শেক্সপীয়রের নাটকে স্বপ্ন

অদিতি ফাল্গুনী




পৃথিবীর সব জাতিই স্বপ্নকে দু’ভাগে ভাগ করে এসেছে এতদিন: বাস্তব স্বপ্ন এবং প্রতীকী স্বপ্ন। বাস্তব স্বপ্ন হচ্ছে যেমনটি ঘটে থাকে তেমনটাই। তবে, প্রতীকী স্বপ্ন আমাদের চলমান জীবনেরই ঘটনাগুলো নানা প্রতীকের মাধ্যমে ব্যখ্যা করে থাকে। বাস্তব স্বপ্নগুলো একজন ব্যক্তিকে পথ দেখায় যে সে কোন্ পথে রয়েছে বা কোন্ পথে যাচ্ছে? সাহিত্যে গোটা ফিকশনকে বলার একটি কৌশল হিসেবে প্রতীকী স্বপ্নের ব্যবহার খুব অপরিচিত নয়। মধ্যযুগের সাহিত্যেও এই ধারাটি ছিল। সেই মধ্যযুগ থেকেই পৃথিবীর খ্যাতনামা নানা নাট্যকার ও লেখকেরা স্বপ্ন দৃশ্যকে তাদের কাজের আদর্শগত অর্থ দান, নাটক বা কাহিনীর পর্ব থেকে পর্বান্তরে যাত্রার সময় চরিত্রদের মানবীয় সত্ত্বার ভুবন প্রদর্শন তথা নাটক বা কাহিনীর আয়তনকে পরিমিত রাখা প্রভৃতি নানা উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করতেন। দৈবী নানা শক্তির সাথে চরিত্রগুলোর আন্ত:সম্পর্ক, দৈবী নানা শক্তি কর্তৃক চরিত্রগুলোকে দেয়া নানা ভবিষ্যদ্বাণী বা বার্তার প্রভাব সৃষ্টিতে স্বপ্ন দৃশ্যের ভূমিকা অপরিসীম। শেক্সপীয়র বোদ্ধা এ.সি.স্পিয়ারিং যেমন বলেন, ‘এটা প্রত্যাশিতই ছিল যে বাস্তব স্বপ্ন থেকে কিছু শেখা যাবে: আর সাহিত্যিক স্বপ্নে তাই অবশ্যই পাওয়া যাবে ভবিষ্যৎ বা দার্শনিক সত্য সম্পর্কে নানা উপদেশ বা সতর্কবাণী যা জাগ্রত জীবনে খুবই দরকারী হয়ে উঠতে পারে।’ বৃটেনে এলিজাবেথীয় যুগের নাট্যকারদের কাছে স্বপ্ন ছিল নাটক বুননের এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশল যেহেতু এতে গোটা ঘটনার একটা আগাম বিবৃতি পাওয়া যেত, দর্শক-শ্রোতাকে দেয়া হতো জরুরি তথ্য এবং নাটকে জ্বলজ্বলে রহস্যের বাতাবরণও যুক্ত হতো স্বপ্ন দৃশ্যের মাধ্যমে। কারণ দৈবী সাবধানবাণী হিসেবে মানুষ তখন স্বপ্নকে সত্যিই খুব বিশ্বাস করতো- বোধ করি আজো করে। এলিজাবেথীয় যুগের বিখ্যাততম নাট্যকার তথা সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপীয়র জানতেন মঞ্চে ঠিক কোন্ ধরণের দৃশ্য এবং সংলাপ দর্শক-শ্রোতাকে পাগল করবে এবং কিভাবে তাঁর সৃজন চিন্তাগুলো তাঁদের সর্বোচ্চ শক্তিতে মঞ্চে উপস্থাপিত করা যায়। সেই কাজে শেক্সপীয়র স্বপ্নদৃশ্য ব্যবহার করেছেন তাঁর বেশ কিছু নাটকে। তাঁর বিশ্বখ্যাত নানা নাটকেই স্বপ্নকে ব্যবহার করা হয়েছে পাঠককে সম্মোহিত বা মুগ্ধ করতে এবং ঘটনাবলীকে আরো নাটকীয় করতে এবং ঘটনার সাথে একধরণের নিয়তির অন্তিম বোধ যুক্ত করতে। এমনকি শেক্সপীয়রের একদম শুরুর দিকের নাটকগুলোতেও স্মৃতি, আবেগ ও কল্পনায় স্বপ্ন হয়ে দাঁড়ায় মানস প্রক্রিয়া প্রদর্শনের একটি পন্থা- সেই সাথে কাহিনীর বয়ান বা প্লটের আগাম রূপরেখাকে দর্শক-শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেবার বিষয় তো ছিলই। ‘জুলিয়াস সিজার’ নাটকে সিজারের স্বপ্ন, ‘রোমিও এ্যান্ড জুলিয়েট’-এ রোমিওর স্বপ্ন বা ‘তৃতীয় রিচার্ড’ নাটকে রিচার্ডের স্বপ্ন যার উদাহরণ। এই প্রতিটি নাটকেই স্বপ্নকে ঘটনা পরম্পরার নাটকীয় অভিঘাত, ট্র্যাজেডি বা শোকাবহতাকে গাঢ় করা এবং প্লট-গঠনে রূপদক্ষের মত ব্যবহার করেছেন শেক্সপীয়র। ঘটনার অতিরিক্ত বিবরণ কমাতে এবং প্লটে বর্ণিত ঘটনাবলীর ভেতর ধারাবাহিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে স্বপ্ন-দৃশ্য নাট্যকারকে সাহায্য করে। যেমন ‘জুলিয়াস সিজার’ নাটকেই স্বপ্ন প্লটকে সমৃদ্ধ করছে এবং ঘটনাবলীর ভেতর ধারাবাহিকতা তৈরি করছে। এই নাটকে স্বপ্নের অভিনবত্ব শুধুই ব্যক্তির অন্তর্জগৎ ও ইচ্ছা-আকাঙ্খা ব্যক্ত করে না, বরং সেসময়ের রাজনৈতিক খেলাগুলোও প্রকাশ করে। মার্জোরি বি. গার্বার বলেন যে, `স্বপ্ন-দৃশ্য ট্র্যাজেডির সেই শিখর দেশ যা নাটকের আসন্ন ঘটনাবলী আগাম বলার জন্য বেছে নেয়া হয়।’ ‘জুলিয়াস সিজারে’ যেমন স্বপ্ন প্লট বর্ণনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ট্র্যাজেডির কিংখাবে স্বপ্ন-দৃশ্য মুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে যা তদানীন্তন রোমের রাজতান্ত্রিক এবং গণতান্ত্রিক দলগুলোর ভেতরের সঙ্ঘাতকে ব্যক্ত করছে। যেমন, নানা রকম অশুভ সঙ্কেত এবং স্বপ্নে পরিপূর্ণ জুলিয়াস সিজার। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সিজারের স্ত্রী কালপূর্ণিয়ার স্বপ্ন বা কবি সীনার স্বপ্নের কথা, বলা যায় রোমের দৈবজ্ঞ পুরোহিতদের সাবধান বাণীর কথা যা ভুল ভাবে ব্যখ্যাকৃত হবার কারণে সিজারের হত্যা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। এই ট্র্যাজেডির স্বপ্ন-দৃশ্যগুলোয় ব্যবহৃত সব চিত্রকল্পে ব্যখ্যার সম্ভাব্য দ্ব্যর্থকতার উপর দেয়া হয় প্রাথমিক জোর; এটা চরিত্রগুলো নিরীক্ষা করার একটি উপায় হিসেবে কাজ করে। `তৃতীয় রিচার্ড-এ দু’ধরণের চরিত্র চিত্রায়িত করেছেন শেক্সপীয়র: যারা নিজেরাই নিজেদের স্বপ্ন ও নিয়তি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেন এবং যারা স্বপ্ন ও নিয়তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন। `জুলিয়াস সিজার’ নাটকে সিজারের স্ত্রী কালপূর্ণিয়া স্বামী হত্যার আগের দিন যে স্বপ্ন দ্যাখেন, সেই স্বপ্ন আমাদের সবিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করে। সিজারের মৃত্যুর আগের রাতে কালপূর্ণিয়া যে দু:স্বপ্ন দ্যাখেন তা’ পরের সকালেই সিজারকে খুলে বলেন তিনি এবং অনুরোধ করেন যেন বাইরে বের না হন। সিজার নিজেও যে শঙ্কিত হন না তা’ নয়। তিনিও সিদ্ধান্ত নেন যে সিনেটে ঐদিন তিনি যাবেন না। গণতন্ত্রবাদী (গোপণে সিজারের বিরুদ্ধাচারী) দিসিয়াস ব্রুটাসকে সরল বিশ্বাসে সিজার তাঁর স্ত্রীর দু:স্বপ্নের কথা জানান: ‘আজ রাতে সে স্বপ্ন দেখেছে যে আমার ভাস্কর্য থেকে/শত ধারা ঝর্ণার মত ছিটকে পড়ছে তাজা রক্ত/ আর সেই রক্তে হাসি মুখে হাত ভিজিয়ে নিচ্ছে বহু সংখ্যক সবল রোমক (She dreamt tonight she saw my statue/, Which, like a fountain with an hundred spouts/, Did run pure blood, and many lusty Romans Came smiling/ and did bathe their hands in it/)/);” ব্রুটাস এটা শুনে ইচ্ছে করেই স্বপ্নের ভিন্নতর ব্যখ্যা হাজির করলেন, ‘ এ ত’ সুন্দর স্বপ্ন, সৌভাগ্যের আশ্বাসদাতা/ আপনার ভাস্কর্য থেকে অসংখ্য ধারায় ছিটকে পড়ছে রক্ত/ যাতে হাত ভেজাচ্ছে হাস্যোজ্জ্বল অসংখ্য রোমক/প্রমাণ করে না কি যে আপনার দেহ থেকেই রোম পান করবে তার পুনরুজ্জীবনের রক্ত (It was a vision, fair and fortunate/ Your statue spouting blood in many pipes/ In which so many smiling Romans bathed/ Signifies that from you great Rome shall suck Reviving blood)|’


লজ্জা পেলেন সিজার। সহ-সিনেটররা তাঁকে স্ত্রীর দু:স্বপ্ন বার্তায় ভয়ে কাতর ভাববে মনে করে কালপূর্ণিয়া এবং স্বপ্ন শোনার পর রোমক পুরোহিতদের সাবধান বাণী অগ্রাহ্য করে ছুটলেন সিনেটে। তারপর যা হবার তাই হলো। শেক্সপীয়র বিশেষজ্ঞ মার্জোরি বি. গার্বারের মতে, ‘শ্রোতারা জুলিয়াস সিজারের ইতিহাস জানত, এখানে নাট্যকার এই স্বপ্ন দৃশ্য সংযুক্ত করার মাধ্যমে এটাই বুঝিয়েছেন যে এই দৃশ্যের রয়েছে এক প্রতীকী ক্ষমতা।’

‘রোমিও এবং জুলিয়েটে-ও স্বপ্ন আসে ভবিষ্যতে নায়ক-নায়িকার জীবনের দু:খময় পরিণতির ইঙ্গিত নিয়ে। নাটকে রোমিওর সাথে মার্ক্যুইটোর কথোপকথনে রোমিও তার যে স্বপ্নের কথা বলে, তাই মূলত: তার আসন্ন স্বপ্নের আভাস:নিদ্রার আনন্দদায়ী সত্য যদি আমি বিশ্বাস করে থাকি/ আমার স্বপ্ন আমাকে দিয়েছে কিছু আগাম খুশির খবর/ আমার হৃদয় দেবতা আলতো বসে ছিলেন সিংহাসনে তাঁর/ সারাটাদিন ধরে কোন্ এক অজানা তেজ আমাকে খুশির ভাবনায় উড়িয়েছে মাটির উপরে/স্বপ্নে দেখলাম আমি যে দয়িতা এসেছে আমার কাছে আর আমাকে সে খুঁজে পেল মৃত/ কি অদ্ভুত স্বপ্ন যে একজন মৃত মানবও তবে ভাবতে পারে!/ প্রেমিকা আমার ঠোঁটে এঁকে দিল চুম্বন আর জাগালো আমার ভেতরে পুনরায় হৃদ-স্পন্দন/জেগে উঠলাম আমি আবার যেন কোন সম্রাট (If I trust the flattering truth of sleep/ My dreams presage some joyful news at hand/: My bosom's lord sits lightly in his throne/; And all this day an unaccustom'd spirit Lifts me above the ground with cheerful thoughts./ I dreamt my lady came and found me dead--/ Strange dream, that gives a dead man leave to think!/-- And breathed such life with kisses in my lips,/ That I revived, and was an emperor/.)
উল্লেখ্য, রোমিও এ স্বপ্ন দেখেছে মানটুয়ায় বসে যখন বহু দূরে জুলিয়েট মৃত্যুর ওষুধ পান করছে পিতার নির্দ্ধারিত পাত্রের সাথে বিয়ে এড়াতে। জুলিয়েট জানে তিন দিন পর সে চেতনা ফিরে পাবে, ততদিনে রোমিও চলে আসবে তার কাছে আর ক্রুদ্ধ পিতাও নিশ্চিত মত পাল্টাবেন। মধুর সমাপ্তি হবে সবকিছুর। বাস্তবে তা’ হয়নি। জুলিয়েটের মৃত্যু সংবাদ শুনেই রোমিও আত্মহত্যা করে। জুলিয়েট চেতনা ফিরে পেয়ে রোমিওর মৃত্যু দেখে আত্মহত্যা করে। দুই চির বৈরী পরিবারের শত্রুতা ঘুচে যায়।
এই যে শেক্সপীয়র তাঁর অসংখ্য নাটকে নানা ভাবে স্বপ্নকে ব্যবহার করেছেন তার একটি কারণ আছে। রেনেসাঁ যুগের বৃটিশ মঞ্চে- প্রাচীন গ্রিক মঞ্চের আদলেই কোন বিশেষ স্বপ্ন-দৃশ্য দিয়ে নাটক শুরু করার রেওয়াজ ছিল। শেক্সপীয়রও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। তবে, বিভিন্ন নাটকের ভেতর তাঁর রোমান্স বা প্রণয়ধর্মী নাটকগুলোতে স্বপ্ন-দৃশ্যের ব্যবহার সমালোচকদের মন সবচেয়ে বেশি কাড়তে পেরেছে। যেহেতুত তাঁর রোমান্সগুলোয় স্বপ্ন তূল্য কল্পভুবন নির্মাণ করা হয়েছে। `দ্য উইন্টারস টেল’-এর মেঠো অরণ্য, ‘দ্য টেম্পেস্ট-এ প্রসপেরোর যাদু দ্বীপ এবং ‘আ মিডসামার নাইটস্ ড্রিম’-এর রূপকথা তূল্য পৃথিবী। আসন্ন ঘটনার ইঙ্গিত হিসেবে স্বপ্নকে বারবার তিনি ব্যবহার করেছেন বিভিন্ন নাটকে। `ষষ্ঠ হেনরি’নাটকে কার্ডিনাল অফ উইনচেস্টার এমন এক স্বপ্ন দেখেন যা ডিউক অফ গ্লুচোস্টারের মৃত্যুর পূর্বাভাস ঘোষণা করেছিল। `তৃতীয় রিচার্ডে’-ও স্বপ্ন এবং অশুভ ইঙ্গিত আসে ভবিষ্যত দূর্বিপাকের আগাম বয়ান রূপে। ম্যাকবেথ, হ্যামলেট এবং কিং লীয়ারে স্বপ্ন ও ভবিষ্যদ্বাণী আসে কখনো ভুত, ডাইনী এবং উন্মাদনার হাত ধরে। শেক্সপীয়রের নাটকের আধুনিক ব্যখ্যাকারীরা তাঁর নাটকে স্বপ্নের বিষয়ে বলতে গিয়ে হালে সাইকো-এ্যানালিসিসের শরণাপন্ন হচ্ছেন। বিষ্ময়কর হলেও সত্য যে শেক্সপীয়রের নাটকের স্বপ্ন-দৃশ্যগুলো তাঁর বহু পরে জন্ম নেওয়া সিগমুন্ড ফ্রয়েডের `স্বপ্ন তত্ত্ব’ বা মানব মনে স্বপ্নের প্রভাব বিষয়ে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বের কাঁচা মাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে। ফ্রাঙ্কি রুবিনস্টেইন (১৯৮৬) শেক্সপীয়রের নাটকে স্বপ্নের ব্যবহারকে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের `স্বপ্ন-উপাদান’ তত্ত্বের পূর্বসূরী হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। কে স্টকহোল্ডার (১৯৮৭) ‘ম্যাকবেথ’ নাটকে সহিংসতা ও যৌনতার অসচেতন মিশ্রণকে নিরীক্ষার মাধ্যমে নাটকের শিরোনাম যার নামে, তার অন্তরে গাঢ় প্রোথিত, অযৌক্তিক কিছু উদ্দেশ্য কিভাবে অর্দ্ধ-জাগ্রত চৈতন্যে স্বপ্ন হিসেবে ঘুরে বেড়ায় সেটাই কারুদক্ষতায় প্রদর্শিত হয়েছে। কে স্টেকহোল্ডার ১৯৯১ সালে `দ্য মার্চেন্ট অফ ভেনিসে’-র ব্যখ্যায় দেখান যে গোটা প্লটটি যেন ছিল পোর্শিয়ার মৃত পিতার স্বপ্ন এবং এই অনন্য প্রেক্ষিতকে সম্পদ এবং বাসনা বিষয়ক নাটকটির পুনরাবৃত্তিমূলক ভাবনাসমূহের সূত্র খুঁজে বের করতে ব্যবহার করা হয়েছে। একইভাবে সিমন ও লেসার (১৯৭৬) সালে ম্যাকবেথকে চিহ্নিত করেছেন নায়কের অচেতন নানা স্বপ্ন ও কল্পনা তাড়িত এক কাহিনী হিসেবে যা শেষ হয় রক্তাক্ত ফলাফলে। `তৃতীয় রিচার্ড’ থেকে `এ্যান্টোনি এ্যান্ড ক্লিওপেট্রা’সহ `হ্যামলেট’, ‘ম্যাকবেথ’ বা `কিং লিয়ারে’ স্বপ্ন বারবার চরিত্রদের অন্তর্গত ল্যান্ডস্কেপ বুঝতে সাহায্য করে।
‘দ্য টেম্পেস্ট’-এর চতুর্থ অঙ্কের দৃশ্য:১-এ প্রসপেরো বলছেন: ‘আমরা এমন বস্ত/ যেন স্বপ্নগুলো তৈরি সব আর আমাদের ছোট জীবন/নিদ্রার বৃত্তে আবর্তিত (We are such stuff/As dreams are made on; and our little life/Is rounded with a sleep.)|’
ফ্রয়েড যাকে বলেছেন ‘স্বপ্নের উপাদান (material of dreams),’ শেক্সপীয়র তাকেই বলেছেন ‘stuff|’ শেক্সপীয়রের নাটককে বুঝতে ইদানীং কালে যে সাইকো-এ্যানালিসিস পদ্ধতির ব্যবহার হচ্ছে, সেক্ষেত্রে ফ্রয়েডের স্বপ্ন-তত্ত্বের ভূমিকা অপরিসীম। একমাত্র ফ্রয়েডীয় সাইকো-এ্যানালিসিস পদ্ধতির মাধ্যমেই অনুধাবন করা যায় যে ম্যাকবেথ মূলত: এক যুবক সেনাপতির রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খার বয়ান যতটা না, তার চেয়ে ঢের বেশি হলো পিতা-পুত্র মনোজাগতিক দ্বন্দ থেকে উদ্ভুত লাগামছাড়া সহিংসতা এবং নারীর বন্ধ্যাত্বের অভিশাপের কাহিনী।
‘কিং লিয়ার’এবং ‘দ্য মার্চেন্ট অফ ভেনিসে’ ফ্রয়েড দেখেছেন একটি পুরণো পৌরাণিক ও লোকজ দ্বন্দ- তিনজন নারীর ভেতর থেকে পুরুষের নির্দিষ্ট একজনকে বেছে নেবার প্রয়োজন- এ যেন মানবের ভাগ্যের তৃতীয় চরকা কাটা দেবী এ্যাট্রোপস বা সেই অলঙ্ঘ্য মৃত্যু- তাকেই বেছে নেয়া। কর্ডেলিয়া যার গলার স্বর ছিল ‘সদা কোমল/শান্ত ও নীচু (ever soft, / Gentle, and low)’ ` ভালবাসবে এবং রইবে মৌন’ ও পোর্শিয়া যে কিনা তৃতীয় ঝুড়িতে লুকনো (ঝুড়ি সর্বদাই নারীর সেই অঙ্গের প্রতীক যার জন্য তাকে ‘নারী’ বলা হয়) নিজের সম্পর্কে বলে, ‘চিন্তা ব্যতীত কুমারীর অন্য কোন জিহ্বা থাকে না (a maiden hath no tongue but thought)| পোর্শিয়া, যার চোখ একদা ব্যাসানিওকে দিয়েছে ‘নি:শব্দ বিবৃতি (speechless messages),’ সে কিন্ত নিজেকে সোনা বা রূপোর ঝুড়িতে নয়, বরং সীসার ঝুড়িতে লুকোয় যা ব্যাসানিওর পছন্দ হয় কারণ সীসার ঝুড়ির ‘ফ্যাকাশেভাব (অথবা পড়–ন ‘সরলতা’) আমাকে বাগ্মীতার চেয়ে বেশি টানে।’ স্বপ্নে, ফ্রয়েড ব্যখ্যা করেন, ‘মৌনতা’ মৃত্যুরই প্রতিনিধি। ফ্রয়েডীয় এই ব্যঞ্জনাদি শেক্সপীয়রের অন্যান্য নানা নাটক যেমন ‘আ মিডসামার নাইটস ড্রিমে’ও সণাক্ত করা যায়। থিসবের কৌতুকোদ্দীপক বুক চাপড়ানি লক্ষ্য করুন, ‘কথা বলো, কথা বলো। একদম চুপ! মৃত, মৃত (Speak, speak. Quite dumb! Dead, dead?)?’ আবার ‘চতুর্থ হেনরি’র দ্বিতীয় অধ্যায়ে সুফোক বলছেন, ‘গ্লুচেস্টার মৃত’ এবং কার্লাইল উত্তরে বলছেন, ‘আজ রাতে স্বপ্ন দেখেছিলাম/ডিউক যেন বোবা হয়ে আছেন (I did dream tonight / The duke was dumb)|’ মৌনতার পাশাপাশি চেহারার ফ্যাকাশে ভাব বা বিশীর্ণতাকে মৃত্যুর সাথে অনেক সময়ই অন্বিত করা হতো: মৃত্যুর ফ্যাকাশে পতাকা - রোমিও এবং জুলিয়েট (death's pale flag- Romeo and Juliet)’ অথবা ‘ফ্যাকাশে-মৃত চোখ, পঞ্চম হেনরি (pale-dead eyes" (Henry V))| ‘আ মিডসামারস নাইট ড্রিম’ নাটকে ‘তিন বোণ...দুধের মত ফ্যাকাশে, সাদা হাতে (The Sisters Three . . . With hands as pale as milk )’ ‘কাঁচি দিয়ে কাটে তার রেশমের সূতো (shore / With shears his thread of silk) ‘ যখন মৃত্যু দাবি করেছিল খোদ পিরামাসকে। শেক্সপীয়রের নাটকের দর্শক-শ্রোতৃবর্গের অনেকেই যারা বাইবেল ভাল জানতেন, অবশ্যই এই উপমায় খুঁজে পেতে পারেন বাইবেলের ‘ফ্যাকাশে অশ্বে-র প্রতিধ্বনি যার চালক ছিল মৃত্যু স্বয়ং (প্রত্যাদেশ ৬:৫)।
‘মার্চেন্ট অফ ভেনিস’-এ সীসার ঝুড়িতে পোর্শিয়ার মৃত পিতার রেখে যাওয়া একটি চিরকুট থাকে যেখানে লেখা ছিল: আমাকে যে পছন্দ করবে তাঁকে অবশ্যই দিতে হবে আমায় যাবতীয় দূর্বিপাক যা তাঁর আছে।’ ষোড়শ শতকে জুয়া খেলা ছিল একটি বিপজ্জনক কাজ আর তিন ঝুড়িতে রাখা তিন জন নারীর ভেতর থেকে একজনকে পছন্দ করে নেয়াটাও জুয়া খেলার মতই কিছু একটা। পোর্শিয়ার ছবি সাঁটা ছিল সীসার ঝুড়ির মুখে আর শেক্সপীয়ারের ব্যবহৃত প্রতীকরাজিতে `সীসা’ সর্বদাই মৃত্যুর প্রতীক। রাজা লিয়ারের কনিষ্ঠা কন্যা কর্ডেলিয়াও একইভাবে আসলে মৃত্যুর প্রতীক। ‘কিং লিয়ারে’-র শেষ দৃশ্যে ইংরেজ যুদ্ধ শিবিরে বাহুতে মৃত, কনিষ্ঠা কন্যাকে নিয়ে বৃদ্ধ রাজা যখন ঢুকছেন, সেই দৃশ্যের ব্যখ্যায় ফ্রয়েড আমাদের বলছেন,
‘কর্ডেলিয়া স্বয়ং মৃত্যু। ঘটনাটা একটু উল্টে দেখলেই গোটা বিষয়টা পরিষ্কার ও আমাদের কাছে পরিচিত একটি দৃশ্য বলেই মনে হবে। কর্ডেলিয়া যেন জার্মান পুরাণের ভাল্কিরির মত মৃত্যু দেবী যে মৃত বীরকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিয়ে যায়। আদিম পুরাণের পোশাকে মোড়ানো এই চিরায়ত প্রজ্ঞা বৃদ্ধ লীয়ারকে বলছেন মরজগতের সব প্রেম ত্যাগ করে, মৃত্যুকে বেছে নেয়া এবং মৃত্যুর প্রয়োজনীয়তার সাথে মৈত্রী স্থাপণ করতে।’ ‘মার্চেন্ট অফ ভেনিসে’-র ব্যখ্যাতেও ফ্রয়েড পুনরায় কাহিনীকে উল্টে দিয়ে ব্যখ্যা করেন যে কেন সোনা বা রূপোর ঝুড়ির বদলে সীসার ঝুড়িতেই তিন নারীর ভেতর সুন্দরীশ্রেষ্ঠা পোর্শিয়া উপবিষ্ট ছিলেন। মৃত্যুর অলঙ্ঘ্যনীয়তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে গিয়ে (তৃতীয় নিয়তি) মানুষ প্রায়ই তৈরি করে এক অন্যতর পুরাণ যেখানে প্রেমের দেবী ব্যতিক্রমহীণভাবে স্থান নেয় মৃত্যুর দেবীর। গ্রিক প্রেম ও সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতি যে একসময় ছিল মৃত্যু ও পাতালের দেবী তা’ কিন্ত ভুলে গেলে চলবে না। হিন্দু ধর্মে নৃত্যের চতুর্বাহু দেবতা নটরাজ, যিনি এক হাতে একটি ঢোলক ধরে রেখেছেন, একই সাথে এই বিশ্বের সৃজন ও সংহার করতে পারেন।
‘কিং লিয়ার’ নাটকে বৃদ্ধ রাজা লিয়ারের সাথে কন্যাদের সম্পর্কের চমৎকার মনস্তাত্ত্বিক ব্যখ্যা করেছেন ফ্রয়েড। লক্ষ্য করুন লিয়ার যেখানে বলছেন, ‘সাহসিকতার সাথে মারা যাব, যেন বা দর্পিত যুবক বর। কি! আমি খুশি হব। এসো, এসো, আমি এক রাজা (I will die bravely, like a smug bridegroom. What! I will be jovial. Come, come, I am a king)!’ লিয়ারের এই উক্তিতে মিশে আছে যুক্তি ও উন্মাদনা- যেন বা শক্ত দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে চলা যার এক পাশে বন্য কৌতুক আর এক পাশে হৃদয় মোচরানো বিষাদ। নাটকে এর আগের দৃশ্যগুলোয় লিয়ারকে দেখা যায় রাজা হিসেবে তাঁর ব্যর্থতা মেনে নিতে এবং অসহায়ের জন্য সমবেদনা তাঁর ভেতর তৈরি হতেও দেখা যায়। তবু নিজ চরিত্রের যে অশুভ দিকগুলোর জন্য তাঁর এই দূর্গতি তার দায়িত্ব তিনি যেন আজো নিতে চান না। তিনি ভুলে যান কন্যাদের সাথে তাঁর আবেগগত খেলার কথা এবং কর্ডেলিয়ার প্রতি যে তীব্র পক্ষপাত তার ছিল সেকথাও আমি তাকে ভালবেসেছিলাম সবচেয়ে বেশি (I loved her most)", ভুলে যান এই পক্ষপাত রিগান এবং গনেরিলের ভেতর যে ঘৃণা তৈরি করেছিল তার কথাও। তিনি থেকে যান এক অহমিকাপূর্ণ ব্যক্তি, ক্ষোভে তিক্ত এবং সর্বপ্রকার যৌনতার সাথে সদা লড়াইরত। ‘ব্যভিচার’কে ঘৃণা করেন বলে নারী সম্পর্কে তাঁর উক্তি, ‘সেখানে নরক (যোনী); সেখানে অন্ধকার, সেখানে ক্ষারগন্ধী খনিদেশ (যোনী)/পুড়ছে, তপ্ত, দূর্গন্ধ, ভোগ (There's hell [the vagina]; there's darkness, there's the sulphurous pit [vagina] / Burning, scalding, stench, consumption)| নারীদেহের গন্ধ এতই কটু যে তাঁর প্রয়োজন হয় ‘এক আউন্স সিভেট (বেড়ালের পায়ুপথ থেকে নি:সরিত রসে সৃষ্ট সুগন্ধী-প্রয়োজন হয় আমার কল্পনাকে সুখী করতে "ounce of civet [perfume derived from a cat's anal glands] . . . to sweeten my imagination)" এবং প্রয়োজন হয় তাঁর হাত মুছে ফেলতে যে হাতে কিনা ‘মৃত্যু বা নশ্বরতার গন্ধ রয়েছে (it smells of mortality)| লিয়ার এই অধ্যায় শেষ করেন ‘মারো, মারো, মারো, মারো, মারো, মারো (‘মারো, মারো, মারো, মারো, মারো, মারো)’ বলে। এলিজাবেথীয় বৃটেনে ‘মৃত্যু’ কিন্ত যৌন জীবনের শেষ হিসেবেও বিবেচিত হতো: নাট্যকার এখানে রেখে দিচ্ছেন কূটাভাস- লিয়ার কি দু’ধরণের মৃত্যুর জন্যই প্রস্তত? কন্যাদের প্রতি লিয়ারের কি রয়েছে কোন সুপ্ত অজাচার বোধ? যা এমনকি কখনো কখনো প্রকাশিত হয়ে পড়ে? ‘মারো’ শব্দটির উপর তাঁর অত্যধিক জোর যেন তাঁর দুই ‘জামাতা’র প্রতিই নিক্ষিপ্ত যদিও দুই জামাতাই তাঁর প্রতি বেশ অনুগত ছিল শুরুতে। ‘হ্যামলেট’ নাটকে নায়কের মুখে ‘মারো’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে পাঁচবার যেহেতু এখানে তার মা দেবরের সাথে অনৈতিক বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। হ্যামলেটের নিজেরও কি ছিল মায়ের প্রতি সুপ্ত অনুরাগ বা অজাচার বোধ? তাই পিতৃব্যের প্রতি এই ঈর্ষা?
হত্যা করা, মৃত্যু হওয়া জাতীয় শব্দবন্ধসমূহ ছিল যৌনতা তাড়িত শব্দাবলী। যেমন আজো জনচিত্তে এই বিশ্বাস আছে যে মেয়েরা তাদের যৌনচাহিদা দিয়ে পুরুষকে হত্যা করে কিম্বা পুরুষেরা তাদের শিশ্নের আঘাতে নারীকে হত্যা করে। ‘ভেনাস এবং আদোনিস’-এ কামতাড়িতা ভেনাস যেমন আদোনিসকে বলে, ‘ওহ্ তুমি একবার আমাকে হত্যা করেছো; হত্যা করো আমাকে আর একবার (O thou didst kill me; kill me once again)|’ ‘ওথেলো’-তে সন্দেহকাতর নায়ক শেষ দৃশ্যে দেসদিমোনাকে একই সাথে হত্যা করতে থাকে এবং আদরও করতে থাকে: নায়িকাকে চুম্বন করতে করতে বলে, ‘এমনটা হবে যে যখন মরবে তুমি, আমি তোমাকে হত্যা করার পর/তোমাকে ভালবাসব আমি (Be thus when thou art dead, and I will kill thee, / And love thee after" (V.ii)).’ হত্যা এবং সঙ্গমের সবচেয়ে প্রকাশ্য সণাক্তকরণ ঘটেছে জন ডানের ‘এ্যান এ্যানাটমি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’-এ।
ফিরে আসা যাক ফ্রয়েড-কৃত `কিং লিয়ারে’-র দ্বিতীয় অধ্যায়ে বৃদ্ধ রাজার মুখে উচ্চারিত তিনটি শব্দ `বর,’ `রাজা’ এবং `আনন্দিত’-এর ব্যখ্যায়। বৃদ্ধ এই রাজা যিনি কিনা তাঁর হাতে নাটকের শেষ দৃশ্যে তৃতীয় কণ্যা কর্ডেলিয়া তথা নিয়তি বা মৃত্যুদেবীকে বহন করছেন বা উল্টে বললে মৃত্যু তাঁকে বহন করছে, তিনি মরতে যাচ্ছেন- যাচ্ছেন মৃত্যুকে বিবাহ করতে। অথচ, অন্তিম মূহুর্তেও নিজেকে ভাবছেন সাহসী রাজা ও হর্ষিত কোন যুবক বরের মতোই। নাটকের শুরুতে এই লিয়ারই জানতে চেয়েছিলেন তাঁর মেয়েদের কাছে যে তাদের ভেতর কে তাকে সবচেয়ে ভালবাসে। ফ্রয়েডের ব্যখ্যায় এখানে রোমকূপে শিহরণ জাগবে- ফ্রয়েড বলছেন যে যদিও বৃদ্ধ এবং মৃত্যুপথযাত্রী- লিয়ার আজো নারীর ভালবাসা ত্যাগ করতে রাজি নন এবং তাই জোর করছেন কন্যাদের কাছ থেকে এটা জানার জন্য যে আজো তাঁকে কতটা ভালবাসা হয়। কর্ডেলিয়ার পাণি-প্রার্থীদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিয়ার বলছেন, ‘ফ্রান্স ও বার্গ্যান্ডির রাজকুমারদ্বয়/ কনিষ্ঠা কণ্যার প্রতি প্রেমে পরষ্পর প্রতিদ্বন্দী তাঁরা/রাজ দরবারে দীর্ঘ সময় ধরে দেখা যাচ্ছে তাদের প্রেমময় উপস্থিতি (The princes, France and Burgundy, / Great rivals in our youngest daughter's love,/ Long in our court have made their amorous sojourn)|’ দুই যুবক রাজকুমার কর্ডেলিয়ার প্রেমে পরষ্পর প্রতিদ্বন্দী, এটা সত্য কথা। কিন্ত লিয়ার নিজেও কি কর্ডেলিয়ার প্রেমে একজন প্রতিদ্বন্দী নন? দুই যুবকের রাজ দরবারে উপস্থিতি লিয়ারের কাছে ‘দীর্ঘ’ মনে হচ্ছে। ফরাসীতে আবার court A_© ‘সংক্ষিপ্ত।’ এটা তাই আদৌ অস্বাভাবিক নয় যে কর্ডেলিয়া যখন তাঁর `অর্দ্ধেক ভালবাসা’ হবু স্বামীকে দিতে প্রতিশ্রুত হন, তখন ক্রুদ্ধ হন লিয়ার: ‘দিদিদের মত বিয়ে কখনোই করব না আমি/ শুধুই পিতাকে দেব না সব প্রেম (I shall never marry like my sisters, / To love my father all)."
ভয়ানক হতাশ ও ক্ষিপ্ত লিয়ার বলেন, ‘ওকেই সবচেয়ে ভালবেসেছিলাম আমি এবং ভেবেছিলাম আমার বিশ্রাম ন্যস্ত করবো/ওর সদয় আশ্রয়ে (I loved her most, and thought to set my rest / On her kind nursery)|’ ফ্রয়েড মনে করেন যে দবিশ্রাম’ বলতে এখানে যৌন তৃপ্তির কথা বলা হয়েছে এবং শিশ্ন তার কাঙ্খিত আশ্রয় কোথায় খুঁজে পায় তা’ বলা বাহুল্য মাত্র। কর্ডেলিয়ার ‘সদয় আশ্রয়’ প্রসঙ্গে লক্ষ্য করুন শেক্সপীয়রের আরো নানা নাটকে ‘নার্সারি’ শব্দটিকে জন্মদাত্রী বা জরায়ুর সাথে একীভূত করা হয়েছে- জরায়ু যেন ‘সেবিকা ও জন্মদানকারী (nurse and breeder" (The Two Gentlemen of Verona),’ ` এই সেবিকা, এই পূর্ণ গর্ভ’ (This nurse, this teeming womb" (Richard II); লিয়ার এক জায়গায় আরো বলছেন ‘Cordelia "must bear with" him’- এর বাংলা কি করা যায়? ‘কর্ডেলিয়াকে মেনে চলতে হবে তাঁকে অথবা? থাক...বাঙালী চৈতন্যে শেক্সপীয়রের ফ্রয়েডীয় ব্যখ্যা পুরোটা লেখাও কঠিন। অপর কন্যা গনেরিল সম্পর্কে বলছেন যে সে ‘সদয়া এবং স্বস্তিদায়ক’ যেহেতু তাঁর আছে ‘স্বস্তিদায়ী চোখ’ যে কিনা তাঁর ‘আসা’-র বিরুদ্ধতা করবে না। পুরুষের যৌন কাজে নারীর সম্মতির প্রশ্নে ‘স্বস্তি’ কথাটি আরো নানা জায়গায় ব্যবহার করেছেন শেক্সপীয়র। যেমন ‘জুলিয়াস সিজার’-এ ব্রুটাস-পতœী পোর্শিয়া ব্রুটাসকে জিজ্ঞাসা করেন যে তাঁর কাজ কি শুধ্ইু ‘তোমার শয্যাকে স্বস্তি দেওয়া’ কিম্বা জুলিয়েটের নতুন বর ‘ঢুকবে তার কক্ষে...এবং স্বস্তি দেবে তাকে -রোমিও এবং জুলিয়েট)।’ একথা তাই নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে বৃদ্ধ ও বিপতœীক রাজা লিয়ার সচেতনে না হলেও অবচেতনে তরুণী কন্যাদের চেয়েছিলেন স্ত্রীর বিকল্প হিসেবে যে স্ত্রী তাঁর ছিল না। লিয়ার নিজেকে যখন ‘জোভ’ বলেন, তখন শেক্সপীয়ার কি তাঁকে ‘মাচ এ্যাডো এবাউট নাথিং’-এর ‘কামুক জোভ’ বা ‘ট্রয়লাস এবং ক্রেসিডা’-র বহুগামী জোভের চিরায়ত রূপের সাথেই মেলান না?
এভাবেই ফ্রয়েডের কাছে যা ‘ড্রিম-ম্যাটেরিয়াল,’ শেক্সপীয়ারের কাছে তা’ ‘ড্রিম-স্টাফ।’ দুয়ের ভেতর পার্থক্য হচ্ছে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের যা কিছু ‘স্বপ্ন উপাদান’ তা’ কেউ সচেতন ভাবে তৈরি করেনা। দক্ষ নাট্যকার শেক্সপীয়ার সচেতন ভাবে তৈরি করেছেন। স্বপ্নদর্শীকে ছদ্মবেশ পরিয়ে, মঞ্চে তাকে দিয়ে কৌতুকালাপ আওড়ানোর পাশাপাশি ঈশপের মত সান্ধ্যভাষাও ব্যবহার করেছেন শেক্সপীয়ার যাতে রাজরোষে পড়তে না হয় নাটকের অন্তর্নিহিত, রাজনৈতিক বক্তব্যের জন্য।
শেক্সপীয়র বা জয়েসের মত অনেকেই সচেতন বা অসচেতন- যেভাবেই হোক না কেন, আমাদের দৈনন্দিনের নানা চিন্তা-উদ্বেগ-সঙ্কল্প মুড়িয়ে দিয়েছেন স্বপ্নের ছদ্মবেশে যা আসলে আমাদের জীবনের নানা গুঢ়াভাসের বহুস্তর অর্থকে উন্মোচিত হতে দেয় না। ‘আ মিডসামার নাইটস ড্রিম’-এ দেখা যায় দিনে মাত্র ছয় পেন্স আয় করা বটম যার আনন্দ ছিল নাটকে ‘স্বৈরাচারী’ রাজার ভূমিকায় অভিনয় করা- একপর্যায়ে নাট্য কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত মেনে নেয় যে সে এক ‘দরিদ্র নাইটে’র চরিত্রে অভিনয় করবে। এই ‘দরিদ্র নাইট’ এক মধ্য-গ্রীষ্মের রাতে স্বপ্ন দ্যাখে যে সে গাধা মাথা পরেছে এবভং গাধার খাবার খাচ্ছে; তবে এক স্বৈরাচারী রাজার স্ত্রী যে তার ভেতর ব্যভিচার প্রণোদনা যুগিয়েছে, সেই নারীটি তার ‘প্রণয়াসক্ত।’ ঘুম ভেঙ্গে গেলে বটম বলে এই ‘স্বপ্ন বোঝা মানুষের বুদ্ধির অঘম্য’ তবু ‘নাটকের শেষে’ সে এই পালা গাবে যেখানে সে একজন অভিনেতা।

এমন নয় যে জীবনে যৌনতার নানা উপাদানকে লুকোতে শেক্সপীয়র স্বপ্নকে ব্যবহার করেছেন। যৌনতাকে সরাসরি উপস্থাপন করেছেন নানা জায়গায়। ‘সিম্বেলিন’-এ সতীত্বের দেবী ডায়ানা ‘উত্তপ্ত স্বপ্ন’ দ্যাখে, ‘দ্য মেরি ওয়াইভস অফ উইন্ডসর’-এ ফোর্ড তার সেরা কোটের গায়ে ফুটোর মাধ্যমে আসলে স্ত্রীর অবিশ্বস্ততার ইঙ্গিত পায়, ‘ওথেলো- য় সতীর্থ সেনা তথা এক বিছানায় ঘুমানো বন্ধু ইয়াগোকে ক্যাসিও যে দেসদিমোনার সাথে স্বপ্নে দৈহিকভাবে মিলিত হওয়ার কথা বলে তা’ খুবই প্রত্যক্ষ এবং কামোদ্দীপক। আছে সমকামও যেখানে ক্যাসিও ইয়াগোর উরুর উপর পা তুলে এবং তাকে তীব্র ভাবে চুম্বন করে।
আধুনিক পন্ডিতেরা একমত যে এলিজাবেথীয় যুগে একটি শব্দের দ্বৈত অর্থ থাকত যা আজকের শ্রোতৃবর্গ আর অনুধাবনে সক্ষম নয়। সান্ধ্য সেই ভাষা আর প্রতীকী স্বপ্ন-দৃশ্যের চিত্রায়ণের মাধ্যমে শেক্সপীয়র বলে গেছেন নানা নিষ্ঠুর রাজনৈতিক হত্যাকান্ড, রক্তপাত, প্রেম ও যৌনতা, বাসনা, কূটনীতি এবং মানবীয় রিরংসার আখ্যান।

সূত্র:

1. Frankie Rubinstein- Overviews: Dreams And Psychoanalysis (1974).
2. Marjorie B. Garber: Dreams And Imagination (A Dagger of the Mind: Dream and 'Conscience' in the Tragedies," in Dream in Shakespeare: From Metaphor to Metamorphosis, Yale University Press, 1974, pp. 88-138.)
3. Jerome Mandel : Dream and Imagination in Shakespeare, Shakespeare Quarterly
Vol. 24, No. 1 (Winter, 1973), pp. 61-68

* ইংরেজি উদ্ধৃতিগুলোর বাংলা অনুবাদ- লেখক।