাইয়ের মূর্তি, সিংহ দরজায় হা করে থাকা দুটো সিংহের মুখ, লোহার গেইট। সব মিলিয়ে শহুরে জীবনে এমন বাড়াবাড়ি রকমের শ্বেতপাথরের বাড়ি অনেকটা বেমানানই লাগে। দূর থেকে যে দেখে সে-ই একবার দাঁড়ায়, অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। মনে মনে বলে, এটা বাড়ি না অন্যকিছু! এ অঞ্চলে এই বাড়ির পরিচয় পুতুল বাড়ি বলে। বাড়ির অধিবাসীদের খুব একটা দেখা যায় না। মাঝে মাঝে হঠাৎ করে।
আজকাল প্রায় প্রতিদিন নভ বাইক চালিয়ে এখানে এসে দাঁড়ায়। যদি আবারও একবার তার দেখতে পায়! যদি বিশাল ওই বাড়িটা থেকে একবার বেরিয়ে আসে সে! সেই যে দেখেছিল, তারপর থেকে চোখ ও মনের তৃষ্ণা চূড়ান্ত রূপ নিয়ে, ছেলেটাকে উড়ন্ত বানিয়ে ফেলছে দিনকে দিন। ওই বাড়ি থেকে মরিস-মাইনর গাড়িটা প্রায় দিনই বের হয়, ঢোকে, কিন্তু সে কোথায়! বের হয় না নাকি! বারান্দাতেও আসে না! তাহলে কোথায় গেল সে! ওই যে দেখল তাকে পর পর দু’তিন দিন। তারপর আর তো দেখা মেলে না। খুঁজতে থাকে মনে মনে, প্রকাশ্যে।
গার্লস কলেজের কাছাকাছি কয়েক দিন বাইক নিয়ে দাঁড়াল। আর সেই কারণে বন্ধুর ছোট বোনের চোখেও পড়ে যায়। বোন তার ভাই, মানে নভর ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে কথাটা বলে দেয়। বন্ধু ওকে সোজা জিজ্ঞেস করে বসে, কিরে তুই নাকি আজকাল গার্লস কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকিস, ঘটনা কী, কী হয়েছে তোর? নভ কিছু বলতে চায় না, কী হয়েছে তার! এটা তো দেখানোর মতো কোনো বিষয় নয় যে সে বলে বলে বেড়াবে। তাছাড়া সে বলতেও পারে না সেভাবে। কী বলবে, শুধু একজনকে দেখবে বলে ভার্সিটি কামাই দিয়ে আজকাল কখনো গার্লস কলেজ, কখনো পুতুল বাড়ির সামনে অপেক্ষা করে? অথচ তার নাম জানে না। জানে না আদৌ সে কেমন! এ কেমন তৃষ্ণা।
অবশেষে বন্ধুকে সব খুলে বলে। কবে, কোথায় দেখেছিল মেয়েটাকে। তাকে নিয়ে কী ঘটছে ভেতরে ভেতরে, সব। কোথাও না কোথাও, কারো না কারো কাছে হয়তো বলতেই হয়। তা না হলে কী করে চলবে! সব কথা শুনে ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যে নভকে এতকাল ধরে চেনে, তার সঙ্গে মিলাতে পারে না, আবার মেলেও। কারণ, নির্জন কণ্ঠে প্রবল এক অস্থিরতার কথা নভই বলতে পারে। যে কোনো বিষয় সিরিয়াসলি নেয়াই ওর স্বভাব। তার জীবনে হালকা বলে কিছুই নেই। কাজেই অবাক হতে হতেও অবাক হয় না সে। বরং কিছুটা ভাবনা জাগে নভর জন্য।
অবশেষে জানতে পারা গেল, মেয়েটি ওই কলেজেই পড়ে। নাম ডোরা। খুব চুপচাপ শান্ত। ভালো গান করে, বই পড়ে আর, মনে হয় স্বপ্নও দেখে। এধরনের মেয়েরা স্বপ্ন না দেখেই যায় না। ছোটো একটি ভাই আছে। বাবা দেশের বাইরে কানাডা না কোথায় যেন থাকেন। মায়ের সঙ্গে এখানে ওদের পৈত্রিক বাড়িতে অপেক্ষায় আছে, হয়তো যে কোনো দিন বাবার কাছে চলে যাবে ওরা।
ডোরার ওই বিদেশে চলে যাবার ব্যাপারটা জেনে, নভকে ওর বন্ধু এই সম্পর্কে জড়াতে নিষেধ করে, কিন্তু কোনো লাভ হয় না। আর সেসময়টা কেইবা শোনে কার নিষেধ। বয়সের নিজস্ব গতি একাকার করে ভাসিয়ে নিলো নভকে। কিসের কী! ভেবো না, যাও, এগোও! বলেই হৃদয় ছুটল বল্গাহারা। কে তাকে বাঁধে!
একদিন পরিচয় হয়ে গেল। ভালোলাগা তো একপক্ষের ছিলই। এবার দুপক্ষ ভালোবাসার দিকে এগোয়। কীভাবে পরিচয়টা গড়াতে পারে, কোথায়, কদ্দূর তা কি কেউ হিসেব করে করে? ওরাও করেনি। পরিচিত শহরে, একটু চেপে, একটু পাওয়া না-পাওয়া নিয়ে খুব একটা খারাপ কাটছিল না দিন। দুজনেরই অনেক পছন্দ মিলা যায়। ডোরা অনুভব করে নভকে ভালোবাসতে খুব ভালো লাগছে। নভ টের পায়, ডোরার জন্য একটা জীবন খুব অল্পই হয়ে যাবে। ওদের বন্ধুত্ব প্রেম নদী তীরের অশোক গাছ জানতে থাকে, হাইওয়ের দীর্ঘ রাস্তা জানল, আরও জানল ধমনীর শিরা উপশিরা, রক্তের দোল লাগা কণিকারা।
গ.
নভ আর ডোরার গল্পটা আর দশটা প্রেম কাহিনির মতো হতে পারত। ভালোলাগা, ভালোবাসা, প্রেম, বিয়ে, সংসার। একটি নতুন গানের মতো সুর ও কথায় পাশাপাশি বেঁচে থাকতে পারত অনেকটা জীবন। এভাবেই শেষ হলেও চলতো। না, তা হলো না বলেই কোথায় যেন বেসুর গান পথ রোধ করে দাঁড়াল। কিছু তৃষ্ণা, কিছু চাওয়া অঙ্কুরেই মিইয়ে গেল। পরস্পর চলে গেল অন্য কোনো প্রান্তরেখায়। সাদামাটা চোখে দেখলে, খুব সাধারণ বিচ্ছেদের চাদরে ঢেকে দেয়া একটি প্রেম। এমন বয়সে এসব ভাঙাভাঙির প্রেম হতেই পারে। তবে এমন না হলেও ক্ষতি কিছু ছিল না, তবু এমনই হয়েছিল। ডোরা এবং নভ একান্ত অনিচ্ছাতে বিচ্ছেদের অংকে পড়ে গেল। দূরদেশের অভিবাসী হবার ষড়যন্ত্রে ছিটকে গেল পরস্পর। কলেজ, ভার্সিটির ঘনিষ্ঠ যুগল। কেউ না জানলেও দুজনের অনুচ্চারিত প্রতিজ্ঞা ছিল পরস্পরের কাছে। এমন প্রতিজ্ঞা তো অহরহ অনেকেই করে, তাই বলে প্রতিজ্ঞা রাখতেই হবে, এমন দায় আছে নাকি!
ঘ.
এমন দায় টেনে টেনে বয়ে বেড়াতে সকলে পারে না। তবে দু’একজন পারে, তাদের নিয়েই গল্প হয়, অবাক করা ঘটনা হয়, নভ তাদের একজন। কোনো কিছুকে হালকাভাবে নিতে জানে না। সে তার একুশ বছর বয়সের বিদায় দেয়া প্রেমকে কাঁধে পিঠে মাথায় করে এখনো বয়ে বেড়ায়। কানাডায় এসেছে। পড়াশুনা শেষ করে এখানেই থেকে গেছে। এবং সে জানে তার সঙ্গে দেখা হবে কোনো একদিন। সেই মেয়ে, যে তাকে দিয়েছিল প্রথম ভালোবাসার ছায়া। স্মার্ট, অন্তরঙ্গ নভ এই একটি বিষয়ে আজও প্রাচীন রয়ে গেছে। বন্ধুরা অন্তত তাই মনে করে। তবে সেই মেয়ে কোথায় কোন শহরে আছে, এখনো জানে না। যেখানে যায় কেবলই খোঁজে। খুঁজতে খুঁজতে অনেকটা কাল। একটি রূপকথার গল্প যেন সে গড়বেই।
জ্বরঘোর থেকে মাত্রই উঠে দাঁড়িয়েছে। এখন অনেক বিশ্রামের প্রয়োজন। খুব সুস্থ থাকার চেষ্টা করাও দরকার। প্রতিদিন এখানে সেখানে তো যেতে হয়! না গেলে চলবে না। নভকে না পেয়ে আবারও যদি হারিয়ে যায় সে। এই উৎকণ্ঠা তাকে প্রতিদিন পথে নামায়। সেই কবে বুকে গেঁথে গেছে কানাডার টরন্টো শহর। আজ সে নিজেও এখানে। কত বছর কেটে যাচ্ছে, কী আশায় বুক বেঁধে ঘুরে মরছে, কেউ না জানুক, সে জানে! ছেলেবেলার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা মাঝে মাঝে নভর কাছে বেড়াতে এসে অনেক বুঝাতে চেষ্টা করে। বাস্তবকে মেনে নিয়ে জীবন সাজাতে বলে। সে কেবল বলে, চল তোদেরকে ঘুরিয়ে দেখাই। নায়াগ্রা, লেক অন্টারিও ঘুরে আবারও বন্ধুরা ফিরে যায়। নভ তার জায়গায় স্থির হয়ে রয়।
শরতে কানাডা শহরের রূপ বদলে যেতে থাকে। গ্রীষ্ম আর শীতের মাঝখানের এই সময়টা নভর সবচেয়ে ভালোলাগে। সে যেখানেই যায়, ফেরার সময় চেষ্টা করে প্রকৃতি দেখতে দেখতে ফিরতে। অন্টারিওর ফল সিজন, মানে শরৎ ঋতু এলে আকাশ থেকে গড়িয়ে দেয়া কমলা, হলুদ, লাল, সোনালি রং সবুজকে গ্রাস করে কিভাবে মাতিয়ে রাখে চারদিক। ভীষণ ভালো লাগে। নভর মন বলে, এমন সময়েই হয়তো তাকে খুঁজে পাবে! তাকে খুঁজে পাবে!! আর তখন এত বড়ো পৃথিবীটাও তার কাছে এতটুকুন হয়ে যায়। তাহলে কোথায় হারাবে সে! অথবা কোথায় বা লুকিয়ে থাকবে! তাইবা কত দিন?
ঙ.
কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়া প্রভিন্সের সাউদার্ন গালফ আইল্যান্ডের দ্বীপগুলো এত চুপচাপ, এত নির্জন যে, নিজের অস্তিত্বকেও মাঝে মাঝে বাড়তি বলে মনে হয়। প্রশান্ত মহাসাগরের কাছাকাছি যে সবুজ দ্বীপগুলো তারই একটি মেইন আইল্যান্ড। ওখানে আজ সাত বছর হয় ডোরা বসবাস করছে, একা একা। সেই কবে স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার পর মেয়েকে নিয়ে জীবন সংগ্রাম করেছে। কারও সাহায্য চায়নি। বাবা মা ভাই সকলেই করতে চেয়েছে, কিন্তু ডোরা নেয়নি। একটা নিজস্ব জেদ, আত্মসম্মান তাকে আজও আর দশজন থেকে ভিন্ন করে দেয়। তাই হয়তো সংসারটাও করা হলো না। মেয়েকে নিয়ে টরন্টো ছেড়ে ভ্যাঙ্কুয়েভারে চলে আসার পর ব্যাংকে কাজ করেছে। যতটা ভালো করা সম্ভব করেছে। মেয়েও পড়াশুনা করল নিজের পছন্দ মতো। হঠাৎ করেই যেন একদিন খেয়াল করল মেয়েটা বড়ো হয়ে গেছে। মেয়ের জীবনে কখনোই নিজের ইচ্ছে অনিচ্ছা চাপিয়ে দেয়নি ডোরা। পড়াশুনার শেষ হতে না হতেই মেয়েও কাজ পেয়ে গেল টরন্টোতে। যে টরন্টো ছেড়ে একদিন সে এখানে চলে এসেছিল, সেখানেই ফিরে গেল ডোরার মেয়ে। এখন বসবাস করছে ফরাসি ফিঁয়াসের সঙ্গে।
মেয়েটি খুব গান পাগল হয়েছে। আর কী অদ্ভুত সে কিনা মাঝে মাঝে গিটার নিয়ে বেরিয়ে যায় এদিক সেদিক। মন মতো কোথাও বসে গান গায়। এই পাগল মেয়েটিই ডোরার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। ডোরা ওর জীবনের সব কথা মেয়ের সঙ্গে শেয়ার করেছে, এখনো করে। মেয়েও তাই। মা মেয়ের এই বন্ধুত্বের শিকড় অনেক গভীরে বলেই হয়তো ডোরা আড়াল করতে পেরেছে অনেক কষ্ট, ব্যথা, দীর্ঘশ্বাস।
মেয়ে চলে যাবার পর চাকরি ছেড়ে, ডোরা নিজেকে এমন কোথাও নিয়ে যেতে চেয়েছে যেখানে সব পরিচয়, সব প্রকৃতি নতুন করে শুরু হবে। আরাধ্য জীবনের বাকি চাওয়াটুকুর যোগ্য স্থান হিসেবে সাউদার্ন গালফ আইল্যান্ডের সবুজ একটি দ্বীপ, মেইন আইল্যান্ডে সঁপেছে নিজকে। চায়নি কোলাহলময় কোথাও থাকতে। অনেক তো হল কোলাহলে কোলাহলে। এবার নিজের মাঝে নিজেকে সমাহিত করে প্রকৃতিতে বেঁচে থাকবে। প্রাণ ভরে নিশ্বাস নেবে, খুব হালকা ফিনফিনে বাতাস। মাঝে মাঝে লাইট হাউজ পার্কে বসে অপলক চেয়ে থাকবে নীল সমুদ্রের দিকে। সে সমুদ্রকে ভালোবাসতো দুজনেই।
মেইন আইল্যান্ডের সবাই সবাইকে চেনে। মাত্র হাজার খানেক মানুষ, তার মাঝে সে-ই একমাত্র ব্রাউন কালার। নির্জন দ্বীপে ডোরার দিনগুলো কেটে যায় বাগান করে, অর্গানিক গ্রোসারি স্টোরে কফি কিংবা ছোট্ট লাইব্রেরিতে বই পড়ে। মাঝে মাঝে শনিবার স্থানীয় ফার্মার মার্কেটে হাতে করা সামুসার স্বাদ দিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। ছোট্ট দ্বীপে সবাই সবাইকে চেনে, সাহায্য করে। দেখা হলে হ্যালো বলে। হাগ দেয়। ডোরার বন্ধু যে কজন আছে ওরাও বেশ খোঁজ খবর রাখে। তাই একা হয়েও বন্ধুহীনতায় ভোগে না সে। বিকেলে ব্যাক ইয়ার্ডে বসে থাকলে হরিণের দেখা মেলে। খুব ভালো লাগে প্রকৃতির এই উপহার। এমনই তো চেয়েছিল সে।
চ.
ওই যে দূরে গির্জার চূড়াটা দেখা যাচ্ছে, ওখান থেকে ভেসে আসছে ঢং ঢং ঢং- এক আধা অলৌকিক সুর। মনের দুয়ারে এসে ধাক্কা দিয়ে বলছে, চল মন চল! যেখানে আমূল বদলে গেছে সব পরিচয় সেখানে, কি যাবে না! নভ চোখ রাখে পাতায়, ঘাসে, ফুলে। কয়েকটি কাঠবিড়াল এদিক সেদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে। আচ্ছা যাবে নাকি একবার ওই দিকটায়? নিজেকে নিজে জিজ্ঞেস করে।
যায়। পকেটে হাত ঢুকিয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে, হেঁটে হেঁটে যায়। দূরে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের আহ্লাদিত উচাটন আভা। নিমগ্ন আগুন রঙা সূর্যের তপ্ত শিহরণ, আজকের বিকেলটা অদ্ভুত সারেঙ্গিতে বাঁধা। একটা চেনা সুরের আভাস ভেসে এল। কেউ যেন কোথাও গিটার বাজাচ্ছে। সে চারপাশে চেয়ে দেখে, কই কেউকে তো দেখা যাচ্ছে না তো। এক সময় গির্জার চৌহদ্দি ও নভর দূরত্ব কমে এলে, চমকে দাঁড়িয়ে পড়ে সে!
রোদে ভেজা একটি মেয়ে সিঁড়িতে বসে গিটার বাজিয়ে গান গাইছে। মুখটা দেখা যাচ্ছে না। পাশ থেকে যেটুকু দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, তাতে হিপি বলেও মনে হয় না। যদিও মাথার ব্যান্ডানা, হাতে নানা রঙের ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড, গলার হাড়ের মালা আর ফুল ছাপের স্কার্টে মেয়েটিকে আজকের বিকেলের অনন্য এক অতিথি বলে মনে হচ্ছে। চেহারা স্পষ্ট দেখা না গেলেও, গায়ের রং বলে দিচ্ছে সে সাদা নয়। এবার নভ মেয়েটির মুখোমুখি চলে এসেছে। মাথা ঝুঁকে গান গাইছে। মুখটা সামান্য তুলতেই থমকে যায় নভ! একে কি আগে কোথাও দেখেছ? খুব চেনা ঘাড়, বসার ভঙ্গি, তাকানো। স্মৃতি ফিরে আসে, ফিরে ফিরে ফেরে। এত চেনা, আবার পুরোপুরিও নয়! কোথায় দেখেছে একে! যা মনে পড়ল তাই বা হয় কী করে! মানুষ কি কখনো আটকে থাকে নির্দিষ্ট কোনো বয়সে! অস্থিরতা পেয়ে বসে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে।
মেয়েটি একমনে গেয়ে চলছে জোন বায়াজের সেই বিখ্যাত গান ‘ডায়মন্ড অ্যান্ড রাস্ট’ ..............
As I remember your eyes
Were bluer than robin's eggs
My poetry was lousy you said
Where are you calling from?
A booth in the midwest
Ten years ago
I bought you some cufflinks
You brought me something
We both know what memories can bring
They bring diamonds and rust.........

আরে মেয়েটি এই গানই কেন গাইছে, এ তো তার গান! এ যুগের মেয়েরা কি এইসব গান গায়? নভ আকুল হয়ে কখন যে মেয়েটির কাছে গিয়ে দাঁড়ায় বুঝতে পারে না। যতটুকু ব্যবধান থাকলে শুধুই শ্রোতা ভাবা যায়, তার চেয়েও সংক্ষিপ্ত ব্যবধানে একেবারে কাছাকাছি গিয়ে ডাক দেয়- ডোরা!
গিটারে হাত থেমে যায়। ছিঁড়ে যায় সুরের রেশ। সামান্য চুপ, উত্তর আসে
- আই অ্যাম নট ডোরা
ঘোরে পাওয়া মানুষের মতো নভ প্রশ্ন করে
- ইউ আর নট ডোরা, দেন হু ইউ আর?
এবার বিস্ময় নিয়ে গানের মেয়েটি উলটো প্রশ্ন করে
- হু ইউ আর?
নভ কিছুই শুনছে না, একাগ্র তাকিয়ে থাকে, মন্ত্র পাওয়ার মতো বলে
- আমি নভ, তুমি ডোরা
- হোয়াট!
সহসা যেন থমকে যায় পৃথিবী। মেয়েটি ভেতরে ভেতরে চমকে ওঠে! তার চোখ ছোটো হয়ে আসে। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না সে। এবার সে নিজেই নভর কাছে এসে দাঁড়ায়। জিজ্ঞেস করে
- প্লিজ, হোয়াট ইউ সে?
- আই অ্যাম নভ, ইউ আর ডোরা
- কাম উইথ মি
বলে সে একটি কফি শপের দিকে হাঁটতে থাকে। নভ তার পিছন পিছন যায়। দুটো চেয়ার টেনে মুখোমুখি বসে। কেউ কারো সঙ্গে কথা বলছে না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ। তারপর মেয়েটিই বলে
- শি ইজ মাই মম
আবারও খানিকটা নিস্তব্ধতা। নিশ্বাস গলার কাছে এসে থমকে গেছে! ডোরার মেয়ে! তাইতো একই ভঙ্গি, একই অভিব্যক্তি। মা মেয়ের এই একই প্রতিচ্ছবি অবাক হয়ে দেখছে নভ। আর এমন না হলে কেমন করেই বা চিনত তাকে!
- তুমি এখনো মাকে মনে রেখেছ, মাও তোমাকে। হোয়াট এ সারপ্রাইজ!
ভাঙা ভাঙা বাংলায় কথাগুলো বললো। তারপর নিজের ব্যাগ খুলে কলম বের করে একটুকরো কাগজে খস খস করে লিখে দিলো একটি টেলিফোন নাম্বার। নভ স্তব্ধ চেয়েই থাকে মুখের দিকে। সে জানে না এখন ঠিক কী বললে মানায় তাকে। কিছুই বলতে হয় না, মেয়েটি কাগজের টুকরোটি এগিয়ে দিয়ে বলে
- গো, অ্যান্ড টক টু হার
পুরো দিন কেটে গেল ঘোরের ভেতর। নভ থমকে গেছে, চমকে গেছে। এবার তাহলে প্রতীক্ষার শেষ পরীক্ষাটা দেবার সময় হয়ে গেছে। বুক পকেটে রাখা ফোন নাম্বার বের করে অনেকক্ষণ বসে থাকে। কানে ভাসে, তুমি এখনো মাকে মনে রেখেছ, মাও তোমাকে।
ডায়াল করে...
চ.
ভিক্টোরিয়ার সোয়ার্জ বে ফেরিঘাট থেকে ফেরি ধরে সোজা মেইন আইল্যান্ডের দিকে যাচ্ছে নভ। চারদিকে গাঢ় নীল জল আর সবুজ পাহাড়। আকাশেও কী গভীর নীল। জাহাজের মতো বিশাল ফেরি ছুটছে জল কেটে। মন পড়ে আছে এতকাল ও গতকালের কণ্ঠস্বরের কাছে। ফোনে কেউ ওরা ঠিকঠাক কথা বলতে পারেনি। শুধু নিঃশ্চুপ নীরবতা বেঁধে রেখেছিল। অসহ্য আবেগ কণ্ঠের কাছে বারবার দলা পাকিয়ে উঠেছে। এই আখ্যানের কী নাম হতে পারে দুজনার কেউই জানে না। শুধু বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটানোর শব্দটা বোধহয় দুজনেই শুনতে পাচ্ছিল।
সাড়ে পাঁচঘন্টার ফ্লাইটে ব্রিটিশ কলম্বিয়ার রাজধানী ভিক্টোরিয়ায় এসে পৌঁছাল। সারা পথ চাপা উদ্বেগ ও উত্তেজনায় কিছুই দেখেনি নভ। কখন পথ ফুরাবে শুধু তারই প্রতীক্ষায়। ফোনে সেরকম কোনো কথা না বলতে পারলেও। ডোরা কেবল ছোট্ট করে বলেছে
- এসো
সেই ডাক! সেই কণ্ঠ এত বছর বাদে তাকে ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কতকালের প্রতীক্ষার ডাক। বলার সাথে সাথে পাগলের মতো যেভাবে হোক একটি টিকেট জোগাড় করেছে সে। জীবন এবার কোথায় নিয়ে যাবে কে জানে। কিন্তু ডোরার কাছে তাকে যেতেই হবে। বারবার ডিপ ব্রিথ নেয় নভ। ফেরি চলছে। বাতাসে উড়ছে চুল। একঝাঁক সামুদ্রিক সিগ্যাল ডানা মেলে জাহাজের সাথে সাথে চলছে। নভর একটু শীত লাগতে থাকে। আর তো কিছুক্ষণ, তারপর দেখবে তাকে। আচ্ছা সে আসবে তো! বলেছে তো আসবে। তাও মনে হয়, আসবে তো!
ছ.
আজ খুব ভোরেই বিছানা ছেড়েছে ডোরা। গত রাতে নভর সঙ্গে কথা বলার পর একটুও চোখের পাতা এক করতে পারেনি। জানিয়েছে আজ বিকেল সাড়ে ছ’টায় মেইন আইল্যান্ডে এসে পৌঁছবে। কেমন অদ্ভুত লাগছে নিজের কাছে। নভ, তার প্রথম প্রেম, যার জন্য জীবনের প্রতিটি দিন দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে, সে-ই আজকে তার নিশ্বাসের কাছাকাছি এসে দাঁড়াবে। দেখা হলে ঠিকই চিনতে পারবে, একটুও ভুল হবে না। নভর ফোন আসার আগেই মেয়ে তাকে জানিয়েছে এই আশ্চর্য যোগাযোগের কথা। মেয়ের ফোনের পর প্রতি মুহূর্ত অপেক্ষা করেছে নভর ফোনের। অবশেষে সেই দূরান্তের ডাক, হারানো সময়, এতদিনের কষ্ট সব একাকার করে সারারাত অনেক কেঁদেছে সে।
ঘর গুছিয়ে, রান্না করে নিজেকে তৈরি করল ডোরা। আজ কি আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠবে। গাড়ি চালিয়ে একবার স্থানীয় গ্রোসারি স্টোর থেকে অনেক কিছু কিনে নিয়ে এল। ওর এত সব বাজার করা দেখে দোকানি কৌতুক করে জিজ্ঞেস করলো, ডোরা তুমি কি ছ’মাসের বাজার একবারে করে নিচ্ছো? ডোরা হাসে, মুখে কিছুই বলে না।
এর মাঝে টরন্টো থেকে মেয়ে একবার ফোন করে মায়ের অবস্থা জানতে চাইল। এই নিয়ে মায়ের সঙ্গে একটু মজাও করলো সে। ডোরা কি লজ্জা পেল! সব আয়োজন নিজের হাতেই করতে হয় বলে প্রতিদিন যেধরনের ক্লান্তি ভাব থাকে, আজ যেন তা একবারও অনুভব করলো না। নভ আসছে। আসছে তো!
বিকেলের ফেরিতে এসে পৌঁছাবে বলে টেক্সট করেছে। তাড়াতাড়ি করে সব গুছিয়ে, একটু আগেই বেরিয়ে গেল ফেরিঘাটের দিকে। আজ কি সে কিছুটা সেজেছে! কী সাজে গেলে আজকে মানাতো, তাও ভেবেছে বার কয়েক। অবশেষে প্রিয় কিছু একটা পরে রওয়ানা হলো। সারা পথ উৎকণ্ঠা। পার্কিং লটে গাড়ি রেখে নেমে গেল ঘাটের কাছাকাছি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই খানিক দূরে ফেরি দেখা গেল। বুকের ভেতর কে যেন তখন ড্রাম পিটাচ্ছে।
ফেরি এসে লাগছে মেইন আইল্যান্ডের ভিলেজ বে ঘাটে। ঘন নীল জলের চারপাশ ঘিরে সোনালি আর লাল আলো মিলিয়ে অপূর্ব এক রূপ নিয়েছে প্রকৃতি। ফেরি ভিড়তেই প্রথমে যাত্রীদের নামতে দেয়া হয়। ডোরা দেখতে পেল খুব চেনা ভঙ্গিতে একজন যেন দ্রুত পার হয়ে আসছে। তার পরনে ফেইড জিন্স, গায়ে সাদা শার্ট। কত বছর পর। পা অবশ হয়ে আসতে চাইছে। কিন্তু তাতো এখন হবার নয়!
নভ ফেরির পাটাতন ডিঙিয়ে মাটিতে পা রাখল। চারদিকে চোখা বুলায়। মনে মনে ভাবে, সে এসেছে তো! এই দ্বীপে কি সত্যি সত্যি ডোরা আছে! ঠিক দ্বীপে এসে পৌঁছেছে তো! আর ঠিক তখনই নির্জন বিকেলের কনে দেখা আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেল একটি নীল শাড়ি। যেন সোয়ান লেক থেকে উঠে আসা কোনো রাজহংসী।
কারো পা চলছে না। পলকহীন স্থিরতায় এক এক করে পেরিয়ে যাচ্ছে দৃষ্টি ও সময়। সন্ধ্যা নেমে আসছে দ্বীপের আঙ্গিনায়। সহযাত্রীদের কেউই নেই। যে যার মতো চলে গেছে নিজস্ব গন্তব্যে। দাঁড়িয়ে থাকা নভ হাত তুলে ওয়েভ করলো। কণ্ঠের কাছে জমে থাকা নাম ধরে ডাক দিতেই দেখলো, ডোরা হেঁটে আসছে। এত দীপ্র, এত নিপাট, এত স্বচ্ছ সে পদক্ষেপে, মেইন আইল্যান্ডের নীল জলে সাক্সোফোন বেজে ওঠে। সন্ধ্যার মায়াবী আকাশের অথই নীলে এবার ওরা এগোতে থাকে পরস্পরের দিকে। এমনই তো কথা ছিল।