হায় রে স্বপ্ন

ফারহানা রহমান



“ স্বপ্ন সেটা নয় যা তুমি ঘুমিয়ে দেখো। স্বপ্ন সেটা যা তোমাকে ঘুমাতে দেয়না।” ( - এপিজে আবদুল কালাম )

আমি একজন স্বাপ্নিক মানুষ। ছেলেবেলা থেকে আর সবার মতো নানারকম কাল্পনিক, মজার, ভয়ের আর নানা উদ্ভট স্বপ্ন দেখে চলেছি আমিও। আমাকে ঘুমাতে দেয়না এমন স্বপ্নের দ্বারা কতটুকু তাড়িত হয়েছি জানিনা তবে ঘুমালেই আমি স্বপ্ন দেখি আর সেটা প্রায় প্রতিনিয়ত । যদিও আসলে জানিনা স্বপ্ন কি বা মানুষ কেন স্বপ্ন দেখে? সত্যি আমি জানিনা । তবে আমি কিন্তু গত সতের বছর ধরে শুধু একটি স্বপ্নই নানাভাবে ঘুরেফিরে দেখে চলেছি। আর সেটা হলো আব্বা এসেছে আমার কাছে।
২০০০ সালের ২৯ জুন আব্বা মারা গেলো। তখন আমি পাঁড় আস্তিক । আব্বার ঘুমন্ত লাশকে ছুঁয়ে বললাম “ আবার দেখা হবে আব্বা।” এখন আমি ভীষণ দিশেহারা কারণ জানি মানুষ মরে গেলে আর কখনও তার সাথে দেখা হয়না। আস্তিক হওয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা মজার মজার কল্পনার মধ্যে বিচরণ করা থেকে আমি এখন বঞ্চিত। সেটা অবশ্যই একধরনের কষ্ট তাতে কোন সন্দেহ নেই। যাহোক, আব্বা মারা গেলো ঠিকই কিন্তু আমি তো সেটা কিছুতেই বিশ্বাস করিনা। কারণ আমার বিয়ে হয়েছে ১৯৯১ সালে আর তারপর থেকেই আমি আব্বার কাছ থেকে অনেক দূরে থাকি। একই বাসায় যেহেতু থাকিনা তাই মনে হতে থাকে নিশ্চয়ই বাসায় গেলে আব্বাকে আবার দেখতে পাবো। আমি তো আর আব্বার সাথে একবাসায় নাই। আব্বা তো দূরেই থাকে তো একসময় নিশ্চয়ই দেখা হবে। তাই মন আমাকে আব্বার কাছে বারবার নিয়ে যায়।
এরপর থেকে শুরু হলো স্বপ্ন দেখা । ডোর বেল বাজছে । দরজা খুলে দেখি আব্বা তার চিরচেনা জলপাই রঙের পোলো সার্ট পরে ঘরে ঢুকলো। আব্বার সব মিলে দুটো পোলো সার্ট। একটা জলপাই আর একটা অ্যাস। প্যান্টও দুটোই। আর দুটোই অ্যাস। লুঙ্গি একটা ছেঁড়া আর একটা খুব পুরনো। একটা মাত্র স্যান্ডেল স্যু। এই হচ্ছে আব্বা। অথচ বাজারের সবচেয়ে দামী কাপড় দিয়ে আমাদের ড্রেস বানানো হয়। আলনা, আলমারি, ওয়ারড্রব উপচে উপচে আমাদের ড্রেস পড়ে যায়। আমরা দুবোন কখনও একই ড্রেস পর পর দুদিন পরেছি এমন কখনও হয়নি। বাজারে যেদিন প্রথম আম বা লিচু বা অন্য কোন ফল আসবে সেদিনই আব্বাকে কিনতে হবে। আব্বাকে দেখলে বাজারের মাছওয়ালা, মাংসওয়ালা, ফলওয়ালা সবাই মহা খুশী। ঝুড়ি ভরে ভরে বাজার করা আব্বার অভ্যেস ছিল। আব্বা গাদাগাদা বাজার আনতো আর আম্মা সেগুলো পচিয়ে পচিয়ে ফেলে দিতো। এই ছিল আমাদের নিত্য দিনের জীবন।
প্রত্যেকটি বাসার বোধহয় নিজস্ব কিছু অভ্যেস থাকে তো আমাদের বাসার একটা কমন অভ্যেস ছিল সেটা হচ্ছে দিনরাত মগ ভরে ভরে চা বানানো আর যখন যার ইচ্ছে বসে বসে চা বিস্কুট, পাউরুটি এসব খাওয়া। তো ডোরবেল বেজে উঠলো আমিও দরজা খুলে দিলাম। সবাই মিলে চা-নাস্তা খাচ্ছি । নানা কথা হচ্ছে। হঠাৎ মনে হলো আব্বা তো মরে গেছে। আমি জানতে চাইলাম আব্বা তুমি না মরে গেছো? আব্বা বললো “ আর বলিস না গবেটগুলোর কাজ। আমি সেন্স হারিয়ে ফেলেছিলাম আর গবেটগুলো আমাকে মরে গেছি মনে করে কবর দিয়ে আসলো। আমার যখন হুস আসলো আমি কবর থেকে উঠে চলে আসলাম। ” আমাদের বাসায় মাঝে মাঝেই এসব নানারকম কথা বার্তা হতো আর আমরা সবাই হো হো করে হেসে উঠতাম । এবারও তাই হলো আমরা সব ভাইবোন হো হো করে হাসতে লাগলাম।
এই গেলো প্রথম দিকের স্বপ্ন। একইরকম স্বপ্ন দিনের পর দিন দেখতে লাগলাম। আব্বা আসে আমার গায়ের চাঁদর ঠিক করে দেয়, মশারী ঠিকমতো গোঁজা হয়েছে কিনা দেখে , মাঝে মাঝে রান্না করে দেয়। ( আব্বা মাঝেমাঝে রান্না করতো ), চা বানিয়ে দেয়। সিনামা দেখতে নিয়ে যায়। কিন্তু শেষে মনে পড়ে আব্বা না মারা গেছে । তখন জিজ্ঞ্যেস করলেই একই উত্তর দেয়।
এরপর শুরু হলো অন্য স্বপ্ন দেখা । আমি অনেক অনেক উঁচু কোন বিল্ডিংএ উঠে গেছি। অনেক নীচে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে করে আমার ছোট্ট ছেলেটা কাঁদছে। আম্মু আম্মু করে চিৎকার করে চলেছে, কোথাও কেউ নেই যে একটু সাহায্য করবে। ওকে কারা যেন ধরে নিয়ে যাচ্ছে । বা মারছে কিন্তু আমি কিছুতেই নীচে নামতে পারছিনা। আমিও উন্মাদের মতো কাঁদছি তখন আব্বা এসে আমাকে হাত ধরে নীচে নামিয়ে নিয়ে আসলো। তো বেশ কিছুদিন চললো এমন স্বপ্ন। পাগলের মতো দৌড়াচ্ছি তো দৌড়াচ্ছি, হঠাৎ গর্তে পড়ে গেলাম। কিছুতেই উঠতে পারিনা। আব্বা এসে উঠিয়ে দিয়ে গেলো। মাঝেমাঝে দেখতে শুরু করলাম আব্বার সাথে আকাশে উড়ে উড়ে কোথায় যেন চলে যাচ্ছি। সুন্দর সুন্দর বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছি, অনেক উঁচু সিঁড়িতে উঠে যাচ্ছি। একসময় এই পর্ব শেষ হলো।
এরপর শুরু হলো স্কুল জীবনের স্বপ্ন। আমার পিরিয়ড হয়েছে । আম্মাকে এসে বললাম যে হিস্যু দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে । আম্মা এমন চিৎকার দিয়ে গালাগালি শুরু করলো ( আম্মা সারাজীবন শুধু গালাগালি, চিৎকার চেঁচামেচি করেছে কারণ এছাড়া উনি অন্য কোন কাজ পারতো না) আমি কাঁদতে কাঁদতে সারাদিন ঘুরঘুর করলাম। আব্বা অফিস থেকে এসে সব কিছু সামাল দিল। তো এসব স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম। আমার পিরিয়ড হয়েছে আর আব্বাকে বলছি। এইসব।
স্কুলে পড়ার সময় আমি খুব গাছে চড়ে বসে থাকতাম। আমরা যে বাসাটায় থাকতাম তার পিছন দিকটায় অনেক গাছপালা ছিলো। পেয়ারা গাছ, বড়ই গাছ, আম গাছ, কাঁঠাল গাছ, এসব। আমি স্কুল থেকে এসেই পেয়ারা গাছে চড়ে বসে থাকতাম। এটা আমার প্রতিদিনের রুটিন ছিল। তো একদিন বড়ই গাছের অনেক উঁচুতে উঠতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। সেদিন সম্ভবত ছুটির দিন ছিল। আব্বা কেন যেন গাছের নীচেই চেয়ার নিয়ে বসে ছিল আর বই পড়ছিল । আমি হঠাৎ পা পিছলে অনেক উঁচু থেকে পড়ে যাই আর আব্বা তাড়াতাড়ি কোলে নিয়ে দৌড়ে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। আমি ক্লাস সিক্সে পড়ি তখন। এবার শুরু হলো ঐ স্বপ্ন দেখা । আমি গাছ থেকে পড়ে যাচ্ছি আর আব্বা আমাকে কোলে নিয়ে দৌড়াচ্ছে।
এই স্বপ্ন কিছুদিন পরে বন্ধ হলো । এবার আরও ছোটবেলার কাহিনী। আমার তখন ৬/৭ বয়স। আমরা নানা-নানির বাসায় আছি কয়েকমাস হলো। আব্বা দুবাই থেকে এসেছে । গলায় অনেকগুলো সোনার চেইন আর দুহাতে অনেকগুলো ঘড়ি পরে। সত্যি সত্যি কিন্তু এমন হয়েছিলো। একদিন দুপুরে আমরা দুবোন একভাই নানাজির বাসার বারান্দায় খেলছিলাম হঠাৎ দেখি আব্বা কেমন জোবড়া জাবড়া পরে গলায় অনেকগুলো চেইন পরে এসে হাজির। তো আমি সেই স্বপ্নই দেখতে লাগলাম । অনেক অনেকদিন একই স্বপ্ন দেখলাম।
এরপর শুরু হলো আরও ছোটবেলার স্বপ্ন। আমি দোলনায় দুলছি । ৪/৫ বছর বয়স। দুজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জোরে জোরে দোল দিচ্ছে আর আমি মাঝখানে চেইন ধরে বসে আছি। একসময় দোল খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়লাম। আর নীচে পড়ে গেলাম। কিন্তু ওরা তো আর সাথে সাথে দোলনা থামাতে পারেনা। এদিকে আমি দোলনার নীচে । মাথায় বারবার বারি খাচ্ছি। মাথা ফেটে গলগল করে রক্ত পড়ছে। হঠাৎ আব্বা এসে আমাকে তুলে নিলো। কোলে নিয়ে দৌড়াচ্ছে আর দৌড়াচ্ছে...
এটাও একদিন শেষ হলো। এরপর আরও ছোটবেলার । জানিনা বয়স কত হবে । ঐ ৩/৪ বছর হবে হয়তো। কারণ আমার পরের ভাইটা আমার চেয়ে তিন বছরের ছোট। আম্মা আমার ভাইকে বুকের দুধ খাওয়ায়, গোসল করায়, ঘুম পারায়। আর আমিও আমার পুতুলকে দুধ খাওয়াই, ঘুম পাড়াই। একদিন আমি একা একা খেলছি , আব্বা বারান্দায় বসে বসে কি যেন করছে। আমি ঘরের ভিতরে গিয়ে দেখি আম্মা আমার ভাইকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছে। তো আমারও ইচ্ছে হলো কাউকে দুধ খাওয়াতে হবে। আমি যথারীতি আব্বার কাছে গিয়ে বারবার বোলতে লাগলাম আব্বা আমার দুদু খাও। আব্বাও মুখ দিয়ে চুক চুক শব্দ করে দুখ খাওয়ার অভিনয় করতে লাগলো। তো শুরু হলো সেই স্বপ্ন দেখা। আমি আব্বাকে বারবার ঘুরে ঘুরে বলি, আব্বা দুদু খাও, দুদু খাও। আব্বাও চুক চুক করে শব্দ করে বলে খাচ্ছি তো মা , খাচ্ছি তো...।
এভাবেই আমার নিয়তি আমাকে বারবার স্বপ্নের দুয়ারে নিয়ে চলেছে আর আমি কেঁদে চলেছি জীবনের কথা ভেবে । জীবনের প্রাপ্তি, অপ্রাপ্তি, বেদনা, হাহাকার, চাওয়া-পাওয়া এসবই বারবার ভেসে আসে কোন সুদূর অচেনা দ্বীপ থেকে । এসব কিছুই যন্ত্রণায় দগ্ধ করে। কাঁদায় আর পোড়ায়। না পারি সেসব ভার লাঘব করতে না পারি এতো এতো ভারবহন করতে । এ এক এমন জীবন যা তোমাকে স্বপ্নে-বাস্তবে প্রতিনিয়ত পুড়িয়ে পুড়িয়ে খাঁটি সোনা বানাতে চাইবে। পুড়তে পুড়তে তুমি ছারখার হবে, ছাই হয়ে মাটিতে গড়াবে, ভুভুক্ষ হবে, তৃষ্ণার্ত হবে । এবাভেই হয়তো কোন একদিন খাঁদ গলে গিয়ে খাঁটি সোনায় পরিনত হবে । কাঁদতে তো হবেই। হয় স্বপ্নে নয় বাস্তবে। স্বাপ্নিক মানুষের কান্না ঘিরে থাকে সপ্নকে নিয়েই...
হায় রে স্বপ্ন ! তুই আর কত কাঁদাবি আমায় ?