ইচ্ছে হলেই

স্বপন রায়



#
উধাও গুপ্ত ‘ফিঙ্গারি’ অন ক’রে বাইরে তাকালো। শীতের রাত। একটু আগে কাঁপুনি হচ্ছিল। দমদমের এদিকটায় বরাবরই শীত বেশি। এখন শরীর উষ্ণ হচ্ছে, ক’ড়ে আর বুড়ো আঙুলের পারস্পরিক স্পর্শে। সোউজন্যে ‘ফিঙ্গারি’। দশটা নখে এখন বেশ কিছু অনুভবের ন্যানোস্পার্ক রাখা যায়। বহু আগে যেমন ফোনের রিচার্জ করা হত, এত টাকায় এত টক-টাইম আর এতটা ডেটা, এখন সব নখের ডগায়।একমাসের জন্য শীত বা উষ্ণতা, স্পার্কিংস্পটে গেলেই ওরা নখের ডগায় ‘টাচইংক’ লাগিয়ে দেয়, যা একধরণের ঘনীভূত স্পর্শক, বিভিন্ন অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য। উধাও দেয়ালে লাগানো টাচস্ক্রিনে নাম গুলো দেখছে। অস্থি সেন, নদীটি মাইতি, বাঁক চ্যাটার্জি, জলকাতার বসু, ঘুমতরী রায়...উধাও গুপ্ত এই হারিয়ে যাওয়া পুরুষ আর মহিলাদের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে। গুন গুন করে, কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা....ভাবে এই গানটা কেন সবাই তাদের রিদম বক্সে মোস্ট ফেভারিট হিসেবে রেখে দিয়েছে। দিতেই পারে। কিন্তু কোথাও একটা কিছু আছে যা এই গান আর তাদের হারিয়ে যাওয়ার ভেতরে লুকনো, উধাও গুপ্ত সেই লুকিয়ে থাকা সূত্রের খোঁজ করছে এখন। এটাই ওর এসাইনমেন্ট। এবার ঘড়ির দিকে তাকায়। দেয়ালে থ্রি-ডি ঘড়ি।তাকাতেই হেসে বলে, তিনটে তেত্রিশ স্যর, সেকেন্ডটা বলবো?
#
২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০৪০। উধাও গুপ্ত’র কানে রিন রিন করে স্যটেলাইট ফোন। রাঙামাটির গলা। রিন রিন। বলছে, তুমি ঠিকই সন্দেহ করেছিলে, এরা এখানেই আছে। আমি জলকাতার বসু আর নদীটি মাইতিকে দেখেছি। এখনো কথা বলিনি। ওয়েটিং ফর ইউ। কবে আসছ? উধাও সামান্য তারিফই করে নিজের। একটা গান, ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’, একটি পাহাড়ি নদী ‘বিপাশা’, আর একটি পাহাড়ি বাঁকে ঝুলে থাকা ঘর, পাহাড়ে যেমন থাকে। অস্থি সেন, নদীটি মাইতি, বাঁক চ্যাটার্জি, জলকাতার বসু, ঘুমতরী রায়-এর ডিজিটাল প্রোফাইলে রোজই একবার ক’রে এগুলো এসেছে। নিরুদ্দেশ হওয়ার কিছুদিন আগে থেকেই। কিন্তু উধাও আরেকটা ধাঁধায় আটকে আছে। ওর সামনের ওয়াল-স্ক্রিনের ডানদিকে ২০১১’র বেশ কিছু নাম। একটা নামে ও আটকে আছে অনেকক্ষণ। ছবিটা ফিল্টার দিয়ে পরিষ্কার করতে করতে এখন স্পষ্ট। শুভঙ্কর গুপ্ত। উধাও’র কাকা। নিরুদিষ্ট ২০১১ থেকে। উপরে নিচে আরো কিছু নাম। আর সূত্র ওই একটা গান, ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নাই মানা’।একটি পাহাড়ি নদী ‘বিপাশা।।আর একটি পাহাড়ের বাঁকে ঝুলে থাকা ঘর।, পাহাড়ে যেমন থাকে।
#
কোঠি।
#
রাঙামাটি কোঠি থেকে ফোন করেছিল। মানালি থেকে প্রায় চোদ্দ কিলোমিটার দূরে কোঠি। উধাও অবাক হয়না তেমন, এটা ওর স্বভাবে আছে, বরং কারণ খোঁজে। ‘ না উড়ে থেমেছ পাখি, সমস্তটা ওড়ো..’ স্বদেশ সেন। এই সময়ের সব চেয়ে আলোচিত কবি। অথচ সত্তর বছর আগে যখন তিনি এসব লিখছেন, বাঙালি তাঁর নামই জানতো না। তখন কবিতা ছিল দোদুল্যমান। যে কবিতা দোলায়, সেই কবিতার কদর ছিল! তবে এখন এই ‘সমস্তটা ওড়ো’ খুব ভাবাচ্ছে। এই ওড়া কি সময়পার উড়ে চলা? পাখির সমস্ত ওড়া মানুষ আত্মস্থ করে নিলে তো কি কি করতে পারে? ২০১১ থকে উধাও ছোট কাকা কি কোঠিতেই আছে? নাকি পাখির ওড়া নিয়ে মিলিয়ে গেছে অন্যকোথাও? তখন কাকা অরিত্রর বয়স ছিল ছাব্বিশ। বামপন্থী দলের সক্রিয় কর্মী। প্রথমে খুন করা হয়েছে, এটাই ভাবা হচ্ছিল। নতুন ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা কয়েকবার শাসিয়েও ছিল কাকাকে। পুলিশে এফ.আই.আর করা হল। পুলিশ যা করে তাই করতে থাকে, অর্থাৎ কিছুই করেনা। একদিন তো বলেই দিল, ‘ছিপিএম’ করতে আমরা বলেছিলাম? আমরা চেষ্টা করছি, পেলে জানাবো, বারবার থানায় আসবেন না.....উধাও তখন বছর দশেকের। মর্মান্তিক কোন খবরের জন্যই তখন সকলের অপেক্ষা ছিল তখন। বাস তিনেক পরে কাকার ফোন এল।আর বাড়িতে কিছুটা স্বস্তি। কাকা জানিয়েছে, সে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে যোগ দিচ্ছে। কি কাজ, কোথায় এসব না বললেও এটা বলেছে যে, সে অনেক দূরে কোথাও যাচ্ছে। কবে ফিরবে বা আদৌ ফিরবে কিনা জানেনা। বাবা, বাপ-মা মরা ভাইয়ের খবর পেয়ে কিছুটা নিশ্চিত হলেও কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল সেই থেকে। মা গোপনে কাঁদতো। এই বিষাদে অভ্যস্ত হয়ে গেল তাদের পরিবার। আর এই বিষন্ন পরিবেশে উধাও একা একা বড় হতে লাগল। খোঁজ জড়িয়ে গেল ওর স্বভাবে। ২০২৮ এ খুলে ফেলল নিজের কোম্পানি, ‘সার্চ এঞ্জিন’। অনুসন্ধানি উধাও গুপ্ত’র পরিচিতি বেশ ভালই এখন। উধাও এবার ফোন করল রাঙামাটিকে। কাজের কথা কিছু বলল না। বলল, মিসিং ইউ, কাল যাচ্ছি আমি....
#
বাঁক চ্যাটার্জি, জলকাতার বসু, ঘুমতরী রায় অপেক্ষা করছে মানালি থেকে শেয়ারের টাটাসুমোতে। কোঠি যাবে। কোঠি পাহাড়ের অংশ তো বটেই, এখন শরীরেও গেঁথে বসেছে। আর আছে কোঠির শুভঙ্কর। বাঁক চ্যাটার্জি শ্যমলা, ছিপছিপে তরুণ। ঘর ছেড়েছে, কেন ছেড়েছে, কিসের জন্য? উধাও গুপ্ত এসব প্রশ্ন করবে। করবেই। বাঁক কি করে বোঝাবে, যে কোনদিনও সেকেন্ড হয়নি কোন পরীক্ষাতেই সেই বাঁক চাটুজ্জ্যের কেন মনে হয়েছিল, হোয়াট নেক্সট? ইন্ডিয়ান ইন্সটিউট আফ সায়েন্স, ব্যাঙ্গালোর, পি.এইচ.ডি...বাঁক মার্কিন মুলুকে উড়বে, সব ঠিকঠাক...নাকি কোথাও সামান্য কিছু অসামঞ্জস্য আছে..হচ্ছে আজকাল...ব্যাঙ্গালোরের বোটানিকাল গার্ডেনে হাঁটতে হাঁটতে ওর এটা মনে হয়েছিল। আর কতদিন শুধু একটা সংখ্যায় আটকে থাকবো। ওর সামনে টিপু সুলতানের লাগানো শিমূল তুলোর গাছ। গাছটা আটকে আছে, আমিও, বাঁক ভেবেছিল, ভাবনাটা সঙ্গী হয়ে গেল ওর...
#
বাঁক কি সত্যি কথা বলছে? কাল ওরা ।মানলি থকে এখানে আসার পরে উধাও কথা বলেছে ওদের সঙ্গে। কেন সব ছেড়েছুড়ে ওরা কোঠি আর মানালিতে চলে এল, এই প্রশ্নের উত্তরে তিনজনই বলছে ওরা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল, ওদের কাছে অসহায় শব্দটাই প্রামাণ্য হয়ে উঠেছিল।। বাঁক এক নম্বরের চাপ নিতে নিতে ফাঁকা শুন্যতায় যখন হারিয়ে যাচ্ছে, একটা গাছ, শিমূল গাছ, টিপু সুলতানের লাগানো, ওকে রাস্তা দেখিয়েছে, এরকমই কিছু বলল বাঁক। কোঠির যে রেস্টোরেন্টে ওরা কথা বলছে সেটা আদতে একটা পাহাড়ই। পাহাড়ের একটা অংশ রেস্টোরেন্ট খোলার সময় বেরিয়ে আসে, শূন্যে। ঝুলন্ত রেস্টোরেন্টে বদলে যায়। ‘মাইক্রো-ন্যানো’ এনজিনিয়ারিং-এর চূড়ান্ত উদাহরণ এই ‘ফ্লাইং সসার’ বার-কাম-রেস্টোরেন্ট। বস্তুকে হাল্কা আর ভারী করা এখন ‘মাইক্রো-ন্যানো’র এনজিনিয়ারিং প্রয়োগে সম্ভব হয়ে উঠেছে। প্রোগ্রামিং-এর মাধ্যমে পাহাড়ের এই অংশ বেরিয়ে আসে রেস্টোরেন্ট খোলার সময়, তখন ভার হাল্কা করা হয় এই অংশের।আবার বন্ধ হওয়ার পরে পাহাড়েই অবসৃত হয়ে যায় আগের ভার যুক্ত হয়ে। বাঁক এসবও বলল উধাওকে। জলকাতার, নদীটি আর ঘুমতরী চুপচাপ বাঁকের কথা শুনে যায়। ওদের কোন প্রশ্ন নেই, কথাও নেই?
#
অস্থি সেন, নদীটি মাইতি, বাঁক চ্যাটার্জি, জলকাতার বসু, ঘুমতরী রায় বিপাশার ধারে। অপেক্ষা করছে। মানালীর একটু আগেই। শুভঙ্কর গুপ্ত ঘুমতরীকে বলেছে বিপাশা আমাদের, বাঙালিদের। বিয়াস বাকিদের। ঘুমতরী চব্বিশ। শুভঙ্কর বাহান্ন। ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ ডিকোড করার খেলায় শুভঙ্কর ওকে বলে, ডিকোডিং জীবনের আলো চায়, তবে অন্ধকার না হলে তার চলে না। কোডে আলো ফেলো। ঘুমতরী অবাক হয়েছিল। তখন ওর কাছে অপশন আর নেই বললেই চলে। পি.এইচ.ডি’র জন্য দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাবে ভাবেনি ও। শুভঙ্করকে জানালো এসবই জানালো ঘুমতরী, হাহাকার টাহাকার না করেই। লিখলো, আমি রেপড হচ্ছি এখন, নিয়মিত। আমার থিসিস নিয়ে টালবাহানা করছিল যখন, আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, কোথায় আটকাচ্ছে স্যর? অরণ্য দত্ত, যার আণ্ডারে ঘুমতরী পি.এইচ.ডি করছে, নিজের চেম্বারে ডেকেছিল ওকে। চেয়ার থেকে উঠে এসে বলল, আমি খুব একা ঘুম, আমায় একটু আশ্রয় দেবে? ঘুমতরী এই বিখ্যাত অধ্যাপককে এরকম করতে দেখে ঘাবড়ে গেল। বলল, আমি আমার থিসিসিটার কথা জানতে চাইছি স্যর! অরণ্য আরো কাছে এসে বলল, আমায় একটু কাছে নাও ঘুম, টেক মি অ্যান্ড আই উইল টেক ইউ..শুভঙ্করকে খোলাখুলিই জানায় ঘুমতরী, আমি কিছুটা স্বার্থের জন্য, কিছুটা অরণ্য দত্ত’র আকর্ষণে জড়িয়ে যাই। কনসেন্সুয়াল সেক্স হতে থাকে আমাদের মধ্যে। আমার যে ভালো লাগেনি প্রথম দিকে একথা বলবো না।কিন্তু অরণ্য দত্ত কিছুদিনের মধ্যেই বুঝিয়ে দেয় ‘দেয়া’টা শুধু আমার। থিসিস নিয়ে ওর কোন মাথাব্যথা নেই। ও নাকি এরকমই। আমি এখন প্রায়ই রেপড হই। থিসিস এখন খুড়োর কল আমার কাছে। আমি কি করবো, শুভঙ্কর, আমি কি সুইসাইড করবো?
#
‘ফিঙ্গারি’ অন করে বিপাশার স্রোত দেখছে সবাই। গায়ে লাগছে না তিন ডিগ্রী ঠাণ্ডার কামড়। শুভঙ্করের দেরী হচ্ছে। উধাও আর রাঙামাটি দেখছে ওদের। আড়াল থেকে। ধ্বনিতরঙ্গকে এখন রিসেপ্টার দিয়ে বাড়িয়ে দেয়া যায়। রিমোট কাজ করে হাজার ফুট অবধি। তো, ওদের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছে উধাও। বাঁক এসকেপ করেছে, ও একনম্বরে থাকার আতঙ্কে পড়ে গিয়েছিল। ইনসিকিওরড মনে করতে শুরু করেছিল। সন্দেহ করত সবাইকে। এটা হচ্ছে এখন। একা মানুষ এককে পরিনত হচ্ছে। তার ইচ্ছের ভেতরে আতঙ্ক ঢুকে ফুটো করে দিচ্ছে তার অস্তিত্বকে। এই সময়ে শুভঙ্করের সঙ্গে যোগাযোগ বাঁকের। বাঁক নিজেই উধাওকে বলেছে এসব কথা। উধাও নিজের পরিচয় লুকোয়নি। কারণ এরা অপরাধী নয়, আপাতদৃষ্টিতে। কিন্তু নিজের কাকা শুভঙ্কর থেকে আরম্ভ ক’রে এদের সবার মধ্যে একটা অপরাধবোধ কাজ করে যাচ্ছে, উধাও এটা অনুভবে ধরতে পারছে।কি হতে পারে সেই অপরাধবোধ? ভাবনার জায়গাটা পিছল এখনো। জলকাতার আর নদীটি মাইতি যেমন। ‘এগ্রো সায়েন্সে’র ক্ষেত্রে ওরা একটা কোম্পানির রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট উইং-এ রিসার্চ কোঅরডিনেটর ছিল। এমন একটি কীটনাশক ওরা আবিষ্কার করে ফেলেছিল যা বিষাক্ত নয়। জলকাতার আর নদীটি লিভ-ইন করতো। ওরা দুজনেই সিদ্ধান্ত নেয় যে এই কীটনাশকের পেটেন্ট ওরা নিজেদের নামে নেবে। যদি পেটেন্ট মঞ্জুর হয়ে যায় তো চাকরি ছেড়ে দিয়ে ব্যবসা শুরু করবে। উধাও জেনেছে যে এরপরেই পেস্টিসাইড বানায় এমন সব মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ওদের কাছে প্রস্তাব নিয়ে আসে যে আবিষ্কারটা হয় ভুলে যেতে হবে নইলে স্বত্ব বিক্রি করে দিতে হবে ওইসব কোম্পানীদের। ওরা স্বভাবতই প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু ওদের নিজেদের কোম্পানি চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। সেই চাপ পরে শাসানিতে এবং আরো পরে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার হুমকিতে বদলে যায়। তো, উধাও ২০১১ থেকে ২০৫০-এর এই নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া মানুষগুলোকে ‘ট্রুথ’ সফটওয়্যারে ফেলে দেখছিল এরকম মানসিক পরিস্থিতে একজন কি কি করতে পারে? ‘ট্রুথ’ বানানো হয়েছে ‘ইন্টিলিজেন্স কোশেন্ট’ আর ‘ইমোশনাল কোশেন্টে’র বিভিন্ন মাপকগুলোকে আলাদা আর মিশ্রিত করার এক অভিনব পদ্ধতিতে। রাঙামাটিও সঙ্গে ছিল। উধাও আর রাঙামাটি, লাভবার্ড। বহুদিনের সঙ্গী। উধাও’র ‘সার্চ এঞ্জিন’-এর সঙ্গেও প্রথম থেকে। তো, ওরা দুজনেই দেখল, একমাত্র বাঁক চ্যাটার্জি ছাড়া আবাকি অন্য সবাই তাদের পরিস্থিতিকে বশে আনার জন্য একদম চরম সিদ্ধান্তও নিয়ে নিতে পারে। চরম সিদ্ধান্ত, অর্থাৎ মার্ডার!
#
শুভঙ্কর এসেছে। উধাও ওর কাকা’কে দেখে অবাকই হয়েছিল।কাকার চুয়ান্ন পঞ্চান্ন চলছে। চেহারা দেখলে চল্লিশের বেশি মনে হয়না। সঙ্গে ঘুমতরীও ছিল। ঘুমতরীর প্রেমই কি শুভঙ্করকে এমন তাজা রেখেছে? ঘুমতরীকে জিজ্ঞেস করায় ও বলল, শুভঙ্করের জীবনে আমি তো কিছুদিন হল এসেছি, ও তো এরকমই আছে বহুবছর। শুভঙ্কর হেসে ফেলল। বলল, তোকে পেয়ে আমি খুব খুশিরে উধাও। কত ছোট ছিলিস। ২০১১! আমি খুব মিস করতাম তোদের। খুব। আর চেহারাটা? আপেলের প্রভাব। আপেল নিয়েই আছি তো। উধাও একে একে সবার সঙ্গে কথা বলেছে। জানার চেষ্টা করেছে কেন তারা নিরুদ্দেশ হল, কেনই বা কোঠিক আর মানালিকে বেছে নিল? কোঠির উচ্চতা প্রায় সাড়ে আটহাজার ফুট। বিপাশা এখানে খুব গভীর গর্জের ভেতর দিয়ে নেমে গেছে তেরো কিলোমিটার দূরে মানালির দিকে।রোতাং পাস এখান থেকে চল্লিশ কিলোমিটার। তবে শুভঙ্কর ছাড়া বাকিরা মানালিতে থাকে। শুভঙ্কর ওদের আপেল বাগানের নানা কাজে যুক্ত করে দিয়েছে। গবেষণা থেকে ব্যবস্থাপনা। উধাও সকলের কথাই বলেছে শুধু আর কিছু নয়। রাঙামাটিকে আদর করেছে উন্মত্তের মত। রাঙামাটি বলেছে, তুমি তো এমন করো কেস সলভ্‌ড হয়ে গেলে, হয়ে গেছে তাহলে? উধাও ঘনিয়ে আসে আরো, গলায় তুমুল এনে বলে, এখনো হয়নি, হলে তুমি জানবে না? রাঙামাটি বলে, অসভ্য!
#
শুভঙ্কর বলছে, আমরা বিপাশার পাশে এসেছি। কাছে নয়, পাশে। আমাদের অতীত তাহলে কি?বিপাশা। বর্তমান, বিপাশা। ভবিষ্যৎ, বিপাশা। নদীটাকে দেখুন। দেখলে মনে হবে এই যে বয়ে যাওয়া, এটা স্থির সত্য। এর জল, এর অববাহিকা, এর সবকিছু। কিন্তু সত্য এত সহজ নয়। সত্য স্থিরও নয়। সত্য সচল। এই নদীর বুকে বয়ে যাওয়া জল দেখতে একইরকম, কিন্তু এই জল, কালকের জল নয়। এই বয়ে যাওয়া, কালকের বয়ে যাওয়া নয়। সব বদলে গেছে। অতীত থাকেনা, তাই সে অতীত। আমরা নিজেদের দিকে তাকাবো এখন। আমি নিজে, রাজনীতি করতাম। ২০১১’র নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পরে আমায় বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়। নানা জায়গায় ঘুরতে থাকি।পার্টি সাহায্য করেনি, এমন নয়। তবে পার্টিও তখন পালাচ্ছে। সাধারণ মানুষের কাছে আমরা তখন ভিলেন। বাম শুনলেই খেপে যায়। সন্দেহ করে। তো, এভাবেই আমি ধরা পড়ে যাই। এক বামপন্থী বন্ধু বা কমরেড ধরিয়ে দেয় আমাকে। আমি ডিটেইল-এ যাবোনা। কিন্তু নিজেকে বাঁচাবার জন্য আমি পালাবার চেষ্টা করি। একটা ভারী জিনিস দিয়ে মারতে হয় আমাকে ধরে রাখা রাখা অন্যদলের একটি ছেলেকে। মাথায় মেরেছিলাম। ও লুটিয়ে পড়ে। হয়ত মরে যায়। আমি জানিনা। আমি বাঁচতে চাইছিলাম। তারপরের গল্প থাক। আমি বাঁচার জন্য হাঁটতে শুরু করি। আমি সোশাল মিডিয়ায় ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা’ এই কোডটা ছড়িয়ে দিই। আর একটা ঘরের ছবি, পাহাড়ের গায়ে। কোঠি, সঙ্গে পাহাড়ি নদী বিপাশা!
#
ঘুমতরী উঠে দাঁড়ায়। বলে। ওর বলা শেষ হলে জলকাতার আর নদিটি বলে। অস্থি সেনও নিজের কথা বলে। ওদের কথাগুলো বিপাশায় গড়িয়ে যায়। ঘুমতরী অরণ্য দত্তকে কফির সঙ্গে এমন রসায়নিক মিশিয়ে দিয়েছিল যার প্রভাবে অরণ্য ওর পৌরুষ হারিয়ে ফেলে এক সপ্তাহের মধ্যে। ওর ভেতরের সেক্সড্রাইভ নষ্ট হয়ে যায়। রসায়নিকের নাম জানিয়েছিল শুভঙ্কর। জলকাতার আর নদীটির সঙ্গে ইন্টারঅ্যাক্ট করতে থাকা শুভঙ্কর পরামর্শ দেয় এখানে চলে আসার জন্য। তার আগে শুভঙ্করের পরামর্শ অনুযায়ি বিভিন্ন রাইভ্যাল কোম্পানিকে ওরা জানিয়ে দেয় যে ওদের থেকে জোর করে তাদের নিজেদের কোম্পানি স্বত্ব লিখিয়ে নিয়েছে।করপোরেট বৈরীতাকে উশকে দিয়ে ওরা চলে আসে। এখানে আসার পরে খবর পায় ওদের কোম্পানির যে পাব্লিক রিলেশনের লোকটা ওদের দুজনকেই খতম করে দেয়ার হুমকি দিয়েছিল, তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে একটা ব্রথেল থেকে!
#
উধাও শুনতে পায় শুভঙ্কর বলছে, আমার ভাইপো উধাও আমাদের ধরে ফেলেছে হয়ত। কিন্তু, আমাদের লুকোবার তো কিছু নেই। তবে এখান থেকে আমরা ফিরবো না। বিপাশা আর আপেলবাগান ছেড়ে যাওয়ার প্রশ্ন নেই। ও যদি জোর করে আমি যে ক্যাপসুল আপনাদের দিয়েছি একটা করে খেয়ে নেবেন। আবার বলছি যদি। যদি উধাও মনে করে আমরা অপরাধী, তবেই।
#
উধাও আর রাঙামাটি ফিরে আসে কোঠির হোম-স্টে’তে। তারপর ফোন করে শুভঙ্করকে, বলে, কাকা কাল আমি আর রাঙামাটি ফিরছি। পারলে একবার কলকাতায় ঘুরে যেও। বাবা, মা দুজনেই এখন আর নেই। কিন্তু আমি আছি।কি আসবে তো? শুভঙ্কর বলল, তোর তদন্তের কি হল? সমাধান পেলি? উধাও হাসতে হাসতে বলে, আরে দূর আমি আর রাঙামাটিতো এখানে হনিমুন করতে এসেছিলাম। তদন্ত ফদন্ত নয়। কাকা, এবার ভাবছি বিয়েটা করেই ফেলবো...
#
রাঙামাটি আর উধাও নখের স্পর্শকগুলো ছাড়িয়ে নিয়ে পালকের লেপের মধ্যে মিশে যেতে থাকে। অনেক নিচে, বিপাশার গভীর খাতেও জলের শব্দে মিশতে থাকে এইসব, যার কিছুটা সত্যি, কিছুটা মিথ্যে, বাকি আর যা কিছু একটা সম্ভাবনা, এই যেমন কাল ভোর হবে, সূর্য উঠবে আবার কোঠিতে...