ছায়া, এ কিসের ছায়া..

মেঘ অদিতি



" ছড়াও তোমার ডানা আমি মুগ্ধচোখে দেখি তোমার ডানার বিস্তার"

অলস এক দুপুর। বিশাল ছাতিমের পাতা ছুঁয়ে ডালে নেমে এসেছে প্রাপ্তবয়স্ক রোদ।
আর অজস্র পাখি ডেকে চলেছে।

ঘোর নামা চোখের পাতায় হয়ত সন্ধ্যা তখন। সময় থমকে আছে তপ্ত কপালের কুঞ্চনে, ভ্রূ থেকে বন্ধ চোখের পাতায়, কান থেকে কপোলে আর জল সরছে দ্রুত। আলো জ্বলছে। আলো নিভছে। কেউ কানের কাছে ফিসফিস করে কথা বলছে। পারদ আর ঘড়ির কাটার সম্পর্ক গাঢ় হয়ে উঠছে। চেতন-অচেতনের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে একটা পালতোলা নৌকো। দুপাশের জলরাশি ফুলে ফুলে উঠছে। কী করে তখনই আমার হাত ধরে কেউ বলে, শুক বল বা সন্ধ্যা, ডাক নামে একটি তারাকেই আমি চিনি। সে তুমি।

চমকে দেখি অলৌকিক সে সন্ধ্যায়, অল্প দূরে সুবর্ণরেখার জল। ঢালের দিকে ঘাসের বিছানায় আমি শুয়ে। ঢাল বেয়ে কিছুটা নেমে সূর্যাস্তের শেষতম মুহূর্ত ধারণ করতে যে এখন সুবর্ণরেখাকে ছুঁয়ে তাকে দূর থেকে মনে হয় সুবর্ণরেখারই একান্ত পুরুষ। চারদিকে সন্ধ্যার কী প্রবল আবাহন। ধ্যানী সুবর্ণরেখায় দূর থেকে নেমে আসছে সান্ধ্যকুয়াশা। জল ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে উঠছে।

তারপর সন্ধ্যা আসে। বহুদিন না দেখা তার হাত ছুঁয়ে এক গোলগাল মায়াবী চাঁদের জন্য আমিও অপেক্ষা করি। এক অনন্ত অলৌকিক ভাস্কর্যের সর্বাঙ্গে ঝরে পড়ে কোমল কোনো সুর। আর দীর্ঘ নিরুচ্চার চুম্বনের মতো নেমে আসে নির্জন রাত।



"কাল রাত্রিবেলার স্বপ্নে দু একটা সাদা পালক ছিলো। দু একটা নীল পালক।"

র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট। অন্ধতার গাঢ়তর সন্ধ্যা থেকে রাতের দিকে পাশ ফেরা। একটা যন্ত্রণা ঠোঁটের কুঞ্চনে এসে থেমে থাকে। টুপটাপ কিছু জল ঝরে। কপালে কেউ শীতল হাত রাখে। সে হাত ধরেই পেরিয়ে যেতে চাই সুবর্ণরেখা।

এসে দাঁড়াই ফুলডুংরির প্রথম ধাপে। ছায়াঘেরা মায়াবী ফুলডুংরি, পাহাড় হতে চেয়ে থমকে কেন যে টিলা হলে তুমি! এই এক জায়গা কেন আমায় বারবার টানে। বুনো গুল্মের গায়ে চাঁদের আলো আসে। সে আলোয় আলো মেখে কেউ লিখে চলে ইচ্ছেপুরণের কথা। লতাগুল্ম পেরিয়ে আমি তাকে ছুঁতে চাই। চাঁদের আলো কমে আসে। বিঁধে থাকে একটা দুটো চোরকাঁটা আমার অন্ধ চোখের ভাঁজে।

অবশ স্নায়ুতে জলের দাপট বাড়ে। এখন কি অনেক রাত? একটা অদ্ভুত ফ্যাকাশে সবুজ আলো আমার চোখের ওপর ফেলে জল ছপছপ মেঝেতে কেউ হাঁটে। ফ্যাসফ্যাসে গলায় কে ডাকে ইকথিয়ান্ডার.. শ..স..স..! ইকথিয়ান্ডার! কোথায় তুমি!

শ্যাওলা জলজ গন্ধ হাওয়ায় মিলিয়ে ঘরময় পড়ে থাকে ছড়ানো পালক।


“চারদিকে ভাঙা কাচের টুকরো আর ক্ষয়ে যাওয়া মুখ”

কে আমাকে টান মেরে জল থেকে এনে ফেলে ডাঙ্গায়। চারপাশে ছড়িয়ে ভাঙা কাচের টুকরো। ছেঁড়া এক পাটি জুতো। বিচ্ছিন্ন শরীরের অঙ্গ এদিকসেদিক। চারদিকে ধ্বংসের ছিন্নভিন্ন চেহারা। বেলাভূমিতে শুয়ে ছটফট ছটফট করি। আমার শ্বাস কমে আসে। আর চারপাশ কী দ্রুত বদলে যায়। একটা ছায়া আমার দিকে এগিয়ে আসে। সামান্য ঝুঁকে আমায় দেখে। আমার বাড়িয়ে দেওয়া বিপণ্ণ হাত সে ধরতে চায় অথচ ধরতে পারে না।

কেবল কাছ থেকে ছায়া সরে দূরে দূরে যায়।

কানে ভেসে আসে, 'যে বিকেলে জ্বর আসে সেই বিকেলের মতো তুমি এসে দাঁড়িয়ে রয়েছো। ঘড়ির ভেতর দিয়ে রক্তের রেখার মতো সময় চলেছে'।

সময় চলতে থাকে রক্তরেখার মতোই। আমি ভেসে যাই, ভেসে যেতে থাকি জলের ঘূর্ণির ভেতর। আকাশ ছাড়িয়ে আরও বহু দূরে...

ছাতিমগন্ধী বাতাসে মিশে থাকে ডেটলের মৃদু গন্ধ।


কবিতার পঙক্তি : ভাস্কর চক্রবর্তী