মেয়েটি এসেছিল শরতের শেষে

মাহরীন ফেরদৌস





আমার যখন মাত্র বার বছর বয়স তখন আমার বৃদ্ধা দাদী এক দুপুরে আমার ডান হাত শক্ত করে ধরে বলেছিলেন,

- তুই জানোস তোর লাইগ্যা একখান পরী আইব? সেই পরীর থাকব আন্ধার করা লম্বা চুল, টকটকা ফর্সা গতর, গোলাপি ঠোঁট আর মিঠা হাসি।

আমার জন্য পরী আসবে শুনে আমি বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে ফেলেছিলাম। মনে হচ্ছিল রূপকথার বইয়ের সব গল্প হয়ত সত্যি হয়ে যাবে। আমি নিজে হয়ত রূপকথার গল্পের কোন চরিত্র। তারপর ঢোক গিলে প্রশ্ন করেছিলাম,

- দাদী, পরীটা কি চশমা পরবে?

দাদী প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন,

- কী কস? চশমা পরা মাইয়া মানে তো চোক খারাফ। এমন মাইয়া পরী ক্যামনে হইব?

আমি মুখ কালো করে চুপ করে গিয়েছিলাম।

আমার শৈশবটা ছিল ভীষণ আনন্দের। দাদাবাড়ি আর আমাদের বাড়ি একইসাথে। স্কুল থেকে আসার পর নাটাইবিহীন ঘুড়ির মত এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে সময় কেটে যেত। সন্ধ্যা নামলে পড়তে বসার জন্য আব্বা বেত হাতে আমাকে খুঁজে বেড়াতেন এখানে সেখানে। আমি তখন লুকিয়ে থাকতাম প্রায় আশি পেরুনো দাদীর পালঙ্কের নীচে। আব্বা এসে খুঁজতে গেলে দাদী মুখ ঝামটা দিয়ে বলতেন,

-না, ও আসে নাই এইখানে। আর ওরে পাইলে মারবি না কইলাম। আমার বড় নাতি ও। ম্যালা আদরের।

সে সময় একদিন স্কুলে গিয়ে দেখেছিলাম আমাদের সবার প্রিয় ম্যাডাম খুব মাথা ব্যাথা হয় বলে ডাক্তার দেখিয়ে চশমা নিয়েছেন। আর তাই পরে ক্লাস নিতে আসছেন। উনাকে দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম। দুইটা কাচের গ্লাসের জন্য কারো চেহারা বুঝি এত বদলে যায়? আমার তা জানা ছিল না। সেই আলগা কাচের জন্য আমার ম্যাডামকে আরও সুন্দর লাগত। উনি চশমার কোন দিয়ে তাকিয়ে যখন ধমক দিতেন তখন আরও বেশি ভালো লাগত। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। তারপর থেকে চশমা পরা মানুষ আমার ভালো লাগে। সেকারণেই দাদী যখন বলছিলেন, পরীর কথা, তখন আমার কল্পনায় ভেসে উঠেছিল মেয়েটা চশমা পরে আছে। কিন্তু পরক্ষণেই উনার ধমক খেয়ে সব কল্পনা উড়ে গিয়েছিল। দাদী ঠিকই দেখতে পেরেছিলেন আমি মুখ কালো করে ফেলেছি। উনিও তাই একটুক্ষণ থেমে বলেছিলেন,

- থাক আর মুখ কালা করনের দরকার নাই। তোর পরী চশমা পরব নে। অহন খুশি?

বিস্তর ছানি পড়া চোখ নিয়ে দাদীর দেখার কথা না আমি মুখ কালো করেছি নাকি লাল। তবে উনি দেখেছিলেন। কারণ, চোখের দৃষ্টির চেয়ে মনের দৃষ্টি অনেক বেশি নির্ভুল।

এরপর প্রায় বিশটি শরৎকাল চলে গেল। বসন্ত দিয়ে সময় গুনলাম না কারণ বসন্ত ঋতু আমার ভালো লাগে না। বড্ড কোলাহলের মত মনে হয় এই ঋতুটাকে। আমার ভালো লাগে ভাদ্র, আশ্বিন মাস। ষড়ঋতুর তৃতীয় ঋতু। ভালো লাগে এ সময়ের নীল আকাশ, শিমুল তুলার মত তুমুল মেঘ, শেফালি আর ছাতিম ফুলের ঘ্রাণ। আকাশের উজ্জ্বল নীলিমার প্রান্ত ছুঁয়ে মালার মত যখন উড়ে যায় পাখির ঝাঁক, আমার তখন সুখে মরে যেতে ইচ্ছে করে। মরে যাওয়ার সুখ নিয়ে আমি পার করলাম প্রায় বিশটি শরৎকাল। তারও বহুদিন পর আজ তার সাথে আমার দেখা হল।

এখন আমার জীবন চলে লেখালেখি করে। প্রতিমাসে লেখা নিয়ে কয়েকটা ডেডলাইন আর মাস শেষে একটা সাদা খাম আমাকে মূলত বাঁচিয়ে রেখেছে। পত্রিকা অফিস থেকে এবার আমাকে বলা হয়েছে তিন দিনের মাঝে মিলনাত্মক গল্প দিতে। অথচ আমার জীবনে মিলনাত্মক কোন গল্প নেই। বাস্তবতাকে ছুঁয়ে না দেখে শুধু কল্পনা দিয়ে আর কতদিন লেখা যায়? তবে লিখতে তো আমাকে হবেই। তাই, কীভাবে লিখব, গল্পটাকে কীভাবে সাজাব এসব নিয়েই যখন ভাবছি তখনই তার সাথে আমার দেখা হল।

এ রাস্তায় অনেকগুলো খাবারের দোকান। প্রচুর মানুষ পেটের ক্ষুধা আর মনের ক্ষুধা নিয়ে এখানে চলে আসে। প্রেম করার জন্য দোকানগুলোতে এসে ভিড় জমায়। বিকেল হলে গিজগিজ করতে থাকে দোকানপাট আর রাস্তাঘাট। তাদের চলাফেরা আর তাড়া দেখে মনে হয় এরা সিনেমার কোন ফাস্ট ফরোয়ার্ড করা দৃশ্য। খাবারের দোকানে অজস্র মানুষ থাকে, সেখানে কেউ এলে কিংবা কেউ চলে গেলে আমার চোখে পড়ার কথা না। কিন্তু মেয়েটি বের হয়েছিল একটি বইয়ের দোকান থেকে। বড় রাস্তার নানা দোকানের মাঝে একটিই কেবল বইয়ের দোকান। নতুন বই ১৫% ছাড়ে আর পুরানো বই ৫০% ছাড়ে বিক্রি করা হয় এই দোকানে। আমাকে খুব ভালো করেই চেনে দোকানী। আমি মাঝে মাঝে আসি। গল্প করি। তারপর এক কাপ চা শেষ করে সিগারেটের শেষাংশটুকু চায়ের কাপে নৌকার মত ভাসিয়ে চলে আসি। মেয়েটিকে দেখে আমি আর সবসময়ের মত দোকানের ভেতরে গেলাম না। বেশ দূরে দাঁড়িয়ে গেলাম। বুঝতে পারলাম মেয়েটি আসলে পরী। ‘পরী’ শব্দটাকে নাটক, সিনেমা কিংবা চলতি লেখকরা খুব বাজারি বানিয়ে ফেললেও আমার এই নাম বাদে অন্য কোন নামে তাকে ভাবা সম্ভব ছিল না। আর কোন সুন্দর নাম কিংবা বিশেষণও আমার মাথায় আসছিল না। আর দাদীও বলে গিয়েছিলেন মেয়েটি হবে পরী। আমার মস্তিষ্ক আজীবন এটাই বিশ্বাস করে এসেছে, সেই বিশ্বাস থেকে বের হয়ে অন্য কোন নাম বা রূপ দেওয়ায় ব্যাপারে আমি ব্যর্থ।

পরী দেখতে এমন আহামরি কোন সুন্দর না। ছিপছিপে গড়নের। হালকা ঢেউ খেলানো চুল কাঁধ পেরিয়ে পিঠ ছুঁয়েছে। চোখের নীচে কালচে দাগ। অর্থাৎ রাতে সে ঘুমায় না ঠিকমত। তার গায়ের রঙ ফর্সা কিংবা কালোও নয়। কোন রঙিন পোশাকও সে পরে নি। তবুও তাকে সুন্দর লাগছে। এমন সৌন্দর্য দেখে আমার মনে হল, এখন শরৎকাল। এবং শরতের এ বেলায় আমার সুখে মরে যাওয়ার কথা ছিল। আমি অপলক তাকিয়ে ছিলাম মেয়েটির দিকে। মেয়েটি ভেতর থেকে এসে দোকানের বাইরে শেলফে রাখা বই দেখছিল, দু একটা বইয়ের ঘ্রাণ নিচ্ছিল। মোবাইলে কী কী যেন টুকেও নিচ্ছিল। আমার মনে হচ্ছিল এভাবেই ও আজীবন বই দেখে যাক।

আচ্ছা, রূপকথার পরীদের তো পাখা থাকে। মানুষরূপী পরীদের চেনার উপায় কী? কোন সংজ্ঞায় ফেলা যায়? যেমন ধরুন, সব মানুষরূপী পরীদের পটলচেরা চোখ থাকবে। ধনুকের মত ভ্রু থাকবে। থাকবে হাঁসের মত গ্রীবা আর পাখির পালকের মত নরম আঙুল।

না। কেউ এমন সংজ্ঞা ধরে পরী খুঁজতে পারবে না। আমার এক বন্ধু আমাকে একবার জানাল সে পরীর মত এক মেয়েকে লুকিয়ে বিয়ে করে ফেলেছে। তারসাথে একই ছাদের নীচে বাস করছে তার পরী। পরদিন আমরা সব বন্ধুরা দলবেঁধে ছুটে গেলাম সেই পরীকে দেখার জন্য। গিয়ে দেখলাম বেশ লম্বা এবং মোটা একটি মেয়েকে সে বিয়ে করেছে। উচ্চতায় সে আমার বন্ধুর চেয়েও দুই ইঞ্চি বড়। আমরা প্রচণ্ড আশাহত হলাম। কেউ বলল, পরী কখনও মোটা হয় না। কেউবা বলল, পরী ধবধবে ফর্সা হয়। কেউ বলল, পরী হয় তুলার মত হালকা। হাতির মত ভারি না। আমরা নানা জল্পনা কল্পনা করতে থাকলাম পরী নিয়ে। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলে যাওয়ার পর আমাদের বন্ধু-স্ত্রী এলো চা নাস্তা নিয়ে। এরপর বন্ধু নাটুকে স্বরে বলল, বউ একটা গান গাও দেখি। মেয়েটি একটু হেসে গান ধরল। চমৎকার কণ্ঠ। সুরেলা গান। আমরা নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম। বন্ধু তার স্ত্রীর দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টি অনুসরণ করে আমরাও তাকালাম, পরী দেখতে।


ইশ! এখন যদি এই মেয়েটির সাথে একটু কথা বলা যেত। পরিচয় হবে। একটু কথা হবে। মেয়েটি হাসবে। আমি হাসব। অল্প কথায় আমি নিজেকে বেশ আধুনিক আর উদার পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইব। সেই উদারতা বুঝে মেয়েটি কোমলভাবে তাকাবে। আমরা কয়েক কদম একসাথে হাঁটব। তারপর রাস্তার অন্যপাশে বড় সিনেমা হলের নতুন পোস্টার দেখিয়ে আমি বলব,

- এই সিনেমাটা নাকি খুব ভালো। আমার বন্ধু দেখে বলেছে। আমার অবশ্য এখনও দেখা হয় নি।

মেয়েটি মুখ নিচু করে হেসে বলবে,

- আমিও দেখি নি।

আমি তখন বেশ গম্ভীর ভঙ্গিতে গলা ঝেড়ে বলব,

- তাহলে চলুন না একদিন......

আমার অর্ধসমাপ্ত কথা বুঝে নিয়ে মেয়েটি সম্মতি জানাবে। তারপর এক বর্ষাকালে ঝুম বৃষ্টিতে একটা বিশাল বড় গাছের নীচে আমরা দুজন হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকব। এরপর এক হেমন্তকালে নদীতে ভাসাব অলকানন্দা ফুল। ওকে নিয়ে কিছু প্রেমের কবিতা লিখব, যা লিখতে পারি নি আজও। এরপর এক কুয়াশাঝরা সকালে অপেক্ষা করব আমার খালি বাসায় ও আসবে বলে। বাসার সামনে পথটুকু দিয়ে ও আসার সময় আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখব, লাল-কালো চাদরে গা ঢেকে ও হালকা পায়ে আসছে। আমি বিছানার চাদর টান টান করে বিছাব। লাগোয়া টেবিলে রাখব বড় এক গ্লাস ভর্তি ঠাণ্ডা পানি। ভালোবাসাবাসির পর যদি ওর খুব তেষ্ঠা পায়! আহ! কী সবুজ দিন!

একের পর এক দৃশ্য আমার কল্পনায় দোল খাচ্ছে। আমি দোকানে সাজানো ম্যানিকুইনের মত অনড় হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছি। পুরোই তথৈবচ অবস্থা। দেখতে পেলাম, মেয়েটি দুটো বইয়ের দাম দিলো দোকানিকে। তারপর হাত-ব্যাগের ভেতরে ছোট্ট বইটি পুরে ফেলল। অন্য বইটি ছিল বেশ বড়। সেই বইটি একটি কাগজের প্যাকেটে করে হাতে নিলো। ও যদি সিনেমা হলের দিকে যায় তাহলে আমার সাথে মুখোমুখি দেখা হবে। আর ও যদি বইয়ের দোকানের পাশে থাকা মস্ত বড় পার্কের রাস্তা দিয়ে যায় তাহলে আমার সাথে আর ওর দেখা হবে না। আমি কি তখন রাস্তা পার হয়ে দৌড়ে যাব ওর সামনে? তারপর লম্বা দম নিয়ে বলব,

- এই যে মিস, একটু কথা বলতে পারি?
নিশ্চয়ই আমাকে তখন ওর বখাটে ছেলে মনে হবে। ছেলে তো নই এখন আর আমি। বয়স হয়ে গিয়েছে বত্রিশ। কিন্তু তবুও, কী ভাববে মেয়েটি! তাহলে কি ওকে বলবঃ

- ঢাকায় নতুন এসেছি। কিছুই চিনি না। সবচেয়ে কাছের বাসস্টপটি কোথায় আছে বলতে পারবেন? নাকি সরাসরি চোখে চোখ রেখে স্থির হয়ে বলব,

- আপনি কি পরী?

ধ্যাৎ! ঠিক জমছে না। মেয়েটি তো সদ্য বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া কোন কিশোরী নয়। বয়স তারও হয়েছে যথেষ্ঠ। অন্তত এত তরল আবেগের সময় তার হবে না। এসব সে পাত্তা দিবে না। কী বলা যায় তাহলে ওকে? এসব ভাবতে ভাবতে আমার মধ্যে হঠাৎ প্রবল তৃষ্ণা কাজ করতে থাকল। প্রবল তৃষ্ণা। নিমিষেই যেন গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। এদিকে মেয়েটি যে কোন মুহূর্তে দোকান থেকে বের হয়ে হাঁটা শুরু করবে। কী করব এখন আমি ভাবতে ভাবতে শুনি কানের পাশে দাদীর ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠস্বর,

- আয় তোগো আরও আগেই দেখা করায় দেই। ম্যালাদিন আগে। মনে পরে কবে দেখা হইছিল তোগো? এইডাই তোর পরীইইইই। পরীইইইই... চিকন সুরে শীষ দেওয়ার মত দাদী বলে উঠেন।

এবার তাহলে আমাদের অনেক দিন আগে দেখা হবে! তবে তাই হোক...
মাথার ভেতর দুত্যি ছড়িয়ে যায় হঠাৎ। মনে পড়ে, আঠার বছর বয়সে কলেজ পাশ করে আমি একবার শহর থেকে আমাদের গ্রামে গিয়েছিলাম। বাস থেকে নেমে একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে আমি এক কাপ চা চাইলাম। তারপর চা পান করে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম বাড়ির দিকে। এদিকে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। পথ থেকে আমার দীর্ঘ ছায়া একটু একটু করে মিলিয়ে যাচ্ছে। মৃত পাখির মত নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছে চারপাশ। ঝিঁ ঝি পোকারা তখনও গান গেয়ে উঠে নি। আমি হাঁটছি আর হাঁটছি। হেঁটে হেঁটে বহুদূর গেলাম। বাড়ির উঠানে যখন পৌঁছিয়েছি তখন হ্যাজাকের আলো বাদে চারপাশে আর কোন আলো নেই। সেই আলোতে দেখলাম দাওয়ায় মাদুরের উপর চোখ বুজে শুয়ে আছেন দাদী। চারপাশে চেনা, অচেনা বেশ কিছু মানুষ। সবাই ধীর- স্থির। যে যার মত। যেন কোন শিশু একসাথে তার সব ব্যাটারিচালিত খেলনা চালু করে দিয়েছে। সবাই সচল, কিন্তু কারও সাথে কারও কোন মিল নেই। আমি সেই দমবন্ধ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। এই চেনা উঠোন, ঘরবাড়ি, আর পুরনো আকাশ হঠাৎ করে আমার কাছে অচেনা লাগতে থাকলো। বুঝিবা দাদী অনন্তকালের একটা স্তব্ধতাকে সাথী করে সবকিছু এলোমেলো করে দিয়ে গেছেন। আর আমি একটা অবুঝ শিশুর মতো সেই অঙ্ক মেলাতে না পেরে ভেতরে ভেতরে তলিয়ে যাচ্ছি।

দাদী মারা যাওয়ার দিন তিনেক পর বাড়িতে বাদ আসর মিলাদ হল। দোওয়া হল। সেখানে আশেপাশের অনেক মানুষ এলেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল কলেজ মাস্টার মজিদ কাকার পরিবারের সাথে উনার বোনের মেয়ে এলো। মেয়েটির পরনে সাদা সালোয়ার-কামিজ। মাথায় ঢেউ খেলানো চুল। গায়ের রঙ ফর্সাও না কালো না। মেয়েটিকে দেখে আঠার বছর বয়সী এক ছেলের চোখের মণি স্থির হয়ে গেল। তার মনে হল, একটা নির্জন দীঘিতে কেউ বুঝি দুধসাদা রাজহাঁস ছেড়ে দিয়েছে। আর সবুজ বনে মাদুর পেতে বসে সে দৃশ্য দেখছে কোন কবি।


মিলাদের পরদিন ছেলেটি ছুট লাগাল মজিদ মাষ্টারের বাড়িতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য পরামর্শ চাইতে। মজিদ মাষ্টার অনেক কথা বললেন। মাষ্টারের স্ত্রী পায়েস আর খই খেতে দিল। তাদের বাচ্চাগুলো দু তিনবার গা ঘেঁষে দাঁড়াল। সবাই আসল, সবাই থাকল। শুধু কোন রাজহাঁস এলো না। ছেলেটি পায়েস হাতে চেয়ারে বহুক্ষণ বসে থাকল। একসময় তার কানের পাশে মৃত দাদী ফ্যাসফ্যাসে কণ্ঠে বলে উঠলেন,

- পরীইইইইইই। পরীইইইইইইইইই।

ছেলেটি একঘেয়ে বাজনার মত দীর্ঘসময় দাদীর কণ্ঠ শুনল। তারপর সে লক্ষ্য করল বাটির পায়েসটুকুকে কেমন যেন একটা নির্জন দীঘি মনে হচ্ছে। সেই দীঘিটাকে কাঠের চেয়ারের হাতলের উপর রেখে ছেলেটি ক্লান্ত পায়ে বাড়ি ফিরে গেল।

এরপর থেকে প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসে শহর থেকে গ্রামে গেলেই ছেলেটিকে মজিদ মাষ্টারের বাড়ির আশেপাশে ঘোরাফেরা করতে দেখা যেত। এর কিছুক্ষণ পর বইয়ের পাতা উলটানোর মত পরের পৃষ্ঠায় দেখা যেত ছেলেটি হতাশ হয়ে বাড়ির পথ ধরেছে। এক সময় সৃষ্টিকর্তা কোন এক খেয়ালে যেন কিছুটা সদয় হয়ে গেলেন। মজিদ মাষ্টারের বড় ছেলের কাছ থেকে কৌশলে জানা গেলো সেই মেয়েটি থাকে শহরে। নোকিয়া এগারশ ফোনের ম্যাসেজে ছেলেটি টুকে নিলো মেয়েটির বাড়ির ঠিকানা। এরপর থেকে তাদের অজস্রবার দেখা হতে থাকলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে, বাসস্টপে, রিকশায়, বাড়ির বারান্দায়, ফাস্টফুডের দোকানে। জীবন কোন ছোটগল্প হলে নিশ্চয়ই দেখা যেত ছেলেটি এক বিকেলে রঙবেরঙের ফুলের তোড়া নিয়ে মেয়েটির জন্য চিরকুট হাতে অপেক্ষা করছে। নয়ত বাড়ির সামনে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যেন মেয়েটি তাকে দেখতে পায়। কিংবা ঝুম বৃষ্টির মাঝে রিকশা চড়ে এসে হাতের কালো ছাতাটি রাস্তার পিলারের পেছনে লুকিয়ে রেখে মেয়েটির ঘরের জানালার নীচে এসে কাকভেজা হত। কিন্তু জীবন কোন ছোটগল্প নয়। তাই ছেলেটির সাথে মেয়েটির দেখা হত এক তরফা। ছেলেটি দেখত, অনুসরণ করত, কানের পাশে মৃত দাদীর কণ্ঠ শুনত, আর এদিকে স্রোতের মত সময় বয়ে যেত। মেয়েটি চলতি পথে প্রায়শই ঝট করে পেছনে তাকাত, কারণ মাঝে মাঝে তারও মনে হত কেউ যেন তাকিয়ে আছে ওর দিকে। কিন্তু সেই চোখদুটো সে খুঁজে পেত না। ছেলেটি এতই সাধারণ, এতই আটপৌরে যে তাকে খুব সহজে চোখেই পড়ে না। এই আটপৌরে ভাবটা তাকে এতই বেদনাকাতর করে তুলল যে এই বেদনা কাউকে বলতে না পেরে সে শব্দ আর বাক্য বানিয়ে লিখতে শুরু করল। আর লিখতে লিখতেই সে হয়ে উঠল লেখক।

এরপর রূপকথার গল্পের মত বলতে হয় অনেক অনেক দিন পর এক সকালে, শহরের ব্যস্ততম রাস্তায় ছেলেটি দেখল খাবারের দোকানের পাশে বইয়ের দোকানে হেঁটে বেড়াচ্ছে তার চিরচেনা সেই মেয়েটি। পরনে প্রথমদিনের মত সাদা সালোয়ার-কামিজ। ছেলেটি বুঝতে পারল, গ্রামের উঠান ঘুরে শত শত রাজহাঁস উড়ে চলে আসছে শহরে। আর শহরটা ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে। আর হয়ে যাচ্ছে একটা মস্ত দীঘি।

সেই দীঘিতে মেয়েটি বইয়ের প্যাকেট হাতে নিয়ে আচমকাই পার্কের রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করে দিল। ছেলেটির মনে হল, এখন তার মেয়েটির দিকে দৌড় দেওয়া উচিৎ। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভ্যাস, জড়তা, দূর থেকেই তাকিয়ে থাকা, কিংবা অনড় হয়ে যাওয়া বোধগুলো তাকে থামিয়ে ফেলল। দীর্ঘদিনের এই অভ্যাস সে পলকে বদলাবে কীভাবে? তাই সে দাঁড়িয়ে থাকল। আর অপলক তাকিয়ে থাকল। দেখতে পেলো, মেয়েটি হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছে বহুদূর।

তারপর তাদের দুজনের আর কোন দিন দেখা হল না...

ওহ! একটা মিলনাত্মক গল্প লেখার কথা ছিল। আচ্ছা, ঠিক আছে। তাহলে পাঠক ধরে নিন শরৎকালের এক সকালে নীল আকাশে উড়ছে সাদা সাদা শিমুল তুলা। বাতাসে ভাসছে ছাতিম ফুলের মৃদুমন্দ ঘ্রাণ। পার্কের পথ ঘুরে পরী মেয়েটি এসে দাঁড়িয়েছে আমার পেছনে। তারপর কণ্ঠ তুলে বলেছে,

- শুনুন, সবচেয়ে কাছের বাসস্টপটি কোথায় আছে বলতে পারবেন?

আমার মিলনাত্মক গল্পটি এবার শুরু হল...


ধন্যবাদ।