ইতালি

ঈশানী বসু

জান্নি রোদারি (১৯২০-১৯৮০)

জান্নি রোদারি, একাধারে সাংবাদিক ও শিশুসাহিত্যিক, ১৯২০ সালে ইতালির ওমেনিয়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বাচ্চাদের স্কুলে পড়ান থেকে সঙ্গীত শিক্ষা, ফাসিস্ত পার্টিতে যোগ দেওয়া ও পরে ইতালীয় গোপন প্রতিরোধ আন্দোলনে যুক্ত হওয়া, সাংবাদিকতা, ইতালিও রেডিওয় শিশু বিভাগের দায়িত্ব পালন, “পায়োনিয়েরে” (শিশু পত্রিকা) ও “জোরনালে দেই জেনিতরি” পত্রিকার সম্পাদনা, শিশু সাহিত্য লেখা— এই সব মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল তাঁর গল্পের মতই বর্ণময়। বাংলার সুকুমার রায়ের মত তিনিও শব্দ নিয়ে নানা মজা করতেন এবং অদ্ভুত রসের রসজ্ঞ ছিলেন। তাঁর গল্পের কাঠামোয় প্রায়শই রূপকথা ও স্বপ্ন-বাস্তব (“magic realism”)— এই দু’এর সুতোয় বোনা এক আশ্চর্য পৃথিবীকে আমরা দেখতে পাই। ১৯৭০ সালে তিনি অ্যান্ডারসন পুরস্কার পান যাকে শিশু সাহিত্যের নোবেল বলা হয়। তাঁর লেখা বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ১৯৮০ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। আজও তাঁকেই ইতালির সেরা আধুনিক শিশু গল্পকার বলা হয়। “ইল লিব্র দেল্লে ফিলাস্ত্রক্কে” বা “ছড়ার বই” (১৯৫০), “ইল রমান্তসো দি চিপল্লিনো” বা “ছোট্ট পেঁয়াজের অভিযান” (১৯৫১) ও “ফাভোলে আল তেলেফোনো” বা “টেলিফোনে রূপকথা” (১৯৬২) তাঁর লেখা অন্যতম জনপ্রিয় বই। অনূদিত গল্পটির ইতালীয় শিরনাম হল “ইল রে কে দোভেভা মরিরে”। এই গল্পটি “ফাভোলে আল তেলেফোনো” গল্পগুচ্ছ থেকে নেওয়া।

অনুবাদকের কথা:- শিশুদের গল্প বা রূপকথা অনুবাদ করা নিঃসন্দেহে লোভনীয়, কিন্তু ঝকমারির কাজ। প্রথমত, জান্নি রোদারির গল্পগুলির মধ্যে থেকে একটি বাছাই করে নেওয়া মোটেও সহজ নয়। দ্বিতীয়ত, তাঁর অসামান্য রসবোধকে অন্য ভাষায় আনয়ন করা। বর্তমান গল্পটি ঠিক ছোটদের নয়, কারণ এই গল্পটির বিষয়বস্তু মৃত্যু। কিন্তু করুণ রসের চেয়েও রোদারির সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ ও সামাজিক বিশ্লেষণের এক নজির হয়ে উঠেছে এই গল্প। এই গল্পটি মূল ইতালীয় থেকেই অনূদিত হয়েছে। আক্ষরিক অনুবাদের থেকে ভাবানুবাদের দিকেই লক্ষ্য রাখার চেষ্টা করা হয়েছে যত দূর সম্ভব মূল গল্পটির রস অক্ষুণ্ণ রেখে।


যে রাজার মরার কথা ছিল

একবার এক রাজার মরার সময় ঘনিয়ে এলো। তিনি ছিলেন এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ রাজা কিন্তু মরণাপন্ন অসুখে ভুগে তিনিও ভেঙ্গে পড়েছিলেন -
-“বলি, এমন শক্তিশালী রাজাকে মরতে হবে কেন, শুনি? আমার জাদুকরগুলো সব করছেটা কি? কেন তারা বাঁচাচ্ছে না আমায়?”
ইতিমধ্যে জাদুকরেরা সব গর্দান যাওয়ার ভয়ে পালিয়েছে। কেবল একজনই বাকি ছিল, সে এক বুড়ো জাদুকর যাকে আর কেউই আমল দিত না, কারণ সে ছিল বেশ অদ্ভুত ধরনের আর একটু পাগলাটে। অনেক বছর হল রাজা তার পরামর্শ চান না, কিন্তু এবার তাকেই ডেকে পাঠালেন।
-“তোমায় বাঁচাতে পারি” জাদুকর বললেন, “কিন্তু এক শর্তে, তোমাকে একটা দিন যার সাথে তোমার সব থেকে বেশি মিল তার মত জীবন কাটাতে হবে। তারপর সেই লোকটাই মরবে তোমার জায়গায়।
শিগগিরই সারা রাজ্যে ঢেঁড়া দেওয়া হল – “যাদের রাজার সাথে মিল আছে তারা যেন চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে রাজসভায় হাজির হয়, নচেৎ প্রাণটা যাবে”।
অনেকেই হাজির হল। কিছু লোকের দাড়ি রাজার মত, কিন্তু কারও নাক লম্বা বা বোঁচা বলে জাদুকর তাদের বাদ দিলেন। আর বাকিদের সাথে রাজার এমন মিল বেরল যেমন ফলের ব্যাপারীর ঝুড়িতে রাখা একটা কমলালেবুর সাথে আরেকটার। কিন্তু জাদুকর তাদেরও বাতিল করলেন, অমুকের একটা দাঁত নেই, তমুকের পিঠে তিল আছে এই সব বলে।
-“কিন্তু তুমি যে সবাইকেই বাদ দিয়ে দিলে” রাজা জাদুকরের কাছে আপত্তি জানালেন। “দোহাই, আর বাছাই করা ছাড়ো, আর ওদের মধ্যে একটাকে নিয়ে শুরু করো”।
-“ওরা কেউই তোমার কাজে লাগবে না হে”, জাদুকর জবাব দিলেন।
এক সন্ধ্যায় রাজা ও তাঁর জাদুকর শহরের প্রাচীরের১ ওপর হাঁটছিলেন, হঠাৎ জাদুকর চীৎকার করে উঠলেন – “এই যে, এই যে সেই লোক, যার সাথে তোমার সব থেকে বেশি মিল!” এই না বলে এক পঙ্গু, কুঁজো, প্রায় অন্ধ, নোংরা এক ভিখারি, যার সারা গায়ে ঘা, তাকে দেখালেন।
-“অসম্ভব”, রাজা প্রতিবাদ করলেন, “ওর আর আমার মধ্যে যে আকাশ পাতাল তফাৎ”।
-“যেই রাজার মরার সময় ঘনিয়েছে”, জাদুকর জোর গলায় বললেন, “তাঁর সাথে মিল কেবল শহরের সবথেকে গরীব, সবচেয়ে অভাগার। শিগগিরি, ওর সাথে পোশাকটা পালটে নাও এক দিনের জন্য, আর বসাও ওকে সিংহাসনে। তারপর আমি তোমায় বাঁচিয়ে তুলব”।
কিন্তু রাজা কিছুতেই ভিখারি সাজতে রাজী হলেন না। বেজায় রেগে তিনি প্রাসাদে ফিরে গেলেন এবং সেই সন্ধ্যাতেই তাঁর মৃত্যু হল। বলাই বাহুল্য মাথায় মুকুট ও হাতে রাজদণ্ড সমেত।

টীকা
১) রাজা যেহেতু অসুস্থ তিনি প্রাচীরের ওপরেই পায়চারি করছিলেন। প্রসঙ্গত দুর্গের বা রাজপ্রাসাদের প্রাচীর ভালোই চওড়া হয়, যাতে সান্ত্রিরা, যারা বাইরে নজর রাখে, তাদের যাতায়াতে বা বাইরের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে অসুবিধা না হয়।