জলজ অভিসার

ইন্দ্রনীল বিশ্বাস




বৃষ্টির জল পাতাগুলো ধরে খানিক দোল খেয়ে পড়ে যাচ্ছে মাটিতে। মাটিই শেষ গন্তব্য কিনা নাকি ওই পাতার নিচে আর অনেক ছোট বড় পাতায় দোল খেতে খেতে খানখান হয়ে বিন্দু হয়ে গেঁথে থাকবে মাটিতে সেকথা একমাত্র বৃষ্টির কুর্চিদানা বা মাটি কারোর কাছেই কেউ জানতে চায়নি। চায়নাও, চাইলে এতদিনে খানাতল্লাশির দলিলদস্তাবেজ সভ্যতার নিম্ন থেকে উচ্চ আদালতের অমীমাংসিত মামলার কয়েক লক্ষ গুন বেশিই হতে পারত। সেই সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের ময়না আমাদের খুব একটা আন্দোলিত করে বলে মনেও হয়না। দৈনন্দিন বন্যার প্রবল স্রোতে আমাদের বাজারের থলি উপার্জনের হিসেব কষার আগেই বেঁচে থাকবার অপরিসীম জৈবনিক তাগিদে অন্য কোনও খড়কুটো ধরে আর এক হিসেবে শ্যামল মিত্র গুনগুন করে, যা গেছে তা যাক, যাক যা গেছে তা যাক।

তবুও বৃষ্টি পড়ে, পাতা ধরে দোল খায়, অবিনাশী এই দৃশ্যে আমাদের দড়ি ভরা প্যান্ট বেলবটম, প্যারালাল অতিক্রম করে পুনরায় চোস্তে ফিরে আসে পরিযায়ীর দক্ষতায়। শুধু হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশের বিজ্ঞাপনে ফিকে হয়ে আসা মুখে স্মার্ট নামে। সত্তর দশকের খানিক আগে এই লুপ্তপ্রায় বিজ্ঞাপনে জন্মলগ্ন ঘোষণা করে যারা হেঁট মুণ্ডে অভিবাদন জানায়, তারাও একদিন জেনে যায় স্বাধীনতা তাদের চেয়ে মাত্র কুড়ি বছরের বড়। অষ্টাদশী অতিক্রান্ত প্রেয়সীর হিল্লোলে আন্দোলিত হওয়ার আগেই ঘোষিত ইস্তাহারে ধরা পড়ে ‘এ আজাদি ঝুটা হ্যায়’। এই নিয়তির নির্মাণে ইতোমধ্যে বাহু বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া স্বপ্ন খানিকটা যেন উপঢৌকনের ডালি ভরে বহুমূল্য রক্তের নিদানে নির্ধারিত হোল। আর হোলই যখন তখন গ্রিক ট্রাজেডি ধার করে আউদিপউসের নিয়তি নির্ভর দেশ হাইডেন্ট খুলে নিয়ে কুষ্ঠরোগীর মত জল চেটে নিতে থাকে। এই কারনেই কিনা জানিনা আমাদের মধ্যবিত্তের অহংবোধের আয়নায় বেহুলার বাসরঘরের ছিদ্র দিয়ে যে কালনাগিনীর মুখ বারবার ফিরে আসে জীবনানন্দই একমাত্র প্রতিস্পর্ধি ভাষ্য হয়ে ওঠেন-

জীবন গিয়েছে চলে আমাদের কুড়ি-কুড়ি বছরের পার-
তখন হঠাৎ যদি মেঠে পথে পাই আমি তোমারে আবার!

এমনই স্বপ্নের বুননে এক তীব্র বর্ষায় তিন বছরের শিশুর কান বজ্রপাত ও অন্য এক বজ্রধ্বনির মধ্যে যুগপৎ আতঙ্ক ও বিস্ময় নিয়ে বড় হয়, যেখানে তীব্র বর্ষার জল ধোয়া রক্তের উৎস সহযোদ্ধাদের কাঁধে হাত রেখে মরণ দেখা গলায় ক্রমগত বলে যেতে থাকে ‘পালা, তোরা পালা’। পালাতে পালাতে বড় হতে থাকা স্বাধীনতা কোনও এক গোপন ও অভিসারি বিহ্বলতায় পর্দা জুড়ে মধ্যবিত্তের অভিলাস পূর্ণ হতে দেখে, যেখানে উত্তম ও সুচিত্রা যুগপৎ মিলন ও বিরহের আবহটুকু অন্তত ছড়িয়ে দিয়ে যান। তখনও স্বাধীনতা নামক অচিন পাখি ঊনপঞ্চাশোর্ধ পাড়া প্রতিবেশির মুখে এক লব্জে পার্টিশন ও দেশভাগ শব্দের মধ্যে নামমাহাত্ম্যে ক্রমশ প্রকাশ্য হতে থাকে।

সুতরাং গল্পদাদুর আসর ও আনন্দমেলার সচিত্র টিনটিন ম্যানড্রেক ছাড়িয়ে কিরীটী রায় ব্যোমকেশের অনুসন্ধিৎসা নিয়ে ধর্ষিত স্বাধীনতার নির্যাতিত মুখের দিকে চেয়ে দেখবার সমস্ত রাজনৈতিক প্রয়াস যখন উপর্যপরি নাকচ হয়ে পড়ে তখনও মরেও না মরা স্বপ্ন দেখতে ছুটে চলে যৌবন। আর তাকেই যূপকাষ্ঠে তুলে আহ্লাদিত আত্মপ্রসাদে ভুগতে থাকা বেওয়ারিশ স্বপ্নেরা কোষ্ঠকাঠিন্যের মায়াজাল বুনে মসনদের দখলদারিত্ব নিলামে তুলতে থাকে। এই পার্টিশনই যে একমাত্র সত্য নয়, ইতিহাসের সেই জোরজবরদস্তি সীমারেখা টানবার গোকুলে মুক্তিযুদ্ধের ডাক দিয়ে যায় যে যৌবন সেখানেও ক্রেয়নের অভাব হবে এটাও বাতুলতা। তাই পাঁচ বছরের সেই শিশু স্কুলে স্বাধীনতাদিবস পালন করে বাড়িতে আবিষ্কার করে শোকাতুর জন্মদাতা জন্মদাত্রীকে, যখন তার বিস্ময়ে জুড়ে যেতে থাকে মুজিব নামক এক ব্যক্তি কেননা যার মৃত্যু একটি অন্যদেশের একটি পরিবার স্বজন হারানোর অশৌচ যাপনে অরন্ধন পালন করে।

সেই সব বিচ্ছিন্ন ও আত্মপীড়নের ইতিহাস আসলে কোনও কিছুই আর জুড়তে দেয়না। তবুও স্বপ্ন তো থাকে, সেই শিরশিরানির মধ্যেও আত্মমেহনের অলৌকিক আবদারগুলো নাতিদীর্ঘ কোনও অতিরেকে আর ফিরে আসে না। গলিত স্থবির ব্যাঙের মতো মুহূর্তেরা যদি একবারও এই এঁদো গলির ঠিকানায় আলো দেখতে পেতো তাহলেও অন্তত একবার ঘটমান সময়ের ঊর্ধ্বতনে উঠে দেখা যেতে পারতো রিওয়াইন্ড ক্ষত চিহ্নগুলি। তাকে গুনে নেবার দায় থেকেই বহুলাংশের আকাঙ্ক্ষা আগে ক্যামন সোন্দর দিন কাটাইতাম। অন্তত এই সময়ের আন্তিগনেদেরে একমাত্র উচ্চাকাঙ্খায় বেঁচে থাকা মৃত্যুকে বিশল্যকরণীয় তারিকা বাতলে দেওয়া যেত।

একদিন, হয়তবা কোনও একদিন পুনরায় অগ্রহায়ণের পৌষের স্মৃতিগন্ধগুলি ফিরে পাবে বৈঠকি মৌতাত। যৌথখামারের উঠোন ভরে উঠবে মাটির সোঁদা গন্ধে, সেখানে একই সঙ্গে হরিপদ কেরানী ও আকবর বাদশা নিলামে তোলা তামাদি অহং ভেঙে এক হুঁকোয় টেনে নিতে পারবে আরও কিছু জীবন। এই অন্ধকারেও দেখতে পাই আর কোনও কাঁটাতার নেই, কুপার্স নেই, দণ্ডকারণ্য নেই, মরীচ ঝাঁপি নেই, নেই বরানগর, বারাসাত। আমার মেয়েটা ইচ্ছেখুশির সময়কে নিয়ে বাগাডুলি খেলছে, আমাকে আর ঘড়ির কাঁটার উৎকণ্ঠায় উদ্বাহু দুশ্চিন্তারা তাড়া করে ফিরছে না। কোনও পরিচয়পত্র নয়, মানুষ আর একজনকে মানুষ বলে জেনেছে। বৃষ্টির পতনের ইতিহাসে একবুক ধান নিয়ে এই অপেক্ষা হয়ত কোনও একদিন সফল হবে, নইলে গালি দেওয়ার জন্যও অন্য কোনও দ্বিতীয় মানুষ খুঁজতে হবে।