ইচ্ছেদেখা

অর্ক চট্টোপাধ্যায়





হাবুল ছোটোবেলা থেকেই বুঝে গেছিল, এই ইচ্ছে ব্যাটাই গেঁড়ে! মা বলতো, "বাবা আসলে বলবি, 'ভুল করে করে ফেলেছিস', অত বকুনি খাবি না। কিন্তু যদি বলিস 'ইচ্ছে করে করেছিস' তাহলে কিন্তু বাবা ছেড়ে কথা বলবে না।" হাবুল তখন থেকেই বুঝেছিল, ইচ্ছে ব্যাপারটা বিশেষ সুবিধের নয়। তাও হাবুলের উটপটাং ইচ্ছে করতো।

রোজ সকালে মর্নিং স্কুল যাওয়ার সময় বাস থেকে ডানহাতে আস্তাকুড়ের দিকে তাকিয়ে দেখতো, একটা লোক এক গাড়ি ময়লা উল্টোচ্ছে। লোকটার বয়েস নয় নয় করে ষাট ছুঁইছুঁই। মানে হাবুলের দাদুর বয়সী। কই দাদুকে তো এমন খাটনির কাজ করতে হয়না? লোকটা জাস্ট পারছে না ভারী ময়লার গাড়িটাকে আস্তাকুড়ের মধ্যে উপুড় করে ফেলতে। ওর হাতের শিরাগুলো ফুলে ফুলে উঠছে কুঁচকে যাওয়া বাদামি চামড়ার ওপর। মুখ দেখে হাবুলের মনে হত, লোকটার হাতটাই না খুলে আসে কাঁধ থেকে।

হাবুল তখনো বুঝতে পারেনি, ময়লা ফেলতে ফেলতে লোকটা নিজেই একটা ময়লা ফেলার গাড়ি হয়ে গেছে। গাড়িটার বাইরে তার কোনো অস্তিত্ব নেই শুধু তা নয়, ঐ গাড়িটাই তার অস্তিত্ব। হাবুল রোজ সকালে লোকটাকে চেয়ে চেয়ে দেখতো আর ভাবতো লোকটার ইচ্ছে কি? লোকটা কি ইচ্ছে করেই একাজ করে নাকি ভুল করে? এই কাজ করা বা না করার জন্য ওকেও কি কেউ বকুনি দেয়? লোকটার ইচ্ছের কথা ভাবতে ভাবতে হাবুলের নিজের দেখাটাও নিজের অজান্তেই একটা ইচ্ছে হয়ে গেল। হাবুল লোকটাকে দেখতে দেখতে ইচ্ছের বদবেয়াড়া চোখ দিয়ে ভাবতে লাগলো, লোকটা ওর সদ্য অবসর নেওয়া দাদুর মতো দোতলার বারান্দায় ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে বসে রোদ পোহাচ্ছে। হাতে সকালের কাগজ। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। হাতের শিরা বা কুঁচকানো চামড়া সম্ভ্রান্ত সাদা পাঞ্জাবির আড়ালে ঢাকা। লোকটা আর ময়লার গাড়ি নেই, ইজি চেয়ারে সহজ হয়ে গেছে। এহেন দেখা দেখে হাবুলের মুখটাও হাসিতে জ্বলজ্বল করে উঠলো।

কিন্তু ঐ যে, ইচ্ছে ব্যাটাই গেঁড়ে! ইচ্ছেচোখে এই বিকল্প দৃশ্যটা দেখার পর বাস থেকে বাইরের দিকে তাকিয়ে হাবুল যা দেখলো তাতে ওর মুখ হাঁ হয়ে গেলো। দেখলো, ওর দাদু আস্তাকুড়ের ভেতর একটা পেল্লাই ময়লার গাড়ি উল্টোতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। দাদুর হাতের শিরা ফুলে ঢোল। সেখান থেকে রোদে ডোবানো ঘাম ঝরছে। দাদুর মুখে কেমন একটা করুণ ভাব। বাসটা একটু দাঁড়াতেই দাদু আস্তাকুড় থেকে হাবুলের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে কি যেন বলার চেষ্টা করলো। হাবুল কিছুই শুনতে পেল না। ইচ্ছেপর্দা তখনো টকিজ হয়নি। হাবুল ভাবলো, তবে কি তার ইচ্ছের জন্যেই এমন অদলবদল হলো? এবার সে কি করবে? লোকটাকে উদ্ধার করবে না দাদুকে? একজন তার নিজের বাড়ির লোক, আরেকজন এমন, যাকে দেখে রোজই হাবুলের মনের ভেতরটা কেমন বুজে আসে। হাবুল কিছু বুঝতে পারলো না। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো। বন্ধ চোখের ভেতর ওর শিরাগুলো ফুলে ঢোল হয়ে গেল আর আগল বোজা অন্ধকারে একফালি আলোর মধ্যে হাবুলের ইচ্ছেচোখ তার ইচ্ছেপর্দায় দেখলো, আস্তাকুড়ের ভেতর বসানো রয়েছে একটা উল্টোনো ইজিচেয়ার আর তাদের বাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে সটান সোজা একটা ময়লা ফেলার গাড়ি। বারান্দাটা একটু একটু করে দুর্গন্ধে ভরে যাচ্ছে।