বীজো পাগলার মুক্তক

বিদ্যুৎলেখা ঘোষ



গাঢ় নীল অন্ধকার নেমে এলে বীজো পাগলা আকাশের দিকে দু চোখ মেলে স্বপ্ন দেখে । বীজো খাবার চিবোতে থাকা মানুষের মুখের দিকে চোখ গোলগোল করে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখে । মুখ থেকে ফু ফু করে ফেলে দেওয়া বীজের দানা কুড়িয়ে জমা করে রাখে কাঁধের ঝুলিতে । বীজো ফুটিফাটা মাটির দিকে তাকিয়ে স্বপ্ন দেখে । আমরা অবশ্য বীজোর মতো এমন করে দেখতে তো পারবো না কোনোদিন । নিশ্চল আমাদের বিশ্বাসের ব্যাকরণগুলো দেখতে দেয় না । দেবে না নিশ্চিত । আমরা জানিনা খোলা চোখে স্বপ্ন দেখার সুলুক সন্ধান । যেমন করে নানান দিকে দু চোখ মেলে বীজো পাগলা দেখতে পারে । ও যে গৎ বাঁধা কলস্বরে অনর্গল হতে শেখেনি । আমরা শিখে নিতে পেরেছি তাই চেন শ'র আওয়াজে আমরা বধির হয়ে যাই ঠিকই তবু বিরক্ত হই না । ইকুইলিব্রিয়াম বিগড়ে দিয়েও এমনি করে যায় যদি দিন যাক না । আমরা ইকুয়াল কুল কুল হয়ে থাকতে পারলেই খুশি । বীজো এসব কিছুর ধার ধারে না । ওর মুক্তকে যে অপার্থিব ধ্বনিময় খবর থাকে সে বোধহয় কেবল নতুন নতুন মরশুমী বীজের মধ্যে ভরা থাকে । সেসব বীজো জানে আর তার বীজ । হ্যাঁ , বীজ । নানান রকম ফুল ফল সব্জির বীজ । ষড়ঋতুর ষড়যন্ত্রের ফল । বীজো পাগলা সেসবের আক্রান্ত এক সংগ্রাহক । যারা চেনে তারাই আহ্লাদ করে এই " বীজো " উপাধি দিয়েছে । পথে ঘাটে গজিয়ে ওঠা মানুষরা এমন করেই তো নাম পায় । বীজোর মধ্যে সংক্রামিত হয়েছে হয়তো তাই কিষাণ সুখের মৌতাত । মহড়া নিতে থাকে রিমঝিম জলনুপুরের দিনগুলো আসবে কবে । উদোম হয়ে ভিজবে , জল ছিটিয়ে ভিজিয়ে দিতে চাইবে যতদূর দেখা যায় সুকনো তৃষ্ণার্ত ফাঁকা জমি । ভিজে ওঠা নরম মাটিতে শুয়ে গড়াগড়ি দিতে দিতে সোঁদা মাটির গন্ধ নিতে পারবে কবে । যেমন করে নারী শরীরের আঘ্রাণে উন্মনা হয়ে ওঠে কোনো পুরুষ শরীর । ধ্বস্ত হয়ে ওঠে দুজন দুজনের দামালপনায় । আরো সরস হলে পরে রোপণে সহায়ক হয়ে উঠবে মাটি । বীজো পাগলা দু হাতে করে আবার কখনো মুখে করে পরিষ্কার করে দেবে আগাছা । তারপর একলাফে উঠে বীজগুলো হাতে নেবে । যারা দেখেছে এমন সময় বীজো পাগলাকে তারা জানে , এই সময়টাতে সে প্রবল এক পুরুষ হয়ে ওঠে । নরম মাটিতে বোধহয় তার কাঙ্ক্ষিত নারীর শরীর খুঁজে পায় । অন্য সময় পায় না । তাই জড়িয়ে রাখতে চায় সবুজ মখমলি শাড়িতে তার নারীকে । ফুটিফাটা জরতি মাটির মুখখানা তার ভীষণ অপছন্দের বলে অন্য পাঁচ ঋতু জুড়ে থাকে কেবল স্বপ্ন আর স্বপ্নে ভিতরে থেকে থেকে শিউরে ওঠা । কেবল মেদুর ধারাপাতের এই দিনগুলিতে রমনের ছন্দে উষ্ণ হতে হতে বুনে যেতে পারে একটার পর একটা বীজ ।