মনভূমি

গাজী তানজিয়া



দীর্ঘদিন ধরে আমি ঘরবন্দি এক মানুষ। ঘরবন্দি এবং একা। একটা প্রতিবাদ আর তার বিনিময়ে পাওয়া একটা বুলেট আমাকে এই জীবন উপহার দিয়েছে। এ নিয়ে আমার বিশেষ অনুযোগ নেই। যে দেশে এবং যেমন রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে আছি তাতে সম্পূর্ন সুস্থ অবস্থায় বেঁচে বর্তে থাকাটা এক বিশেষ ভাগ্যের ব্যাপার। তবে চুপ করে থাকতে জানলে ভাগ্য টাগ্যের ধার খুব একটা ধারতে হয় না। যা বেশিরভাগ নির্বিঘেœ থাকতে চাওয়া মানুষেরা জানে। শুধু আমি জানতাম না, তাই..! তাই শরীরের সব অরগানগুলো আর ঠিকঠাক অবস্থানে রাখতে পারি নাই। সে যাক- তাও ভালো, আমি এখনো দেখতে পাচ্ছি। এই বয়সে চোখ চলে গেলে তা হতো মৃত্যুর সমান।
আমার সংসার নেই, সন্তান নেই। যেমন উটকো কোনো ঝামেলা নেই তেমনি নেই নিশ্চিত কোনো ভবিষ্যতও। কথা বলার মানুষ নেই, ভাব বিনিময়ের জন্য বন্ধু নেই। সহজ ভাষায় বলতে গেলে বলতে হয় নিয়তি আমাকে আমার পূর্ণ যৌবনেই যাবতীয় অযৌবনিক বলয়ে বন্দি করেছে। আমার পূর্ণ তারুণ্যে আমি একজন ষাটোর্ধের অবসর জীবন যাপন করছিলাম। তাতে আমার যে দুঃখবোধ ছিল সেটা থাকতে থাকতে সয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমার ঐ বিশেষ নিয়তি আমাকে নিত্য নিত্য যে সব শূক্ষ্ম কষ্টগুলো উপহার দিত সেসব নিয়েই ছিল আমার যত অস্বস্তি।
এক সময়ে আমার একান্ত প্রিয় একজন মানুষ ছিল। আমি তাকে ভালোবাসতাম খুব। কিন্তু দুর্ঘটনাটা তাকে আমার কাছ থেকে সবচেয়ে দূরে পৌছে দিল।
আমার একটা চাকরিও ছিল। কেবল পাশ করে বেরিয়ে নতুন নতুন জয়েন করেছিলাম। বিদেশি কোম্পানি! কত রঙিন স্বপ্নের জাল বুনেছিলাম আমরা দুজনে! সেখান থেকেও একদিন সেচ্ছায় ইস্তফা দিতে হলো। বলা হয় স্বেচ্ছায়, আসলে ইচ্ছে ছিল না মোটেই। কিন্তু শরীর যে আর টানতে পারছিল না। সে তো আর টানার মতো অবস্থায়ও ছিল না। মাঝে মাঝে এটা ভাবতে চাই না যে আমি আর স্বাভাবিক নেই। তাই বুকের ভেতরে একটা টনটনে অনুভুুতি। ব্যথা ভরা একটা গোলাকার ডেলা গলা পর্যন্ত উঠে আসার পর তাকে ঠেলে নামিয়ে দেই। পাত্তা দিতে চাই না মোট্ইে। নইলে আমার একলা বেঁচে থাকা বা বেঁচে থাকার কসরত করে যাওয়া সম্ভব হতো কি করে!
সারাদিন নিঃসঙ্গ একাকী থেকে বই ছাড়া আমার দ্বিতীয় কোনো সঙ্গী ছিল না। তাই জীবনের রূপ-রস-গন্ধকে আদ্যান্ত আত্মসাৎ করে নিতে নিতে হাতের কলমটাকেই ভাব প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলাম।
কিন্তু যখন আমার লেখালিখি বেশ কিছুটা প্রচার পেতে শুরু করেছে ঠিক তখনই আমার প্রযুক্তি নির্ভর উপকরণগুলো বিগড়াতে শুরু করল। তাতেও আমি খুব একটা পাত্তা দিচ্ছিলাম না। অসুবিধা কিছু হচ্ছিল না, স্মার্ট ফোনের অভ্র ও ই-মেইলে কাজ চালিয়ে নিচ্ছিলাম। আর মাঝে মাঝে ভাবছিলাম ইশৃ ট্যাব যদি ল্যাপটপের মতো কাজ করত! করবে হয়ত একদিন, সেই আশায় থাকতে থাকতে একদিন আমার পিসির মনিটরটাও নষ্ট হয়ে গেল। দশ বছরের পুরান মনিটর একবার বিগড়ে গেলে আর ভালো হবার যোগ নেই বলল ওরা, যারা মরে যাওয়া ক¤িপউটারকে জীবিত করে। ও দিয়ে আর কাজ হবে না বুঝতে পারলেও নতুন একটা কেনার সাহস হচ্ছিল না।
টের পাচ্ছিলাম ব্যাংকে আমার গচ্ছিত টাকা ফুরাতে ফুরাতে প্রায় শূন্যের কোটায় এসে পৌছে গেছে। কত টাকা্ইা বা ছিল! বিদেশি কোম্পানি তাই চাকরি ছেড়ে আসার সময় একটা গোল্ডেন হ্যান্ডশেক মতো হয়েছিল। তাই দিয়ে চলছিল হিসেব কষে কষে। সে লিকুইডিটিও তো তলানীতে ঠেকেছে।
কাগজে কলমে আঁচড়ালে এ যুগে একজন তরুণ লেখকের যে কোনো ক’ল হবে না, সে আমি ততদিনে বুঝে ফেলেছিলাম। ইন্টারনেট এমবি কিনতেও পারতাম না প্রায়ই। খাবারের বাজেটের সাথে ভাগাভাগি করে কুলিয়ে ওঠা হতো না। তাই আপাতত লেখালিখি একান্ত নিজের রেখে আঁকা-আঁকিতে যে একটু ঝোক ছিল সেদিকেই ঝাপ দিলাম। তার পেছনেও একটা কারণ ছিল।
প্রতিদিন আমি আমার ঘরের বারান্দায় দাঁড়ালে রাস্তার সামান্যই দেখতে পেতাম। কারণ যে বাড়িটায় থাকি তার পেছন দিকের কম ভাড়ার একটা ফ্যাট আমার জন্য বরাদ্দ। অথচ আমার চোখ দুটো মাঝে মাঝেই মানুষ-জন দেখতে চায়। দেখতে চায় চলমান জীবন। হাহৃ জীবন! জীবন যার কাছ থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছে- তার জীবন দেখতে চাওয়াটা বিলাসিতাই বটে! বেশ খানিকটা সময ধরে অনেক কসরত করে রাস্তার কিছুটা দেখার পর আমার কান্ত চোখ আপনিতেই গিয়ে ঠেকত বাড়ির বাউন্ডারী ওয়ালে। তখন সেখানে দীর্ঘদিন ধরে শ্যাওলা পড়ে পড়ে এমন কিছু দাগ ছোপ হয়েছে যে, সেদিকে তাকালে আমি একটা বিশালাকার দৈত্য দেখতে পেতাম।
দৈত্যটা কি শুধু আমিই দেখতে পেতাম! হয়ত! ওই যে আমার সৃষ্টির নেশা। সেই নেশা আমাকে এমন কিছু দেখায় যা অন্যরা সচারচার দেখতে পায় না। আমার কল্পনার চোখ সাধারণ ছোপ-ছাপের মধ্যেও না-না ছবি খুঁজে পায়। তো দেয়ালের সেই দৈত্য তার বিশাল মুখ গহ্বর, মাথার শিং ও কানা একটা চোখ নিয়ে প্রতিনিয়ত আমাকে ভয় দেখাতে শুরু করল। বারান্দায় গিয়ে কখনো দাঁড়ালে দেয়ালের ঐ দৈত্য আমাকে ভয় দেখাবেই। ভীষণ অস^স্তি হতে লাগল ভেতরে ভেতরে। কি চায় এই দৈত্য আমার কাছে?
ওই দৈত্য ক্রমান্বয়ে আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠল। তাই উপায় না দেখে একদিন আমি একটা ছুরি, কঞ্চি, কাঠ কয়লা ও প্রায় শুকিয়ে যাওয়া কিছু রং নিয়ে নেমে পড়লাম ঐ শ্যাওলা ধরা দেয়ালে ছবি আঁকতে। বলতে হয় ছবি তৈরি করতে। এবং দু’একদিনের ভেতরেই আমার শারিরীক সব রকম অক্ষমতাকে পাত্তা না দিয়েই দেয়ালের সেই ভয়ঙ্কর বিভৎস চেহারার দৈত্যটাকে কেটেকুটে একজন সুদর্শন তরুণে রুপ দিলাম। যে তার মাথাভর্তি কালো অঙ্গুরের মতো থোকা থোকা চুল, তীক্ষ্ম নাক, ধনুকের মতো গ্রীবা ও উদাস চোখ নিয়ে গভীর ঘণ জঙ্গলে এক হাতি সমেত ঘুরে বেড়াচ্ছিল। তার পায়ের কাছে সবুজ ঘাসে নীল ঘাসফুল, আর সেখানে ছুটে বেড়াচ্ছে খরগোশ। আমাদের পাশের বাড়ির খাঁচায় বন্দি বিমর্ষ খরগোশটার মতো না। একেবারে ছুটন্ত দূরন্ত স^াধীন খরগোশ ! গাছের ডালে ডালে পাখি, অর্কিড, মাকাল ফলের লতা, টকটকে লাল ফল আর ডালে ডালে ছুটন্ত কাঠবেড়ালিরা। ওপরে গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘের মধ্যে গাঢ় নীল আকাশখ-।
এখন বারান্দায় গেলে এবং ঐ দেয়ালের দিকে তাকালে আমার আর অস^স্তি হয় না। বরং ঘণ জঙ্গলে হাতি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ঐ যুবককে দেখলে আমার একটু একটু ঈর্ষাই হয়। কিন্তু ঐ যে বললাম নিয়তি!
একদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি-আমার ল্যান্ডলেডি দেয়ালটাকে লোক দিয়ে ঘসিয়ে প্রায় সাদা করে ফেলেছেন। আর আমার আঁকা ঘণ জঙ্গলের কিয়দাংশ তখনো আমার দিকে তাকিয়ে বলতে চাইছে, বাঁচাও! বিষাক্ত কার্বন দ্রুত গতিতে যেন ছড়িয়ে পড়ছিল বাতাসে আচ্ছন্ন করছিল আকাশ।
আমি তখন কি করব ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমি এতোটা অসহায় কখনো বোধ কারি নাই! আমার শুধু মনে হচ্ছিল যেন গোটা সুন্দরবনটাই উজাড় হয়ে যাচ্ছে।
ওই ছবিটার মধ্যে আমি আমার শৈশব খুঁজে পেয়েছিলাম। সুন্দরবনের উপকূল ঘেসে বেড়ে ওঠা আমার শৈশব। আমার মানসপটে সদা জেগে থাকা শৈশব যেন ছিনিয়ে নিচ্ছিল কেউ এক লহমায়।
আমি যেন আবারও সব কিছু হারাতে বসেছি। সেই জ¦লজ¦লে স্মৃতি আর সুখানুভূতি! অলস দুপুরে বাতাসে গোল পাতার সর-সর শব্দ। পলি পড়া তটভূমি জুড়ে যেন প্রহরীর মতো ঢাল উচু করে দাঁড়িয়ে আছে সুন্দরী আর কেওড়া গাছের শেকড়। গাঢ় লাল ছৈলা ফুলে হলুদ রেণু যেন এখনো তার ছটায় বর্ণিল আমার চোখে। পাখির ডাকের সাথে মিশে থাকা বানরের কিচির মিচির। কখনো মানুষের পায়ের শব্দে কচিপাতা মুখে পলায়নরত চকিত হরিণ!
এই বনকে ঘিরেই ছিল আমাদের গ্রামের মানুষের নিত্য কর্মচঞ্চলতা। চাষাবাদ ছাড়াও ছিল্ মাছ ধরা, মোম, মধু কাঠ সংগ্রহের মতো বহু পেশা। নদীর লোনা পানিতে হঠাৎ কাঠের গুড়ির মতো ভেসে ওঠা কুমিরের লেজ যেনো পাত্তাই পেত না জেলেদের কাছে। সন্ধ্যা নামলে হ্যাসাক জ¦ালিয়ে পাহারা- কখন জানি গ্রামের প্রান্তসীমায় বাঘ দেয় হানা। এই যে নিত্য আতঙ্কের এক জীবন সেও যেন ছিল প্রকৃতি প্রদত্ত এক বিচিত্র উৎসব। ওই দেয়ালটা আমাকে নিয়ে গিয়েছিল সেই বৃহৎ কর্মযজ্ঞে। আমি ওখানে প্রাণ দেখতে পাচ্ছিলাম বহুদিন পর। অথচ আজ, এই এগারো বছর পর এখনই দেয়ালটা হোয়াইট ওয়াশ করবার সময় হলো!
আমার ভেতরে যে তখন কি হলো। আমি আমার গড়া সুন্দরবন বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠলাম। আমার যেন দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। বাকি ছবিটা মুছে ফেলার আগেই আমাকে ছুটতে হবে। আমি জানতাম ল্যান্ডলেডি আমার কথা শুনবেন না, তারপরও আমি হাল ছাড়ব কেন? যান্ত্রিক চোরাবালিতে ডুবে মরার আগে একবার বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা আমাকে করতেই হবে।


ডোরবেল বাজিয়ে অস্থির অপেক্ষা করছি। প্রতি মুহূর্ত যেন এক দীর্ঘকালের মতো মনে হচ্চিল আমার তখন। না জানি এই সময়ের মধ্যে কতটা উজাড় হয়েছে আমার বন! এভাবে কতক্ষণ কেটেছে কে জানে!
দরজা খুললেন ল্যান্ডলেডি স্বয়ং। মোটা-সোটা সদা রাসভারী মহিলা আমাকে দেখে যেন একটু অবাক হলেন। তারপর বললেন, ওহ তুমি! আমি আজই যেতাম তোমার কাছে। বোসো তুমি, বলে তিনি দ্রুত পায়ে ভেতরে চলে গেলেন আবার।
আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। ভাবলাম বাড়িঘর পরিস্কার পরিছন্ন করে এখন হয়ত আমাদের মতো ভাড়াটেদের তুলে দেবে। সেকথাই বলতে যাবেন, আর কি বলার থাকতে পারে তার! অথবা বাড়ি ভাড়া বাড়ানোর কথা বলবেন। এই তো থাকে এদের মতলব। কিন্তু যে ক’দিনই এ বাড়িতে থাকি না কেন, আমি আমার বন বাঁচানোর কথা বলবোই। মনে মনে সব যুক্তি-তর্কগুলো ঝালাই করে নিতে লাগলাম।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি ফিরে এলেন একটা ট্রেতে দু’কাপ চা নিয়ে। চা করছিলাম, এমন সময়ে তুমি এলে; এ সময়ে তুমি চা খাও তো? বলে আমার হাতে একটা চায়ের কাপ তুলে দিলেন। আমি মনে মনে বললাম, চা দিয়ে আমাকে ভোলানো যাবে না।
ম্যাডাম, আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাচ্ছিলাম..!
তিনি সে কথা শুনলেন কি শুনলেন না, নিজে থেকেই বেশ উচ্ছাসের ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, তুমি তো দেখছি দারুণ ছবি আঁকো হে! ওই শ্যাওলা ধরা দেয়াল দেখি তুমি টেরাকোটার ক্যানভাস বানিয়ে ফেলেছো! আমি এতোটা সারপ্রাইজড হয়েছি কি বলব! জানি সুস্থ শিল্প জন্মায় প্রচ- তাগিদে, শিল্পীর যন্ত্রণায় ও বিশ^াসের তাড়নায়। উদারতার মুক্তির স্বাদ ছড়িয়ে দেয় শিল্পী।
এবার তো আমার অবাক হবার পালা। তিনি তা প্রকাশের সময় দিচ্ছেন কোথায়; ওভাবেই বলে চলেছেন, যেন দীর্ঘকাল পর কথার আগল ভাঙল কেউ।
জানো, এক সময় দেয়ালে রাজনৈতিক স্লোগান লেখা হতো। বাঙ্কসির ইদুর চিকা হয়ে ঘুরত দেয়ালে দেয়ালে। তখন মনে হতো দেয়ালটা চলমান, জীবন্ত। নগরী তিলোত্তমা করার প্রজ্ঞাপনে একদিন তার চল উঠে গেল। দেয়ালগুলো ক্রমশ হয়ে উঠতে লাগলো বিজ্ঞাপনের ডিপো। আমরা ক্রমশ প্রতিবাদ বিমুখ, প্রকৃতি থেকে দূরে কারখানা আর পণ্য নির্ভর মানুষ হয়ে উঠতে লাগলাম। পুঁজির মুখোশে ঢাকা পড়ে যাওয়া জাগ্রত সরব দেয়ালেরা সব মূক-বধির আজ। এ ক্ষোভ থেকেই আমি দেয়ালগুলো ওভাবে রেখে দিয়েছিলাম এতোদিন। কিন্তু সেদিন দেয়লে তোমার আঁকা ছবি দেখে মনে হলো যেন আবার প্রাণ ফিরে এসেছে। তোমার জন্য, জানো তোমার জন্যই দেয়ালটা পরিস্কার করাচ্ছি। ঝকঝকে পরিস্কার দেয়ালের ভেতরে ও বাইরে তুমি বানাবে তোমার মন-বন!!