চক্রের কেন্দ্র থেকে...

তানিয়া চক্রবর্তী



হওয়া আর না হওয়া এটা একটা ঘূর্ণি। বলা যায় একটা চক্র যা ক্রমশ ঘুরছে তাকে হঠাৎ থামিয়ে কেন্দ্র থেকে দেখুন, এটা হওয়া আর না হওয়ার একটা ক্ষণমাত্র।এবার ওপরের ছবিটির আকৃতিটি দেখুন। এরা সমান্তরাল চলমান গতি যা বাস্তবিক মেলার নয় এবার ধরা যাক কোনো মাধ্যমে তাদের একটু বেঁকিয়ে দেওয়া হল এবারে “ক” স্থানে এরা মিলিত হচ্ছে। আবার দেখুন এর থেকে বেরিয়ে যাওয়া বাহু না সমান্তরাল না মিলিত এর পরস্পরের থেকে ক্রমশ দূরে ধাবমান। যেন এক নতুন এর জন্ম “হওয়া আর না হওয়া”কে দেখে হাসছে।যা মেলার নয় তা মিলে গিয়েও দূরবর্তী। যে কোনো একদিন যদি হওয়া আর একদিক যদি নয়া হওয়া হয় তবে এটাই তার সরলতম চিত্র। হওয়া আর না হওয়া কোনোটার জন্যই মুখ্যত আমরা দায়ী নই । কারণ জীবন দেখলেই বোঝা যায় এই আমির মালিকানা কার্যত খুব গুরুত্বের নয় চূড়ান্তভাবেও। এই আমি সব পারে তার ইচ্ছের চারণক্ষেত্র স্বপ্নের মধ্যে তবে এই একরকম না হওয়াকে হইয়ে দেওয়া স্বপ্নের ফেরিওয়ালাদের স্বত্ব কিনে নেওয়ার মতোই।পৃথিবীর সমস্ত সত্যি আসলে মিথ্যে। যতক্ষণ আমি আমার মন, কলম, জীবন আছে ততক্ষণ এই লেখা আমার কাছে সত্যি তারপর আমির সাপেক্ষে তার আর কোনো মাত্রা নেই। এই অনুভূতি আছে বলেই রূপ , রস, স্পর্শ আছে অনুভূতি না থাকলয়ে আর কোনো মাত্রাই এর নেই
“সত্য কী আর মিথ্যে কী/ জাগরণে সব ফাঁকি” ---এই গান আশা করি আমাদের সকলেরই জানা। আর যদি ধরি সব সত্যি, তবে মৃত্যু কী এমন ম্যাজিক যে সত্যকে মিথ্যে বানিয়ে দেয়!
অধরার শ্লেষে মরি বারবার
জীবন মারে একবার
এসব গোলের ঘরে পতঙ্গভূক হয়ে দেখি
সারা শরীর আত্মরক্ষার তাদিদে কী রং বানায়
আহা রং তুমি শ্লীল থেকে আরো আরো শ্লীল হয়ে’
নেমে আসো চোখে --- তোমার ঘোরের পাশে
জীবন জীবন খেলি
যারা এসে চলে গেছে
তাদের জন্য মৃত্যুর গান বাঁচিয়ে রাখি---
ছোটো থেকে বড় হওয়ার মুহূর্তে বহু নিকটের মানুষদের মৃত্যু দেখেছি --- তার থাকলে আজ কী হতো! একসময় কার্ডিওলজির মধ্যস্থ রক্তরস,প্লাজমা সম্পর্ক আমার জগৎ ছিল আজ সব এসে পড়েছে পৃষ্ঠার কোষপ্রাচীরে। যদি ওরাই থাকত কী হতো!আসলে যে ছেড়ে যায় বা যাকে ছাড়া হয় দুটোই অবস্থার খেলা আর জীবন সেটাকেই কার্যকরী করে এগিয়ে যায়। ফলস্বরূপ তাদের আর জীবনে তেমন কোনো সম্ভাবনা থাকে না এগিয়ে যাওয়ার, কেবল স্মৃতিতে তারা অনুষঙ্গে আসে কিম্বা আসে না। আসলে এই হওয়া আর নয়া হওয়ার মাঝে যে নির্বিবাদী জমি মানে ধরুন নো ম্যানস ল্যান্ড আছে তার মধ্যে একটা কূটচাল আছে যা আপনাকে কোনো অবস্থাতেই সুখে থাকতে দেয় না। হওয়াকে বলয়ে “ না হওয়ার দিকে” তাকা না হওয়াকে বলে “হওয়ার” দিকে তাকা।
#
যে কল থেকে জল পড়ল না, যে মেয়ে গৃহবধূ রয়ে গেল, যে ছেলেটি আত্মহত্যা করল, যে প্রেমিক প্রেমিকাকে অ্যাসিড মেরে পালাল, যে গাছে ফুল ফুটল না, যে নদী শুকিয়ে গেল, যে অসহায় শিশু প্রতিবন্ধী বলে তাকে সকলে সরিয়ে দিল, যে মেয়েটি শিশুবেলায় পিতৃহারা হল, যে সদ্যবিবাহিত মেয়েটি স্বপ্ন দেখার আগে স্বামী হারাল, যে শিশুটি সূচবিদ্ধ হল, যে লম্পট মুখোশ পড়ে রইল, যে রাজনীতি নীতি হারিয়ে ফেলল, যে বাড়ির দরজায় তালা আর কেউ খুলল না, যে নায়িকা আর কোনোদিন বিয়ে করল না, যে প্রেম হিংসায় হিংসায় হারিয়ে গেল, যে ছেলেটি প্রেমিকার কবরের ওপর মন্দির বানাল, যে শিশু জন্মাল না, যে কবিতা বিনয় মজুমদারের মিথ হয়ে গেল, যে মেয়েটা প্রেমিকের বাড়ির পাশ দিয়ে সোজা চলে গেল, যে কবি পেট ভরে খেতে পেল না, যে অকবি কবি হতে চেয়ে দালাল বনে গেল, যে চোখ কখনো কাজল পড়লো না, যে ডাকাত প্রেম করল না, যে ধর্ষকের ফাঁসি হল না, যে মেয়ে পাচার হয়ে গেল, যে বাস হাওড়া পেরিয়ে ময়দান চলে গেল, যে বাংলার কবি নোবেল পেল না, যে সুন্দরী মেয়েটি কখনো নায়িকা হল না
এইসমস্ত কে উলটো যদি করে দেওয়া যেতো কী হতো। নতুন কী হতো! কারণ এর হওয়াটাও তো আছেই এখানে শুধু সাপেক্ষে ঘটেনি---কিন্তু যা এতদিন হয়নি
#
চলুন ব্রাহ্মণ গলার পৈতে খুলে, ম্নত্র ভুলে বোরখা খুলে মেয়েটির কপালে চুমুই না হয় খেলেন, আপনিও মানুষ আর মেয়েটিও মানুষ। আর জানেন তো কোঠাবাড়িতেও কোনো আসল ধর্ম কেউ জানে না! চলো আমার বন্ধু মেয়েটি যে ছেলেটি লোভে, অজুহাতে তোমায় বিছানায় মাপল তাকে উলঙ্গ করে তার মায়ের সামনে চড় মারো অজস্র। এই যে কবি আর ছবি নাই বা দিলেন কিম্বা দিলেও আবছা কিছু যাতে আপনার কবিতা প্রেমিক আপনার মুখ চিনতে পাগলা হয়ে যায়! এই যে হর্ষবর্ধন কাপূর আপনি হয়ে যান না সত্যিকারের আই।পি।এস। এই যে মাতাল আজ মদ না খেয়ে প্রেমিকাকে এক গোছা চুড়ি কিনে দিন না, কিম্বা বাচ্চার দুধ, এই যে ডাক্তার আজ বৃষ্টির দিনে হেঁটে গিয়ে দু’একটা তেলেভাজা কিনে খান না। এই যে আজন্ম শাড়ি পড়া মেয়ে মুখ খুলে, চোখ খুলে হাফশোল্ডার টপ পড়ে ছবি দিন না ফেসবুকে।
যে তোমায় ক্ষিস্তি করে তার নাম সম্মুখে আনো। যে তোমায় ধর্ষণ করে তাকে খুন করো--- হ্যাঁ খুন! --- তবু যা এতদিন হয়নি তাকে হইয়ে দাও। যে অপছন্দের ছেলেটিকে ভালবেসে সব গোলমেলে তাকে ছাড়ো, নিজে হাতে সাপের মুখ ধরে বোতলের মুখে চেপে ধরো, বিষ নিয়ে বার করে আনো ওষুধ! যে ছেলে তোমার আঁচলের ফাঁকে থাকা ভাঁজ দেখে পিছু নিলো তার দিকে ফিরে আঁচল খুলে বলো এই নে মা খা---যা হচ্ছে না তা হইয়ে দাও মেয়ে। রজঃপূর্ণ শরীরে ফুল নিয়ে ঢোকো মন্দিরে ঈশ্বরী যদি থাকে তিনি মন খুলে দেখবেন। যে মা স্বপ্ন ভুলে সংসারে তাকে স্বপ্ন ফিরিয়ে দাও, যে আঙুলে কেবল নখপালিশের রং তাকে ট্রিগারে হাত দেওয়াও।
#
এই পৃথিবীতে হওয়া আর না হওয়া রুটির উল্টোপিঠ নয়। তারা সবদিক থেকে আলাদা! হয়ে যাওয়ার পরও তারা আরও না হওয়ার মতো হয়ে যায় অনেকসময়। আসলে যা হচ্ছে আমরা তো সেইসব হয়ে যাওয়ার পক্ষে নই। তাই হওয়া আর নয়া হওয়াটা আসল কথা নয় আসল হল কোনটা ইতিবাচক, যদি হওয়া আর না হওয়া ইতিবাচকের বিরুদ্ধে যায় তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে।আসলে গোটাটাই একটা খেলা। অনেকটা এককোষী প্রাণীর রেচনের মতো। আমাদের এই সমস্ত অভাবনীয় অপূরণীয় জীবন আসলে পেণ্ডুলামের গতি তার দোলনকাল বদলাতে হলে তাকেই ভেঙ্গে ফেলতে হবে, মানে সিস্টেম ই ধবংস।
এ গাঢ় রং –এর কাকতালীয় ধূসর দিগন্ত
এখানে পর্যাপ্ত পর্যাপ্তকে খায়
আসুন ঘড়ি বিসদৃশ হলে তার সময় বদলায়
আমাদের সুপুরি জীবন নারকেল জীবনকে টক্কর দেয়
এসব গোলমেলে কাঠকয়লার দিনে
আমরা কয়লার হীরে গল্প ভুলেছি
আর হীরে কাটার সময় কেবল কাচকে ডেকেছি---