নেদারল্যান্ড

মালিনী ভট্টাচার্য

হেরমান গর্টের (১৮৬৪-১৯২৭)

উনিশ শতকের শেষে শুরু হওয়া তুমুল আলোড়নকারী বিখ্যাত ‘এইট্টিজ মুভমেন্ট’ এর অন্যতম পুরোধা হলেন হেরমান গর্টের। ১৮৮৯ এ প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মেই’ একটি অবিস্মরণীয় মহাকাব্য যা শুধু লেখক হিসেবে তাঁকে মান্যতাই এনে দেয়নি উপরন্তু ওলন্দাজ ইম্প্রেশনিস্ট সাহিত্যে শীর্ষস্থানে তুলে এনেছে। এর পরপরই ১৮৯০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর সমাদৃত লিরিকাল কবিতার সংগ্রহ যার নাম ‘ভের্জেন’।

‘ভের্জেন’ শুধুমাত্র ওলন্দাজ কাব্যে নয়, সমগ্র ইউরোপীয় কাব্যচর্চায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে। গর্টেরের লক্ষ্য ছিল এমন এক কাব্য-শৈলী সৃষ্টি করার যা পরবর্তীকালে ‘সেন্সিটিভিজম্’ আখ্যা পায়। এই ‘সেন্সিটিভিজম্’-এর মূল লক্ষ্য হল ব্যক্তি-অভিজ্ঞতার টুকরো টুকরো বহমান অংশকে এক মিস্টিক গভীরতায় প্রকাশ করা। ‘সেন্সিটিভিজম্’ তথা গর্টেরের কবিতার উপমা হয়েছে কখনো ভ্যান গখের চিত্র, কখনো বা রাঁবর কাব্য। তবে ইংরেজি সাহিত্যের পাঠকদের ক্ষেত্রে হয়তো কবিতাগুলির সঙ্গে ওয়ার্ডসওয়ার্থের গভীর প্রকৃতি তথা আত্ম-উপলব্ধির মিল পাওয়াও অসম্ভব নয়। কবি যেন যুগসন্ধিক্ষণের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে প্রকৃতি ও সভ্যতার দ্বৈরথ নীরবে প্রত্যক্ষ করে চলেছেন। একদিকে তিনি যে কোন শুভচেতনা সমৃদ্ধ মানুষের মতো সভ্যতা তথা পরিবর্তনকে স্বাগত জানাচ্ছেন, অপরদিকে তিনি সংশয়-কবলিত যে প্রকৃতির ওপর সভ্যতার এই নির্বিচার রমণ শেষ অবধি তারই বিনাশ ডেকে আনে কিনা। পুরনো ও নতুন বিশ্ব-ব্যবস্থার মধ্যবর্তী এই দোলাচল তাঁকে আধুনিক মানুষের প্রতিভূ করে তোলে। গর্টেরের কবিতাকে ওলন্দাজ কবিতার ক্ষেত্রে আধুনিকতার উৎসমুখ ভাবা হয়। তবে শুধুমাত্র আধুনিক বা উত্তরাধুনিক তকমা দিয়ে তাঁর কবিতার সংকীর্ণ বিশ্লেষণ করা নিরর্থক কারণ তিনি সমকালীন সেইসব মানুষেরও একজন যাঁরা সভ্যতার রণ-দুন্দুভির মাঝেও এমন এক প্রকৃতির দীর্ঘশ্বাস শুনতে পান যে প্রকৃতি আত্ম-স্ফুরণ ঘটাতে সক্ষম হয়েও সভ্যতার দ্বারা নিষ্পেষিত।


গাছগুলো সব নিঃস্পন্দ

গাছগুলো সব নিঃস্পন্দ
আকাশের রঙ ছিল ধূসর
ইচ্ছাহীন পাহাড়েরা শুয়ে
অদ্ভুতভাবে পরপর।

মানুষেরা সব শ্রমে ব্যস্ত
সমস্ত অঞ্চল জুড়ে
যেন খুঁজে আনবেই রতন
ধীর লয়ে মৃত্তিকা খুঁড়ে।

পৃথিবীর সারা মুখ জুড়ে
সবকিছু বুঝি একই রকম
জগৎ ও মনুষ্যজাতি
বেঁচে থাকে না বাঁচারই মতন।

আমি হাঁটি, দৃশ্যটিও দেখি
সন্তুষ্ট ও সন্ত্রস্ত
নীচে, আমার পদক্ষেপ চলে
আগ্রহী, চিরবিশ্বস্ত।


নিঝুম রাস্তা

নিঝুম রাস্তা
জ্যোৎস্নায় মাখামাখি আলোক-উষ্ণ রাস্তা--

গাছেদের দল
উফ! কি স্তব্ধ ও বৃদ্ধ গাছেদের দল--
জল
ধীরে ধীরে শক্ত হওয়া তৃপ্ত সে জল।

এবং সব ছাড়িয়ে, বহুদূরে, ডুবেছে আকাশ
সঙ্গে তার তারাদের শীৎকৃত উল্লাস।