ম্যাজিকলণ্ঠনের আলো

অনিন্দিতা গুপ্ত রায়



তাই কি আবার হয় নাকি? ধরো একখানা সাদা পাতা নিয়ে তুমি বসেছ আঁকতে আর হঠাত দমকা হাওয়ায় উলটে গেল রঙের বাটি, জলের দোয়াত। ব্যস---যেমন যেমন রঙ মেলাবে ভেবেছিলে মুহূর্তে সব ভেস্তে গেল। সেই পৃষ্ঠাখানা আবার সম্ভব কী আগের মত করে তোলার! সেই অনিচ্ছাকৃত চাপিয়ে দেওয়া পরিস্থিতির ভেতর বরং চোখের জল মুছেটুছে খুঁজে দেখি অন্য কোনও ছবি পাওয়া যায় কিনা। যায়না---মনের মত হয়না সে আর। ওই ভুল রঙে ভেজা ক্যানভাসটিকেই রোদে আলোয় শুকিয়ে সাজিয়ে তার মাপ মত করে নিতে হয় নিজের দেওয়াল। অনেক দীর্ঘশ্বাস ক্রমশ ফুরিয়ে আসে প্রকাশ্যে। সরে যায় নিভৃতে। জীবনে এমন বহুবার ঘটে। কত অপ্রয়োজনীয় অদরকারী ঠাসাঠাসি করে থাকে একটুখানি কুঠুরিতে---আর বড্ড দরকারী অপরিহার্যটুকু হারিয়ে যায় দূর্বিপাকে। জীবন সুযোগ দেয়না তাকে দ্বিতীয়বার। কিন্তু কাগজ কলম তো দেয়। যদি সেরকম একটা সকালবেলা হঠাত কোনো যাদুকর তার যাদুঝুলি নিয়ে এসে দাঁড়ায়, আর তার প্রেস্টিজিয়াস ফিরিয়ে দেওয়ার মুহূর্তটি বাঁচিয়ে দেয় আকস্মিক জীবনে---তবে বদলে যাক সেই দিনটি যেদিন বাবার পজিটিভ বায়োপ্সি রিপোর্ট হাতে নিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে ঝাঁকড়া চুলের ডানপিটে ছাব্বিশ বছরের ছেলেটি বাচ্চাদের মত হাউহাউ করে কাঁদছিল--- মা যেন কিছুতেই জানতে না পারে, মাধ্যমিক পরিক্ষার্থী বোন যেন কিছুতেই না জানতে পারে যে বাবা আর কয়েকমাসের অতিথি---বাবা, বাহান্ন বছরের তরতাজা সম্পূর্ন তরুণ মানুষটি যেন বুঝতে না পারেন কিছুতেই। বড্ড ভিতু যে তিনি! কত কাজ যে বাকি রয়ে গেছে তাঁর। শখ করে পুত্রস্নেহে অন্ধ মানুষটি ছেলের ভালোবাসা কে স্বীকৃতি দিয়ে খুব আয়োজন করে বউমা নিয়ে এসেছেন ঘরে---তোরা দুটিতে থাকনা আমার ঘরটুকু জুড়ে-- এই বলে। খুব ঠান্ডা ছিল সেদিন। ২০০০ সালের জানুয়ারি মাসটায়। কুয়াশা, হাল্কা বৃষ্টি আর একটা গোটা পরিবারের মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়া! এমন হয়না---এই মারাত্মক অসুখটা যদি সামান্য সর্দিজ্বরের মত দুএকটা ওষুধ খেলে বা না খেলেও সহজ আরোগ্য হয়ে যেতে পারে?
জাদুকর বলুক —বেশ , তবে তাই হোক! আর তারপর তার আলখাল্লার ওপর ঝোলানো তাপ্পি মারা ঝুলিটা থেকে বের করুক একটা স্বচ্ছ স্ফটিক। হাতের মুঠোয় দেক ছেলেটির----ওমনি একমুহূর্তে সতেরো বছর ঘুরে যাক চাকা, সামনের দিকে। সেদিনের সেই ঝাঁকড়া চুলের মায়াময় চোখের ছাব্বিশের ছেলেটি আজ চল্লিশ পেরনো অধ্যাপক। উঁচু গেট দেওয়া বিরাট সুদৃশ্য দোতলা বাড়িটার বড় লোহার গেট খুলে গ্যারেজে গাড়ি ঢুকিয়ে সে দেখবে বিরাট লম্বা হলুদ বারান্দাটায় দুটো দোলনা চেয়ারে কাচাপাকা মাথার দুজনে বসে আছে। মা-বাবা। প্রতিদিনের সান্ধ্যভ্রমণের আগে চা-পর্ব। মানুষদুটি পরস্পরের হাতের ওপর হাত ছুঁইয়ে রেখে মৃদুস্বরে গল্প করছে। মায়ের হাসির আওয়াজ রিনরিন করে বাজছে ছেলেটি শুনতে পায়। বাবার মুখে চাপা হাসিতে একটু দুষ্টুমি আর একটু প্রসন্নতার সঙ্গে সামান্য গর্বও মাখামাখি। মায়ের কপালজোড়া লালে সূর্যাস্তের আলো টকটকে মুখখানা আরো উদ্ভাসিত করেছে লাবণ্যে। দুই নাতি---একটি তারুণ্যের দরজায় অন্যটি শৈশবের অমল শোভায় চঞ্চল পায়ে আহ্লাদে আবদারে ভরিয়ে তুলেছে মস্ত বাড়িটার আনাচকানাচ। এই বাড়িটা সাজিয়েছে ওরা সবাই মিলে ভালোবাসায়। মায়ের শখের ঠাকুরঘর, প্রিয় বারান্দা, বাবার নিজে হাতে তৈরি বাগান, ভাই বোনের ছোটবেলার সহস্র স্মৃতিমাখা বাড়িটায় বাবার নিথর শরীর সেই দুহাজার সালে এসে পৌঁছনোর পর---চাকরি নিয়ে, শহর ছেড়ে, পরিবারের মানুষগুলোর হাত ধরে আর নিজের শরীরে মধুমেহর তীব্র ছোবল জড়িয়ে সেই সাতাশ বছরের স্বপ্ন দেখা ছেলেটার বয়স একশ বছর বেড়ে গেছে যে ঘটনাটায়----আর মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী বোনটার জীবন লড়াইএর সমার্থক হয়ে আছে সেই থেকে ----সেই সমস্ত ঘটে যাওয়াগুলো হঠাত নেই হয়ে যাক চোখের সামনে। সেই নেই হয়ে যাওয়া বাড়িটা আসলে তো আছে ওর বুকের ভিতর। নিজের নিজের বাড়ি আছে, কিন্তু মেয়েটির ছেলেটির কোনও বাপের বাড়ি নেই। অন্য মেয়েটির ছেলেটির যেমন শ্বশুরবাড়ি নেই আর।
ছিলো থেকে নেই হয়ে যাওয়া গুলো অন্যভাবে লিখলে কিরকম হত এই জীবন? কিছু কম হত--- শোক সন্তাপ হাহাকার অশ্রু অভিমান শূন্যতা। কত কম হত এই জীবনে। আরো অনেক অনেক জীবনে। পৃথিবী থেকে নেই করে দেওয়া যায়না মারণ অসুখগুলোকে? নতুন করে লেখা যায়না অকালে হারিয়ে যাওয়া জীবনগুলোর গল্প---স্বাভাবিক আসা-যাওয়ার ছন্দে? লিখতে গেলে কলমের কালি ঝাপসা হয়ে আসে চোখের জলে যেসব গল্প--- সেগুলোতে রঙ ফেরাতে পারো জাদুকর? তাহলে সেই বাসটা---সেই যে মহানগরের বুকে একটু বেশি রাতে শীতের কুয়াশার বাসটা এক হাস্যোজ্জ্বল তরুন তরুণীকে নিয়ে ছুটে যাবে বলে প্রতিশ্রুত ছিল তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দাও। মুছে যাক নির্ভয়া কাহিনির মধ্যে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসা ভয়ার্ত মেয়েগুলোর চিৎকার। লেখো না এমন খবর---যে বাসের ড্রাইভার খালাসি সহযোগি ছেলেগুলো বড় যত্নে মমতায় নিরাপদে ছেলে মেয়ে দুটিকে পৌঁছে দিয়েছিল তাদের বাড়ি অবধি। গান গাইছিলো ওরা সবাই মিলে। আর মেয়েটি হাসছিল ঝর্নার মত। “ভাইয়া ভালো থেকো” বলে---হাত ধরে বিদায় নিয়েছিল ওদের কাছ থেকে নামার সময়। এ গল্প লেখা যায়না, না? পঁচিশে এপ্রিল ২০১৪ নেপালে ভেঙে পড়া বাড়িগুলো ওই দ্যাখ----আসলে বাচ্চাদের ঝুলন উৎসব ছিল। সত্যি সত্যি ঘটেনি। ওই পাহাড় আসলে কাঠ পাথর আর ছেঁড়া কাপড়ের পুতুলখেলা গো! ওই যে ছবির মত দেশটার ভাঙাচোরা ঘরগুলো থেকে সারি সারি পুতুলের দেহ ওগুলো একটা চলচ্চিত্রের অংশ, বল? কিছুক্ষণ পর আবার সব আগের মত হয়ে যাবে? এই ভূমিকম্পের আতঙ্ক ত আসলে আমাদের নিরাপত্তাহীনতা! মজ্জার ভেতর সেঁধিয়ে থাকা টালমাটাল বিপন্নতা। এগুলো ঘটেনি---আমি চাই যাদুকর। তুমি নেই করে দাও। নেই করে দাও আমার না চাইতে বলে ফেলা সেইসমস্ত কথাদের যা এফোঁড় ওফোঁড় করেছে প্রিয়জনদের অভিমানের ছদ্মবেশে। সমস্ত আঘাত ধারন করতে না পেরে উচ্চারিতও যদি হয়ে থাকে তারা---তবু আমি ফিরিয়ে নিতে চাই। ভুল সম্পর্কের ভাঙা কাচে ফেলে আসা রক্তাক্ত পদচিহ্ন মুছে নিতে দাও। “তোমায় কাল বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাব” বলে হাসপাতালের সাদা বিছানায় অসহায় জলে ভেজা চোখের কথা বন্ধ হয়ে যাওয়া মানুষটির কাছে কথা রাখার সুযোগ করে দাও হে জীবন তার অপদার্থ সন্তানকে। মৃত্যুকে হেরে যেতে দাও কিছুক্ষনের জন্য অন্ততঃ! এতাবৎ সমস্ত দূর্ঘটনাগ্রস্ত যানগুলি অক্ষত গন্তব্যে ফিরুক। মিথ্যে হোক চলে যাওয়াগুলো। রোজা শেষে মায়ের কোলে ফিরে গেছে অভুক্ত ছেলেটি দ্যাখো। ট্রেনযাত্রীরা তো ওর সহযাত্রী সকলে। আমরা যে জানি একযাত্রায় পৃথক ফল নেই। এক জীবনে পৃথক আকাশ নেই। একটা গোটা আকাশের স্বপ্ন ফিরিয়ে দাও যাদুকর। জানলার মত যাকে ইচ্ছেমত বন্ধ করা যায়না, মাদুরের মত গুটিয়ে নেওয়া যায়না। রক্তের ভেতর ভেসে থাকা সূঁচগুলি তুলে নাও। সম্পর্ক শব্দের ভেতর এত যে রঙ, এত মায়া, এত স্নেহ, এত ভালোবাসা, এত অধিকার, এত উড়ান, এত মুক্তি---- তুমি আগামী পৃথিবীতে তাকে আগলে রেখো তোমার ওই জাদুঝুলির মেঠো অন্দরে। খুঁজে দ্যাখো ত একটা ইরেজার আছে নাকি লুকনো কোথাও ওই শমীবৃক্ষের ডালে----আমায় দিও। আমি ঘষে ঘষে তুলে ফেলব পাপ ও প্রতারণা, হত্যা ও হিংসা, অবিশ্বাস আর অপমানের মত শব্দগুলো যা দিয়ে ধ্বংস হয়ে গেছে হাজার হাজার বছর ধরে সেজে ওঠা অন্দর –বাহির। তাদের যদি নতুন করে লিখতে চাই---সেই ভাষা আমায় শিখিয়ে দেবে ত? জলে রঙে মাখামাখি ক্যানভাসটা কিরকম ছবি হয়ে উঠেছে দ্যাখো!