আত্মজের মুখ

শীলা বৃষ্টি



প্লাস্টিকের জানলা খুলে কোকিলটা পরপর তিনবার ডেকে উঠলে রাশেদ অনিচ্ছায় উঠে বসে। ঘড়ির কাঁটায় চোখ যাওয়ার আগে সেগুলো এক পলক স্থির হওয়ার চেষ্টা করে কুঁড়েঘর সদৃশ এলার্ম ঘড়ির উপরে। পাখিটিকে দেখা যায় না, জানালা খুলে কর্তব্য পালন করে সেটি আবার লাগিয়ে দিয়েছে সে। আবার তার কর্তব্য বুঝিয়ে না দিলে সে আর জানালা খুলবে না। এবার সময়ের দিকে চোখ যায় রাশেদের। তা দেখে সে নিশ্চিত হয় যে তার ঘুম ভাঙানোর জন্য ডাকটি কোকিলের প্রথম কু.... ছিল না। এক লাফে বিছানা ছাড়ে রাশেদ, দেড় লাফে বাথরুমে ঢোকে।
"অলরেডি আধাঘণ্টা লেইট!" বিরক্তিভরে ভ্রু কুচকায় তরুণী। হাতে ধরা অস্থির শিশুটিকে সামলানোর জন্যে তার দিকে একটু নীচু করে শাসনের চোখে সে এক পলক তাকায় । তারপর আবার ঘুরে দাঁড়ায় রাশেদের দিকে।
"মনে থাকে যেন সময় একটাই। এর বাইরে যদি কিছু পাওয়া যায় সেটা হবে বাড়তি পাওনা, তবে সেটা নির্ভর করবে রাস্তার জ্যামের উপর।" এখানেও ঝুমি নামের তরুণীটির কণ্ঠে শাসনের কমতি নেই।
"আপনার অনেক দয়া ম্যাডাম!" কথা ক'টি ঠোঁটের আগায় এলেও সেটাকে জিহ্বার ধাক্কায় পেছনে ঠেলে দেয় রাশেদ। চোখ তুলে অংকুর নামের পাঁচ বছরের শিশুটির দিকে তাকায়। শিশুটির এক হাত এখনও তরুণীর মুঠোয়। ছেলেটি সেভাবেই জিরাফের মত গলা বাড়িয়ে ইতিউতি তাকাচ্ছে। ঐ তাকানোই সার। ঝুমি খালামণিকে ফাঁকি দিয়ে কোথাও যাওয়ার সাহস ওর নেই। শিশুটি তার খালামণিকে কিছুটা তার মায়ের মতোই ভয় পায়।
"বাবাকে একদম বিরক্ত করবে না!" এই বলে শিশুটিকে শেষবার শাসিয়ে ঝুমি নামের মেয়েটি পেছন ফেরে, তারপর এগিয়ে যায় লিফটের দিকে। মেয়েটির অনেক তাড়া! রাশেদ এমনিতেই তাকে অনেক দেরি করিয়ে দিয়েছে আজ। ঝুমির ছেলেবন্ধুকে গতবারও অপেক্ষা করতে হয়েছে রাশেদের কারণেই। আজও রাশেদের একই রকম অবস্থা।
ছেলের হাত ধরে ছিল এতক্ষণ রাশেদ। খালামণি চোখের আড়াল হতেই অংকুর দৌড়ে যায় খেলার জায়গাটার দিকে। ছুটন্ত ছেলের দিকে তাকিয়ে রাশেদ ভাবে রুমকি কি জানে তার বোন যে প্রতিবার ছেলেকে রাশেদের কাছে দিয়ে ছেলেবন্ধুর সাথে সময় কাটাতে যায়? নিশ্চয় না। এটা রাশেদেরও জানার কথা নয়, সে শুধু আন্দাজ করে মাত্র। এটা রুমকি জানলে কী কাণ্ড ঘটাবে সেটার একটা চিত্রকল্প সাজানোর চেষ্টা করতে গিয়েও বাদ দেয় সে, অর্ডার দেওয়া জরুরি। দুপুরে বলতে গেলে কিছুই খাওয়া হয়নি। মানিব্যাগ বের করে চেক করে রাশেদ।
এক ঝাঁক রঙিন বলের মাঝে সাঁতার সাঁতার খেলে উঠে বসে অংকুর। তার পাশের গাবলু টাইপ প্রতিযোগী খেলায় বিরতি দিয়ে বাবা-মায়ের ডাকে খেতে গেছে। পছন্দসই আর কোনও প্রতিযোগী খুঁজে না পেয়ে সে বলগুলো নিয়ে লুফালুফি করতে করতে আড়চোখে বাবাকে দেখে। বাবা ভদ্রলোকের ব্যাপারস্যাপার সে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। কী কারণে যে ইনি তার পেছনে এত টাকা খরচ করেন! কই, তেমন কোনও কথাও তো সে বলে না তার সাথে। অবশ্য কথা বলার সুযোগ অংকুর তাকে দিলে তো! বেচারা রাজ্যের খাবারের মধ্যে একাএকা বসে মেন্যু কিংবা সাথে থাকা কোনও বইয়ের পাতা উল্টায়। মাঝেমাঝে ঠান্ডা হয়ে আসা কফিতে চুমুক দেয়, কখনও কখনও খেলতে থাকা অংকুরের দিকে তাকায় অবশ্য কিন্তু তাতেও বাবাসুলভ কোনও আহ্লাদের আভাষ থাকে না। হঠাৎ হঠাৎ অন্য খেলার সাথিদের সাথে অংকুর ঝামেলা না বাঁধালে বাবা খয়েরি বার্নিশ করা চেয়ারগুলো ছেড়ে ওঠেও না তেমন। তবে অংকুর সবচেয়ে মজা পায় পার্কে। একবার তো ওখানকার ঝুলকালি মাখা শিশুগুলোর সাথে একটা কদবেলের খোসাকে বল বানিয়ে এমন হুল্লোড় শুরু করেছিল যে পার্কের দাড়োয়ান শেষ পর্যন্ত সেই বাচ্চাগুলোকে বের করে দিতে বাধ্য হয়েছিল।
খাবার দিয়ে গেলে ক্লাব স্যান্ডউইচ নয় কিটক্যাটের লোভে অংকুরকে রেস্টুরেন্টটির শিশু-স্বর্গ নামক কিম্ভুত খাঁচাটি থেকে বের করা গেল। অংকুর স্যান্ডুইচ চিবুতে শুরু করলে রাশেদ জিজ্ঞেস করে, " তুমি যে আজ এখানে আসবে সেটা মা জানে?" অংকুর তার জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে, "মায়ের নাম্বারটা কি আছে তোমার কাছে?"
কী বলবে ভেবে পায় না রাশেদ। হাতে রাখা "পারস্যের রূপকথা" নামের বইটা টেবিলের মাঝে রেখে বলে,"আগামীবার আসার আগে এর সবগুলো গল্প পড়ে শেষ করবে।"
"নানা বলে এগুলো পড়া নাকি ভালো না, এগুলো নাকি আউটবই?"
রাশেদ কিছু বলে না। খিদে ছিল প্রচণ্ড। এখন সেটির অস্তিত্ব টের পাওয়া যাচ্ছে না। সে কফিতে চুমুক দেয়। টেবিলে অবহেলায় পড়ে থাকেন পারস্যের আমীর-ওমরাহগণ। রাশেদ কিংবা অংকুর দু'জনেরই কারোরই সেদিকে মনোযোগ নেই। একজন স্যান্ডুইচ থেকে চিজ ফেলতে ব্যস্ত আরেকজন কিছু করার খুঁজে না পেয়ে কফির মগের অলঙ্করণের ভাবোদ্ধারে মনযোগী।
"বাবা তুমি নাকি দোজখে যাবে?" ঠান্ডা স্প্রাইটে চুমুক দিয়ে নির্দয়ের মতো বোমাটি ফাটায় অংকুর।
"কে বলেছে?"
"নানু বলেছে। তুমি যে নামাজ পড়ো না তাই।"
"মাও কি তাই বলে?"
"হুম। তবে মা বলেছে আমি যদি তোমার সাথে কম কম দেখা করি তাহলে তুমি বেহেস্তে যাবে।"
"তুমি চাও আমি বেহেস্তে যাই?"
উপরনীচ মাথা ঝাকিয়ে বাবা বেহেস্তে যাক এটা যে সে চায় সেটা জানায় অংকুর। পরক্ষণেই হতাশভঙ্গিতে বলে ওঠে," কিন্তু, আমি মনে হয় তোমাকে বেহেস্তে পাঠাতে পারব না। তোমার সাথে কম দেখা হলে তো আমার বাইরে খেলাই বন্ধ হয়ে যাবে। মা তো ঘর থেকেই বের হয় না।"
স্বর্গ-মর্ত্যের নাগরদোলায় দুলতে থাকা শিশুটির দিকে তাকিয়ে থাকে রাশেদ। ছেলেটির মায়াভরা ফর্শা মুখটি কমলা রঙের গেঞ্জি যেটি Kid's নামক ট্যাগের আভিজাতিকচিহ্ন নিয়ে মহিমান্বিত তার ভেতরেও তার দারিদ্র্য ঢেকে রাখতে পারে না।
গ্যাসচেম্বারে পরিণত হওয়া সেগুনবাগিচার দোতলা বাড়িটি থেকে রাশেদের মুক্তি মিলেছে ঠিকই কিন্তু এই ছোট্ট শিশুটিকে তার বলি দিতে হয়েছে। রাশেদ কি স্বার্থপর? নিজেকে প্রশ্ন করে সে। হ্যাঁ, সে স্বার্থপর। নিজের স্বাধীনতার জন্য ছেলের বাঁধনও তাকে আটকে রাখতে পারেনি।
কেমন থাকে অংকুর তার মায়ের কাছে? নানা-নানুর কাছে? অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলটায় কি তাদের কৃষ্ণমোহন হাই স্কুলের মতো অত বড় মাঠ আছে? নানাবাড়ির ছোট্ট বারান্দায় সাইকেল চালিয়ে কি অংকুর সেই আনন্দ পায় রাশেদ যেমন পেত বডদিঘির পাড়ের মেঠো সেই পথটায়?
বহুবিস্তৃত ভাবনার মাঝে একবার করে ঘড়ি দেখে রাশেদ। বেলা প্রায় পাঁচটা। কী মনে করে উঠে দাঁড়ায় সে। অংকুর স্ট্র মুখে নিয়ে টেবিলে পড়ে থাকা স্প্রাইটে ফোঁত ফোঁত টান দিয়ে বুদবুদ ফোটানোর চেষ্টা করছিল। রাশেদ ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে, "নতুন এক জায়গায় খেলতে যাবে বাবা? অনেক পাখি, গাছ আর দোলনা আছে সেখানে। প্লাস্টিকের না সত্যিকারের!"
"সত্যি! "
"হুম, সত্যি!"
"ছাগলছানা আছে? পাপনদের গ্রামের বাড়িতে যেমন থাকে তেমন?"
"পাপন কে?"
"আমার বন্ধু। আমার সাথে স্কুলে পড়ে। ওদের গ্রামে নাকি রাজহাঁস আছে ইয়া বড় বড়।" অংকুর দুহাত মেলে কল্পিত রাজহাঁসের আয়তন বোঝাতে চায়। তারপর প্রশ্ন ছুঁড়ে," বাবা তুমি রাজহাঁস দেখেছ?" তার চোখে নির্ভেজাল কৌতূহল।
"হুম! যেখানে যাব সেখানে রাজহাঁসও থাকতে পারে। চলো যাই।" বলে রাশেদ ছেলের হাত ধরে। প্রি-পেইড রেস্টুরেন্ট বিধায় এখন আর বিল দেওয়ার ঝামেলায় যেতে হলো না তাকে। রেস্টুরেন্ট থেকে রাজকীয় ভঙ্গিমায় বের হলেও বাইরে এসে থমকে যায় রাশেদ। প্রায় সন্ধ্যা। এই বেলায় প্রকৃতির মাঝে ঘুরতে যাওয়ার লোভ দেখানো বড় রকমের বোকামো হয়েছে টের পায় সে। তাছাড়া অবিরত চূর্ণ হতে থাকা কাঁকড়ের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন এই শহরে রাজহাঁস পাবে কোথা সে! হঠাৎ আসা আবেগ তাকে এমন বেহাল অবস্থায় ফেলবে আগে টের পায়নি রাশেদ। এখন ছেলেকে ফুল-পাখি, রাজহাঁস আর ছাগলছানার মাঝে খেলতে না দিতে পারার বেদনা ভোলানোর মন্ত্র জানা নেই তার। ও দিকে অধৈর্য হয়ে বাবার হাত ঝাঁকায় অংকুর। কী করবে এক মুহূর্ত ভাবে রাশেদ। অতর্কিতে হামলা চালানো একটা বোলতার মতোই ভাবনাটা হুল ফোটায় তার মগজে। আচ্ছা, অংকুরকে নিয়ে বহু দূরে কোথাও চলে গেলে কেমন হয়! যেখানে রুমকিরা ওদের খুঁজে পাবে না! সুনামগঞ্জে বর্ডারের কাছে বাহাউদ্দিনের একটা অফিস কাম বাসা আছে যেখানে বসে সে ভারতের কয়লা আমদানি সংক্রান্ত বাণিজ্যগুলো চালায় বাহাউদ্দিন। বিস্তীর্ণ হাওড় দেখার আমন্ত্রণ ছিল একসময় তার। পারিবারিক আবহাওয়া অনুকূলে ছিল না বলে রাশেদ কখনও উৎসাহ পায় নি। কিছুদিন আগে বাহাউদ্দিন তাকে সেই অফিসটার দায়িত্ব নিতে বলেছিল। প্রস্তাবটি লোভনীয় হলেও রাশেদ হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিল সে কথা। নিজের অবস্থান নিয়ে মাঝেমাঝে বিব্রত থাকে সে, কিন্তু বন্ধুত্বের মাঝে এই ধরনের লেনদেন তার কাছে আরও বিব্রতকর। কিন্তু অংকুরকে নিয়ে লুকানোর এর চেয়ে চমৎকার জায়গা আর নেই এই দেশে!
লুকানোর এই কর্মযজ্ঞ কোথা শুরু করে কোথায় শেষ করবে তা মনে মনে সাজায় সে। ভেতরে ভেতরে এক ধরনের রোমাঞ্চ অনুভব করে সে। ফুরফুরে মেজাজে সে অনুভব করে, একবার ঘরে যাওয়া প্রয়োজন তার। দরকারি কিছু জিনিশ নিয়ে বাহাউদ্দিনের বাসায় গেলেই হলো। তার আগে অংকুরকে কোনও একটা রেস্টুরেন্টের খেলনা খাঁচায় আটকে যেতে হবে। বাহাউদ্দিনকে সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। ফেরার পথে ছেলেকে তুলে নিলেই হলো। যতদূর জানে ঢাকা-সুনামগঞ্জ করে এখনও অফিসের কাজ বাহাউদ্দিনই চালাচ্ছে। উত্তেজনায় ঘাম ধরে রাশেদের। অধৈর্য ছেলেকে শান্ত করতে ইতিমধ্যেই তার হাতে একটা কিটক্যাট দেওয়া হয়েছে। কলাবাগান ফার্স্ট লেইন বলে একটা রিকশা ধরতে যাওয়ার আগে তার মনে হয় বাহাউদ্দিনকে আগে একটা ফোন দেওয়া দরকার। দুইবার রিং হওয়ার পর বাহাউদ্দিন ফোন ধরে। রাশেদের আগ্রহের কথা শুনে একটু যেন দমে যায় সে। বলে, "আচ্ছা দোস্ত আমি তোকে সপ্তাহখানেক পরে কনফার্ম করতেসি।" তার যে আজকের মধ্যেই ঢাকা ছেড়ে গেলে খুব উপকার হয় সেটি রাশেদ বন্ধুকে নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে। উত্তরে বাহাউদ্দিন যা জানায় তা রাশেদের জন্য আজকের প্রেক্ষাপটে মর্মান্তিক! রাশেদের অনিচ্ছার কথা জেনেও বহুদিন বাহাউদ্দিন অপেক্ষা করেছে। কিন্তু গত মাসে তার এক মামাতো শালাকে ওই দায়িত্বটি দেওয়া হয়েছে। এখন তাকে সরাতে হলে অন্য কোথাও কোনও একটা ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এ-জন্যে কিছু সময় দরকার।
অত্যন্ত যৌক্তিক কথা। বাহাউদ্দিন কথা দিয়ে কথা না রাখার মতো ছেলে নয়। বাহাউদ্দিনের কথায় সম্বিৎ ফিরে পায় রাশেদ। কী করতে যাচ্ছিল সে! ছেলেকে আজীবন নিজের কাছে রাখা, প্রকৃতির প্রাচুর্যের মাঝে বেড়ে তোলা টাইপ ছেলেমানুষি বিলাসী চিন্তা তার মাথায় কীভাবে এল এ ভেবে অবাক হয় সে। নিজের উপর বিরক্ত হয়ে রিকশা ডাকতে যায় সে। রিকশা যাবে ধানমন্ডি মাঠ। ওখানে অংকুর লাফাতে পারবে খানিক। বেলার দিকে চেয়ে সেটাও বাদ দিতে হলো। শীতের বেলা, অল্পেই পড়ে যায়। যেতে যেতেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে। তাছাড়া আর ১৫/২০ মিনিটের মধ্যেই ঝুমি তার বোনপোকে নিতে আসবে এখানেই। সে ঘুরে আবার রেস্টুরেন্ট বরাবর চলে যায়। একটু খেয়াল করলেই পেছন থেকেও অনায়াসে বোঝা যাবে তার উদ্যোমহীন ক্লান্ত ভঙ্গিটি। সামনে থেকে তার লজ্জিতভাবটাও নজর এড়াবে না। ফালতু আবেগের এমন আজগুবি একটা চিন্তাকে মাথায় স্থান দেওয়ায় নিজের উপরই বিরক্ত হয় সে! ছেলের প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হতে হতে লিফট বরাবর এগিয়ে যায় রাশেদ।
লিফটে উঠে বাবার আগেই তিন নম্বর বোতামে চাপ দেয় অংকুর। লিফটে তারা ছাড়া আর কেউ নেই দেখে অংকুর লাগামছাড়া। বাবা বাঁধা না দিলে পারলে সবগুলো বোতামই একবার করে চেপে দিত সে। মাথাপাগলা বাবাটার কারবার সে বোঝে না ঠিক। শুধু শুধু অন্য খেলার জায়গার নাম করে এতক্ষণ সময় নষ্ট হলো। খালামণি একটু পরেই এসে পড়বে, টিশন নামের গাবলু ছেলেটাও এতক্ষণে চলে গেছে নিশ্চয়! গাবলুটার সাথে খেলে অনেক মজা, যতই ওর গায়ে লাল-নীল বল ছুঁড়ে মার না কেন একটুও রাগ করে না। উলটো রা-ওয়ানের সেই রোবটের মতো ভিলেন মার্কা হাসি দেয় হো হো করে।
তিন তলায় এসে লিফটের দরজা খুলে গেলে বের হয়ে আসে তারা। পরক্ষণেই ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ছেলের হাত শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে যায় রাশেদ। জায়গাটা কোথায়? এখানেই তো কুইক বাইটের কাচের দরজাটা থাকার কথা ছিল! কিন্তু তার বদলে তার সামনে টিপটপ ঝকঝকে এক উঠোন। প্রচুর গাছপালা। এ কোথায় এল সে? লিফটের তিনেই কি চাপ দিয়েছিল অংকুর! এমন জায়গা এই ভবনের কয় তলাতে! আশেপাশে প্রচুর গাছ থাকলেও উঠোনে একটি পাতাও পড়ে নেই। ঝিরঝিরে বাতাস পাশের জলাধারের উপস্থিতির আগাম বার্তা দিচ্ছে। অবশ্য এ-সবের কোনও কিছুই উপভোগ করার অবস্থা বর্তমানে রাশেদের নেই। অংকুরকে এই অচেনা জায়গার ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে এর মধ্যেই তাকে সে কোলে তুলে নিয়েছে। কিন্তু অংকুরের ভাব উল্টো। বাবা প্রতিশ্রুতি রেখেছে বলে আনন্দিতচিত্তে এঁকেবেঁকে নেমে যেতে চাইছে বাবার কোল থেকে। সামনের হলদেটে পাতার গাছটার নীচে একটা ছাগলছানা তারস্বরে চেঁচাচ্ছে, বাবার কোলের আরামদায়ক আশ্রয়ের চেয়ে ছাগলছানাই তার কাছে দুর্মূল্য। হতভম্ভ রাশেদ শক্ত হাতে ছেলেকে সামলে লিফটের দিকে ঘুরে যায়। এই অদ্ভুতুড়ে জায়গা থেকে মুক্তির একমাত্র দরজা ওটাই। কিন্তু ঘুরে গিয়ে থমকে দাঁড়াতে হয় তাকে। কোথায় সে লিফট! যে জায়গায় ওটা থাকার কথা ওখানে ছিমছাম একটা কুঁড়ে এমন আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে যেন প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই তার অবস্থান ওখানে। লিফটের দরজা যেখানে থাকার কথা সেখানটায় কুঁড়ের দরজা। প্রায় সব পরিস্থিতিতে নিজেকে শান্ত রাখার একটা অসাধারণ গুণ নিয়েও রাশেদ টের পায় ভয়ের একটা অন্ধ সাপ তার ঘাড় বেয়ে এঁকেবেঁকে নেমে যাচ্ছে। যে দুপুরে গ্রামের বাড়ির বিছানায় ঘুম ভেঙে পুলিশ তাকে তার বাবা-মা সহ গ্রেফতার করছিল রুমকির দেওয়া মিথ্যা মামলায়, সেই কাঁচাঘুমভাঙা দুপুরেও রাশেদের অবস্থা এমন দুরবস্থা ছিল না। অবাক হয়েছিল রুমকির অধঃপতনে কিন্তু এমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় নির্ঘাত হয়নি।
রাশেদ দৌড়ে যায় কুঁড়ের দরজা বরাবর। আঁতিপাতি করে একটা ধাতব দরজা খোঁজে সে। ওটি আর পাওয়া যাবে না এই বিশ্বাস তার নেই। বারবার চেষ্টা করেও যখন দরজার খোঁজ মেলে না তখন রাশেদ কুঁড়ের দরজায় প্রচণ্ড জোড়ে একটা লাথি মারে ভয় আর রাগের মিশ্র প্রতিক্রিয়া সরূপ। যদিও প্রতিক্রিয়া দেখার মতো আপাতত অংকুর ছাড়া আর কেউ সেখানে নেই।
বাবার কাণ্ডে অংকুর ভীষণ বিরক্ত হয়। এই বাবাকে চেনে না সে। এমন করছে কেন বাবা? কী সুন্দর বিকেল, কত গাছ, পাখি। এর মধ্যে তাকে খেলতে না দিয়ে তাকে এমন কোলে চেপে রাখা কেন! এইবার সে জোড় করেই নেমে যায় বাবার কোল থেকে। রাশেদ ডান হাত দিয়ে দ্রুত ছেলেকে আটকায়; এই ম্যাজিকের দুনিয়াকে এক ফোঁটাও বিশ্বাস করে না সে। দেখা যাবে অংকুরও উধাও হয়ে গেছে পলকে। দুরন্ত শিশুটিকে সামলাতে সামলাতে পকেটে হাত দেয় রাশেদ। মোবাইল ফোনের কথা তার হঠাৎ মনে পড়েছে। কেন এতক্ষণ এটার কথা তার মাথায় আসেনি ভেবে নিজের জন্য লম্বাচওড়া একটা গালি তৈরি রাখে সে পরে দেওয়া যাবে ভেবে। ফোনের অস্তিত্ব তার বুকে হঠাৎ করেই সহস্র সিংহের সাহস এনে দেয়। পুলকিত চিত্তে ফোন হাতে নিলেও মুহূর্তেই দমে যায় সে। নেটওয়ার্কের সিগন্যাল দেওয়া জায়গাটায় কোনও দাগ নেই। দাগগুলো পাওয়ার আশায় তার ফোন ঝাঁকাঝাঁকি, ছোটাছুটি, অফ-অন জাতীয় যাবতীয় ক্রিয়াকৌশল শেষ হলে হাল ছেড়ে কুঁড়েঘরের খড়ের বিছানায় বসে পড়ে রাশেদ। এইবার বাবার হাত ফাঁকি দিয়ে এক ছুটে পালিয়ে যায় অংকুর। সে একটি কাঁঠালগাছ দেখেছে। তার বদ্ধমূল ধারণা হয়েছে দু-একটা কাঁঠালপাতা উপহার পেলেই বন্ধুত্বের হাত বাড়াবে ছাগলছানাটি। খড়ের বিছানায় পা মেলে বসেছে রাশেদ। এই উদ্ভট জায়গায় আগমনের হেতু নিয়ে ভাবিত সে, চোখের পলকে চেনা পৃথিবীর এমন ভোজবাজির মত উধাও হয়ে যাওয়ায় স্তম্ভিত-ভাব এখনও কাটেনি তার। তার উপরে ফোনের নেটওয়ার্ক সম্পৃক্ত জটিলতার কারণে এর সাথে নবযোগ ঘটেছে আতঙ্কের। এই জায়গা থেকে মুক্তির নিশ্চয় কোনও সহজ উপায় আছে, ভাবে সে। হতে পারে এটা রেস্টুরেন্টওয়ালাদের খেলার কোনও অংশ, যারা ভয় না পেয়ে একটি নির্দিষ্ট সময় পার করতে পারবে তাদের পুরস্কৃত করা হবে। কিংবা সে হয়তো ঘুমাচ্ছে, এখনই কর্কশ এলার্মের শব্দে তার ঘুম ভাঙবে। এমনই বহুবিধ যৌক্তিক-অযৌক্তিকের গোলকধাঁধায় ঘুরতে থাকে সে। তারপর খড়ের গাদায় বসে আগড়ম-বাগড়ম ভাবনায় সময় নষ্ট করার বোকামোকে প্রশ্রয় না দিয়ে জায়গাটির চারিধার ঘুরে দেখার সিদ্ধান্তে উঠে দাঁড়ায়। এটা নিশ্চয় পৃথিবীরই অংশ, এখনও পর্যাপ্ত অক্সিজেন পাওয়া যাচ্ছে যেহেতু। আর সেটা হলে রাস্তা পাওয়া যাবে, ঘর যেহেতু একটি আছে নিশ্চয় এর মালিকের দেখাও মিলবে। তার কাছ থেকে শহরের সন্ধান পাওয়া তেমন ক্লেশের হবে না। সে ভাবে, অস্থির না হয়ে তার বরং জায়গাটা ঘুরে দেখতে দেখতে কুঁড়ের মালিকের ফিরে আসার অপেক্ষা করা উচিত। কারণ বিছানা খড়ের হলেও তার উপরে আটপৌরে ঢঙে সাজানো শীতলপাটিটি মানুষের নিশ্চিত বসতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। রেস্টুরেন্টে তাদের না পেয়ে কিংবা তার ফোন বন্ধ পেয়ে ঝুমি আর রুমকিদের কী অবস্থা তাই ভাবে রাশেদ। এর মধ্যেই হয়ত তার নামে অপহরণের মামলা হয়ে গেছে।
কুইকবাইটে দ্বিতীয়বার ঢোকার সময়টা সন্ধ্যা হলেও এখানে বিকেল গড়াচ্ছে। সময়ের হিশেবটা গোলমেলে লাগলেও সেটার সমাধান ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়ে ওদিক মাথা ঘামানোয় ক্ষান্ত দেয় রাশেদ। বিকেলের ম্লান আলোয় সে দেখে অংকুর শাদা-কালো রঙের ছাগল-ছানাটির পেছন পেছন দৌড়াচ্ছে। তার উচ্ছ্বাস দেখে মনে হচ্ছে এমন আনন্দ এই জীবনে আর পায়নি সে। অবশ্য পরবর্তীকালে সেটি পাওয়া যাবে এমন সম্ভাবনাও ক্ষীণ। ছেলের খিলখিল হাসি শুনেই বাস্তবতার স্রোতে ভেসে যাওয়া একটু আগের ছেলেমানুষি সেই ভাবনাটি ফিরে আসে আবার। জায়গাটা ভালো করে দেখে সে। ছাগলছানা আছে, পুকুরে রাজহাঁস সাঁতার কাটছে, আম-কাঁঠালের গাছ আছে। বসবাসের উপযোগী একটা ঘর আছে। এখানে স্বেচ্ছায় আসেনি সে। এখান থেকে বের হওয়ার উপায় এখনও অজ্ঞাত তার। যেভাবেই আসুক না কেন সে এসেছে এমন একটা জায়গায় যেটা সে অংকুরের জন্য নিজের অজান্তেই কামনা করে এসেছে এ যাবতকাল। এখানে নিশ্চয় খুঁজলে অংকুরের বেড়ে ওঠার সব কিছুই পাওয়া যাবে। কুঁড়ের মালিকের সহায়তাও নিশ্চয় পাওয়া যাবে। পরক্ষণেই তার মনে পড়ে রুমকির মুখ। আদরের ছেলেকে না পেলে কেমন বেদনাহত হবে সে! একমাত্র শ্যালক রিপনের ভৈরবী চেহারাও ভেসে ওঠে। রিপন নিশ্চয় এতক্ষণে সঙ্গিসাথি নিয়ে ভীমের গদাহাতে খুঁজতে বেরিয়ে গেছে তাকে। এত অস্থিরতায় মাঝেও তারেক খুঁক করে হেসে উঠে একটু।
রুমকির কান্নাভেজা চোখ, রিপনের করাল মূর্তি, ঝুমির কোঁচকানো ভ্রু'র কথা ভাবতে ভাবতে ভীষণ ঘুম পায় তার! মনে হয় লম্বা একটা ঘুম দিলেই সে উঠে দেখবে সে তার সেই চিলেকোঠার ফ্ল্যাটে। বরারবরের মত এলার্ম বেজে বন্ধ হয়ে গেছে। অংকুরকে দেখতে যাওয়ার দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে সে তিন লাফে সিঁড়ি ভাঙছে। এইসব ভাবতেই ভাবতেই হাঁস-মুরগি-ছাগলছানা আর অংকুরের সম্মিলিত কলরবের মাঝেই সে শুয়ে পড়ে কাঁঠাল গাছটির নীচে স্তুপ করে রাখা খড়ের গাদায়। দু'চোখ ভেঙে ঘুম নামে তার। ছাগলের দৌরাত্ম্য নিয়ে সে চিন্তিত হয়। অংকুর ওটার পেছন পেছন দৌড়ে হারিয়ে গেলে আরেক কাণ্ড হবে! একবার সে বলার চেষ্টা করে, "অংকুর, বেশি দূরে যেও না বাবা!" কিন্তু ততক্ষণে একটা অনাবিল প্রশান্তি ঘিরে ধরেছে তাকে আর ঘুমপাড়ানি মাসিপিসিরাও খাট-পালঙ্ক না পেয়ে তার চোখেই জেঁকে বসেছে। এই আপাতসুখী মানুষটিকে সুষুপ্তির চরম পর্যায়ে যেতে দেখেও তার ছেলেসহ প্রকৃতির কোনও ভাবান্তর ঘটল না অবশ্য।
কানের কাছে খুব মিষ্টি একটা রিনরিনে শব্দে ঘুম ভাঙে রাশেদের। ধরমর করে ওঠে বসে রাশেদ। সন্ধ্যা শেষে রাত নেমেছে। মশার পিনপিন এতক্ষণ টের পাওয়া না গেলেও পায়ের জ্বলুনি জানিয়ে দিচ্ছে জায়গাটায় মশার উপস্থিতি। অন্ধকারে ঠিক দিশা পাওয়া যায় না। কতক্ষণ ঘুমিয়েছে সে! অংকুর কোথায়! দুশ্চিন্তাটি মাথায় জুড়তেই ধাতস্ত হয়ে বসে খেয়াল করে সে এ তার আজিমপুরের দু'কামড়ার চেনা ফ্ল্যাট। একটু আগে দেখা দুঃস্বপ্নের কথা ভেবে একটু লজ্জা পায় রাশেদ। জানালা দিয়ে রাস্তায় জ্বলতে থাকা আলো ত্যাছড়া ভাবে বিছানায় পড়েছে। অবশ্য সেই আলোতে নয় নিজের আলোকছটাতেই স্মার্ট নামক ফোনটি ঝিলিক দেয়। রিনরিনে শব্দটি এখান থেকেই আসছে। ইমো নামের এপসের রিসিভার স্পর্শ করতেই সেখানে ভেসে ওঠে অংকুরের উদ্বিগ্ন মুখ,"বাবা! সেই কখন থেকে ফোন দিয়ে যাচ্ছি, তোমার শরীর ঠিক আছে তো!" জবাব না দিয়ে রাশেদ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অপরাধী ভঙ্গিতে হাসে। ছেলের মুখটি হাত দিয়ে ধরার বাসনাকে দমন করে সে। "বাবা তাড়াতাড়ি আসো না!" এবার অংকুরের কণ্ঠে ঝাঁঝ ঝরে পড়ে।" সবাই চলে এসেছে তুমি এলে কেক কাটা হবে। তুমি সবসময় খালি লেইট খাও!" বলে অংকুর ঠোঁট উল্টায়, ঠিক যেমন উল্টাত রাশেদ এই বয়েসে। রাশেদ এবারও চুপ করে থাকে। ভেতর থেকে তার তাড়া অনুভব হয়। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে সে কিন্তু তার আগেই এবার এক অদম্য আগ্রহে ডান হাতে সে স্পর্শ করতে চায় ছেলের মুখ। আজ উনিশ বছরে পড়েছে অংকুর। কী মনে করে হাত সরিয়ে নেয় রাশেদ। মনে মনেই সে স্পর্শ করে যায় আত্মজের ভার্চুয়াল মুখ!