ইচ্ছার স্বরূপ

উপল বড়ুয়া



“ইচ্ছে হলো একধরণের গঙ্গাফড়িং/ অনিচ্ছেতেও লাফায় খালি তিড়িং বিড়িং/ ইচ্ছে হলো একধরণের বেড়াল ছানা/ মিনি গলার আবদারে সে খুব সেয়ানা।” —কবীর সুমন।

মানুষ যে দুনিয়াতে বেঁচে আছে তার একভাগ হলো অভ্যেস ও আরেকভাগ নিশ্চিত ইচ্ছে শক্তি।’ এই ‘ইচ্ছের শক্তি’ই মানুষকে হাজার হাজার বছর ধরে অন্যপ্রাণ থেকে নিজেকে আলাদা করে দিয়েছে। এই ‘ইচ্ছে শক্তি’ই মানুষকে একদিন বয়ে নিয়ে যাবে। মানুষ যাযাবর। মানুষ বহমান। সে কেবল স্রোতের অনুকূলেই যেতে চায়। মানুষ মাত্রই ইচ্ছার দাস। এবং সমাজের উচ্চ থেকে নিম্ন মানুষটিও ইচ্ছে করে। স্বপ্ন দেখে। কল্পনা করে। এই ইচ্ছে, স্বপ্ন, কল্পনা এসব মানুষের স্বাভাবিক অ্যাবসার্ড ক্রিয়া। যখন একজন মানুষ আত্মহত্যার জন্য জলে ডুবতে যায় তখন ডোবার পূর্ব মূহুর্তেও সে তার ইচ্ছের কাছে ফিরতে চায়। কতো কোটি মানুষের কতো ইচ্ছা। কতো চাহিদা। এই চাহিদা বা ইচ্ছাই মানুষকে জনমের পর জনম ভোগায়। জন্মান্তর ঘটে আর তার নির্বাণ ঘটে না। সব ইচ্ছাই পূর্ণ হবে মানুষ সেই স্বপ্ন দেখে না। কিন্তু তার নিজস্ব দুনিয়ায় ‘ইচ্ছা’য় তাকে টিকিয়ে রাখে। ফলে আমরা দেখব, মানুষের যে সারভাইভাল পাওয়ার বা অস্থিত্বের ক্ষমতা এটা যতটুকুই জন্মগত তারচেয়ে অধিক ‘ইচ্ছেনির্ভর।’ মানুষের ভেতর লোভ, দ্বেষ, মোহ, কাম, অনাচার, দুঃখ, প্রতিকার, হিংসা, প্রেম, ব্যবহারও নির্ভর করে ‘ইচ্ছেশক্তির’ উপর।

‘the world itself is the will to power- & nothing else!& you yourself are the will to power- & nothing else’ —Friedrich Nietzsche.

দুনিয়ার ইতিহাস যদি আমরা দেখি, তবে দেখব, মানুষের যুদ্ধ মূলত- ভয়ংকর ইচ্ছে ও স্বদিচ্ছার সাথে লড়াই। দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টের যে নীতিবিদ্যা তা গড়ে উঠেছে মূলত ‘ইচ্ছা(will)’ কে কেন্দ্র করে। যেখানে কান্ট বলছে, -ইচ্ছা স্বাধীন ও অনন্য। জগৎ যেখানে নির্ধারিত সেখানে ‘ইচ্ছা’ বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন। কিন্তু এই কথাও আসে, জগৎ কি কেবল ভাল ও খারাপ নির্ভর? মানুষ কি কেবল দেবতা ও শয়তানের মাঝখানে দোদ্যুল্যমান স্বত্ত্বা? নৈতিক ও অনৈতিক প্রশ্নে আমরা মূলত পরিবেশ উপযোগী কথাকে সায় দিতে পারি। সুতরাং মানুষের ‘ইচ্ছা’ও তার সম্পূর্ণ পরিবেশ ও ঐতিহ্যগত বা পারিপার্শ্বিক বোঝপড়ার ফসল। যা আজকের ভাল তা ভবিষ্যতের ভাল নাও হতে পারে বা ভালটা আদতে তার নিজের কাছেই ভাল।

ব্যক্তি মানুষের ‘ইচ্ছা’র মৃত্যু ঘটলেও সামগ্রিক অর্থে মানুষ কখনও বোধ ও ইচ্ছাহীন হয়ে পড়ে না। মানুষ ধারাবাহিক ভাবে ‘ইচ্ছা’কে বয়ে চলে। জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতোন- ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে।’ তবে জগৎ কি কেবল কারও ইচ্ছেতে সৃষ্টি? বা এই জগৎ কি কারও সৃষ্টির খামখেয়ালি নাকি উদ্দেশ্যমূলক?’
সহজ কথায়, ব্যক্তি মানুষের ইচ্ছে যখন সামগ্রিক মানুষের ইচ্ছে হযে উঠে, তখন এর ভাল বা খারাপ- দুনিয়াতে পরিবর্তন নিয়ে আসে। এবং তখন ক্ষমতাবানদের ইচ্ছের কাছে সাধারণ জনগণ তার ইচ্ছেটা বিক্রি করে ফেলে। তখন ব্যক্তিগত ইচ্ছেটাও পরিবর্তিত হয। এবং ইচ্ছার পরাজয়ও অনেক সময় মানুষকে সমাজে ‘নিহিলিস্ট’ হিসেবে উপস্থাপন করে।
একবার ইশকুলে পড়াকালীন আমাদের ক্লাস টিচার প্রতিজন ছাত্রকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল- ‘বড় হয়ে তুমি কি হতে চাও বা তোমার ইচ্ছা কী?’ আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ডাক্তার, এঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, পাইলট, নাবিক, খেলোযাড় এমনকি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিল। এরপরেও আমার মতো কিছু বালক রয়ে গিয়েছিল যারা তাদের ইচ্ছার কথা জানাতে পারেনি সেদিন। হয়তো বা তারা নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা ‘অমলকান্তি’র মতো রোদ্দুর হতে চেয়েছিল সেদিন। একটা জিনিস আজ ভাবনায় এলো, -ব্যক্তিগত ‘ইচ্ছা’ টাও কিভাবে তার পারিপার্শ্বিক বা পরিবারের উপর থেকে শিশুমনে ছাপ ফেলে। একটা শিশু যেমন তার ভাষাটা আয়ত্ত্ব করে ‘ইচ্ছে’ বিষয়টাও অনেকটা তদ্রুপ। ধারণকৃত। আমরা মানুষ আসলে নিজের ইচ্ছামাফিক বেঁচে থাকতে পারি না। অন্যের ইচ্ছার উপরই অধিকাংশ ও অনেকাংশে নির্ভর করতে হয়। মানুষ তার ইচ্ছার অধীন কিন্তু ইচ্ছেমতো একটা জীবনই সে আমরণ খুঁজে ফিরে। এরপর হয়তো কয়েক বৎসর পর, আরেকটু উঁচু ক্লাসে আমাদের ট্রান্সেলেশন করতে হয়- ‘if i were a bird, i would fly in the sky’.