ইচ্ছে ডানার সবগুলো বোতাম খোলা

জয়ন্ত জিল্লু




একদিন বৃষ্টি নেমে যাচ্ছে, আমি আকাশ ভেদ করে আরশেআজিম অবধি পৌঁছে বসে জোছনা পোহাচ্ছি। সফেদ ফালি ফালি জোছনা। আমার ইচ্ছের সব দরোজা শব্দ করে খুলে গেল। আমি প্রবেশ করলাম। আমি দেখলাম—বৃষ্টি তৈরি হচ্ছে। পোয়াতি মেঘ ঝরছে। মেঘের বাড়ির দিকে আমার চরকা-সূতার বিনিয়োগ মনে পড়ল। পরিব্রাজক! ভাবলাম একটি সাঁতার দিই। একটি সাঁতারে মুখ খুলে তাকিয়ে রইল দেহভরি ওজন, নিজের সঙ্গম ও অন্যান্য পায়তারা। কারও কথা মনে পড়ল। কুসুম, না সাকিয়া, না সুখি, না আঞ্জুমান!!! সব চরিত্র কাল্পনিক। ভাবতে চাইলাম, পৃথিবীতে আমার একটা জোছনা পোহানো বিদ্যা আছে। ইচ্ছের ডানায় চড়ে আছে মায়াসভ্যতা যাপন। এবার মায়াসভ্যতার কথা বলি—সে এক বিরাট কারবার, জানেন সিলিং ফ্যানের নিশ্বাস থেকে আয়ু খরচ করে উদোম শরীর নিয়ে হাঁটি। পৃথিবীর প্রথম পুরুষ আদমের মুখ মনে আসে। মনে আসে জাবালে-রহমতের প্রার্থনা। হাত উঁচু করে উদোম আকাশের দিকে তাকাই, জোছনা গলে গলে পড়ছে। শরীরে শার্ট নেই, সেলাই হওয়া বুকে একেকটা জোছনার তীর এসে ছটফট করে। পানিতে বুদবুদ উঠলে যেমন হয়, তেমন শব্দ হচ্ছে। জীবনানন্দের ট্রাম সহযোগে চাঁদের আলো অবধি পৌঁছে যাচ্ছে মায়াসভ্যতার হেঁশেল। আমি একা একা হাঁটা শুরু করেছি। আমি হাঁটছি আরর ভাবছি চুয়ান্ন কোটি বছরের জীবন। একটি আলাপন আলপিনে চুলে গুঁজে দিলাম। চরিত্রগুলোর নাম মনে থাকে। হয়ত সাকিয়া হবে, নতুবা ঋদি। কিংবা শৈশবের আঞ্জুমান। ইচ্ছের দেয়ালে কথোপকথন প্রিন্ট হতে থাকে...

আপনার প্যারালেল দুটি স্বত্তা। একদিকে রাত, একদিকে নিশ্বাস। একদিকে ঘুম, একদিকে স্বপ্ন। আপনি ভীষণ ভালোবাসা, ভালোবাসাময় মনঃস্বত্তা। উর্ধ্বমুখী, ডাইমেনশনাল।

আপনাকে ডিফাইন করছি। বৃষ্টি এসেছে। ভিজবেন? ভাবুন, একটি মই বেয়ে উপরে উঠছেন। আস্তে আস্তে আকাশ স্পর্শ করেছেন। মেঘ ধরা গেল হাতে। মেঘ স্পর্শে বৃষ্টি এল।

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে এলেন একটি নৌকায়। নৌকায় বৈঠা বেয়ে যাচ্ছে। একটি অরণ্য। রহস্যময় হলো পথ। একটি রহস্য এসে চুলে হাত বুলিয়ে দিল। ভেজা চুল। একটি দারুণ গন্ধ।

ঘাড় থেকে চুল সরানো হলো। একটি স্পর্শ ঘাড়ে, কানের লতিতে, থুতনিতে। চোখ বন্ধ। চোখের পাতায় বৃষ্টি। টুপ। টুপ করে বৃষ্টি নামছে। ঠোঁট ছোঁয়।রহস্যময় একটি অরণ্য, আরও গভীর হচ্ছে। আরও রহস্যময়। আরও লাবণ্যময়। আরও গভীর। স্পর্শ।

চোখ বন্ধ। একটি অন্ধকার বানানো হলো। এখন অন্ধকারের ভেতর থেকে উঠে আসছে একটি নির্ভার হাত। যাকে ভরসা করা যায়। একটি হাত। যাকে নিরাপদ মনে হলো। চোখে এসে পড়ল হাত। কী সুন্দর অন্ধকার। এখন দেখা যাচ্ছে একটি কাশফুল। অন্ধকারে শাদা হয়ে ফুটে আছে। বুকের দিকে ফের আলো ছড়িয়ে এল। একটি তাসখণ্ড। একটি ঢেউ। বুকের গহীণ ভেতর একটি রহস্য। বাইরে বৃষ্টি। ভেজা চুল। শরীর আটকে আছে লাবণ্যে। জল চুষে নিচ্ছে মাটি। বাইরে এতো জল, তবু তৃষ্ণা। উষ্ণ হচ্ছে নিশ্বাস।

হাঁপরের মতো বুক। যেন একটি ঢেউ, সবুজ ধানক্ষেত। একটি পানকৌড়ি। রক্ত। চিবুক স্পর্শ প্রার্থনা করে। ঘাড় করে স্পর্শ। ঘাড়ের চুল সরে যাচ্ছে। চোখ বন্ধ। কানের লতি ঠান্ডা। বরফের মতো ঠান্ডা। স্পর্শ। উফ।

দেহ শরীর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। মন উড়ে যাচ্ছে নীলে। একটি মই উপরে উঠছে। নীল নেমে যাচ্ছে। একটি স্নিগ্ধ আকাশ। বুকে ঢেউ। বাঁশিতে ফুঁ। সুর ওঠছে। অরণ্যে রহস্য। নৌকা ছুটছে। দু-ধারে কাশবন।
বৃষ্টি হচ্ছে। খুব বৃষ্টি। বৃষ্টির শব্দে শরীর ভাঁজ খুলছে মাড় দেওয়া শাড়ীর মতোন। উদোম। পৃথিবী ধুয়ে দিচ্ছে দেহ। দেহের অধিক বৃষ্টি। অধিক বৃষ্টির গান। ঘাড় থেকে চুল সরে যাচ্ছে। পেছনে ছায়া। একটি স্পর্শ। একটি মুখ এসে জমা হয়ে আছে ঘাড়ে। দুটি হাত দুদিক থেকে দরোজার মতো বন্ধ করে দিচ্ছে চোখ। এখন নিশ্বাস বুঝা যাচ্ছে। নিশ্বাস পড়ছে। স্বরিত স্বর থেকে উদাত্ত। নিশ্বাস বাড়ছে। দ্রুত হচ্ছে নিশ্বাস। আরও দ্রুত। শরীর নেমে যাচ্ছে লাবণ্যে। কানের লতি থেকে ঠান্ডা এসে জমা হচ্ছে হাতে। ঠান্ডা হাত। বুকের দিকে বিদ্যুৎ চমকে যাচ্ছে।

স্পর্শ একটি আয়নার মতো। নিজেকে দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে ভেজা চুল থেকে উড়ে যাচ্ছে গন্ধের সারস। কানের লতি থেকে চিঠির মতো আসছে ঠান্ডা। চিবুকে আন্দোলন। ঠোঁট কাঁপছে। পৃথিবীসুদ্ধ স্থির। একটি রহস্য জমা পড়েছে হাতে। একটি রহস্য জমা পড়েছে বুকে। উদোম। মায়াসভ্যতা। এক ফোঁটা বৃষ্টি নিচে নামছে যেন নামছে সুখ। যেন একটি সুখের ট্রেন নিচে নেমে যাচ্ছে। মৌ মৌ গন্ধ। ভেজা ভেজা গন্ধ। একটি রহস্যের দরোজা খুলে গেল। একটি দরোজা। এটা স্বর্গ। এখানে চুলের মতো বৃষ্টি এলো। এখানে নিশ্বাস এলো।

এখানে তুমি এসে চুপ করে রয়েছো। কারণ তুমি জানতে এখানে কবি আসবে। কারণ তুমি জানতে এখানে নিশ্বাসে জারিত হচ্ছে কবি। কারণ তুমি জানতে এখানে চুয়ান্ন কোটি বছর ধরে অপেক্ষা করছে কবি, একটি নিশ্বাসের জন্য।

এবার চোখ খোল। এবার শরীরে জড়িয়ে নাও পোশাক। এবার কানের লতি স্পর্শ করে দেখো। এবার ঘাড়ের চুল ধরে দেখো। এবার দেখো বুকের কাঁপন। এবার দেখো, নিম্নমুখী ট্রেন কোথায় থামল। একটি বলবিদ্যা এবার। এবার তুমি বিন্দু হয়ে গেলে। একটি বিন্দু, যাকে বড় করা যায়। যাকে ভালোবাসা যায়। যাকে শোনানো যায় প্রেম।

এতক্ষণে তুমি বুঝলে তোমার কবিকে দরকার। তোমার একটি প্রশ্রয় দরকার, যেখানে মেলা যাব হাত। যেখানে ছোয়া যাবে বৃষ্টি। যেখানে শরীর থেকে নেমে যাবে শরীর। এবার বলো, তুমি কি আমাকে চাও না, তুমি কি কবিকে চাও না?

এই যে অপেক্ষা করে আছি জৈব যৌগ পুরাবে, কোচিং এর শিডিউল ভুল হবে: এটা মিথ্যে না। তুমি আমি আরেকটা জীবন। বিশ্বাস করো, আমাদের নিশ্বাস জমা হয়ে আছে আস্তিনে; তোমার ঘাড়ে।

হুম, প্রশ্নটা তোমাকে। আপনি বলিনি। কেননা তুমি বরফসম শব্দ। ঠান্ডা। ভেজা।

তোমার চুলের গন্ধের মতো একটি রহস্য। প্রশ্নটা তোমাকে। কেননা, আমি চার ঘণ্টা জেগে ছিলাম উত্তরের জন্য।

তবু একটি নিশ্বাসসংকট। ভাবছো, কবে ঘাড়ের চুল সরাবে, কবে কানের লতি পাবে স্পর্শ। জীবন একটি কবিতা। এই যে আজ তোমাকে যেখানে নিয়ে গেলাম, আর কোনদিন গিয়েছিলে?

সত্যি!! ওই যে চুয়ান্ন কোটি বছর আগে। তোমার এখন আমাকে অবহেলা করার সময় এসে গেছে। এখন আমাকে অবহেলা কর।

আমার সাথে কি আকাশ দেখা যায়? বৃষ্টিতে ভেজা? নৌকায় রহস্যে প্রবেশ।

ভালোবাসা একটি সুদীর্ঘ ব্লাউজ; যেখানে হৃদয়ের মাপে স্তন উঠে।

ওই যে নিশ্বাস। ভেজা চুল। ট্রেন। পানকৌড়ি। রক্ত। হাঁপরের মতো বুক। ঘাড়ের উষ্ণতা। কানের লতি ও ঠান্ডা। বন্ধ চোখ। একটি নৌকা। আর তুমি।

এখন আমরা মরে যেতে পারি।

তারপর চুয়ান্ন কোটি বছর ফিরে যাব। আমি তুমি নিশ্বাস পুহাব। আমার বুকে তুমি, তোমার বুকে আমি অনিবার্য রয়ে যাব চিরকাল। আমি এখন কাঁদছি।
ভীষণ। খুব। আচ্ছা, তোমার আদুরে নাম কী?

আমি মোমের মতো গলে গেছি। ভিজে গেছি চুলের গন্ধে।

আমাকে প্রশ্রয় দেবে, একটু?