গল্প না-হলেও সত্যি

অনিন্দিতা ভৌমিক




দৃশ্য- এক

“And I alone with my voices – and you, so far on the other side that I confuse you with myself.”

দিনের এই সময়টা ভাঙা ভাঙা। ছিটিয়ে থাকে। যেন কতগুলো টুকরো-টাকরা মুহূর্ত খোসা ছাড়ানোর পর দূরে সরে যাচ্ছে। তবুও কোনো অস্থিরতা নেই। কানের পেছনে ভেজা চুল সরিয়ে ভাবতে থাকি আগামী শীতের কথা। ফুলের টব আর তাদের মানসিক অবস্থানের কথা। দেখি চিন্তার মধ্যেও কেমন একটা অসংলগ্নতা আসে। ঘোরলাগে। চোখ বন্ধ করে থাকি। পাশের দেওয়ালের দিকে মুখ ঘুরিয়ে খুঁজতে থাকি তার গলিঘুঁজি। অথচ কি খুঁজতে চাইছি সেটুকুও কি স্পষ্ট? এই যে লেখা, লিখতে চাওয়ার মতো কতোগুলো ইচ্ছে, তাদের ঘিরে তো একটা পাতলা পর্দা থাকে সবসময়। স্নায়ুতন্ত্র খুঁড়েও যার শেষবিন্দু পর্যন্ত পৌঁছতে পারি না কিছুতেই। বড়জোর নিজেকে বাইরের দিকে ঠেলে দিই আর চারপাশ কেমন চেনা চেনা হয়ে উঠে পুরনো দিনের মতো।
#

দৃশ্য- দুই
#
[ঘরের ভেতর আবছা আলো। চরিত্রগুলো ঘষা কাচের মতো ধোঁয়াটে হয়ে উঠছে। শুধু একটা জানলার মতো অবয়ব, নীল পর্দা, টেবিলে চাপা দেওয়া একটা কাগজের অবস্থান টের পাওয়া যায়। আমি বুঝতে পারি না এটা কার ঘর অথবা আমিই বা কে। নিস্তরঙ্গ থাকার চেষ্টা করি। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই কথা বলে ওঠে চরিত্র। প্রকাশ্য উত্তেজনার মাত্রা কম করে আমি ধীরে চরিত্রের ভেতর ঢুকে যাই…]

- তবে? এটাই তো চেয়েছিলি? এরকম একটা জীবনের জন্যেই তো বেশ কয়েকটা বছর, কতো সামাজিকতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়া, নিজেকে আলাদা করে রাখা। তাহলে এখন চিন্তার কী আছে? নাকি শিকড় গঁজিয়ে উঠলো? ভুলে যাস না যে শিকড়হীন জীবন বহন করার মতো স্পর্ধা সবার থাকে না।

- সেরকম কিছুই না। শুধু আচমকা এরকম পরিস্থিতির জন্যে তৈরি ছিলাম না। আর তাছাড়া...

- চুপ শালা! সেই এক ঘ্যানঘ্যানে বাঙালি অজুহাত... “তৈরি ছিলাম না”! তৈরি না থাকতে কে মাথার দিব্যি দিয়েছিল? ন্যাকামি যতোসব। স্বীকার কর...স্বীকার কর যে দূর্বলতা তৈরি হচ্ছে। সেই প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসের রুট ট্রিটমেন্টের কথা মনে নেই? ব্রাশ দিয়ে আস্তে আস্তে শিকড়ের সাথে লেগে থাকা সমস্ত মাটি ছাড়িয়ে নিতে হতো। বাঁচতে চাইলে তুইও তাই কর। নস্টালজিয়া কিম্বা আবেগ ওই দু-চার দিনের জন্যেই যথেষ্ট। তার বেশি হলে পুরো বালতি উপুড় হয়ে যায়। আর এই উপুড় হওয়ার আগেই টুপ করে নিজেকে সামলে নেওয়াটাই তো আত্ম-নিয়ন্ত্রণ বা সেল্ফ-কন্ট্রোল। যেখানে সুতো-ছাড়ার আর টান মারার মাত্রাবোধটা আসলে নিজের হাতেই রাখতে হয়। সচেতন হতে হয়। অসেচতনতার জন্যে তো আর কোনো পরিশ্রম লাগে না।

[বাইরে বৃষ্টি। হাওয়া। নীল পর্দাটা একবার উড়ল কিছুটা। ঝাপটা লাগলো গায়ে। ঠিক এই সময় ক্যামেরা জুম করে টেবিলে রাখা 160(M) dt. 16.08.2017 নাম্বারের চিঠিটার ওপর। এতোক্ষণে বোঝা যায় যে তা অন্যত্র বদলির নির্দেশ। একটা অন্যত্র চলে যাওয়ার সূচনা। শর্তানুযায়ী যা খানিকটা নিয়মিত। পরের পৃষ্ঠায় নতুন গন্তব্য বা ঠিকানা। আর ঠিক এই মুহূর্তে আবেগ আসে চরিত্রের। ক্যামেরা মুভ করে তার চোখের দিকে। ধীরে ধীরে সব রঙ মুছে শাদা-কালো। কিন্তু এই দু’টোও তো রঙ আদতে। চরিত্রের আর কিছু ভাবতে ইচ্ছে করে না। সে শুধু বুঝতে পারে যে বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টি পড়ছে খুব।]

- তবুও তো কখনও থেকে যেতে ইচ্ছে করে বল! যুক্তিহীনভাবে একটা থেকে যেতে চাওয়ার ইচ্ছে। একটা উঠে আসা সিঁড়ি, মেলে দেওয়া জামাকাপড়, পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া। আর একটু বাঁয়ে ঘুরলেই চাঁপা। তোর মনে আছে, আমি চাঁপাগাছ চিনতে পারিনি প্রথমে ! কতোদিন ভুল নামে ডেকেছি। আর এইসব কিছুই তো মুছে যাবে চোখ থেকে। তারপর মস্তিষ্ক ও সমস্ত নিউরোন থেকে। মনে রাখা আসলে একটা প্রক্রিয়া রে... ছবির মতো। রোজকার ব্যবহারে আমরা শুধু তার উপরের ধুলো মুছে দিই। নিয়মিত সুতগুলোর গিঁট ছাড়িয়ে সাবলীল করে দিতে হয়। অব্যবহারে যার ক্ষয় আসে। মরচে রঙের ক্ষয়। আর একটা সময় নিউরোনগুলো আর মনে করতে পারে না যে কোথাও একদিন ঠিক কি কি ছিলো।

- আবার আবেগ ! তোকে তৈরি করতে কতো কেজি আবেগ ঢালতে হয়েছিল বলতো? নিজেকে হালকা কর বুঝলি...নিজেকে হালকা কর। লম্বা দৌড়ে থাকতে হলে এতো মালপত্র নিয়ে কখনোই চলতে পারবি না। আর আবেগের আমেজ নিতে হয় আসলে। তাকে উপভোগ কর। এই যে একটু পরে ব্যাগ গোছাতে শুরু করবি, সেটাও তো একটা অভিজ্ঞতা। কয়জনের জীবনে তা থাকে ! সব তো শালা ‘যেখানে জীবন,সেখানেই মরণ’ লিখে বসে আছে। আর কিছু তথ্য নিউরোন থেকে মুছে যাবে তো নতুন তথ্যও তো আসবে নাকি! তুই ক্লাস থ্রি নিয়ে বসে থাকলে তো আর কলেজের স্মৃতি পাবি না। তাই এগিয়ে যেতে শেখ। আর মাথার মধ্যে এটা গুঁজে নে যে তুই খুব ভালো আছিস। হাতে-পায়ে-মনে-মস্তিষ্ক ে তুই হেব্বি ভালো আছিস। কেননা আমাদের এই মস্তিষ্ক খুব অদ্ভুত জিনিস রে...তুই যা বোঝাবি তাই বুঝবে। তুই অসুস্থতা বোঝা, সে অসুস্থ হয়ে যাবে। তুই ভালো থাকা বোঝা, সে ভালো থাকবে। ওই যে বললাম সুতো-টানা আর সুতো-ছাড়া দুটোই নিজের হাতে রাখতে হয়।
আর নে নে...অনেক হয়েছে...জয়েনিং টাইম কতোদিন দিয়েছে দেখ...এরমধ্যেই এখানকার সব কাজ মিটিয়ে নিতে হবে। ওঠ রে এবার মা...আর আবেগে ডুবে থাকিস না প্লিজ!
#

দৃশ্য – যদি এমন হতো...
#
উপকরণ – মৃদু ধাতব শব্দ, একজন ফেরিওয়ালার ডাক (পরিচিত)
সময় – যখন প্রতিটা সম্ভাবনাই একে অপরকে অতিক্রম করে যাচ্ছে

[পর্দা দু’পাশে সরে যাওয়ার আগেই আমরা পাল্টে নিচ্ছি সময়, অবস্থান ও প্রতিফলনের সূত্রগুলো। পরিকল্পনার বিপরীতে একটা ক্যানভাস রাখা থাকবে তখন। অতীতের মাত্রা সরিয়ে যে স্বচ্ছ হতে চাইবে। দর্শকের মুখের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলবে, উপেক্ষিত হওয়ার আগে প্রতিটা দৃশ্যেরই সত্যি হওয়ার অধিকার আছে। আর শুকনো গ্লাস হাতে তখন সংলাপের ভেতর ঘাপটি মেরে বসে থাকবেন দর্শক। সাম্প্রতিক স্বাধীনতার ভাষণের ভেতর প্রবেশ করতে চাইবেন হাঁটুমুড়ে।]




#
পুরনো জানালার কাছে ফিরে আসি আবার। দেওয়ালে টাঙানো গ্রুপ ছবি। রোজকার দিনের সেই পরিচিত আওয়াজ। কখনও রেলিং-এ ভর দিয়ে দাঁড়াই। আর দেখতে পাই আমাদের ছায়া, শুকনো পাতার গায়ে, ঘাসের আয়ুর গায়ে... ছায়া লেগে থাকছে তখন।
অনিশ্চিত জায়গা সরিয়ে দিয়ে এভাবেই থেকে যাচ্ছি আজীবন। পেছনে ঘুরি আর একটা দীর্ঘ সরুগলি। হাতে হাত ধরেই যার ভেতর ঢুকে পড়া যায়। সমস্ত চিহ্ন খুলে দেখানো যায় চোখ বুজে থাকার তাগিদ। যতক্ষণ না প্রতিটা বিন্দু ঝাপসা হয়ে উঠছে গালে।
#
“ Sad when I desire and when I don’t. Sad when with a body and when without. Sad when with a smile and without ”
এই যে কথাদের রিক্ত হয়ে ওঠা, এই যে অপরিসীম নীরবতার মুহূর্ত, এটাই তো অস্তিত্ব। চলে যাওয়ার রেখাটুকু যে বালিতে মুছে দেয়। ঠায় তাকিয়ে থাকে একটা বৃষ্টির দিনে, একটা কালো পিচরাস্তার পাশের একছটাক সবুজে। আর আমি হাত রাখি কৃষ্ণচূড়ায়। ঝিঁকিয়ে ওঠে জল। তার সদ্য লাল পাঁপড়ি খসায়। ডালপালা থেকে, আলো থেকে, মগ্নতা থেকে বলে ওঠে – একবার স্পর্শ করো নিজেকে। পার্থিব নিয়মের সীমা ছাড়িয়ে স্পর্শ করে থাকো চেতনায়। আর এটুকুই সত্য। এই শ্রাবণ দিবস, এই ছুঁয়ে ওঠার মুহূর্ত...এতোটুকুই সত্য আজন্মকাল।
-----------