ট্রিস্ট উইদ ডেস্টিনি:এ মিডনাইট জার্নি

তমাল রায়



যে কথাটা বলা হয়নি ভালো লাগছে বলতে সেই ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া ডাক বাক্সটা আবার গাঢ় লাল। সকালে খুলতেই পাখা মেলে উড়ে এলো চিঠিটা। তাহলে হারায়নি। কিছুই হারায় না। খানিকক্ষণ গন্ধ শোঁকার পর চিঠিটা খুব আস্তে আস্তে খুলেছিলো। যাতে ছিঁড়ে না যায়। ভয় হয় আসলেই। সারাটা পাতা জুড়েই তো লেখা। ছিঁড়তে গিয়ে যদি অক্ষরগুলো ছিঁড়ে যায়...গত চার পাঁচ দিন ও রাত অনবরত তুষার ঝড় গেল,কোথাও কোনো শব্দ নেই,কেবল এক নাগাড়ে সোঁ সোঁ শব্দ। ভেবেছিল পাখিগুলো সব মরেছে বোধ হয়। ওমা! পাখি ডাকছে। সে উঠলো। জানলার দিকে তাকালো। বাইরে একটা পুরু হলুদ রোদ্দুর অনেকদিন পর। গাছগুলো বরফ ঝেড়ে আবার পাতা মেলে হাসছে। পুলওভারের হাতা গুটিয়ে সে এক কাপ স্ট্রং কফি বানালো। আবার টেবিলের পাশে এসে বসলো। খুব যত্ন করে বার করে আনলো চিঠির ভেতর ভাঁজ করা ছবিটা। একটু লালচে তা হোক। ট্রামের ছবি। ট্রামের দরজা জানলায় অসংখ্য ধুতি,পাঞ্জাবি পরিহিত মানুষ। হাতে তেরঙা পতাকা। মুখে হাসি। চশমাটা নাকের কাছে নামিয়ে সে পড়তে শুরু করল।
'খোকন অবশেষে মাউন্টব্যাটেন পরাজয় স্বীকার করিয়া নিলো।'
এইটুকু পড়েই সে বাইরে তাকাতেই চোখে পড়ল,ভাঙা পামট্রির দিকে। ভাঙা কই! যেমন ছিল তেমনই তো। দিব্যি পাতা নাড়ছে হাসতে হাসতে। হালকা বাতাস বয়ে আসছে। ফিক হাসিতে মুখটা প্রসন্ন করে দিলো। পরের লাইনে গেল। ' গতকাল নেহরু আর জিন্না উভয়েই লালকেল্লায় উপস্থিত হইয়া স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করিয়াছেন। যৎকিঞ্চিত দুরত্বে পরাজিত,হতাশ মাউন্টব্যাটেন বিমর্ষ মুখে বসিয়াছিলেন।'
সে এবার পুরনো এলব্যাম খুলে বসলো। পাতার পর পাতা খুব দ্রুত উলটে যাচ্ছিল,কিন্তু সাবধানে। মোবাইলে বেজে উঠলো সারে জাঁহাসে আচ্ছা। না ফোন ধরেনি। এটা ফোন ধরার সময়ও না। একটা পাখি উড়ে এসে বসেছে তার জানলায়। তার মুখে এক অন্য আলো। চিঠির নীচে চলে গেল। একদম নীচে। 'পরমেশ্বরের কৃপায় আমাদিগের সকলি কুশল। তোমার আন্তরিক কুশল কামনা করি। ইতি-
বাবা
পুনঃ মাতৃদেবী তোমার আসন্ন আগমন কল্পনায় ছাদে বড়ি শুকাইতে দিয়াছিলেন। হনুমান আসিয়া সে বড়ির অর্ধেক নষ্ট করিয়া গিয়াছে।'
বাবা কি অদ্ভুত এক আচ্ছন্নতা! বেশী কথা তো হতনা। গম্ভীর,শিক্ষিত মানুষ। নিজের চিন্তা ভাবনাতেই নিমজ্জিত দিন-রাত। তার মনে পড়ল ছাদের কথা। বর বউ খেলতে গিয়ে চুমু খেয়ে বসেছিল মন্দিরাকে। আর মন্দিরার কি লজ্জা! পরদিন আর আসেনি। তারপর দিনও না। টেবিলের ওপরে থাকা নিউজ পেপারটা সরিয়ে রাখলো একপাশে। আজ আর বাকি সংবাদে কোনো আগ্রহ নেই।
‘লাহোর হইতে অমৃতসর,কাশ্মীর হইতে করাচী,ঢাকা হইতে কলিকাতা এই সুবিশাল একটি দেশের সুশাসন প্রকৃতই কঠিন। ইহা বিবেচনা করিয়া নেহরু প্রধানমন্ত্রী ও জিন্না উপপ্রধানমন্ত্রী পদে শপথ গ্রহণ করিয়াছেন পার্লামেন্টে।'
তার চোখের সামনে ভেসে আসছে পুরনো দিল্লির সেই রাস্তাগুলো। গোল করে ঘিরে ধরে পানিপুরি খাওয়া, ঘাসফুল থেকে ঘেঁটুফুল, শিউলিপাতার বড়া,লাউ-চিংড়ি,ঝাল ঝাল বড়ার তরকারি,
দুর্গাপূজোর অষ্টমীতে মার হাতে করা খিচুড়ি আর বেগুন ভাজা। কিছুটা পায়চারি করে এবার প্রজাপতি বিস্কুটের কৌটোটা নিয়ে সে বসে। মনে পড়ল ...ডেস্কের সামনে বসে একমনে বই পড়ছে বাবা,মা দিদিকে গান শেখাচ্ছে...মন্দিরারা শ্রীহট্টের বাসিন্দা ছিল। একে কাঠ বাঙাল তায় আঞ্চলিক টান। কথা বললেই ভেংচাতো বলে সে বলত কম,শুনতো বেশী। কিশোরী মন্দিরা ঘরের এক কোণে বসে,পায়ে তাল ঠুকতে ঠুকতে তার দিকে একঠায়ে চেয়ে। চোখে জল আসে কেন কে জানে! মাথার ভেতর বিদ্যুৎ এর মত কি যেন চমকাচ্ছে আর পাগলের মত মাথায় একের পর এক দৃশ্য ভেসে আসছে।
বিছানায় শুয়ে সে তুলে নেয় চিঠিটা আবার। ' অদ্য সমগ্র কলিকাতা জুড়িয়া আনন্দোচ্ছাস। ধনী দরিদ্র হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে আনন্দে উত্তাল। আকাশবাণীর সংবাদে জ্ঞাত হইলাম একশত নব্বই বৎসরের পরাধীনতার গ্লানিমুক্ত ভারতের ১৪০টি ইউনিয়ন প্রদেশে গতকল্য রাত্রি বারোটার সময় স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলিত হইয়াছে। কংগ্রেস নেতা,স্বাধীনতা সংগ্রামী শ্রী প্রফুল্ল ঘোষকে বাংলার দায়িত্বভার গ্রহণের অনুরোধ করিয়াছিলেন উপপ্রধানমন্ত্রী জিন্না। তিনি সবিনয়ে সে অনুরোধ প্রত্যাখান করিয়া মুসলিম লিগ নেতা সোহরাবর্দীর হস্তে দায়ভার সমর্পণ করিয়াছেন। কথা দিয়াছেন তিনি যে কোনো সমস্যায় সর্বতভাবে সাহায্য করিবেন। ভারতীয় জাতির এই আনন্দ উৎসবে সামিল হইতে শ্রী মহাত্মা গান্ধী আসিয়া উপস্থিত হইয়াছেন বেলিয়াঘাটার আশ্রমে। তোমার পত্র বহুদিন যাবৎ পাই নাই। অতএব তোমার বর্তমান শারীরিক ও গবেষণা সংক্রান্ত তথ্যাদি সম্পর্কে অবহিত করিলে তোমার মাতা প্রসন্ন হইতেন। আমার এক বাল্যবন্ধুর নিকট হইতে অবহিত হইলাম ডাকোটা যুক্তরাষ্ট্রের শীতলতম অঞ্চল। প্রভূত তুষারপাত হয়।
ডাকোটা ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ তোমায় যে বসবাস কক্ষ প্রদান কররিয়াছেন ,তাহা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কিনা জানিতে বাসনা হয়। এই সকল উদ্বিগ্নতায় তোমার মাতা অদ্য প্রভাতে স্বাধীন ভারত ও তোমার মঙ্গল কামনায় আমাদিগের গৃহে সুবচনী সত্যনারায়ণের পূজাপাঠ আয়োজন করিয়াছিলেন। এই মুহুর্তকালে আমাদিগের মির্জাপুর স্ট্রীট গৃহ সংলগ্ন পথে আপাতত পটকা সহযোগে প্রভাতফেরিতে অংশগ্রহণ করিয়াছেন অজস্র মানুষ। তোমার মাতৃদেবী সেই প্রভাতী শোভাযাত্রার সম্মুখে একটি চলমান টানা রিক্সায় বসিয়া রবি বাবুর গান গাহিতেছেন, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’,অংশগ্রহণকারী অন্যান্য গৃহের মহিলাদিগ তাহার সাথে গলা মিলাইতেছেন। ভারতীয় জাতিসত্ত্বার একজন অংশীদার হিসাবে যাহা গর্বের,এই প্রভূত উৎসবেও সমগ্র দেশে কোথাও কোনোরূপ গ্নানি দ্বেষ বা অনিষ্টের সংবাদ নেই।'
আজ, এই সকালে আর কোনো ভয়ের লেশমাত্র নেই। বরফ গলতে শুরু করেছে। কেমন জানি হঠাৎ খুব মন কেমন শুরু হয়েছে পুলওভারের ওপর উইন্ডচিটার গলিয়ে সে রাস্তায় বেরোল। হাড় অবধি কেঁপে উঠলো ঠান্ডায়। কেমন একটা ঘটাং ঘট আওয়াজ আর নীলে নীল চতুর্দিক। কিছুক্ষণের জন্য শূণ্যতা,তারপর কোথা থেকে একটা পুরনো স্টিম ইঞ্জিনের ট্রেন এসে হাজির হল। কিছু ইতস্ততার পর সে উঠে বসলো ট্রেনে। দরজার পাশেই বসে বাবা একমনে কাগজ পড়ছে। মা উল বুনছে,দিদি গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে ভারতের মানচিত্র দেখছে আর দুলে দুলে পড়ছে। দিদি জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা দিল্লী না লাহোর আমাদের রাজধানীর নাম কি?’ বাবা কেমন কটমট করে তাকালো। - ভারতবর্ষের রাজধানী আজ হইতে দিল্লি,লাহোর সেকেন্ড ক্যাপিটাল। খেয়াল করেনি মার ঠিক পাশে,একদম কোল ঘেঁষে বসে মন্দিরা! তবে যে জানত মন্দিরাকে অন্য সম্প্রদায়ের কারা যেন ধর্ষণ করেছিল,পরে সে বিষ খেয়ে...আত্মহত্যা করেনি তাহলে??? মনটা কেমন উৎফুল্ল লাগছিলো তার। রাত তখন বারোটার কাঁটা ছুঁলো, হুইসল বাজিয়ে রাত চিরে ট্রেন চলেছে স্বাধীন ভারতের মধ্যে দিয়ে। হঠাৎ পাশের কামরায় কারা যেন হইচই করে উঠলো। সামনের সেতুটা কেউ কি ভেঙে রেখেছিলো?...ঘটাং ঘট ঘটাং...
১৪ আগস্ট রাত বারোটা। দুর্ঘটনার পূর্ব বা পর জানা যায় না,দুর্ঘটনা আদৌ কি ঘটেছিল? জানা যায় না। মণিবন্ধে কেবল বন্ধ ঘড়িটা আবার চলতে শুরু করেছে....

আর,আপাতত স্বাধীনতার পক্ষকাল পর লুকনো ইচ্ছেগুলোর পূরণ হওয়া,বা আসন্নতা বা সম্ভাবনার কিছু কথা কবিতা ও কথকথা নিয়ে ঐহিক অনলাইন হাজির হল পাঠকের দরবারে। দরবারি কানাড়ায় এখন ইচ্ছেপূরণের সুর। তার,তাহাদের কথা না হয় পরে কখনও আবার বলা যাবে।