নায়াগ্রা জলপ্রপাত একটি ইচ্ছের নাম

উমাপদ কর




আমার একটি ইচ্ছে আছে। আমার অনেক অনেক ইচ্ছের মধ্যে এটিই প্রধান। একবার, অন্তত একবার নায়গ্রা জলপ্রপাত স্বচক্ষে দেখা। একটুখানি জলধারা সামান্য ওপর থেকে নীচে আছড়ে পড়ছে দেখলেই আমার ভালোলাগার সীমানা ভেঙে খানখান হয়ে যায়। সেখানে নায়াগ্রা। দৈত্য জলপ্রপাত।
ইচ্ছেটা আমি লালন করছি গত ২০-২২ বছর ধরে। ইচ্ছেটার আরেকটা দিক ছিল। সেটা হলো নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখব দু-জনে মিলে একসঙ্গে। বলাবাহুল্য দু-জন বলতে আমি আমার প্রেমিকা বন্ধু ও স্ত্রীর কথা বলছি। তবে সে ইচ্ছেটা বছর পাঁচেক আগে এক গভীর রাতে হিমশীতল ঘরে ঢুকে গেছে। দুজনে মিলে দেখার সেই ভাগাভাগিটা আমি পেরিয়ে এসেছি। বলতে কি, ইচ্ছেটার আর্ধেকটাই কি মরে গেল না?
অনেকেই হয়ত এর পরে আর এই ইচ্ছেটাকে আর প্রধান ইচ্ছে হিসেবে রাখত না। হয়ত আর কখনো নায়াগ্রা যাওয়ার বাসনা মন থেকে মুছে ফেলত। আমি তা না। আমি এখনো নায়াগ্রা স্বচক্ষে দেখার পিয়াসি। অর্ধেকটা ইচ্ছেই কালের গভীর নিয়মে গোটা ইচ্ছায পরিনত হয়েছে। ইচ্ছেরা এমনই কোনো বাঁধাধরা গৎ মানে না। আবার ব্যক্তি বিশেষে সে ভীষণই আপেক্ষিক। ওই যে বলছিলাম না অনেকেই হয়ত একটা নিদারুণ বিয়োগান্তক চিত্রনাট্য সংঘটিত হয়ে যাবার পর নায়াগ্রা যাওয়ার কথা আর ভাবতই না। কী দেখবে একা একা, যেখানে দুজনে দেখার কথা ছিল! দেখার মজাটাই মাটি করে দেবে স্মৃতি নামক এক পরানবন্ধু, চোখকে নোনা আর ঝাপসা করে দিয়ে। অতএব আর যাওয়া নেই।
আমারটা সেরকম নয়। আপেক্ষিকতার জন্যই হোক আর অন্য যে কোনো কারণের জন্যই হোক আমি ইচ্ছেটা পুষে রেখেছি, রাখবও, যতদিন না সে একটা মুক্তির সেপ পায়! মুক্তির কি কোনো সেপ হতে পারে? পারে হয়ত। যদি ভাবি আমি দেখলে আমার চোখ জুড়োবে, মনে অপার উল্লাস নেচে যাবে, ইচ্ছা পুরণের তালিকা থেকে প্রথম ও প্রধানটা একটা মুক্তির ব্যাপ্ত পরিসর খুঁজে পাবে, স্মৃতিটা একবার বেশ করে ঝালিয়ে নেওয়া যাবে, আর বিশ্বাস করি আর না করি এই বাক্যে যথেষ্ট প্রসন্ন বোধ করব—‘আমার চোখ দিয়ে বহু দূরবর্তী তোমার চোখও কি একবার দেখে নিল না এই অপার সৌন্দর্য?’। বাক্যটি একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে উঠবে বুঝতে পারিনি। ভেবেছিলাম লিখব—‘আমার চোখ দিয়ে তুমিও দেখে নিচ্ছ সেই প্রবল জলরাশির সহসা নিম্নগামীতা। আর আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে বলছ— দ্যাখো আমাদের ইচ্ছেটা শেষ পর্যন্ত পূর্ণ হয়ে গেল। আর আমি নিরুচ্চারে বলছি, ঠিকই তো আমার চোখ দিয়ে তুমি তো দেখলেই। তুমি তো আমার মধ্যেই বেঁচে আছো। বেঁচে আছো ঠিক সেদিন থেকেই।’
সুতরাং আমার ইচ্ছেটার পসিবিলিটি আমি এখনো মেরে ফেলিনি। সম্ভাবনার সব দরজাগুলো যে খুলবে তার কিন্তু কোনো মানে নেই। প্রতিদিনই যেমন কোনো না কোনো অভিলাষ পূরণ হচ্ছে তেমনি কোনো না কোনো সামান্য চাহিদাও মিটছে না। একটা টাইম-ফ্রেম আছে। সেই টাইম-ফ্রেমের মধ্যে ইচ্ছে মিটলে ভালো, নয়ত তার অপমৃত্যু হলো। অপমৃত্যু হলো? আমার বিশ্বাসে না। সম্ভাবনা জারিই থাকলো। এই যেমন নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখা, ছুঁয়ে দেখা জল, বিন্দু বিন্দু জলকণার তুমুল আস্ফালন, রামধনু, ভিজে যাওয়া ইত্যাদি ইচ্ছে আমার নির্দিষ্ট টাইম-ফ্রেমের মধ্যে মিটল না, হলো না। তাহলে কি সেটার অপমৃত্যু ঘটল? সেই ইচ্ছেটা কি অমিট হয়ে গেলো? আমার মনে হয় তা গেল না। সম্ভাবনা মরে না। এমন কি মৃত্যুর পরেও সম্ভাবনা থেকেই যাবে। কেউ তো বলবে—আহা লোকটার নায়াগ্রা স্বচক্ষে দেখার খুব সাধ ছিল, সাধ্যে কুলোলো না।
আর আমি যদি ইউনিভার্সাল চিন্তা করতে পারি তাহলে সে চিন্তায় অন্য আর কারো চোখ দিয়ে আমার নায়াগ্রা দেখা সম্পন্ন হতে পারে। ঠিক যেমন আমার চোখ দিয়ে আমারই প্রিয়তমার না থেকেও একবার দেখা। ঠিক একইভাবে আমি যদি কারো মধ্যে সামান্যতম হয়েও বেঁচে থাকতে পারি আর সে যদি নায়াগ্রা দেখতে দেখতে আমাকে একবার একবার মাত্র স্মরণ করে। তাহলেই আমারও দেখা হয়ে গেল। ইচ্ছে পূরণের এও এক তরিকা হয়ত, শুধু যা সম্ভাবনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
এভাবেই একটু একটু করে সম্ভাবনাগুলো জিইয়ে রেখে চলা। বলা যায় বাঁচা। পথ চলা। বলা যায় যাপন। আনন্দ সেখানে নিরানন্দের মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢেলে দেয়। উল্লাস সেখানে চরৈবেতির পায়ে নূপুর পরিয়ে দেয়। খোঁজ সেখানে অদেখাকে দেখা, অজানাকে জানা, অচেনাকে চেনার মালা জড়িয়ে দেয়। রহস্যের ডালি তবু উপচিয়েই পড়তে থাকে। কালে কালে যুগে যুগে এই নিরন্তর চলা আর খোঁজের সম্মীলনে কত রহস্যের ডোর যে আলগা হয়ে গেলো, কখনো পুরোটাই খুলে গেলো। তাই বলে কি রহস্য শেষ হয়ে গেল জীবন থেকে? কখনই না। একটা যখন ভাঙছে আরেকটা তখন গড়ে উঠছে। যেন পুঞ্জিভূত কিছু থেকে খসে যেমন পড়ছে তেমন জুড়েও যাচ্ছে যথেষ্ট। এই রহস্যের জাল বিস্তৃত হয়ে পড়াই এই বিশ্বের আরেক মহান রহস্য। না হলে চলা বন্ধ হয়ে যেত। বলা যায় বাঁচা অসাড় হয়ে পড়ত। তো এই রহস্যের পেছনে ছুটে চলাও একটা ইচ্ছে। ঠিক যেমন আমার নায়াগ্রা দেখার বাসনা বা ইচ্ছে, যা আমাকে ছোটাবে।
আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে একটা জিনিস দেখার মধ্যে কীই বা রহস্য থাকতে পারে? কিন্তু প্রকৃত দৃষ্টিভঙ্গিতে রহস্যতো জড়িয়েই থাকে। এই রহস্য কৌতূহলের রহস্য। শুধু প্রশ্ন আর উত্তরমালার রহস্য। এই যেমন আমার নায়াগ্রা স্বচক্ষে দেখার বাসনা। ২০-২২ বছর ধরে এটাই আমার আদি ও অনন্ত বাসনা। এই বাসনাটাকে বাদ দিলে আমার অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন উঠে পড়বে। বাসনাশূন্যরা জড়, প্রাণ থাকলেও। জড় হলে জীবন থাকে না। জীবন না থাকলে চরৈবেতি গাইবে কে? তাই এই সব মিলিয়ে একটা বৃত্ত। প্রাণ যদি হয় তার সূত্রপাত, কেন্দ্রক, জীবন তাহলে পরিধি পর্যন্ত যে পরিসর সেই সসীমটুকু, আর ইচ্ছে বা বাসনা হলো সেই পরিধির বাইরে অসীমের প্রতি আগ্রহ, কৌতূহল, আর অতৃপ্তি। ইচ্ছে আর অতৃপ্তি পাশাপাশি। কখনো দূরত্ব কমে কখনো দূরত্ব অনেক বেড়ে যায়। এই যেমন আমার নায়াগ্রা দেখার বাসনা। সে এখন অতৃপ্তির ভীষণ কাছে। একদম পাশাপাশি। আবার যদি কোনোদিন নায়াগ্রা সত্যিই দেখে ফেলি তখন অতৃপ্তির দূরত্ব বেড়ে যাবে। শেষ হবে না। আরেকটা বাসনার কাছাকাছি চলে আসবে। দুরত্ব সাধারণত দুটি বিন্দুর মধ্যের সরলরেখাটি। কিন্তু বাসনা আর অতৃপ্তি এই দুই বিন্দু সেই সূত্র মানতেও পারে নাও পারে। বক্ররেখায় তার চলাচল হতে পারে। আমার তো মনে হয় এখানেও শেষ পর্যন্ত একটি বৃত্ত বা উপবৃত্ত বা অধিবৃত্ত রচিত হয়ে চলে। বা জিগজ্যাগ অনেক বক্ররেখার সমাহার হয়ে ওঠে। এই যেমন আমার নায়াগ্রা দেখার বাসনা্র বাস্তব দূরত্ব আমার স্বস্থান থেকে নায়াগ্রার স্থান পর্যন্ত। কিন্তু এই মুহূর্তে যদি কোনো সম্ভাবনাই না থাকে তবে তার দূরত্ব অসীম। আর যেই মাত্র কোনো সম্ভাবনা তৈরি হবে সঙ্গে সঙ্গে দূরত্ব কমতে থাকবে। বাসনা চরিতার্থ হলে আপাত তৃপ্তি। আবার নতুন বীজ বপন আর অংকুর উদ্‌গম।
এতসব কথার পর কি মনে হয় না ইচ্ছে উড়তে ভালোবাসে এবং তা নিরন্তর। আর উড়তে গেলে ডানা লাগে। নিরন্তর উড়তে গেলে লাগে ডানার জোর আর দাপট। এসব কিছু থাকলে একটা রিমোটও লাগে এই ওড়াকে নিয়ন্ত্রনের জন্য। সেও আছে। সে হলো মন। এই যেমন আমার মনই একদিন ঠিক করেছিল বা বাসনা পাখিটি উড়িয়ে দিয়েছিল যে নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখতে হবে। ইচ্ছে-ডানা বহু এবং বিচিত্র। রঙ-বেরঙ। যত মানুষ তত একক ইচ্ছে নয়। একেকজন মানুষেরই বহুরকম ইচ্ছে। তারা আবার বিচিত্রতায় ভরা। তো এই ডানা আছে অথচ ওড়ার ক্ষমতা নেই বা খুবই সল্প ওড়া এ যেমন সত্যি হয়ে দাঁড়ায় ঠিক তখনই স্বপনের জাল বোনা। ইচ্ছাই জন্ম দেয় স্বপ্নের। এই স্বপ্ন ঘুমন্তের নয়, জেগে থেকে স্বপ্ন। আশ এবং আশা সঙ্গে ইচ্ছে ও ইচ্ছের ডানা সব মিলিয়ে একটা স্বপ্নের আবহ। যতক্ষণ না সে বাস্তবে এসে পাতা হচ্ছে ফুল হচ্ছে ফল ধরাচ্ছে ততক্ষণ তার শেকড়ের শুকিয়ে যাওয়া নেই, মৃত্যু নেই। এই যেমন আমার নায়াগ্রা দেখার ইচ্ছে-ডানা কাম স্বপ্ন যতক্ষণ না বাস্তবায়িত হচ্ছে ততক্ষণ সে জীবিত সজীব আর বার বার শব্দ করে মনের মধ্যে জলতরঙ্গের ধ্বনি শুনিয়েই যাবে।
ইচ্ছে আর স্বপ্ন যমজ ভাই-বোন। আর রূপান্তরকামী। ইচ্ছে থেকে যেমন স্বপ্নের উদ্ভব হয়, তেমনি স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করতে ইচ্ছে মনে বাসা বাঁধে। আবার উল্টোটাও ঘটে। অর্থাৎ এদের একে অপরের পরিপূরকই শুধু নয়, সম্পূরকও। এই চলাচলটা অনুভব করতে পারলে এদের রূপান্তরকামীতা অবশ্যই ধরা পরবে। কখনো ইচ্ছে ভাই তো স্বপ্ন বোন, আবার কখনো স্বপ্ন বোন থেকে ভাই-এ রূপান্তরিত তো ইচ্ছে ভাই থেকে বোনের আধারে। এ এক অদ্ভুত লীলাখেলা। যে এর মজা উপভোগ করতে পারে তার ভেতরে তরঙ্গ খেলে যেতে বাধ্য। আর সেই তরঙ্গে সে উদ্বেল হবেই।
এই দুই-এর সম্পর্কটা আরেকটু ঝালিয়ে নেওয়া যাক। ইচ্ছের প্রাবল্য না থাকলে স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে। আবার স্বপ্ন না থাকলে ইচ্ছের জন্ম হয় না। ইচ্ছে আর স্বপ্নের একটা গ্রাফ আঁকলে সেটি যে কোনো এক্সিসের সঙ্গে একটি সমান্তরাল রেখার জন্ম দেবে। এই পারস্পরিক সম্পর্কটা নিয়ে একেকজন মানুষ একেকভাবে তার লীলাখেলায় মজে আর ছুটে বেড়ায়। সবসময় শুধু ফিজিক্যালি ছোটে না, করে মানসভ্রমণ। এই যেমন আমার নায়াগ্রা দেখার ইচ্ছেটা কখন একটা স্বপ্নে রূপান্তরিত হয়েছে তা আমি কম বেশি টের পেয়েছি। আর সেই চলাচলের মজাটা উপভোগও করেছি। এখন স্বপ্নটাকে লালন করার সময়। তাকে লালন করছি। জানি এক সময় ইচ্ছের প্রাবল্য এবং পিন-পয়েন্টেড হয়ে যাওয়ার মধ্যে সে সসীমের মাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। আর আমি ভিজে যাবো, শান্ত হবো অসীমের পাদস্পর্শে। নায়াগ্রাতো এখনও আমার কাছে অসীমই।
অনেক ইচ্ছের ডানাই গুটিয়ে যায়। ডানা গুটোলেই তার মৃত্যু। আবার একই সঙ্গে অজস্র ইচ্ছে ডানার কচি পালক গজাতে শুরু করে। রঙিন সব। আর ডানা গজালেই প্রাণ পেয়ে যায় অনন্ত নৃত্যের তালে তালে। কিন্তু প্রথম জীবনের ইচ্ছের সঙ্গে দ্বিতীয় জীবনের ইচ্ছের কোনো দ্বৈরথ না থাকলেও অমিল প্রচুর। প্রথম জীবনের ইচ্ছেগুলো বড় খুদে খুদে আর প্রায়শই মিটে যায়। তাই বড় সসীম। কিন্তু দ্বিতীয় জীবনের ইচ্ছেগুলো ভীষণ বড়, সহজে মিটতে চায় না। তাই অসীম। আর এই দুয়ের মাঝে থাকে আরও সব নানান ইচ্ছে, এই যেমন আমার নায়াগ্রা দেখার ইচ্ছে বাস্তব জীবনে সম্ভব আবার সম্ভব নাও হতে পারে। স্বপ্নই থেকে যেতে পারে। সসীম আর অসীমের মাঝে দুলতে পারে। আর আমি এই দোলন-কালের মধ্যে স্বপ্নটি নিয়ে নাড়াচাড়া করার সুযোগ পেতে থাকি। এ-ও এক মজা। এক উপভোগ। পাওয়া আর না-পাওয়ার মধ্যে ঠিক একটা হাইফেন। কিংবা ড্যাশ। যাকে আশ্রয় করে আমারও দুলে যাওয়া আমৃত্যু। বা মৃত্যুর পরও স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখা আমার সসীম দুনিয়াতে। এত সবের পর, আমি নিশ্চিত নায়াগ্রা আমার চোখে শুধু ভাস্বরই হতে থাকবে।