স্বপন বিষয়ক দু-একটি কথা, যা আমি ঠিকমতো জানি না

কৌশিক দত্ত



স্বপ্ন এক বিচিত্র নেশা। ঘুমে পাওয়া স্বপ্নের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না, কিন্তু জেগে স্বপ্ন দেখার আবেশ আছে। এই নেশায় আমরা সকলেই ডুব দিয়েছি কোনো এক গতকাল। কিন্তু দিবাস্বপ্ন আঁকতে আগামীর ক্যানভাস লাগে। এখন বয়স হয়েছে। যা ছিল ভবিষ্যৎ, তার বারো আনা অতীতের অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছে। “আহা, এমনটা হবে” কল্পনা করার অভ্যাস ছেড়েছি বহুদিন। ভবিষ্যৎ যেমন জন্ম দেয় দিবা স্বপ্নের, অতীত তেমনি আশ্রয় নেয় নৈশ স্বপন-শরীরে। আমার কথকতা তাই নিশি-স্বপ্নের কোটরেই আবদ্ধ থাকবে।

স্বপ্ন নিয়ে কাটা-ছেঁড়া করাও এক নেশা। এই বিচিত্র ফেনোমেনা নিয়ে মহাপুরুষেরা বিস্তর গুল মেরেছেন... কেউ সরল বিশ্বাসে, কেউ কুসংস্কারের বশে, কেউ সত্যি সত্যি বিজ্ঞানচর্চা করছেন ভেবে, কেউ বা জনগণকে টুপি পরানোর সদুদ্দেশ্য নিয়ে। স্বপ্নের স্বপ্নীল ব্যাখ্যায় ভরপুর আমাদের সাহিত্য, এমনকি বিজ্ঞানের পাঠক্রম। মনস্তত্বের অন্যতম ভিত্তি হিসেবেও কাজ করেছেন শ্রীমান স্বপন।

মহারাজ বিক্রমাদিত্য স্বপ্নে দেখলেন, তিনি মোষের পিঠে চড়ে দক্ষিণ দিকে চলেছেন। তখনও ফ্রয়েড সাহেব অবতীর্ণ হননি, স্বপ্নতত্ত্ব বিচার করতেন জ্যোতিষীরা। রাজপুরোহিত এবং মন্ত্রীরাও অবশ্য প্রশিক্ষিত ছিলেন এই বিচারে। তাঁরা জানালেন, এ ঘোর দুঃস্বপ্ন। মহারাজের মৃত্যু আসন্ন। তারপর শালিবাহন, ইত্যাদি। স্বপ্নতত্ত্বজ্ঞদের ভবিষ্যদবাণী সত্য হয়েছিল বলে শোনা যায়। স্পষ্টত যমরাজের বাহন মহিষ এবং আর্যমানসে দক্ষিণযাত্রার অশুভ দ্যোতনা (অগস্ত্যযাত্রার মতো) এই সিদ্ধান্তকে নির্ধারণ করেছিল। দীর্ঘ সময় ধরে স্বপ্নের ব্যাখ্যায় এইসব চিহ্ন বা প্রতীক সংক্রান্ত ধারণার (symbology/ semiology) প্রভাব ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সিম্বলগুলি যেহেতু দেশ-জাতি-সংস্কৃতি অনুসারে ভিন্ন, তাই স্বপ্নের বিষয় (content) এবং তার ব্যাখ্যাও বদলে যায় দেশ থেকে দেশে। শোনা যায় বিতর্কিত রোমান সম্রাট ক্যালিগুলা একদা স্বপ্ন দেখেন যে তিনি দেবরাজ জুপিটারের সিংহাসনের সামনে দাঁড়িয়ে, আর জুপিটার তাঁকে লাথি মেরে পৃথিবীতে ফেলে দিলেন। এই স্বপ্নকে সম্রাটের মৃত্যুর সূচক হিসেবে ধরা হয়। সম্রাট স্বয়ং ব্যাপারটা পাত্তা দেননি, কিন্তু স্বপ্নটি দেখার পরদিনই আততায়ীর হাতে খুন হন।

সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ আছে যে স্বপ্নকে যাতে সাধারণ মানুষ অগ্রাহ্য না করতে পারেন এবং স্বপ্নের গূঢ় অর্থ ভাঙিয়ে যাতে পুরোহিত-যাজক-জ্যোতিষী া নিজের প্রাধান্য কায়েম রাখতে পারেন, তা নিশ্চিত করতেই সুপরিকল্পিতভাবে দুঃস্বপ্ন দেখার পর রাজাদের মৃত্যুর এসব কাহিনী প্রচার করা হয়েছে। তবে আধুনিক যুগেও এরকম ঘটনা আছে। আব্রাহাম লিঙ্কন নাকি মৃত্যুর কয়েকদিন আগে স্বপ্নে নিজেকে হোয়াইট হাউজের মধ্যে আততায়ীর হাতে নিহত অবস্থায় দেখেছিলেন। ওয়ার্ড হিল ল্যামনকে তিনি সেকথা বলেওছিলেন, যা লিঙ্কন-হত্যার পর ল্যামন জানান। নিজের দেহরক্ষীকেও নাকি বলেছিলেন এসব কথা। এঁরা মিথ্যে কথা বলেননি ধরে নিচ্ছি, তবু প্রশ্ন থেকে যায়। স্বপ্নে কি দৈব সংকেত পেলেন লিঙ্কন, নাকি নিজের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং গুপ্তচরদের দ্বারা আহৃত তথ্যাদি থেকে যা আশঙ্কা করছিলেন, তেমনই দেখলেন স্বপ্নে? হয়ত ক্যালিগুলা বা বিক্রমাদিত্যের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য সেই তত্ত্ব।

স্বপ্নের গূঢ়ার্থ বোঝার চেষ্টা না করে স্রেফ স্বপ্নে দেখা চিত্রকে স্ব-রূপে গ্রহণ করে অনেকে উপকৃত হয়েছেন বলে জানা যায়। কিছু অমর সাহিত্যের মূল উপাদান “স্বপ্নে পাওয়া”। মেরী শেলীর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, রবার্ট লুই স্টিভেনসনের ডক্টর জেকিল ও মিস্টার হাইড সংক্রান্ত অমর কাহিনী, টিনটিনের তিব্বতী গপ্পো। স্বপ্ন অডিও-ভিজুয়াল মাধ্যম, সুতরাং সিনেমার কাহিনীও যে পাওয়া যাবে এবং সেই সিনেমা সুপারহিট হবে, সন্দেহ কী তায়? জ্বরের ঘোরে ঘোরালো স্বপনে টার্মিনেটরের দেখা পেয়েছিলেন জেমস ক্যামেরন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রই বা পিছিয়ে থাকে কেন? সেলাই মেশিন বানানোর জন্য আবশ্যিক সুঁচের মাথার দিকে ছিদ্র রাখার বুদ্ধি এসেছিল স্বপ্নে নরখাদকদের বল্লমের মাথায় ছিদ্র সেজে। সরলরৈখিক রাসায়নিক সংকেত যখন বেঞ্জিন জাতীয় অ্যারোম্যাটিক যৌগগুলির রূপ কিছুতেই ধরতে পারছিল না, তখন ফ্রেডরিক কেকুলে চক্রাকার (ষড়ভুজ) সেই বেঞ্জিন নিউক্লিয়াসটিকে দেখতে পেলেন স্বপ্নেই। রেনে দেকার্তে বলেছেন, তাঁর যুগান্তকারী বৈজ্ঞানিক দর্শন নাকি তিনি পেয়েছিলেন শেহেরজাদির গল্পের মতো রাতের পর রাত আসা হেমন্তের স্বপ্নমালায়। ওয়াটসন সাহেবের দাবি, ডিএনএ নামক দীর্ঘসূত্রী (দীর্ঘ ও সূত্রবৎ) অণুর সমান্তরাল দ্বিচারিতা বা “double helix model” এর ধারণা তিনি পান স্বপ্নে একটি সর্পিল মই দেখে। ওয়াটসন সাহেবের দাবির সত্যতা এবং তাঁর সততা নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে সন্দেহ আছে। মনে করা হয় তিনি মডেলটি হঠাৎই পেয়েছিলেন, তবে স্বপ্নে নয়, জাগরণে, রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন নামের এক গবেষিকার এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি লব্ধ তথ্য ঘেঁটে। সমাজ মহিলাদের স্বীকৃতি দিতে ভুলে যায়, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও। ওয়াটসন এবং ক্রিক সাহেবদ্বয়ও ফ্রাঙ্কলিনের কাছে ঋণ স্বীকার করতে ভুলে গিয়েছিলেন, অথবা পুং অহং অনেক কম আহত হয়েছিল নারীর বদলে স্বপ্নের কাছে অধমর্ণ হতে। অজুহাতের জোগানদার হিসেবেও সমান দক্ষ শ্রী স্বপনকুমার।

ঘটনা হল, এইসব স্বপ্ন তাঁদের কাছেই এসেছে, যাঁরা সংশ্লিষ্ট বিষয় (অথবা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত বিষয়) নিয়ে দীর্ঘদিন গভীরভাবে চিন্তা করেছেন, অধ্যয়ন বা গবেষণা করেছেন। অবচেতনে থিতিয়ে পড়া সেইসব চর্চার নির্যাসই জন্ম দিয়েছে এমনতর দুনিয়া কাঁপানো স্বপ্নের। অন্য মানুষের কাছে এসব স্বপ্ন আসেনি। অবশ্য জোর দিয়ে বলি কী করে যে আসেনি? আমার স্বপ্নে কোয়ান্টাম ফিজিক্সের জটিল অঙ্কের সমাধান সরল হয়ে ফুটে উঠলেও তাকে চিনতেই পারব না, পরদিন সকালে তা খাতায় লিখে রাখার মতো বিদ্যে নেই, যার ফলে কেউ জানতেই পারবে না যে আমার স্বপ্নে সেসব এসেছিল।

এসব থেকে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে স্বপ্নে কী আসে আর কেন আসে, তার একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা সম্ভব। আসলে মানুষের শেষতম শান্তির স্টেশন তো সবকিছু “বুঝে ফেলা”। অন্য পশুদের মতো শুধু করতে পারা এবং প্রয়োজনীয় জিনিসটুকু পেয়ে যাওয়া নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারে না মানুষ। সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করা চাই, আর নিয়ন্ত্রণের শ্রেষ্ঠ উপায় হল তার চরিত্র বুঝে ফেলা। স্বপ্নকেও তাই বের করে আনা চাই তার রহস্যের মোড়ক ছিঁড়ে, মেলে ধরা চাই টেবিলের উপর ব্যবচ্ছিন্ন ব্যাঙ বা প্রয়াত মানুষের শরীরের মতো। বিজ্ঞানের খিদে স্বপ্নই বা না মেটাবে কেন?

স্বপ্নের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের প্রসঙ্গ উঠলে সবচেয়ে গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হবে সিগমান্ড ফ্রয়েডের নাম। ফ্রয়েড সাহেব কিন্তু প্রাথমিকভাবে স্বপ্নকে তাড়া করেননি। তিনি আগ্রহী ছিলেন মানুষের মনস্তত্ত্ব আর মনের অসুখ নিয়ে। সাইকোলজি তথা সাইকিয়াট্রিকে জীববিজ্ঞানের ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত করাই ছিল ফ্রয়েডের লক্ষ্য, যদিও তাঁর কর্মপদ্ধতি এবং কর্মকাণ্ডকে আজ আর কেউ জীববৈজ্ঞানিক বলবেন কিনা সন্দেহ। সে এক অন্য বিতর্ক।

চিকিৎসায় হিপনোসিস এবং ক্যাথারসিস পরিত্যাগ করার পর মনঃসমীক্ষণে ফ্রয়েড ব্যবহার করতেন “ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন” পদ্ধতি, অর্থাৎ রোগীর মনে যা আসে নিরবিচারে তা বলে যেতে দেওয়া। এই বলে চলা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে তিনি দেখেন রোগীরা বারবার নিজেদের স্বপ্নের কথা বলছেন, অনুধাবন করেন স্বপ্নের গুরুত্ব। স্বপ্নেরা অর্থময়, ছদ্মবেশী স্মৃতি ও ফ্যান্টাসি। অচেতন মনের প্রাসাদে পৌঁছানোর রাজপথ হল স্বপ্ন, সাহেবের মনে হল। শৈশবের অপূর্ণ ইচ্ছা, অভীপ্সা অদৃশ্য বিচারকের চোখ রাঙানিতে গোপন ভূগর্ভস্থ কারাগারে বন্দী (repressed) থাকতে থাকতে নিজের রূপ বদলে একসময় ফিরে আসে স্বপ্ন সেজে। এই অনুমানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্রয়েডের মনোসমীক্ষণের পদ্ধতি মনোরোগীকে হারিয়ে যাওয়া, কবরস্থ শৈশবে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার (regression) চেষ্টা করে।

স্মৃতি ও ঈপ্সার এই চাপা পড়া এবং গ্রহণযোগ্য হয়ে ফিরে আসা ব্যাখ্যা করতে ফ্রয়েড ইগো সাইকোলজির প্রবর্তন করেন। আদিম চাহিদা বা প্রবৃত্তির নাম দিলেন “Id”, যে তাৎক্ষণিক তৃপ্তি খোঁজে। বিবেক (Superego) এক অন্তঃস্থিত বিচারক বা আত্মীকৃত পিতা, যে সর্বদা অবাধ্য সন্তানকে শাসন করে, প্রবৃত্তিকে লুকিয়ে পড়তে বাধ্য করে। নগ্ন প্রবৃত্তিসকল সহজবেশে রাস্তায় বেরিয়ে আসতে পারলে সমাজে গোল বাধিয়ে দিত। আবার চাপা পড়ে থাকা প্রবৃত্তিরা অতৃপ্ত আত্মার মতো মনের ঘাড় মটকায়, শান্তির দফারফা করে। জন্ম নেয় টানাপোড়েন, টেনশন, যা আধুনিক মানুষের নিয়তি। এই জমতে থাকা বাষ্প বিস্ফোরণে শতখণ্ড করে দিতে পারে ব্যক্তি নামক প্রেশার কুকারটিকেই। অগত্যা তাকে সামলাতে আসে ইগো (ego) নামক এক দুঁদে একজিকিউটিভ। বাস্তব ও গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সে প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তির বিবাদ ভঞ্জন করে। স্বপ্ন তার এক অস্ত্র। ছদ্মবেশে, লোকচক্ষুর আড়ালে প্রবৃত্তিকে পরিতৃপ্তি আস্বাদন করায় স্বপ্ন।

কেমনভাবে স্বপ্ন নির্মিত হয়, তার এক রূপরেখা তৈরি করলেন ফ্রয়েড সাহেব। তার নাম হল “dream work” বা “স্বপ্ন কার্যাবলি”। স্বপ্নে আবেগমথিত ভাবনা বা ধারণাসমূহ প্রতীকের মাধ্যমে প্রতিভাত হয়, যাকে তিনি “symbolic representation” বললেন। এই স্বপ্ন-প্রতীক নির্মাণের পথে প্রথমে আসে “ঘনীভবন” (condensation), যেখানে একাধিক অবচেতন ইচ্ছা, প্রবণতা, ভীতি, ইত্যাদি মিলেমিশে একটি প্রতীকে নিবদ্ধ হয়। আবার ঠিক এর উল্টোটাও ঘটতে পারে (irradiation/ diffusion), যেখানে একটি অবচেতন সমস্যা একাধিক প্রতীকের দ্বারা প্রতিভাত হতে পারে। অতঃপর “প্রতিস্থাপন” (displacement), যার দ্বারা মূল ঈপ্সা বা ভীতির বস্তু বা উপলক্ষ্য (object) থেকে মানসিকে শক্তি (energy) প্রতিস্থাপিত হয় এক বিকল্প প্রতীকে, যা অপেক্ষাকৃত বেশি গ্রহণযোগ্য এবং সেন্সরবোর্ডের কাঁচি এড়িয়ে স্বপ্নের পর্দায় সহজে প্রদর্শিত হতে পারে।

এই অব্দি ঘটে যাওয়া ঘটনাবলিকে বলা হল প্রাথমিক প্রক্রিয়া (primary process), যা এক ইতস্তত শুট করা চলচ্চিত্রের রাশ প্রিন্টের চেয়েও অগোছালো। হয়ত তার চিত্রকল্পগুলোই অতি বিচিত্র, দুর্বোধ্য। তাদের দ্বারা মনকে চোখ ঠারার কাজটি ঠিকমতো হবে না। তাই প্রয়োজন “secondary revision” নামক সম্পাদকীয় প্রক্রিয়ার, যা শেষ অব্দি প্রদর্শনযোগ্য এক স্বপ্ন চলচ্চিত্রের জন্ম দেয়।

ফ্রয়েড সাহেবও স্বপ্ন বিশ্লেষণে প্রতীক-তত্ত্বের দ্বারস্থ হয়েছেন। প্রতীকের নির্মাণ সামাজিক এবং তার অর্থগ্রহণ গ্রহীতা-নির্ভর। ফ্রয়েডের গবেষণায় এইসব স্বপ্ন-প্রতীকের বিশ্লেষণ গ্রীক পুরাণ ও রূপকথা, তথা গবেষকের ইহুদী মানসের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত। বহুযুগ লালিত পিতৃতান্ত্রিক ধ্যানধারণা যেমন তাঁর লেখায় মেয়েদের যৌন উত্তরণের গোড়ায় এনে ফেলেছে শিশ্নহীনতার অসহায়তা থেকে জাত ঈর্ষার (penis envy) তত্ত্বকে, তেমনি যৌন ভাবনা ও অপরাধবোধকেই সবকিছুর মূল ভাবতে গিয়ে পিতা-মাতার প্রতি পুত্রের মনোবৃত্তির ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে ইডিপাসের কাহিনীর উপর। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে যে ব্যক্তিগত উদার বিজ্ঞানচেতনা এবং সৎ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বের চরিত্র নির্ধারণ করেছে ইহুদী-খ্রিষ্টান ধর্মীয় জীবনচর্যার গভীরে প্রোথিত যৌন পাপবোধ, যা যতটা ধর্মীয়, ততটা বৈজ্ঞানিক নয়। সিগমান্ড ফ্রয়েডের স্বপ্নকারিকা তত্ত্ব, বিভিন্ন স্বপ্নের অর্থনির্দেশ,ইড-ইগো-সুপ ারইগোর রূপরেখা, ইত্যাদি অনেককিছুই একবিংশ শতাব্দীর মনোরোগ চিকিৎসায় পরিত্যক্ত। কিন্তু স্বপ্নের ঘর খুঁজতে খুঁজতে তিনি পেয়েছিলেন যে সচল অচেতনের (dynamic unconscious) দেখা, আর নির্মাণ করেছিলেন “topographical model” নামের যে ধাঁচা, তা আজও মূল্যবান।

আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান বলে ঘুমের একাধিক স্তর। এক, দুই, তিন, চার করে (বর্তমানে তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরকে একযোগে তৃতীয় স্তর বলা হয়) গভীরতর হতে থাকে ঘুম, আর ধীর থেকে ধীরতর হতে থাকে ইলেক্ট্রোএনসেফালোগ্র াফিতে দৃশ্যমান মস্তিষ্কের তড়িৎক্ষেত্রের পরিবর্তনের হার। এই স্তরগুলিতে চোখ হয় নড়ে না, অথবা অতি ধীরে দোলায় দোলে, তাই এদের “Non-rapid eye movement (NREM) sleep” বলা হয়। এর গভীরতম অংশটি সুষুপ্তি। এরপর আসে “rapid eye movement (REM) sleep”, যখন চোখদুটি দ্রুত নড়াচড়া করে। এই সময়েই আমরা স্বপ্ন দেখি। গবেষণায় দেখা গেছে, দিনের বেলা চোখে কোনো দৃশ্য দেখার সময় মস্তিষ্কের যে অংশগুলি কর্মব্যস্ত হয়ে পড়ে, স্বপ্ন দেখার সময়েও তাদের বেশ কিছু অংশ একই ক্রমে কাজ করে।

স্বপ্নের মধ্যে ঘটে যায় নানা গুরুত্বপূর্ণ স্নায়বিক এবং শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্মৃতির ঘর গোছানো। দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি (long term memory) গঠনে স্বপ্নের ভূমিকা বিরাট। রাতের পর রাত জেগে পড়লে আর ঘুমের মধ্যে মন দিয়ে স্বপ্ন না দেখলে পরীক্ষার হলে সব ভুলে যাবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। স্বপ্নের সময় আমাদের মাংসপেশীগুলি অতি নরম, প্রায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে থাকে। ভাগ্যিস! নইলে স্বপ্নে ফুটবল খেলা দেখে সন্তুমামার মতো আমরা অনেকেই হয়ত স্ত্রীকে এক লাথি মেরে খাট থেকে ফেলে দিয়ে বলতাম, “গো-ও-ও-ও-ল...”!

স্বপ্নের মানে বোঝার চেষ্টা এখনও থামেনি। একথা পরিষ্কার যে অবচেতনে চলতে থাকা নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া স্বপ্নে প্রভাব ফেলে। তবে সর্বদা চাপা পড়ে থাকা গোপন রহস্যময় কিছুই যে তার মধ্যে থাকবে, তার মানে নেই। আজ যে লোকটির সঙ্গে অনেকক্ষণ সময় কাটালেন, তাকেও দেখতে পারেন স্বপ্নে, অথবা যার সঙ্গে বহুযুগ দেখা নেই, তাকেও। সম্প্রতি যে বিষয়টি নিয়ে বিশেষ উৎফুল্ল বা আতঙ্কিত ছিলেন, তা নিয়ে স্বপ্ন দেখার সম্ভাবনা প্রবল, তা আপনার শৈশবের সুপ্ত বাসনার সঙ্গে যুক্ত না হলেও। স্বপ্ন-প্রতীকেরাও সর্বদা পুঁথির নির্দেশানুসারে সুনির্দিষ্ট অর্থ বহন করবে, এমন কোনো কথা নেই। তাদের বিশ্লেষণ করতে হবে ব্যক্তির প্রেক্ষিতেই।

স্বপ্ন জটিল, জীবনের মতোই। স্বপ্ন রহস্যময়। তার চেয়েও বড় কথা, স্বপ্ন প্রায়শ সুন্দর। দুঃস্বপ্ন আপনাকে রেহাই দিক, সুন্দর সিনেমায় ভরে উঠুক সকলের রাতের প্রেক্ষাগৃহ। দেখুন, দেখুন... দেখা প্র্যাকটিস করুন... স্বপ্ন... শয়নে ও জাগরণে।