ছাতিম ফুলের ঘ্রাণ

ম্যারিনা নাসরীন



দুই এবং তিন পাশাপাশি ভেসে যাচ্ছে। একসাথে ওদেরকে মনে হল তেইশ। আসলে ছিল বত্রিশ। দুটো সংখ্যাই লাল কালিতে লেখা। তারপর অসংখ্য টুকরো কাগজের মিছিল। কোনটি পুরোপুরি সাদা, কোনটি কালো কালির সাত পাঁচ যোগ বিয়োগ গুণ ভাগ।
দত্ত বাড়ির এই দীঘিটি যেন নিস্তরঙ্গে ডুবে থাকা গভীর কূপ। মিশকালো পানি। আসলে কালো নয়,আলোর অভাব। অথবা হতে পারে তলদেশের কাদার ঘনত্বই বর্ণহীন পানিকে এই রঙ দিয়েছে। দীঘির প্রায় বুক অবধি ঝুঁকে আছে বিশাল বিশাল গাছ। আমার মনে হয় ওরা একেকটি বৃদ্ধ নার্সিসাস। অনাদিকাল ধরে নিজের চেহারার দিকে তাকিয়ে আছে নিস্পলক। এদের ফাঁক গলে স্বল্প কিছু সুর্যরশ্মি জলের বুকে খেলছে। নার্সিসাসকে ভাবতে গেলে কেন জানি ইকোর ভাবনাও চলে আসে। ও কি এখানে আছে? দুই করতল শঙ্খের মত গোল করে মুখের কাছে ধরি। কুউউউউ... বলে সজোরে চিৎকার দিই। শব্দেরা ফেরে না। তবে গাছে গাছে শোরগোল পড়ে যায়। এমন বোধ হলো, পাখিরা দীর্ঘকাল ঘুমিয়ে ছিল, আচমকা কোনো শিকারীর হানায় ভীত হয়ে দিক বিদিক ছুটছে।
ঘাট থেকে নীচের উনিশ সিঁড়ি অবধি পানির ওপর জেগে আছে। বাঁধানো ঘাটটি অর্ধচন্দ্রাকার। কতকাল সেখানে লোক বসে না কে জানে! ওপরে পুরু মখমলে সবুজাভ শ্যাওলা। এক কোণে দাগ টেনে লেখা ‘সামিয়া+সুজাহ’। লেখাটি সবুজের বুকে লাল হয়ে ভেসে আছে। দুদিন আগে সুজাহ লিখেছিল। সুঠাম যুবক সুজাহ। প্রাণশক্তিতে ভরপুর। অনেকের মতে বখাটে। এইচএসসি ফেল করেও বুক ফুলিয়ে বাইকে ঘুরে বেড়ায়। কবে কিভাবে পরিচয় হয়েছিল ভাবতে ভাল লাগে না । তবে ওর গতি বড় ভাল লাগে।
পানির ওপর জেগে থাকা শেষ সিঁড়িটিতে বসেছিলাম। পা দুখানা এক সিঁড়ি পানির নীচে। দীর্ঘক্ষণ ডুবিয়ে রাখার কারণে তাদেরকে ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। পায়ে রূপার নূপুর জোড়া চিকচিক করছে। আর্কিমিডিসের তত্ত্বমতে নূপুর ভাসার কথা নয়, তবুও ভাসছে, ডুবছে, হিলহিল করে নড়ছে।
কাগজের টুকরো গুলো ভেসে বেশ খানিকটা দূরে চলে গিয়েছে। এখন আর লাল কালির দুই তিন আলাদা ভাবে বুঝা যায় না। দুই তিন না হয়ে সংখ্যাটি তিন তিন হলে ক্ষতি ছিল না। তাতে অন্তত কেউ বলতে পারত না সামিয়া ফেল করেছে। প্রি-টেস্টে টপ করা ছাত্রী আমি। টেস্ট পরীক্ষায় এসে হাইয়ার ম্যাথে বত্রিশ পেয়েছি, নির্মল স্যার হিসেব মেলাতে পারছিলেন না। ক্লাসের অন্য সবার চোখে বিস্ময়। অংকে একশতে নব্বইয়ের নীচে কখনো পেয়েছি বলে মনে পড়ে না। শুধুমাত্র রিপা মুখ নিচু করে বসে ছিল। বিষয়টা রুমি স্যার এত দ্রুত আর চুপিচুপি ঘটিয়েছিলেন যে আমি আর রিপা ছাড়া এক্সাম হলের অন্য কেউ কিচ্ছুটি টের পায়নি। আমার খাতা তখন রিপার কাছে। আমি রিপার খাতায় অঙ্ক করে দিচ্ছি। স্যার এলেন, খাতার দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের মধ্যে আমাদের কারনামা বুঝে ফেললেন। কোন শোরগোল করলেন না। আমাদের হাত থেকে দুটো খাতা নিয়ে চুপচাপ চলে গেলেন। রুমি স্যার যমের খালাত ভাই। খাতা আমি চাইতে যাব? ফেল করি সে ঢের ভাল।
ক্লাস থেকে বেরিয়ে রিপা কাচুমাচু করে বলেছিল, আমার জন্য তোর এমনটা হল। খুব খারাপ লাগছেরে। তোর মা খুব বকবে, তাই না? আমি হাত নাড়িয়ে মাছি উড়িয়েছি, ধুর, বাদ দে। মাছি তো উড়িয়েছি, কিন্তু মায়ের মুখ মনে পড়তে বুকের মধ্যে ভয়ের মাগুর খলবল করে কাঁটার ঘাই মারছে। তিনি সাক্ষাৎ যম। তার ওপর খাতা কুটি কুটি ছিঁড়ে ভাসিয়ে দিলাম! ক্লাস ওয়ান থেকেই সবসময় ফার্স্ট পজিশন আমার জন্য বাঁধা ছিল। কিন্তু সাত ক্লাসে এসে থার্ড হলাম। মা আমাকে এমনভাবে বেত দিয়ে পেটালেন যে বাবা বরফের সাথে কয়েক ফোঁটা চোখের পানিও আমার পিঠে ফেলে দিলেন। এসএসসিতে রিতু পাঁচ বিষয়ে লেটার পেয়েছে আমি চার বিষয়ে। মা প্রায় পনের দিন আমার সাথে কথা বন্ধ রেখেছিলেন। সে ক’দিন দুধ ডিমও বন্ধ। এত খেয়ে যখন রিতুকে টপকাতে পারলি না, তখন খাওয়া কেন?
কলেজ ছুটির পর প্রায় দুঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। পড়া সংক্রান্ত কাজ ছাড়া এতসময় কখনো একা ঘরের বাইরে আছি আমার মনে পড়ে না। আর মায়ের অনুমতি ছাড়া? বাপরে! আমার ভেতরে কেউ একজন তাগিদ দিচ্ছে, বাড়ি চল। অন্য কেউ চোখ রাঙিয়ে বলছে, যাবে কেন মার খেতে? আমার অনুপস্থিতিতে বাড়িতে কি চলছে সেটা আর ভাবছিনা। পানির বুকে টুপ করে কিছু একটা পড়ল। বোধ হয় শুপারী। ঢেউ গুলো ছোট থেকে বড় হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। আমার অনেক গুলো ইচ্ছের মত করে।
মায়ের খুব শখ আমাকে ডাক্তার বানাবেন। তাঁর একমাত্র ছেলে বেনু হবে আর্কিটেক্ট। আর রাজিয়া আপা যেহেতু ভার্সিটিতে পড়ছে তাঁকে নিয়ে মায়ের স্বপ্ন নেই। পাশ করলে ভাল ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দেবেন। মায়ের কোন এক ডাক্তার খালাত ভাইয়ের সাথে গভীর প্রেম ছিল। তিনি শেষ পর্যন্ত মাকে বিয়ে করেননি। মা সেটারই প্রতিশোধ নিতে চান আমাকে দিয়ে। ডাক্তার হবার জন্য প্রাথমিক কাজ তিনি আমাকে প্র্যাক্টিক্যালি করাচ্ছেন। সেদিন রাতে ইঁদুরমারা কলে ধেড়ে ইঁদুর ধরা পড়েছিল। বেনু কলটি বালতির পানিতে চুবিয়ে রাখল। মা আমাকে বললেন কলের ভেতর থেকে মরা ইঁদুর ছাড়িয়ে আনতে। আমি হাতে পলিথিন পেঁচিয়ে নিতে চেয়েছিলাম। মা রাজী হলেন না। আমি ইঁদুর বের করে হড়হড় করে বমি করলাম। মা বললেল, এগুলো ভাল করে পরিষ্কার কর।
সার্জারির শিক্ষাও দেওয়া হয়েছে। ক্রিকেট খেলতে গিয়ে বেনুর পায়ে বাবলা গাছের এক বিশাল কাঁটা ফুটেছিল। আমাকে ব্লেড দিয়ে কেটে সেই কাঁটা বের করতে বলা হল। হাত কাঁপছিল। যেখানে কাঁটা ফুটেছে তার পাশে প্রায় হাফ ইঞ্চি পরিমাণ কেটে ফেললাম । এরজন্য বেনুকে টিটেনাসের টিকা দিতে হয়েছিল। সাত দিন স্কুলে যেতে পারেনি। মা খুব রেগে গেলেন, এটুকু কাটা বের করতে পার না লাশ কাটবে কিভাবে? লাশের কথায় আমি বোধ হয় একটু কেঁপে উঠেছিলাম। মনে হয়েছিল ব্লেডটা ছুঁড়ে ফেলে বলি, আমি কক্ষনো ডাক্তার হতে চাই না। বলার সাহস হয়নি। ইচ্ছেটাকে গিলে ফেললাম।
রাজিয়া আপা ছুটিতে বাড়ি এলে আমি ঢাকা ভার্সিটির গল্প শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকি। মধুর ক্যান্টিন, টিএসসি, রোকেয়া হল, চারুকলা, রমনা পার্ক। রবিন ভাইয়ার সাথে রাজিয়া আপার ডেটিং। ছবি গুলো ধীরে ধীরে মনের ভেতর এমনভাবে মনে গেঁথে গেল যে ঢাকা ভার্সিটি হয়ে উঠল আমার স্বপ্নের ক্যাম্পাস। রাজিয়া আপা বলে, এসব স্বপ্ন দেখা ছাড়ো। মা যা বলেছে তাই করো। ভাল করে পড়। মেডিক্যালে চান্স না পেলে বাড়ি আর বাড়ি থাকবে না, জাহান্নাম হয়ে যাবে।
দত্তবাড়ির দোতলা বাড়ী থেকে তক্ষকের আওয়াজ ভেসে আসছে। দীঘিটি দত্তবাড়ির পেছনে। ঘন গাছপালায় ছাওয়া বাগানের মিড পয়েন্টে। ঘাটে আসতে হলে বাড়িটি পার হয়ে আসতে হয়। বাড়ি তো নয় ভাঙা ইটের স্তুপ আর লতাগুল্মের আচ্ছাদন। একসময় কতগুলো মানুষ ছিল! বাচ্চা ছিল! পুরুষ নারী! পা টিপে টিপে জায়গাটুকু পার হতাম । বুড়ি আওয়াজ পেলে চিৎকার দিতেন, কে যাস রে? কৎবেল গুলো সাবাড় করবি? ফিরে যা বলছি। হাড় গোড় সব ভেঙে ফেলব দেখিস! নাম ছিল বিমলা দেবী। কিন্তু আমরা বলতাম দত্ত বুড়ি। প্রায় বছর দশ আগে ছেলে সুভাষ দত্ত পরিবার সহ ভারতে চলে গিয়েছেন। মাকে সাথে নেবার জন্য নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু দত্তবুড়িকে কিছুতেই রাজী করাতে পারলেন না। তাঁর একটাই কথা, ভস্ম ভেসে গঙ্গায় গিয়েছে। যাক। স্বামীর শ্মশান, ভিটে এখানেই। ছেড়ে কোথাও যাবেন না। শুনেছি প্রথম জীবনে মুসলমানদের স্পর্শ এড়াতে শাড়ি উঁচু করে দূরত্বে হাঁটতেন কিন্তু শেষ বয়সে পাড়ার আর এক বিধবা মর্জিনা বেওয়া ছিল তাঁর সবসময়ের সঙ্গী। মাঝে মধ্যে মর্জিনা বেওয়াকে বাড়ীটির আশেপাশে ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। আনমনে বিড়বিড় করে, এত্ত কিছু থুইয়া মানুষ কই যায়? দুইনাত আর ফির‍্যা আইয়ে না ক্যা? মর্জিনার আদি বাড়ি ময়মনসিংহ। কবে কিভাবে এখানে এসেছে কেউ বলতে পারে না। মর্জিনা নিজেও জানে না ।
বাইকের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। সুজাহ। আমি সিঁড়ি ছেড়ে উপরে উঠে আসি। গাছপালার ফাঁকে দ্রুত এগিয়ে আসছে ও। গায়ে লালের ওপর হরাইজন্টাল স্ট্রাইপের টি শার্ট। জিন্সের প্যান্ট। দুটোই স্কিন টাইট। হাতের পেশী ফেটে বেরুচ্ছে। আমি জানতাম তুমি এখানেই। দ্রুত বাড়ি চল। তোমার বাবা পুরো থানা, বাজার তোলপাড় করে ফেলেছেন। তার আগে বল কি হয়েছে তোমার? রেজাল্ট খারাপ? তাতে কি? টেস্ট তো বাবা! ফাইনাল নয়! চল চল!
আমি এত প্রশ্নের কোন জবাব দেইনা। বা জবাব দিতে ইচ্ছে করেনা। ওর হাত ধরে টেনে বাইকের কাছে নিয়ে যাই। বাড়ি যাব না। আজ তোমার বাইকে চড়ে ঘুরব। খুব অবাক হয় সুজাহ। অনেক পীড়াপীড়ি করেও আজ পর্যন্ত কোনদিনই ওর বাইকে আমাকে চড়াতে পারেনি। ছোট্ট মফঃস্বল শহর। প্রায় সবাই সবাইকে চেনে। মায়ের কাছে যদি খবর যায়, ঘরে পুতে সমাধি দেবে। মাঝে মধ্যে প্রচণ্ড লোভ হয়েছে ওর বাইকে চড়ে হাওয়ায় হাওয়ায় উড়ে বেড়াই। ইচ্ছেটার গলা টিপে ধরেছি।
বাজার এড়িয়ে সুজাহ বাইপাস ধরে এগোতে থাকে। আমি এক হাতে ওর বুক জড়িয়ে কাঁধে মাথা গুঁজে দেই। আমার খোলা চুল ওর মুখে মাথায় ঘুরপাক খায়। বাইকের গতি এতবেশি যে রাস্তার দুপাশের কিছু স্পষ্ট দেখি না। সবকিছু আমাদেরকে ছেড়ে দ্রুত চলে যাচ্ছে। আমার পুরো শরীরের ভর ওর পিঠে। জোড়া কবুতরের দুর্বিনীত ঝাঁপটানিতে সুজাহ একটু কেঁপে উঠল বোধ হল।
আমি চোখ বন্ধ করি। ঘটমান বর্তমানে বসে পুরাঘটিত অতীত পরিভ্রমণ করে আসি। মানসলোকে ইডেন বাগান। এমন মনে হয়, ইভ নামের প্রথম নারীটি পৃথিবীর প্রথম পুরুষকে প্রলুব্ধ করে গন্ধম বৃক্ষের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ একজন কানের কাছে বলছে, আলো ফুটুক। আলো ফুটল। আলো ভালো। আবার বলল, ইচ্ছে পূরণ হোক। হতেই হবে।
আমরা পার হয়ে যাচ্ছি। বাবা-মা, বেণু নির্মল স্যারের বিস্মিত মুখ। পাশাপাশি ভেসে যাওয়া লাল হরফের তিন, দুই। অকস্মাৎ । হ্যাঁ অকস্মাৎই আমরা থৈথৈ নীল জলের সামনে হাজির হই। বা জলই আমাদের সামনে আসে। আমি পা মেলে ঘাসের ওপর বসি। সুজাহ বসে না। খানিকটা দূরে ওর ব্ল্যাক কালারের বাইকে হেলান দিয়ে সিগারেট টানে। ওকে খুব অন্যমনস্ক লাগে।
নদীর নাম ডাহুক। এখন জোয়ার চলছে। কিন্তু তোড় কম। বিকেল এখন সন্ধ্যেমুখো। ধীরে ধীরে পুরো আকাশ কমলা হয়। নদীর বুকেও কমলা ছড়িয়ে পড়ছে ধীরে। আমি আমার দৃষ্টি ওপারে পাঠাই। সেখানে সারি সারি ছাতিম গাছগুলোকে ঝাপসা দেখাচ্ছে। সেবার ছোট খালা ঢাকা থেকে বেড়াতে এলেন। ডাহুক দেখবেন। আমরা সবাই মিলে এখানে ঘুরতে এসেছিলাম। আর একবার মেজমামা যখন বিদেশ থেকে এসেছিলেন সেই সময়। সকলে নৌকা চড়ে ওপারে গেল। ছাতিম তলায়। ছোট একটা পার্কও রয়েছে সেখানে। বেনু, আমি সাঁতার জানিনা। মা আমাদেরকে এপারে বসিয়ে রাখলেন। আমাদের পাহারায় বাবা। বেনু খুব কান্না করেছিল। আমিও কেঁদেছিলাম। ভেতরে। ছাতিম ফুলের গন্ধ শুনেছি মাদকতাময়। সেই ঘ্রাণ নিতে চেয়েছি বহুদিন । সাহস হয়নি।

সিগারেট শেষ করে সুজাহ আমার কাছে এসে বসে। আমার অলস দুখানি হাত ওর হাতে নেয়। আমার মাথাটা বুকের মধ্যে চেপে ধরে। প্রশ্রয়ের গলায় বলে, এবার বলতো তোমার কি হয়েছে? আজ তুমি এত অন্যরকম কেন? আমি প্রচণ্ড চেষ্টায় চোখ সংবরণ করে ওর বুকের আরও ভেতরে নিজেকে সেদিয়ে দেই।
চুপিচুপি বলি, আমাকে ওপারে নিয়ে যাবে? ছাতিম তলায়? ও বেশ খানিকটা সময় পর ছোট্ট করে বলে, চল।
অনেকে নৌকোয় চড়ে যাচ্ছে আসছে। জীবনে প্রথম নৌকোয় চড়া আমার। আজো সাঁতার জানিনা। সুজাহর বাহু চেপে ধরি। সাদা থোকা থোকা ছাতিম ফুল ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। আমি দৃষ্টি ফেরাইনা। বাতাসে ঘ্রাণ ভেসে আসছে। আমার নেশা নেশা লাগে।
প্রায় সন্ধ্যা। কলেজড্রেস পরা তরুণী যুবকের সাথে ছাতিম তলায় ...। ঘুরতে আসা আটপৌরে মানুষগুলো বিশেষ দৃষ্টিতে আমাকে দেখে। আমি সুজাহর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলি, ‘ধূসর সন্ধ্যায় বাইরে আসি, বাতাসে ফুলের গন্ধ, বাতাসে ফুলের গন্ধ, আর কিসের হাহাকার’।
সুজাহ আমার হাত ধরে টেনে দূরে নেয়। কি হচ্ছে এসব? চল এক্ষুনি তোমাকে বাসায় দিয়ে আসব ।
উঁহু, পড়েছ মোঘলের হাতে খানা খেতে হবে একপাতে।
উফ! সামিয়া কি হল আজ বলত?
আমাকে আজ তুমি যাত্রাপালা দেখাতে নিয়ে যাবে।
সুজাহ আমার মুখের দিকে এমনভাবে তাকায় যেন আমি তাকে ফাঁসির রায় শুনিয়েছি।
সামিয়া, এনাফ ইজ এনাফ । চল আর এক মুহূর্ত এখানে নয়। কোন ভদ্র পরিবারের মেয়ে যাত্রাপালা দেখে না।
তুমি কখনো দেখেছ সুজাহ?
আমি তো কয়েকবার দেখেছি ।
তোমার পরিবার কি অভদ্র?
কি বলতে চাচ্ছ? ভুলে যাও কেন তুমি নারী আমি পুরুষ?
উঁহু, আমি প্রলেতারিয়েত। সেই আদিকাল থেকে নারী যা। পুরুষ আলাদা জাত। বুর্জোয়া। যেমন তুমি।
তোমার মাও বুঝি প্রলেতারিয়েত সামিয়া? হাহাহাহা ।
আমি চিবিয়ে বলি, জানি না। তুমি না গেলে আমি একাই যাব। দেখতে চাই ভদ্র মেয়েরা যাত্রাপালা কেন দেখতে পারে না?
আচ্ছা সে দেখা যাবে। ছাতিমের ইংরেজি কি জান?
না, জানি না।
ডেভিলস্ ট্রি বা ভিটাবার্ক ট্রি। সংস্কৃত নাম সপ্তপর্ণী। দেখছ না ফুলগুলি সাতটি পাতার মধ্যে? এরজন্য। আর শোন, এই গাছের প্রহরী কিন্তু শয়তান। সো, সাবধান!
ওর বলার ভঙ্গীতে হাসি পায়। বলি, বাহ তুমি এত জান?
ঠাট্টা করছ সামিয়া? করবেই তো! পরীক্ষায় ফেল করা যুবকেরা কিছু জানে না, তাইনা! এখন চল যাই। সন্ধ্যা হলে শয়তান নেমে আসবে।
সুজাহ নিজের চোখ আড়াল করে ঘাটের দিকে এগোতে থাকে।
আমি দৌড়ে ওর কাছে যাই। এপ্রনের পকেট থেকে ছাতিম ফুল বের করে মুঠো ভরে ওর গায়ে ছড়িয়ে দেই । চারপাশে ঘ্রাণ ছড়ায়। ও মুচকি হাসে। হাসিতে কি ছিল? অন্ধকার হয়ে এসেছে । দেখতে পাই না।
উপজেলা পরিষদ থেকে বেশ খানিকটা দূরে খেলার মাঠ। দূর থেকে মাইক, বাঁশি, ঢোল ইত্যাদির মিশ্র শব্দ ভেসে আসছে। প্রতিবছর এখানে প্রায় একমাস ধরে মেলা চলে। হরেক রকমের দোকান, যাত্রাপালা, সার্কাস, পুতুল নাচ। দুই একবার বিকেলের দিকে মা আমাদেরকে নিয়ে এসেছেন। বেনুর খেলনা, আমার কানের টপ বা চুলের ব্যান্ড কিনে দিয়েছেন। নিজের থ্রিপিস, বিছানার চাদর ইত্যাদি। পুতুল নাচের শোরগোল, সার্কাসের বিজ্ঞাপন প্রচণ্ড টানত আমাকে । মাকে বলেছিলাম, পুতুল নাচ দেখব। মা খুব কড়া চোখে তাকিয়ে বলেছিলেন, ওগুলো ছোটলোকেরা দেখে। ছোটলোক কারা তখন বুঝতাম না, এখন বুঝি।
যাত্রাপালা রাত দশটার পর শুরু হবে। মাইকে ঘোষণা চলছে। খ্যাসখেসে কন্ঠে লোকটি বিরতিহীনভাবে বলে চলেছে, যাত্রা যাত্রা যাত্রা। হ্যাঁ ভাই হ্যাঁ, চলে আসুন। কিছুক্ষণের মধ্যে শুরু হতে যাচ্ছে ‘সুন্দরবন অপেরা’র আজকের পালা ‘চাঁপা ডাঙার বউ’। অভিনয় করবেন যাত্রা সম্রাট বিমল কর এবং সম্রাজ্ঞী নিশাত জাহান। একঝাঁক ডানাকাটা পরীর ঝুমুর ঝুমুর নাচের সাথে মঞ্চ কাঁপাবেন প্রিন্সেস রূপালী......।
যাত্রাপালা দেখার ইচ্ছে থাকলেও মায়ের সামনে উচ্চারণ করার সাহস ছিল না । বুঝতে পারছি সুজাহও আমার আজকের বিষয়টাকে মানতে পারছে না। কিন্তু আমি সে নিয়ে কিছু বলি না। স্পেশাল চেয়ারের দুটো টিকেট কেটে আমরা যাত্রা প্যান্ডেলে যখন প্রবেশ করি তখন প্রায় রাত দশটা । সুজাহ উড়না দিয়ে আমার মুখ ভাল করে পেঁচিয়ে নিতে বলল। আমি ওর অনুরোধ রাখলাম ।
খুব বড় জায়গা নয়। মঞ্চটিও ছোট। মঞ্চ ঘিরে চারপাশে কার্পেট বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। পেছনের দিকে কয়েক সারি চেয়ার। আমি আর সুজাহ পাশাপাশি চেয়ারে বসেছি। বাকী চেয়ার এখনো ফাঁকা। কার্পেটে বসে থাকা দর্শকের বেশীরভাগ তরুণ এবং কিশোর, গুটিকয় নারী। হয়ত ওদের আত্মীয়া। পোশাক আশাকে শ্রমিক শ্রেণীর। পালা শুরু হয়নি। তারা উচ্চস্বরে হৈহল্লা করছে।
মঞ্চটির তিন দিকে বাঁশ দিয়ে ঘেরা । রংবেরঙের জোড়াতালির ত্রিপলের ঝালরে লাল, নীল সবুজ মরিচবাতি ঝুলছে। নানা বর্ণের বেলুনের সাথে জরির ফিতে।
রাত এগারোটার দিকে অনেক ধরণের বাদ্যযন্ত্র একসাথে বেজে উঠল। পালা শুরু হতে যাচ্ছে। এক এক করে শিল্পীরা মঞ্চে আসতে শুরু করেছে। তাঁদের সাজ পোশাক দেখে আমি খুব হতাশ হলাম। মা থাকলে নিশ্চয় বলতেন ‘ছোটলোক’। তাঁরা সম্মিলিত সুরে জাতীয় সংগীত গাইছেন। তাল লয় সুর কিছুই ঠিক নেই। আমি আর সুজাহ’সহ আট দশ জন উঠে দাঁড়ালাম।
এদের মধ্যে প্রিন্সেস রূপালী কোনজন? আমি ফিসফিস করে জানতে চাই। সুজা¬হ চিবিয়ে বলল, আমি কি জানি?
জাতীয় সংগীত শেষ হয়েছে। মঞ্চে ‘চাঁপা ডাঙার বউ’ পালার অভিনয় চলছে। ভাই ভাইয়ের মধ্যে পারিবারিক দন্দ। প্রত্যেক আর্টিস্ট টেনে টেনে কথা বলছেন। মন্দ লাগছিল না। মাঝে মধ্যেই দর্শকদের ভেতর থেকে চিৎকার ভেসে আসছিল, এইসব ভংচং বাদ দেন । রূপালীরে পাঠান।¬
একরকম আরোপিতভাবে শুরু হল, ও লাল মেরি....। স্টেজে উদ্দাম নৃত্য চলছে। প্রিন্সেস রূপালী। স্কিন টাইট শর্ট টপস। কোমর থেকে ঝিলঝিলে ঝালরের মিনি স্কার্টে ক্রিস্টাল বল। শরীরের তুলনায় বুক বেঢপ রকমের উঁচু।
যুবকদের হুল্লোড়, আর শিষে পুরো প্যান্ডেল জুড়ে মনে হল তান্ডব চলছে। প্রিন্সেস রূপালী মাঝে মধ্যে কোমর দুলিয়ে বাঁশের ওপর ঝুঁকে পড়ছে। ওমনি যুবকেরা হৈহৈ করে ওর দিকে ছুটে যাচ্ছে। দুটাকা পাঁচ টাকার নোট ছুঁড়ে মারছে। কেউ কেউ অদ্ভুত পারদর্শিতায় ওর বুকের ওপর লেজার লাইট তাক করে আছে। লাল,নীল,সবুজ। আমি আড় চোখে সুজাহর দিকে তাকাই। ওর চোখের দৃষ্টি অন্যরকম । আগে কখনো এমন দেখিনি।
আমি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়েটির মুখের দিকে চেয়ে আছি। রাজ কাপুরের জোকার সিনেমার কথা মনে পড়ছে। এত লাল গোলাপি ব্লাশঅন লাগিয়েও মেয়েটি চেহারার বিষণ্ণতা ঢাকতে পারেনি। জোর করে টেনে রাখা হাসিতে কষ্ট ঝুলে আছে। মেয়েটিকে আমি চিনি। মোমতাজ! ওকে চিনতে আমার এত সময় লেগে গেল!
ছিপছিপে শ্যামলা মেয়ে ছিল মোমতাজ। ক্লাসে আমার পরের রোল ওর জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু সারাক্ষণ একটা বিষণ্ণতা ঘিরে থাকতো ওকে। ‘জীবনের লক্ষ্য’ গল্পে মোমতাজ সবসময় লিখত সে ডাক্তার হতে চায়। গ্রামে একটা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করতে চায়। সেখানে দরিদ্র মানুষকে ফ্রিতে চিকিৎসা দেওয়া হবে। আমাকে গল্পে গল্পে একদিন বলেছিল, দেখে নিস, মলি আপুর মত আমিও একদিন ডাক্তার হবই। এপ্রোনে মলি আপুকে কি যে মানায়! আর দেখেছিস! গলায় নল (স্টেথোস্কোপ) ঝুলানো মেয়েদেরকে কি স্মার্ট লাগে? ওর মা যে বাসায় ঠিকে কাজ করত সে বাসার মালিকের মেয়ে মলি আপু।
আমরা তখন ক্লাস নাইনে। সায়েন্স নিয়েছিল ও। কবে থেকে স্কুলে আসা বন্ধ করেছিল খেয়াল করিনি। ঠিকে ঝিয়ের মেয়ে। ওর সাথে তেমন কারো সখ্যতা ছিল না। পরে মলি আপুর কাছে শুনেছিলাম মোমতাজের মা ওকে ঢাকায় নিয়ে গিয়েছে। গার্মেন্টসে ভাল বেতনে চাকরী করে। মেধাবী ছাত্রী হিসেবে স্কুল থেকে মোমতাজকে ফুল ফ্রি স্টুডেন্টশিপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মোমতাজের বড় ভাই তখন মেডিক্যাল ভর্তি কোচিং করছে। বড় ভাইয়ের ডাক্তার হবার জন্য ছোটবোন মোমতাজের চাকরী করা জরুরী ছিল। ওর ভাইটি কি মেডিক্যালে চান্স পেয়েছিল?
দ্বিতীয় নাচের মাঝখানে আমরা বের হয়ে আসি। মূল রাস্তা দিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছি। লোডশেডিং চলছে। আকাশ ও কালো। ফলে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে নিমজ্জিত পৃথিবী। এরমধ্যে সুজাহর বাইকের হেডলাইট একটি আলোকিত সুড়ঙ্গ তৈরি করেছে। অনেকক্ষণ আমরা কেউ কোন কথা বলছি না। এবং বাড়ির সামনে পৌঁছেও আমরা কোন কথা বলিনা।
শহরটির শেষপ্রান্তে আমাদের বাড়ি। দোতালায় মায়ের ঘরে আলো জ্বলছে। তাঁর অর্থ বাবা মা এখনো ঘুমাননি। মেয়ে ফেরার, না ঘুমানোরই কথা । সুজাহ হর্ণ দেয়, জানালায় বাবার মুখ। আমি বাবার মুখের অভিব্যক্তি বুঝতে পারি না।
কিছুক্ষণের মধ্যে নীচের ঘরের মূল দরজা খুলে যায়। সুজাহ ফিরে যাচ্ছে। ওর বাইকের শব্দে সেটা আমি বুঝতে পারি। কিন্তু আমি পেছন ফিরি না।
মা লাইটের নীচে এসে দাঁড়িয়েছেন। আলোর নীচে বলেই হয়ত তাকে আবছা দেখাচ্ছে। কিন্তু আমি মাকে দেখছি না। আমি দেখছি প্রিন্সেস রূপালীকে। দুই গালে লাল ব্লাশঅন। মিনি স্কার্টের ক্রিস্টাল বলে আসহবেনীকলা। মোমতাজের ইচ্ছে ছিল ডাক্তার হবে! রূপালীর কি ইচ্ছে?
আমি মাকে পাশ কাটিয়ে ঘরে প্রবেশ করি। আমার সাথে ছাতিম ফুলের ঘ্রাণ! রূপালীর ছদ্মবেশী বুকে নাচছে হরেক রঙের লেজার বাতি- লাল, নীল, সবুজ বেগুনী...।