মেনকার সাবান/ জ্যোৎস্না কর্মকার

আলোচনা - জয়া চৌধুরী


সেই কবে বিভূতিভূষণ বলে গিয়েছিলেন “তুমি যাহা প্রথম দেখিতেছ তাহাই তোমার আবিষ্কার।” সুতরাং আবিষ্কারক হতে গেলে টমাস আলভা এডিসন না হলেও চলে এমনই ধ্রুব বলে মেনে চলি। আকস্মিক ভাবেই হাতে এসেছিল ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত একটি বহু পুরনো গল্পগ্রন্থ “মেনকার সাবান”। নামটিই এমন যে কৌতূহল বশতঃ খুলে বসতেই চমক। আদিবাসী মানুষ সাহিত্যে কতখানি প্রতিফলিত হয়েছেন তা পন্ডিতজনেরা বলবেন। নেহাত মূর্খ আমি পাতা খুলে বসতেই বলা যায় আটকে গেলাম। মাকড়সার লালায় যেমন আটকে যায় তার শিকার। স্তম্ভিত হয়ে পড়তে থাকলাম আদিবাসী মেয়েদের খুব কাছ থেকে দেখা জীবনের খুঁটিনাটি। আমাদের শহুরে শীতল প্রেক্ষাগৃহে বসে নাটক সিনেমা দেখে যার কণামাত্র বোঝা যায় না। দেখা যায় তবু অনুভবে আসে না। আসা সম্ভবই নয়। কেননা কী অসম্ভব ভালবাসা সেই জনজাতিটির মেয়েদের প্রতি লেখকের তা না পড়লে বিশ্বাস করা অসম্ভব। ৭০/ ৮০ দশকের প্রেক্ষাপটে লেখা বইটি। অথচ কী নিদারুণ সত্য আজও! ঘটনাচক্রে লেখক নিজেই একটি মানসিক রোগীদের হোমের সুপার থাকার দীর্ঘ অভিজ্ঞতালব্ধ হীরককুচি তুলে দিয়েছেন পাঠকের হাতে। ডাইনী সমস্যা আদিবাসী জীবনের ওতপ্রোত সমস্যা, অশিক্ষা, অনাহার ইত্যাদি একশ বছর আগে যেমনটি ছিল আজও ঠিক তেমনই হয়ে আছে। রুটি, মেনকার সাবান... একটির পর একটি গল্পে চমক ও নিষ্ঠুর থাপ্পড় ভদ্রসমাজের মুখে। কত সহজে আমরা সমাজের এই অংশটিকে ভূলে থাকি। পৃথিবীর ইতিহাস মানুষের সভ্যতার বড়াইকে একদিন এরাই থুতু ফেলে মাটিতে লুটিয়ে দেবে। এদের উন্নতিসাধন না হলে সে কোন উন্নত সমাজ হয়ে দাঁড়াবে যার জন্য আমরা গর্ব করব? ডাহিন গল্পটি পড়ার পরে দুরাত ঘুম আসে নি। এত নির্মম সত্য পড়লে চোখে জল আসে, বুকের ভেতর জ্বালা করে , মনে হয় সাহিত্য করে কি হয় জানি না! তবে লেখক সার্থক তিনি সমাজের ভন্ডামি চিরে দেখিয়েছেন সার্থক ভাবে। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ ছোটগল্পগুলির মধ্যে এটিকে ফেলাই যায় বলে মনে হয়।
লেখকের এত বছরের মানসিক হাসপাতালের সুপার হওয়ার অভিজ্ঞতা শুনছি সমগ্র হিসাবে প্রকাশ করবার পথে । আমরা পাঠক সাগ্রহে অপেক্ষা করে আছি । জরাসন্ধের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জারিত “লৌহকপাট” এর মত অনন্য কোন কীর্তি পেতে চলেছেন পাঠক বলেই আমার ধারণা। প্রবীণা লেখকের সুস্থ জীবন কামনা করি




মেনকার সাবান/ জ্যোৎস্না কর্মকার / প্রকাশক- রক্তকরবী