অদম্য সমতা

আসমা অধরা




“ তুমি লহ নাই ভালোবাসিবার দায়,
দু'হাতে শুধুই কুড়িয়েছো ঝরা ফুল ।
কৃষ্ণচূড়ার তলে,আমি বসে একা
বুনিয়াছি প্রেম ঘৃণা বুনিবার ছলে । ”

মনের ভেতর কেমন দিনমান এক একাকী ঘুঘু ডেকেই যাচ্ছে। বিস্মৃতির আড়ালে আলোর দুপুরগুলো চাঁপা পড়ে গেছে, শূন্যতার নামে দিনমান কেবল তোলপাড়, ভেঙ্গে যাচ্ছে, ভেসে যাচ্ছে সব। যে মানুষটা তাকে বলতো তোমার মুখটা চাঁদ আর শরীরে জোছনা, চোখগুলো জোছনাফুল সেই সবদিক শূন্য করে ভাসিয়ে দিচ্ছে জীবন নাম সমুদ্রের মাঝখানে। তবু একবার শেষ চেষ্টা করা যায়, অন্তত একবার মরিয়া না হলে কি দায় থেকে যায় না নিজের কাছেও?
১.
সম খুব জেদী ভাবেই এসে দাঁড়ায় রানা’র সামনে। আজ এর একটা বিহিত, হ্যাস্তন্যাস্ত করে নেয়াই প্রয়োজন। আচলে নাকের ডগা আর ঠোঁটের উপরকার ঘাম মোছে সে, এক আঙুলে একটা সুতো পেঁচাতে পেঁচাতে এসে স্টাডি রুমের বুক শেলফ টায় হেলান দিয়ে দাঁড়ায়!
-- শোনো
ঈষৎ বাঁকা ভাবে নিতান্তই অনিচ্ছায় তাকায় রানা।
-- বলো,
-- আমি একবার তাকে দেখবো !
-- কাকে (খুব আশ্চর্য হয়ে তাকায় রানা)
-- তোমার সেই তাকে
-- দ্যাখো সম ! মাঝ রাতে আমার এই যন্ত্রণা ভালো লাগছে না !
-- না, যন্ত্রণা নয়, একটিবার শুধু দেখবো তাকে আমি। তুমি নাহয় ঠিকানাটাই দাও, আমিই গিয়ে দেখে আসবো
-- একী ছেলেমানুষি? তোমার সেখানে যাবার প্রশ্নই ওঠে না,
আর বাসায় আনা তো অসম্ভব! তাছাড়া মা কে কী বলবে ভেবে দেখেছো তুমি?
-- মা কে আমি নিজেই সামলাবো, বলবো বুবুন-এর জন্য মাস্টার দেখছি ।
-- না, এটা অসম্ভব, তাছাড়া এগুলো করেও কী লাভ? আমি তো তোমাকে বলেইছি সব।
কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে সম ধীর পায়ে ফিরে আসে নিজ কামরায় । শুন্য দৃষ্টিতে এক এক করে
গুনতে থাকে দেয়ালের হোয়াইট ওয়াশের দাগ। তার কোমর ছাপিয়ে পড়া দীঘল চুল
বাতাসের সাথে খেলায় ব্যাস্ত, মনে পড়ে রোহান রাথোড়ের গান,
And the bright emptiness
In a room full of it
Is a cruel mistress

I feel this unrest
That nest all hollowness
For I have nowhere to go in the cold

And I'm so lonely
There's a better place than this
Emptiness...


২.
সব কাজ শেষে পড়ন্ত বেলাটায় কেমন অস্থির লাগে সম’র আজ। কি যেনো আশঙ্কায় বুকটা দুরদুর কাঁপছে সকাল থেকেই। হটাত হটাত বা পাশের চোখটাও কেমন করছে । বুবুন কে ঘুম পাড়িয়ে ফ্যানটা আরো জোর বাড়িয়েই বিছানায় এলিয়ে পড়ে সে। রাতের পর রাত না ঘুমোনোর
ক্লান্তি ভর করে আসে আজ এই শেষ দুপুরেই চোখের পাতায় ।
ঘুমে মধ্যেই কলিং বেল শুনতে পাচ্ছে। এই ভর দুপুরে কে হতে পারে! রানা যে আর ফিরবে না জানা কথা, তবে কে এলো!

কাজের মেয়েটা এসে জানায় এক ভদ্র মহিলা।
-- জিজ্ঞেস করে আয়, কে? কী দরকার? মা'র কাছে এসছে বোধ হয় , যা বসিয়ে মা'কে
ডেকে দে গিয়ে ।
-- না তো, নাম বলছে শারমিন। আপনার কাছেই এসছে বলছে ।
সম’র পৃথিবী দুলতে শুরু করে। শারমিন মানে তো সে’ই! সে’ই কি এলো তবে ? কিন্তু তাই বা কেমন করে হয়? রানাও তো কিছুই বলেনি এমন আসবার কথা! আস্তে আস্তে শরীরের কাঁপুনি কিছুটা কমে আসলে সে (সম) দাঁড়ায় ড্রেসিং টেবিলের সামনে। চুলে চিরুনি দিতেই বুঝতে পারছে তিরতির করে কাঁপছে হাত। লাক বড় টিপ টাও কিছুতেই ঠিক জায়গায় বসাতে পারছে না কাঁপুনিতে। আচমকাই রানা আর বুবুনের মুখ ভেসে ওঠে চোখে, নিজেকে সামলায় সে । আয়নায়
দেখা যায় অপরুপ এক সম’কে, এতো এতো অবহেলার পরেও কিছু আলো এখনো ঠিকরে বেরোয়, এখনো টিকে আছে কিছুটা জ্যোতি- এগোয় বসার ঘরের দিকে ।
- হ্যালো, ভালো আছেন!
কথা বলার শক্তি আবার হারিয়েছে সম! ফ্যালফ্যাল ছেয়ে থাকে তাঁতের শাড়ী পরা খুব গুছানো মানুষটির দিকে। গায়ের রঙ খুব চাঁপা। গোলগাল সাধারণ মুখ। বেশ পরিপাটি করেই আচড়ানো চুল, নিতান্তই খুব সাধারন এক মেয়ে। বয়সেও তার নিজের চাইতে বেশ বড়ই হবে। তবে চোখে দৃষ্টিটা বেশ প্রখর,উজ্জ্বল। কেমন যেনো খুব ছিনিয়ে নেয়া চাহনী। খুব চেষ্টার পর বলে সম ,
-- ঠিক চিনলাম না আপনাকে !
-- আমি শারমিন
--আসলে এ নামের কাউকে তো আমি ঠিক মনে করতে পারছি না ।
-- রানা ঘুমুবার আগে বলছিল আপনার কথা, আমাকে আপনিই তো দেখতে চেয়েছেন। হয় এখানে, নয়তো আমার বাড়ীতে গিয়েই!

দুলছে সম’র সব কিছু। ধীরে ধীরে ঘোলা হতে থাকে চোখের সামনে থাকা সব,
অথচ খুব স্পষ্টকন্ঠে বলেই চলছে শারমিন
-- সম, আপনি কিন্তু অসাধারণ সুন্দরী, শুধু আপনার ইচ্ছে ছিল বলেই আসতে হলো, ও ঘুমুনোর পর এলাম, যদিও রানা নিজেই বলেছে আপনার সাথে দেখা করে যেতে, বলুন কিছু জানতে চান কিনা? আজ বিকেলটা গল্প করি আমরা দুজন। আমারো রানার ব্যাপারে কিছু জানা হবে, আপনি তো পাঁচ বছর ঘর করলেন। আমি ওর মেজাজের কিছুই বুঝিনা, কখন রেগে থাকে আর কখন মন তরল।

সম’র কানে এসব কিছু যায় না, সে চিন্তা করতে থাকে কোন দিক দিয়েই যে তাকে হারাতে পারার মতো যোগ্যতা এই মেয়ের নেই, তবে কেন রানা এমন করলো!
ভাবতে ভাবতে বসার ঘরেই হটাত অজ্ঞান হয়ে যায় সম।
৩.
মুখের ওপর আলো পড়ছে, সকালের রোদ। চোখ খুলে দেখ ধবধবে সাদা সিলিং এ কি সুন্দর পেইন্ট, একটাও দাগ নেই। সারা ঘর দেখে, জানালায় তাকাতেই আবার আসাড় হয়ে আসে সম’র হাত পা। ওই তো দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে আছে একহারা মানুষটা। পরিপাটি ব্যাকব্রাশ চুল। ঘুরে তাকায়, হেঁটে আসছে কাছে। হাসছে সকালের আলোর মতোই ঝকঝক করে। হাতটা নিজের হাতে নিয়েই বলে, ‘কি হয়েছে বলো তো! এমন কেউ করে? এই যে এতোগুলো দিন এত টানাহ্যাচড়া, তবুতো আছি, আছি না?’
আমাদের দীনতার নাম অন্ধকার আর অন্ধকারের নাম কান্না। আজীবন কান্নার নামই ভালবাসা। সেই ভালোবাসাই পাশে বসে আছে হাত ধরে। বদলে গেছে সব, আরো বদলে যাবে। সেই তো জীবনের একমাত্র অপূর্ণতা ছিলো।