যখন স্বপ্ন হাত বাড়ায়

জিনাত রেহেনা ইসলাম



আপনি একজন সুশিক্ষিত যুক্তিবাদী যুবক। অফিসে গল্পচ্ছলে বলে ফেললেন,আপনি গতকাল স্বপ্নে আকাশে উড়ছিলেন। বলামাত্র পাশের টেবিল থেকে একজন ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করে বসলো তারপর? বা আপনি বলে ফেললেন স্বপ্নে আপনার দাঁত পড়ে যাচ্ছে আপনি দেখেছেন। পাশে বসা কেউ হাহা করে হেসে দিল। আপনি অবাক কিন্তু জিজ্ঞাসা করতে পারছেন না! কিন্তু যারা শুনছেন তারা ফ্রয়েড পড়ে ফেলেছেন আপনার আগে। প্রথম স্বপ্নের মানে তারা করে ফেলেছেন আপনার বিপথগামী যৌন কামনা আর দ্বিতীয়টির মানে আপনার মধ্যে পৌরুষত্বহীনতা ভয় কাজ করছে।ফ্রয়েডিয় স্বপ্ন-বিশ্লেষণের লক্ষ্য অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন ঘটনা ও কর্মপ্রেরণার উপর আলো ফেলা,অবদমিত আকাঙ্ক্ষার কথা বলা।যা ব্যক্তির ভাবনার সাথে মিলে যেতে ও পারে না ও পারে।উপরের স্বপ্নবয়ান করা যুবকের কাছে একদম মিথ্যা বা অমূলক হতে পারে এই স্বপ্ন ব্যাখ্যা।আপনার কাছে নেই মিশরের মত প্রশিক্ষিত পুরোহিত যে এক লহমায় মানে করে দেবে স্বপ্নের।তাছাড়া মাইণ্ডের তিনটি স্তর-কন্সাস,আনকন্সাস,স াবকন্সাস স্টেটের উপর কারো সম্পুর্ন নিয়ন্ত্রন নেই। তবে স্বপ্ন কি ধোঁয়া?আগুন?‘The Accidental Mind’ বইয়ের লেখক ডেভিড লিনডেনের ব্যাখ্যাই কি ভরসা?হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলে করা একটি গবেষণায় রবার্ট স্টিকগোল্ড ও তাঁর সহকর্মীরা স্বেচ্ছাসেবকদের কম্পিউটার ভিডিও গেমডাউনহিল রেসার ২ কয়েক ঘন্টার জন্য খেলতে দেন। ঐ দিন রাতের ঘুমে ৯০ শতাংশের বেশি স্বেচ্ছাসেবক ভিডিও গেমটির বিভিন্ন দৃশ্য স্বপ্নে দেখার কথা জানান। তবে তাদেরকে ঘুমে ঢুলে পড়ার কিছুক্ষন পরেই জাগিয়ে দেয়া হয়েছিলো — রাতের মধ্য বা শেষ ভাগ নয় যখন গভীর নন-রেম ঘুম ও রেম ঘুম কর্তৃত্ব করে।
রাতের ঘুমে আপনি একগুচ্ছ স্বপ্ন দেখলেন।সকালে ভুলে গেলেন।আবার স্বপ্নে দেখা স্বপ্ন কে চিনতে পারলেন স্বপ্নের মধ্যেই কিন্তু সকাল হতেই গেল সব তালগোল পাকিয়ে।এবার?অনেকগুলো বড় আকারের স্বপ্ন গবেষণা হয়েছে যেখানে মানুষজন লিখিত কিংবা অডিও স্বপ্ন-জার্নাল রেখেছেন। অন্য কিছু গবেষণায় তুলনামূলক কম সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবকরা ঘুম-গবেষণাগার কিংবা বাসায় ইইজি-রেকর্ডিং যন্ত্র পরিয়ে ঘুমচক্রের বিভিন্ন ধাপে জাগিয়ে দিয়ে দেখা স্বপ্ন সম্পর্কে তথ্য দিয়েছেন। এইসব গবেষণা থেকে এটা স্পষ্ট যে স্বপ্নের বিষয়বস্তুর মধ্যে ভয়, দুশ্চিন্তা, ঝগড়া-বিবাদের মতো নেতিবাচক আবেগের পরিমাণই বেশি — প্রায় ৭০% এর মতো। ১৫% এর মতো স্বপ্নে বিষয়বস্তু নিশ্চিতভাবে ইতিবাচক আবেগপূর্ণ। এই ফলাফল সব সংস্কৃতিতেই একইরকম। আমাজনের শিকারী-সংগ্রাহক আদিবাসী সমাজ থেকে আধুনিক শহুরে ইউরোপীয় বাসিন্দা হোক, স্বপ্নে কেউ ধাওয়া করছে এই বিষয়টা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। স্বপ্নে উদ্বেগ, ভয় ও বিবাদের পরিমাণ স্বপ্ন-জার্নালেই বেশি দেখা যায় যেখানে স্বেচ্ছাসেবীরা আপনা-আপনি ঘুম থেকে উঠে পড়েন। কিন্তু রাত্রের শেষ তৃতীয়ার্ধে স্বেচ্ছাসেবীদের কৃত্রিমভাবে জাগিয়ে দিয়ে স্বপ্নের বিবরণ নিলে সেখানে নেতিবাচক আবেগের পরিমাণ তুলনামূলক কম দেখা যায় (৭০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ)। এই অসমতার একটি ব্যাখ্যা হলো ঘুম থেকে জেগে উঠে স্বপ্নের নেতিবাচক আবেগগুলোই স্বেচ্ছাসেবীদের বেশি মনে থাকবে। ফ্রয়েডের স্বপ্ন ব্যাখ্যায় যৌন বিষয়গুলো বার বার ঘুরে-ফিরে এলেও সাম্প্রতিক গবেষণা আনুযায়ী ১০% এর চেয়েও কম স্বপ্নে সুস্পষ্ট যৌন বিষয়বস্তু থাকে।গবেষণায় দেখা গেছে ২ শতাংশের চাইতে কম স্বপ্নে বিগত দিনের আত্মকথনমূলক স্মৃতি চলে আসার ঘটনা ঘটে। কোন কোন গবেষক অবশ্য দাবী করেন যে স্বপ্নে দিনের অভিজ্ঞতারা কয়েকদিন দেরী করে ফিরে আসে — তিন থেকে সাত রাত্রি পরে অভিজ্ঞতারা স্বপ্নে দেখা যেতে দেখা যায়।
এমন কি শোনা গেছে কোনো দেশপ্রধান স্বপ্নে দেখেছিলেন তিনি রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী হবেন? সচরাচর শোনা যায় না তবে সেখানে বর্তমান ও ভবিষত্যের সাথে কি করে একসুত্রে গাঁথা যাবে? দেহের মস্তিষ্কের তবে কি ভূমিকা? মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের ভেতর সুপ্রাক্যায়াসম্যাটিক নিউক্লিয়াস নামের একটি জায়গা হলো দেহের মূল সংরক্ষণকারী। এই জায়গায় বিশ হাজার স্নায়ুকোষের একটি নিজস্ব ছন্দ আছে।এই সক্রিয়তার সময়কাল চব্বিশ ঘন্টার কাছাকাছি।কোন প্রাণীর সুপ্রাক্যায়াসম্যাটিক নিউক্লিয়াসটি ক্ষতিগ্রস্থ হলে তার কোন স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণ চক্র থাকে না। বরং সারা দিন ধরেই একটু একটু করে ঘুমিয়ে নেয় তারা।মস্তিষ্কের স্নায়ুবর্তনী ঘুম শুরু হওয়া ও ঘুম চক্রের বিভিন্ন ধাপের সাথে কিভাবে জড়িত থাকে — তা সমকালীন গবেষণার মাধ্যমে বেশ ভালোভাবেই বোঝা গেছে। কিন্তু সুপ্রাক্যায়াসম্যাটিক নিউক্লিয়াস কিভাবে ঘুম-নিয়ন্ত্রক বর্তনীকে প্রভাবিত করে তা এখনো তেমন স্পষ্ট নয়। সুপ্রাক্যায়াসম্যাটিক নিউক্লিয়াসের বিভিন্ন স্নায়ু থেকে অ্যাক্সন বের হয়ে আশেপাশের হাইপোথ্যালামাস অঞ্চলে গিয়ে সিনাপ্সে যুক্ত হয়। এই সংযোগ পরবর্তীতে ব্রেনস্টেম ও থ্যালামাসের দিকে চলে যায়। এছাড়াও এই নিউক্লিয়াস পিনিয়াল গ্রন্থি মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরিত করতে উজ্জিবিত করে। মেলাটোনিনের পরিমাণ রাত গভীর হওয়ার সাথে সাথে বাড়তে থাক। রাত তিনটের দিকে এই হরমোনের পরিমান সর্বোচ্চ হয়ে যায়। মেলাটোনিন সম্পূর্ণ দেহেই ছড়িয়ে যায় কিন্তু ব্রেনস্টেমের ঘুম-নিয়ন্ত্রক বর্তনীর উপরেই মেলাটোনিন মূল প্রভাব রাখে।
কেন স্বপ্ন দেখি এর উত্তরে ঘুম গবেষকদের ব্যাখ্যার ভার্সন আলাদা।এলাকা অনুযায়ী উত্তর আলাদা। অনেকে বলেন স্বপ্নের মূল কাজ হলো মন-মেজাজকে নিয়ন্ত্রণ করা। যেমন শিকাগোর সেইন্ট লুক’স মেডিকেল সেন্টারের গবেষক রোজালিন্ড কার্টরাইট একটি তত্ত্ব খাড়া করেছেন যে স্বপ্ন মেজাজ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নেতিবাচক আবেগগুলোকে প্রক্রিয়াজাত করে। তাই ঘুম থেকে উঠে আমরা সাধারণত ভালো বোধ করি। অন্যদিক মনঃস্তত্ববিদেরা বলবেন স্বপ্ন হলো এক ধরনের মনঃচিকিৎসা। টাফ্টস বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্নেস্ট হার্টম্যান প্রস্তাব করেছেন স্বপ্ন আর মনঃচিকিৎসা দুইই জীবনের আপাত বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলীর মধ্যে সংযোগ স্থাপনের কাজটি করে একটা নিরাপদ ও বাইরের জগত থেকে পৃথক পরিবেশে।
স্বপ্ন অনেকটা ভার্চুয়াল বাস্তবতা।রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ের জোনাথন উইনসন ভাবনা উত্থাপন করেন যে স্বপ্ন আসলে ঘুমন্ত অবস্থায় স্মৃতি প্রক্রিয়াজাত করার একটি উপজাত মাত্র।হার্বার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালেন হবসন বলেন যে ঘুম-চক্রের মূল উদ্দেশ্য হলো স্মৃতি একীভবন ও সংযুক্তিকরণ।সবচেয়ে পছন্দসই ব্যাখ্যা যদি এমন হয় স্বপ্নে সেই সব আচরণকে নিখুঁত করে তোলার মহড়া ঘটে যারা জেগে থাকার সময়ে টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তবে তা সর্বজনগ্রাহ্য।স্বপ্ন ে আমরা সকলে যদি হয়ে উঠতে চায় সে আদর্শ মানুষ তবে সার্থক সে মহড়া।সভ্যাতার এতটা সংগ্রামের পথ অতিক্রম করে জেনে গেছি আমারা স্বপ্নে দেবত্বের বিশ্বাস ভুয়ো।দৈববানীর বাধ্যতা ও মিথ্যা।স্বপ্ন আমাদের মস্তিষ্কজাত,শরীর ও আবেগজাত প্রক্রিয়া।মনের কোনো প্রান্তের প্রতিক্রিয়ার ছবি যা ধরতে চেয়েছিলাম বা ধরতে চায় বা উত্তরণের সেই সূতো যা রঙ্গীন স্বপ্নে গাঁথা হয়েছিল কোনো কালে মনের গহীনে,ফিসফিসিয়ে কেঁদেছিল কোনো যন্ত্রনা,আত্মদর্পনে চুরমার হয়েছিল নীরব কোনো অহংকার।নিজের সমাধির আরেক নাম বুঝি স্বপ্ন যা ভালোবাসার কোনো মহলে যত্নে লালিত!