ঘুরছে ওরা,ঘুরছে চাকা

অপরাহ্ণ সুসমিতো




নবীনা রানির গানের গলা ভালো,চোখ মুদে দরদ করে গায়। বিয়ে বাড়ির আসর বসেছে। চারপাশে লোকজন। সোয়ারিঘাট থেকে ডালা ভর্তি মাছ আসছে। একপাশে ছাই স্তুপ করা। পোস্তগোলা মহাশ্মশানের একটু দূরেই এই কয়েকটা আটচালা বসতি।
নৃপেন ডোমের বড় মেয়ের বিয়ে। অতিথি নারায়ণ,অতিথিদের জন্য মাছের আইটেম হবে হরেক পদের। ডালা থেকে ২ জন মিলে ধরে মাছ বের করে,ছাই দিয়ে ধরার পরও হাত থেকে পিছলে যায়। বড় বড় মাছ। একেকটা মাছ বের করে আর সবাই রব তোলে হৈ ঐ ঐ ঐ ঐ..

অশীতিপর বৃদ্ধ জগাইরাম নিয়ম টিয়ম ধার ধারে না,এই প্রাক দুপুরেরই ছিলিম ধরায়। দূরে শ্মশান থেকে পোড়া বাতাসের ওড়াওড়ি,জগাইরামের গাঁজার গন্ধ মাতম আর নবীনা রানির গানের সুর ভাসিয়ে মাছের ডালা ঘিরে বসে থাকা লোকজন একেকটা মাছ দেখে খসখসে গলায় বলে ওঠে;
: মান্দির পো,এইখান কমসে কম ২০ কেজি হইব কইলাম
নৃপেন ডোমের কোন প্রতিক্রিয়া হয় না। চোখের ভ্রুতে বিরক্তি। দাঁড়ানোর ভঙ্গিতেও। ঘ্যাচঘ্যাচ করে পাছা চুলকায়। নখ বড় বলে আরাম হয়। অসহিষ্ণু গলা;
: ঐ ছেমড়িরা তাড়াতাড়ি কর না..হালায় মাপামাপি পরে কর

নবীনার পূর্বপুরুষ নাকি রাজস্থানের। মাথার ঘোমটা বড় করে টেনে দেয় গান গাইবার সময়। মুখ আর দেখা যায় না। রোদ আর মুখে পড়ছে না। ঘোমটার আড়ালে গুনগুন সুর ছেয়ে বেড়ায় উঠান জুড়ে..
মীরা বাঈয়ের গান জানে সে।

সানওয়ারিও ঘাট মাইরে রামিও ঘাট মাইরে
থান কাটে ধুনধুয়া যাওরে সানওয়ারিও ঘাট মাই গো হো জিয়ো
বির্মা দেখা বিষ্ণু দেখা দেখি স্বারসাত (সরস্বতী) মাইরে
সানওয়ারিও ঘাট মাই
থান কাটে বালভা জাউরে সানওয়ারিও ঘাট মাইরে …

নৃপেনের বড় মেয়ে ভেতরের ঘরে খাটের এক পাশে বসে উদাস হয়ে আছে। সময়টা ভিন্নকাল। মেয়েটার নাম নৃপবালা।
*
দীননাথ সেন রোডে রাঘব ভট্টাচার্যের ৩য় সন্তান হবে। নৃপেনের বউ মালতীকে খবর পাঠানো হয়েছে। মালতী সময়ে অসময়ে দাইয়ের কাজ করে। টুকটাক আয় হয়। রাঘব বাবুর আয়া এসে খবর পাঠিয়ে নিয়ে গেছে মালতীকে। আয়া বারবার সাবধান করে দিচ্ছে কানে কানে খবরদার বড়কত্তা যেন না জানতে পারে যে মালতী চাড়াল। তাহলে সর্বনাশের কেলেংকারী হবে। রাঘবের বড় ছেলে সদ্য এইচএসসি পাশ করেছে। গোঁফ উঠেছে। বন্ধুদের লজ্জায় বলতে পারছে না তার মা আবার গর্ভবতী। তাদের আরেকটা ভাই বা বোন হবে।
বাবার কাছে মিন মিন করে বলার চেষ্টা করেছিল মাকে একবার হরিচরণ রায় রোডে নতুন এক ক্লিনিকে নিয়ে যেতে। মাথা নিচু করে পায়ের বুড়ো আঙুল মেঝেতে ঘষে ঘষে বলল;
: মারে একবার ক্লিনিকে নিমু?
রাঘব বাবুর মাথায় মাখা সরষে তেল কানের পাশের জুলফি বেয়ে নামছে। মোবাইলে ফোনটা পকেট থেকে বের করে কাকে যেন ফোন করতে যাচ্ছিলেন। ফোনটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে বড় ছেলেকে দিলেন কষে এক ধমক।
: চোকি,ফটর ফটর করবি না কইলাম।
বড় ছেলের নাম ভার্গব। জন্মের কিছুক্ষণ পরই চৌকি থেকে কী করে যেন গড়িয়ে পড়ে গিয়েছিল বলে সবাই ওকে আদর করে চোকি ডাকে। ভার্গবের এই নাম নিয়ে দু:খের শেষ নেই। অনেকবার চেষ্টা করেছে,প্রতিবাদ করেছে। কাজ হয়নি। বাবা এখনো ভার্গব নামে কমফোর্ট বোধ করে না। রেগে গেলে তো কথাই নাই।

বাবার কথাই চূড়ান্ত। আয়া মালতীকে ডেকে এনেছে। ভার্গব মালতী মাসীকে দেখে চমকে গেছে। ভার্গবেরও জন্ম এই মাসীর হাতে। সে জানে এই মাসী চাড়াল বংশ। বাবা জানে না। জানলে সর্বনাশ। সে এখনো বুঝতে পারে না কেন মানুষে মানুষে এই জাতপাত। জাতপাত নিয়ে গুগল করে প্রায়ই।

ভার্গব একবার মায়ের শোবার রুমে এসেছিল,মালতী মাসী চেঁচিয়ে উঠল; হাত মুখ আগুন দিয়ে সেঁকে এসেছি কিনা। অবাক ভার্গব,আগুনে সেঁকতে হবে কেন তাকে?
পবিত্র হতে হয় ভার্গবকে। মা ব্যথায় চোখ বন্ধ করে আছে। সে এসে মা’র মাথার সামনে দাঁড়াল। ছোট্ট ঘুলঘুলে রুম। জানালা দুটো বন্ধ। কবুতরের খোপের মতো। জানুয়ারীর এই দুপুরে মায়ের কোমর পর্যন্ত একটা নামাবলী চাদরে ঢাকা। উপরে ফ্যান ঘুরছে ফ্যানফ্যান। ফ্যান ঘোরার নিজস্ব একটা শব্দ আছে।
মাসীমা বললেন;
: যাও বাইরে যাও। মারে বিরক্ত কইরো না কইলাম।
মা শীর্ণ হাতে ভার্গবের হাতটা ধরলেন হাত বাড়িয়ে। দোতলা বাড়ির পেছনে পেঁচানো সিঁড়ি। কার যেন পায়ের আওয়াজ ধুপধাপ। মা হাসার চেষ্টা করছেন ভার্গবের হাত ধরে।
: কি চাও বাবা? ভাই নাকি বইন?

*
নবীনার গানের সুরে সুরে মাছ কাটাকাটি চলতে থাকে। নৃপেনের মাথার মাঝে সারি সারি টাকার একটা গাছ ভেসে ভেড়ায়। জগাই কাকার কাছ থেকে কলকিটা এনে দেবে নাকি এক টান! যদি কোথাও টাকার গাছ থাকত পৃথিবীতে। শীতকালে গাছ থেকে যেমন পাতা ঝরে,তেমনি ঝরতো টাকার পাতা টুপটাপ টুপটাপ।
বউকে বলে দিয়েছে ভট্টাচার্য বাবুর কাছ থেকে আসার সময় যেন ভালো পরিমান বকশিশ নিয়ে আসে। মালতী মুখ ঝামটা মেরে বলেছে;
: মাগর কত্তা চাড়াল বংশ শুনলে আমারে কইলাম বটি দিয়া ফালা ফালা করব। বহুত দিকদারীতে আছি। বকশিস চাইবার পারুম না।
নৃপেনের মেয়ে নৃপবালা ফেসবুক খুলে কাকে যেন লিখছে;
: তোমার সাথে আমার এটাই শেষ সংলাপন। সংলাপন বলে কোনো শব্দ বাংলা ভাষায় আছে কিনা আমি জানি না। সংলাপের সাথে আমার রেণু মিশিয়ে সংলাপন করে নিলাম। এই যে আমি বুঝে নিয়েছি আমার মায়ের নিজের ঘর ছিল না..সংসার গ্রামে ভয় পেতে পেতে বাবার সংসার করেছে,বাবার সাথে কুঁকড়ে শুয়ে থেকেছে। বাবার গায়ে ছিল সস্তা মদের ভুরভুর গন্ধ। নখের ভিতর লাশের লুকানো মাংস। হয়তো ঋতুস্রাবের ঐ কয়েকটা দিন বাদে বাবার ইচ্ছা সঙ্গমে সায় দিয়েছে।

মাঝে মাঝে আমি মায়ের নিরুদ্রুপ মুখটার দিকে তাকিয়ে থাকি। মুখের দিকে তাকিয়ে নিজের একটা ঘরের কথা ভাবি। আচ্ছা বলো তো আমার কি সাধ্য আছে মাকে একটা নিজের ঘর বানিয়ে দিতে?
এই শহরে লাবণ্য নেই,সামান্য বৃষ্টিতে শহর থকথক ডুবে যায়। যার যেভাবে খুশি মাইক লাগিয়ে পরকাল চর্চা করতে থাকে কর্কশ উচ্চারণে। প্রতিদিন,অসহ্য প্রতিদিন।
এখন আমার বিয়ের জন্য বসে আছি। বসে চিপস খাচ্ছি। আমার নিজের বিয়েটা আমি নিজেও পছন্দ করতে পারছি না। কোথাকার এক জেনানা পুরুষ আমার পাজামা খুলবে।
মুখ বন্ধ করে চিপস খাচ্ছি। মেয়েরা হাঁ করে খেলে মানুষ খারাপ বলে মেয়েরা সবার সামনে কলা খেতে পারে না। পা ছড়িয়ে বসতে পারে না। এটা পুরুষতন্ত্র। যদিও গরীব শ্রমজীবী মেয়েরা হাঁ করেই খায়। তোমাদের এসব বাল ছাল পুরুষতন্ত্র মানে না। আমার পরিবারের কেউ প্রভাতফেরীও করে না,তোমাদের দু’পয়সা পাত্তাও দেয় না।

আমার অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে,খুব কষ্ট হচ্ছে। এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে দুনিয়ার কাউকে আমি ধর্তব্য মনে করি না। মাছ কোটার গন্ধ অসহ্য। নবীনা পিসির গান অসহ্য। মন খুলে বলতে পারলে বলতাম: চুদি না।

এটা হয়তো টেস্টোস্টেরেণের প্রভাব। মোবাইল নিয়ে বসে আছি। একটা গানে তন্ময় হবার চেষ্টা করছি। ব্যথা নিয়ে গান শোনা কঠিন।

এটুকু লেখা শেষ করবার পরই মনে হলো লিখে কি হবে? মুছে ফেলল সে। থাক লুকানো মনের কৌটায়,কেবল নিজের মন জানুক সব মনের খবর। বাবার এই সংসার থেকে সে নিজে বাঁচুক,বাবা বাঁচুক,মা নিরাপত্তা হোক।
যে ছেলেটা বিয়ে করতে আসছে তার পণ ডিমান্ড নেই। ছেলে এক জজ আদালতের পেশকার। বয়স খানিকটা বেশি তাতে কি। ছেলের স্ত্রী বিয়োগ হবার পর আবার বিয়ে করবে। ও ঘরে কোন সন্তানাদি নেই। বাঁচোয়া। কোন পণ লাগবে না। মেয়েকে শুধু সাজিয়ে দিলেই হবে।

নৃপবালা চোখ মুদে নবীনা মাসীর গান শুনছে,রোদের স্ট্যাটাসে মাসীর মুখ দেখতে পাচ্ছে না ভালো করে,মাসীর গলার ওঠানামা রাজস্থানী উটের চলন মতো..কখনো উঁচু কখনো নিচু। কল্পনায় দেখতে পাচ্ছে বেনারসের সেই স্থির লোকারণ্য শান্ত নদী। নদী পারে তীর্থ কাক। ঘোমটা ঢাকা সিঁদুর চর্চা মুখ। কাঁপছে তাদের এই পোস্তাগোলা বাড়ি উঠান।
মোবাইলটা নিয়ে কাকে যেন টেক্সট করল আবার : আমার মুক্তি আলোয় আলোয়।

*
ধুপখোলা মাঠটা আর আগের মতো নেই। সবুজের এতো আকাল। পুরানো ঢাকারও কংক্রিট দাঁত ক্রমশ হাঁ করে গিলে খেতে চাইছে মাঠটাকে।যদিও বাউন্ডারি ওয়াল আছে। দড়ি টেনে কে যেন অনেক কাপড় শুকাতে দিয়েছে। রোদের ডানা ছুঁয়ে খুব অল্প গুমোট বাতাসে ভেজা কাপড় দুলছে। এই সময় ভার্গবের কোথাও মন নেই। ভালো লাগছে না এই দুপুর পার করা একলা সময়। নৃপেন কাকুর মেয়ের বিয়ে জানে সে। তাকে নিমন্ত্রণ করা হয়েছে। যেতে ইচ্ছা করছে আবার করছে না। ভেবেছিল এই ধুপখোলা মাঠে এসে কিছুক্ষণ বসে থাকবে।
কয়েকদিন আগে ভার্গব দলে বলে সাকরাইন র‍্যালিতে যোগ দিয়েছিল, ভোরবেলা কুয়াশার আবছায়াতেই ছাদে ছাদে শুরু ঘুড়ি ওড়ানোর উন্মাদনা। সবার অংশগ্রহণে জমেছিল বাড়ির ছাদ। বেলা বাড়ার সাথে সাথে উৎসবের জৌলুস আর শীতের বিকেলে ঘুড়ির কাটা-কাটি খেলার উত্তাপে সাকরাইন উৎসব। ভার্গবের ঘুড়ি কেটে দিয়েছিল আসগর আলী হসপিটালের এক কর্মচারী। দয়াগঞ্জগামী বাসে দেখা হয়েছিল সেই কর্মচারীটার সাথে।
লোকটা ভার্গবের দিকে এমন দাঁতাল হাসি হাসল যে ভার্গবের হাতের মুঠি শক্ত হয়ে গিয়েছিল। কর্মচারী লোকটা বাস থেকে নামার সময় ভার্গবের কানের কাছে মুখ নিয়ে আস্তে করে বলল;
: একলা একলা চইলা আইয়ো মিয়া। আদরও করুম নে,সুতায় মাঞ্ছা মারাও শিখামু নে..

ভার্গব অসম্ভব মুখ খারাপ করে একটা গালি দিতে গিয়েও থেমে গেল। বাস ভর্তি ঘেমে তেলতেল মুখের ভিড়। প্রচণ্ড ভিড়ের মওশুম। বাসের পাশ গলে একটা রিক্সায় চারপাশ কাঁপিয়ে মাইকে এক হুজুর গলার রগ ফুলিয়ে ক্লান্তিহীন বলে যাচ্ছে সুরে সুরে;

: আচ্ছালামু্‌আলাইকুম। প্রিয় মুমীন ভাইয়েরা, ধুপখোলা মাঠের ৩ দিনব্যাপী ওয়াজ মাহফিলের আগামী কাল শেষ দিনে হযরত পীর সাহেব চরমোনাই হুজুরের আখেরি বয়ান। আখেরি বয়ান..

মুখ থেকে জন্ম নেয়া ভার্গবের গালিটা মাইকের শব্দে নিরিবিলি উড়ে গেল গেন্ডারিয়া।

ধুপ খোলা মাঠের পাশে অল্প ছায়ায় বসে থাকে সে। জানুয়ারী রোদের একটা নরোম বর্শা ঘা থাকে ঘুম ঘুমের। চোখের পাতা লেগে আসার মুহূর্তে সাইরেনের শব্দে চমকে ওঠে। একটা অ্যাম্বুলেন্সে সাইরেন বাজিয়ে ধুপখোলা মাঠের পাশে সদ্য নির্মিত আসগর আলী হসপিটালের ভিতর ঢুকছে।
চমকে ওঠে ভার্গব। মা’র শীর্ণ মুখানি দামামা বাজালো ওর ভীরু দর্পণে।

*
এই ঘুপচি ঘরেও আঁধার করে বসেছিল নৃপবালা। এক পিসি এসে ধমকে গেছে ওকে। আলো জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে গজগজ করে। যে মেয়ের আজ বিয়ে সে কিনা অন্ধকারে। পিসি এসে নৃপ’র গাল টিপে দিল। কানের কাছে মুখ নিয়ে হেসে বলে
: নেপা গীত গাইতাছস না ক্যালা। আয় ধর

অদিতি রাখিল নাম আরতি-সুদন
গদাধর নাম রাখে যমল-অর্জুন
মহাযোদ্ধা নাম রাখি ভীম মহাবল
দয়ানিধি নাম রাখে দরিদ্র সকল
বৃন্দাবন-চন্দ্র নাম রাখে বিন্দুদূতি
বিরজা রাখিল নাম যমুনার পতি
বাণী পতি নাম রাখে গুরু বৃহস্পতি
লক্ষ্মীপতি নাম রাখে সুমন্ত্র সারথি।

নৃপের গীতে মন ধরল না। পিসি একা একাই গীত শেষ করে জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কপালে দুই শীর্ণ হাত ঠেকিয়ে ভগবান শ্রী কৃষ্ণের উদ্দেশ্যে প্রণাম ছুঁড়ে দিলো। মেয়েটার দিকে কেমন যেন অজানা শঙ্কা বুড়িগঙ্গা খেলে গেল।
বিকাল নামছে। শীতকালের এই রোদ দুপুর খুব সংক্ষিপ্ত। ঝুপ করে দৌড়ে পালায় তরাসে। বিধবা নি:সন্তান পিসি কল্পনায় দেখতে পায় হাটখোলা রাস্তার পাশ দিয়ে নৃপ আর নৃপের বর হাত ধরে হাঁটছে। টিকাটুলী হয়ে স্বামীবাগ। অতীশ দীপঙ্কর রোডে এসে ওরা থামবে,দূরের ধলপুরের দিকে হাঁ করে তাকাবে। রাস্তার লোকজন অবাক হয়ে এই আলো সুন্দর বউ সাজের মেয়েটা আর টোপর পরা বরকে দেখে হাসবে। ঢুলি আসবে কামরাঙির চর থেকে,ডুগডুগি বাজাবে তার ভাই নৃপেন। পেশকার বর আর কনে নৃপবালা লোকজনকে গোল হতে বলে গান ধরবে;

পিন্দারে পলাশের বন পালাবো পালাবো মন
ন্যাংটি ইন্দুরে ঢোল কাটে রে কাটেরে
গতরে পিরিতের ফুল ফুটে. গতরে পিরিতের ফুল ফুটে.
পিন্দারে পলাশের বন পালাবো পালাবো মন
ন্যাংটি ইন্দুরে ঢোল কাটে রে কাটেরে

আমার বধু রাতকানা বাড়ির পাশে আনাগোনা
ঢেকি চরাই উঠে ধান কুটে রে কুটে রে
গতরে পিরিতের ফুল ফুটে. গতরে পিরিতের ফুল ফুটে।

জগাই কাকা ছোট্ট উঠানের পাশে খুঁটিতে হেলান দিয়ে ঝিম ধরে আছে। মাঝে মাঝে কাকে যেন বিড়বিড় করে ডাক দিয়ে বলে : এক গেলাস দুধ দে না রে..

কেউ বৃদ্ধ জগাই’র কথা আমলে নেয় না। বিয়ে বাড়িতে এতো সময় কার আছে! বাতাসে পুরানো ঢাকার সৌরভ উড়ে বেড়ায়। নৃপেন ডোম টাকার গাছের স্বপ্নটা দেখা বন্ধ করে। নবীনা রানির গান থামে ক্লান্তির বুননে।
কে যেন মোবাইলের ঘড়ির দিকে খামোকা সময় দেখে। স ম য় ..

নৃপেন ঘরে ঢুকে দেখে এলোমেলো নৃপবালা। চমকে ওঠে। বুকের ভেতরটা লাশ কাটা ঘরের মতো হিম লাগে। পা জোড়া অচল হলো নাকি? ধীর পায়ে পা টেনে টেনে খাটের উপর জুবুথুবু বসে থাকা মেয়ের কাছে যায়। সূর্য ডুবে গেছে কতো আগে। ধারের মসজিদের মাইক থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসে। মেয়ের মাথায় হাত রাখে। ডুকরে কেঁদে ওঠে;
: মা রে

*
অষ্টমঙ্গলার দিন নৃপবালা বাবার বাড়ি এসেছে। সাথে জামাইও। পেশকারের মুখ উজ্জ্বল চকচকে। বর হিসাবে একটা আলগা লাবণ্য ঝুলে আছে মুখে লাউ ক্ষেতের মাচানের মতো। আজ অষ্টমঙ্গলা উৎসব হবে ডোমবাড়ি।
আট দিনের মাথায় কনের পিত্রালয়ে এই লোকাচার। নবীনা রানি প্রথমে একটি থালায় দুধ, আলতা এবং জল একসাথে মিশালো। এরপর এই মিশ্রণের ভিতের নৃপ ও পেশকারের হাত ডুবিয়ে মঙ্গলসূত্রের বন্ধন মুক্ত করে দিলো। বিয়ের গাঁটছড়াও মুক্ত করা হলো। বাড়িজুড়ে উলু ধ্বনি।
পেশকার ছোট আকারে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন শ্বশুর বাড়িতে। মঙ্গলকাব্যের শেষ পর্ব। দ্যা নিউ সনাতন সোসাইটি,ময়মনসিং পালার শেষপর্ব করবে আজ। মঙ্গলকাব্যের প্রথম পালা শুরু হবে মঙ্গলবারে আর শেষও হবে মঙ্গলবারে।
আজ মঙ্গলবার।
অষ্ট অহের দেবীর মঙ্গলগীত হবে সন্ধ্যা থেকে। ছোটখাট একটা মঞ্চ বানানো হয়েছে। পালার বিবেক গলা খাকারি দিয়ে শুরু করে;

শুন ভাই সভাজন কবিত্বের বিবরণ এই গীত হইল যেন মতে | উরিয়া মায়ের দেশে কবির শিয়র-দেশে চণ্ডিকা বসিলা আচম্বিতে || সহর সিলিমাবাজ তাতে সজ্জন-রাজ নিবয়ে নিয়োগী গোপীনাথ | তাঁহার তালুকে বসি দামিন্যায় চাষ চষি নিবাস পুরুষ ছয় সাত...

পেশকার হাঁ করে আছে। নৃপ পেশকারের চিবুকে হাত দিয়ে ঠোসা মেরে বলল;মুখ বন্ধ করো। মশা ঢুকবে। বিবেক কবিকঙ্কন মুকুন্দরামের পরিচয় দিচ্ছে।
আসরে জমে উঠেছে। ছেলেমেয়ের দল সামনের কাতারে বসে আছে অবাক কৌতূহলে। কেউ কেউ ঝিমাচ্ছে। বড়দের দল পেছনে। কারো কারো সনাতন সোসাইটির এই পালায় আগ্রহ নেই। হাতের মোবাইলে কী যেন টেপাটিপি। পেশকারের মুখ ভর্তি পুলক কাম। এতো ভিড় ভাট্টার মাঝেও অসাবধানে বউয়ের এখানে সেখানে হাত রাখেন আলগোছে। নৃপ ফস করে রেগে ওঠে। ঝামটা মেরে পেশকারের কাঠবিড়ালি হাত সরিয়ে দেয়।

: এই বুইড়া হাত সরা…
পেশকার মুখ টিপে খিকখিক করে। তার এখন পৌষালি পার্বণ

*
সেদিন ভার্গবের মায়ের কৃত্রিম ব্যথা উঠেছিল,বাচ্চা প্রসব হয়নি। আজ বিকেলে থেকেই আবার ব্যথা দুমড়ে উঠছে মায়ের। রাঘব বাবু অপরাধী গলায় ভার্গবের সামনে এসে ইতস্তত করে। অন্য দিকে তাকিয়ে বলল;
: চোকি একবার মালতীরে খবর দিবার পারবি? তর মায়ের ব্যথা উঠছে..
রাঘব বাবু অবাক হয়ে যান ভার্গব কিচ্ছু বলল না দেখে। চুপচাপ আলনা থেকে একটা ফুলহাতা গরম জামা গায়ে পরে নেয়। ঘর থেকে বেরুতে গেলেই বাবা কোমল স্বরে বলে;
: বাবা রাইত বিরাইত যাইতাছো,মাফলারটা লইয়া যাও..
ভার্গব মাফলারটা নিল। সে জানে আজ নৃপ দিদির অষ্টমঙ্গলা। শ্যামপুর এসে আর পা চলছে না। শীত লাগছে না যদিও তবু ওর কেমন যেন চিনচিন ঘাম হতে থাকল। পুরানো ঢাকার এক আলাদা রঙ সুর আছে। বিক্রমপুল ঝাল বিতানের সামনের অংশে কয়লার চুলায় গরম তেলে ফসফস ডিম পরোটা ভাজা হচ্ছে। দু দুটো লোক সার্বক্ষণিক কাঁটা মরিচ,পিঁয়াজ কুচির সাথে ডিম মেশাচ্ছে। হাত যেন মেশিনের মতো। ভেতরে লোকারণ্য। টাটকা তেহারীর ঘ্রাণে চারপাশটা মৌ টৌ। ভার্গব কী মনে করে দুটো ডিম পরোটা কিনল।
মনের মাঝে লুকানো এক দ্বিধা নিয়ে সে হাঁটছে। পায়ের কাছে জড়তার শেকল,বুকের কাছে সেফটিপিন দিয়ে আটকানো অভিমানী কষ্ট। একটা হাহাকার। মালতী মাসীর বাড়ি যেতে ইচ্ছা করছে না,আবার যেতেও হবে।
নৃপেন কাকু মালতী মাসীদের বাড়ি ঢোকার গলিতে সিটি কর্পোরেশনের এক বিশাল ডাস্টবিন। ঢাকা শহরের উপচানো ময়লা যেন। নাক চাপা দিতে হয়। বাড়িতে ঢোকার আগেই মাইকে গানের শব্দ উড়ে আসে। গানের কথা তার মাথায় ঢোকে না। বাড়ির উঠানে আসতেই সারি সারি চেয়ার ভর্তি মানুষের কালো মাথা,মাথার উপরে ডেকোরেটার্সের সামিয়ানা। কোণায় কোণায় বাল্ব,বাল্ব ঘিরে পোকাদের মিছিল। থমকে দাঁড়াল। সামনের সারিতে সিংহাসন আদলে দুই গদিঅলা চেয়ারে জামাই বউ। খিলখিল হাসছে দুজন। ভার্গবের দৃষ্টি যোজনা থেকে মুহূর্তে উবে যায় বর,সে অপলক তাকিয়ে থাকে অপূর্ব সুন্দর সাজ নিয়ে বসে থাকা,চারপাশ আলো করে থাকা নৃপবালার দিকে।
ভিড়,পোকামাকড়ের উপদ্রব,সরগোল সব ছাপিয়ে ভার্গব ভেসে যেতে থাকে লাবণ্য প্রভায়। এই নৃপবালার সাথে তার কতো কথা,ইনবক্সের সুরভিত জুঁই চামেলি কথোপকথন। কতো তিল তিল অভিমান..কতো বিমূর্ত আরব্য রজনী।
: শোন আমি তোর ৩ বছরের বড়। আমাকে দিদি ডাক। বল দিদি। নৃপদিদি.
: নীপা নীপ নিপুণা। নীপবন..
ভার্গব কিছুতেই দিদি ডাকবে না। ভার্গব মনের উঠানে চাষ করে নীপবন। বর্ষা নামে আর সে জমাতে থাকে কদমফুল।
বাস্তবে ফিরে আসে সে কার যেন ডাকে।
: দাদা এহানে খাড়াইয়া আছেন ক্যালা? ভিতরে ভি আইসা পড়েন।

নৃপবালার বিয়ের দুইদিন আগে ভার্গব ফেসবুকে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিল;

প্রেম ততক্ষণই অমূল্য যতক্ষণ প্রকাশ না হয়। কলির মতো। ফুল হয়ে ফুটলেই ঝরে যায়,নয়তো উপড়ে ফেলে।

নৃপবালা ইনবক্সে ধমক দেয়। কি লিখেছিস তুই? ডিলিট কর।

*
মালতীবালা মনে মনে খানিক বিরক্ত হলেও এক ধরণের টান অনুভব করল যাবার। এই ভট্টাচার্য পরিবারের সাথে তার কোথায় যেন টান আছে প্রাণের। দু দুটো সন্তান তার হাতেই জন্ম। ভার্গব যখন তার সামনে এসে মাথা নিচু করে মৃদু স্বরে বাসায় যেতে বলল তখন মালতী মায়াময় একটা দৃষ্টিতে ভার্গবের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাইরের কোলাহল,রাতের আলোতে নিজের মেয়ের বিচ্ছেদের সুর ছাপিয়ে এই সরলপানা ভার্গবের মুখের পানে অনিমেষ তাকিয়ে রইল্। এই তো সেদিনের দুধের বাচ্চাটা তার হাতে জন্ম,দেখতে দেখতে কী রকম লম্বা বড় ঢ্যাঙা হয়ে উঠল।

এই তো সেদিন..কী বৃষ্টি! ঝড়ের রাতে বিদ্যুৎ নেই। তীব্র ব্যথায় ভার্গবের মা কাঁদছে। বংশের প্রথম সন্তান হবে। কী প্রতিকূল পরিস্থিতি।
ভার্গবকে বলল;
: তুমি আগ বাড়ো। আমি অহনি ভি আইবার লাগছি। কিছু খাইবা?

ভার্গব মাথা নাড়ে।

নৃপেন কাকুর বাসা থেকে বেরিয়ে আসার সময় চোখ পড়ে সামনের সারিতে বসে থাকা হাস্যোজ্জ্বল যুগলের দিকে। নৃপবালা গভীর মনোযোগে পালা দেখছে। আলোবাতির আলোতে চিকচিক করছে তার লাবণ্য মুখ। নৃপ খেয়াল করে না ভার্গবকে। ডিম পরোটা আর দেয়া হলো না। গলি থেকে বেরুবার মুখে ডাস্টবিনে ছুঁড়ে মারে ডিম পরোটার প্যাকেট।

রাত বাড়ছে দুলকি চালে। ভার্গব বাড়ি ফিরছে মন্থর। পা চলছে না। অবসন্ন লাগছে। ঠান্ডাটা এখন বেশ জমিয়ে পড়েছে মনে হচ্ছে। মাফলারটা ভালো করে গলায় পেঁচিয়ে নিল। এ অঞ্চলের অলিগলি তার জন্মের চেনা। মুখস্থ করা কবিতার প্রথম ১২ লাইনের মতো। বাজারের গলি বাঁক নিতেই গাঢ় অন্ধকার গ্রাস করল ওকে। আসার সময় তো এখানে ল্যাম্প পোস্টের আলো ছিল। কয়েকজন লোক অতর্কিতে ভার্গবকে ঘিরে দাঁড়ায়।

: এই থাম হালা মালাউনের বাচ্চা।

ভার্গব ভীতু হরিণ শাবকের মতো কাঁপতে থাকে। ঠোঁট শুকিয়ে আসে। কে যেন কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করল;
: তোর মায় নাকি বিয়াইবো?
অন্য লোকগুলো খ্যাক খ্যাক করে ঘুষঘুষি হাসে।
: তয় হউরের পো ফেছবুকে এইটা কি দেওন চোদাইছো? আমগো জিনিষের উপর তোমগো মূর্তি? শালা বীর বাহাদুর হইবার চাও।

ভার্গব ভ্যাবাচাকা হয়ে পড়ে। কিছুই বুঝতে পারছে না সে। ফেসবুকে যাচ্ছে না সে কয়েক সপ্তাহ হয়ে গেলো। হাঁ করে অন্ধকারের অচেনা মুখের দিকের তাকিয়ে..
: শালা মান্দির পো,ঢঙ করো ক্যালা। রসরাজ সাজো? হোগার মইদ্যে ফেছবুক ঢুকাইয়া বর্ডার পাছ করাইয়া দিমুনে আইজকা..আবে ঐ অরে নোহার পুলে লইয়া আয় তো রে। লৌড় দিলে কইলাম খবর আছে বে।

কে যেন শূন্যে চকচকে চাপাতি তোলে চাঁদের ঘোলা আলোতে।

*
কী সুন্দর মায়াময় হয়ে ভার্গব পড়ে থাকে অন্ধকার কালি মাখা ল্যাম্পপোস্টের নিচে। টগবগ রক্তের একটা দাপুটে গতি আছে,তিরতর করে রাস্তার পাশ গলে ঢালুর দিকে গড়াতে থাকে পিচকারী সদৃশ। একাকী ভার্গবের শূন্য মোলায়েম উষ্ণ মাফলারটা ওরা নিয়ে যায় সাথে।

*
থানার একজন সুদর্শন কর্মকর্তা (এএসআই) মাথা ঝুঁকে একটা লিফলেট পড়ছেন;
ক.
জিহাদ একটি সামাজিক বিষয়;
খ.
সব সংগঠনগুলোকে এই বিধি মানতে হবে। তারা বলেছে যে
গ.
আমাদের লড়াই নাস্তিক ও শরীয়ার শত্রুর বিরুদ্ধে
ঘ.
মসজিদ, জানাজা,কবর, বাজার,মাজার ও আদালত প্রাঙ্গনে বিস্ফোরণ ঘটানো সম্পূর্ণ ভুল।
ঙ.
সেনাসদস্যদের স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যা করা সঠিক নয়।
চ.
যেসব সামরিক অভিযান সাধারণ মুসলমানের কাছে বোধগম্য নয় এবং যা ‘মুজাহিদিনদের’ কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়, সেগুলো ‘এড়িয়ে চলতে’ হবে।
ছ.
‘কাফের’ চিহ্নিত করা ও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জ্ঞানী উলেমার ওপর নির্ভর করতে হবে।

আয়েশ করে তার পুরো লিফলেটটা পড়া শেষ হলো না,এমন সময় পুলিশ বিভাগের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এসে থানায় হাজির। এই বড় সাহেবের আজ বের হবার কথা না। কমিশনার স্যার জরুরী কল করেছেন তাকে। রাতে বেরুতে হলো বলে মেজাজটা খিঁচড়ে আছে। থানার সুদর্শন এএসআই তড়াক করে দাঁড়িয়ে জোরে স্যালুট করলো। বিরক্তির চিহ্ন মুখ থেকে ড্রেসে ছড়িয়ে পড়েছে তার। শুধু বলল;
: চলেন স্পটে।

*
সারা রাত অনুষ্ঠান শেষ করে নৃপেন মাত্র শুয়েছে। ভোরবেলায় মেয়ে ও পেশকার জামাই চলে গেছে। একটা অবসাদ ও হু হু করা বুক খালি আবেগ বাড়িটার ভেতরে। কাল রাতে খানিক পান করতে চেয়েছিল নৃপেন। নৃপ বাবার হাত ধরে মিনতি করে নিষেধ করেছে।
এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। নৃপ বিছানায় শুয়ে গড়াগড়ি করছিল,ঘুম আসছিল না বলে। উঠে দরজা খুলে চমকে উঠল।
দরজায় পুলিশ।
তাকে সংক্ষেপে যা বলা হলো তার মানে হলো নৃপেনকে এখনই হাসপাতালে যেতে হবে। খুবই জরুরী। পুলিশ বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে নৃপেন রেডি হলো। বেরিয়ে যাচ্ছিল আবার কি মনে করে বাড়িতে ঢুকে আলনার কোণায় ঝুলে থাকা টুপিটা সাথে নিয়ে নিল। সকাল বেলাকার ঢাকা জেগে উঠেছে। জিপের পেছনে নৃপেনের ঝিমুনি জম্পেশ হতে হতে পুলিশের গাড়ি হাসপাতালে এসে হাজির। বড় কর্মকর্তা ছোট কর্মকর্তাকে ইশারা করেন। এএসআই নৃপেনের কাঁধে হাত রেখে যা বলল তার অর্থ হলো এখনই তাকে মর্গে যেতে হবে। একটা লাশ এসেছে। নাম কা ওয়াস্তে পোস্ট মর্টেম করতে হবে। যদিও বোঝা যাচ্ছে যে লাশটা খুন হয়েছে। পুলিশ পরিচয়ও উদ্ধার করছে। ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের প্রধানকেও ফোন করা হয়েছে। মিডিয়ার লোকজন আসার আগেই লাশ হস্তান্তর জরুরী।
এএসআই নৃপেনের পকেটে কী যেন যত্ন করে গুঁজে দেয়। নৃপেন বুঝতে পারে পকেটের উষ্ণতা। নৃপেন নির্ঘুম শরীরের ক্লান্তি নিয়ে মেডিকেল কলেজের লম্বা করিডোর ধরে পা বাড়ায়। পা জুড়ে অলস ক্লান্তি। ঘাড়ের ব্যাগের ভিতর লুকানো শিশিটার অস্তিত্ব অনুভব করে আলগোছে। মর্গে ঢুকেই গলায় ঢালবে নাকি শিশি থেকে বের করে মাল।
শীতল লাশের সামনে এসে দাঁড়ালে রাতের ক্লান্তি যাবে উড়ে। নৃপ টেক্সট করেছে বাবাকে জামাই সহ ট্রেনে উঠে গেছে। কমলাপুরে ট্রেন এখনো,ছাড়বে সহসা। ভুস করে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যায় নৃপেনের। টাকার গাছটার কথা আবার মাথায় এক পাঁক ঘুরল। মর্গের সামনে এসে সে দেখতে পায় ডিপার্টমেন্টের সহকারী অধ্যাপক মোল্লা স্যার হাজির। ওর হাতে একটা পেপার ধরিয়ে দিল। তালা খুলে লাশকাটা ঘরে ঢুকতেই চোখে ধ্বক করে বিঁধল উজ্জ্বল আলো। হিম শীতল ঘর। নৃপেনের প্রতিক্রিয়া হয় না।

টুপিটা মাথায় দিল নৃপেন। মোল্লা স্যার আস্তে করে বললেন;
: নূরুল ইসলাম,টুপি পরতে হবে না। ডেডবডি হিন্দুর। এখনো রিসিভার আসে নাই। যাও শুরু করো। আমি ডিপার্টমেন্টেই আছি। আমাদের জন্য চায়ের আয়োজন করি। দেখি এতো সকালে কাউকে পাই কিনা।
নৃপেন কাঁধের ব্যাগ থেকে শিশিটা বের করল। একটা যান্ত্রিক মোশন তৈরী হলো অভ্যস্ত শরীরে। ফ্রিজের এক পাশ থেকে ছুরি,সেলাই সুতার জিনিষপত্র রেডি করতে করতে দ্রুত গ্লাভস পরে নিল। সাদা কাপড়ে ঢাকা ডেডবডিটার মুখ সরাতে সরাতে শিশির ছিপ খোলে নৃপেন ওরফে নুরুল ইসলাম।

ইলেক্ট্রিক শক খাওয়া মানুষের মতো ফ্রিজ হয়ে যায় নৃপেন। শিশি’র তরল মুখে ঢালতে আচানক থেমে যায়। গলার কাছে দোমড়ানো একটা শব্দ আটকে থাকে ক্লান্ত নৃপেনের। মাথা থেকে টুপিটা খুলতে ভুলে গেল।

চোখের সামনে নিথর অনিমেষ ঘুমিয়ে আছে কর্তা বাবুর ছেলে। সেই চোকি। ভার্গব ভট্টাচার্য।

*
সারা রাত ঘরের ভেতর অস্থির ছটফট করেছে রাঘব বাবু। চোকি গেল কোথায়? সে তো রাতে বাইরে থাকার ছেলে নয়। কতো শতবার যে মোবাইলে ফোন করেছে ছেলের। কোন সাড়াশব্দ নাই। মেজাজও খারাপ হচ্ছে চরম। সে ফোন বন্ধ করে রেখেছে কেন?
কয়েকবার আতুর ঘরে ঢুকে মালতীবালাকে জিজ্ঞেস করেছে;
: তুমি অরে সাথে কইরা আনলা না ক্যান? কই গেছে ও?
মালতী কুন্ঠিত গলায় ঘোমটার আড়াল থেকে বলেছে;
: কর্তা কইলাম তুমি আগ বাড়ো। আমি হাতের কাম সাইরা ভি আইতাসি। পুলা যে বাড়িতে আইব না বুঝবার ভি পারি নাইক্কা।
রাঘব বাবুর যন্ত্রণা ক্ষণে ক্ষণে বাড়ছে। সাথে তার স্ত্রীর। মালতী বার কয়েক সরিষার তেল গরম করে আস্তে আস্তে ভার্গবের মায়ের তলপেটে হাত বুলাতে লাগল।
কাছের মসজিদে ফজরের আজান শোনা গেল সশব্দে। কী মনে করে মালতী মাথার দিকের বন্ধ জানালাটা খুলে দিল। ভোরের একটা ঠাণ্ডা বাতাস দৌড়ে গেল কবুতর খোপের মতো আতুর ঘরটায়।
সূর্যের একটা আলো বাচ্চা মেয়ের ফ্রকের মতো ঝিলিক ছন্দে ঘরটাতে প্রবেশ করল। বসবার ঘরে পায়চারী করতে থাকা রাঘব বাবুর ফোনটা তখনই বেজে উঠল।

হাসপাতাল থেকে ফোন।

*
গগনবিদারী চিৎকার করে উঠল ভার্গবের মা। মালতীবালার উৎকন্ঠিত মুখের রেখাবলী সরায়ে জন্ম নিল শিশুটি। ভোরের আলো কুয়াশা বুড়ির চাদর থেকে নেমে এলো হামাগুড়ি দিয়ে। জানালার কাছে এসে উঁকি দিল মমতায়।

কী সুন্দর একটা শিশু ওয়া ওয়া কাঁদছে।
কখনো কখনো কান্না যে এতো সুন্দর !