ঘুমের প্লাবনে ভেসে

স্বরলিপি



ঘুম। এই ছায়া-সংগীত আমাদেরকে দুলিয়ে যায়। এই ছায়া-মৃত্যু আমাদেরকে করে রাখে স্বল্পকালীন মমি।
*ঘুম ঘোর
ঘুম আসলে আমি ক্রমে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থাকি। স্মৃতির পুরনো লাল দালান আমার দিকে ঝুঁকে পড়তে থাকে। এই দালানের একটি রুম আত্মহত্যপ্রবণ। রুমটির দরোজা খুললেই পেয়ে যাই রবীন্দ্রনাথের হাতে-লেখা কোন কবিতা, পেয়ে যাই নূপুরের ধ্বনি অথবা একটি সুইসাডাল নোট।
আমি ডেকে উঠি 'বৌদি... বৌদি...। আঘাত পেয়ে ফিরে আসে নিজেরই কণ্ঠস্বর। নড়ে ওঠে দালানটি। নড়ে উঠি আমি।

তারপর মড়মড়-শব্দ ভেঙ্গে কে যেন হেঁটে যায়। বুকের উঠান ভরে যায় হলুদ পাতায়।

সারাদিনের এক একটি কাজ আর একটু অবসরকে আমি গাছের কাছে জমা করে দেই। খরচের হাত লম্বা করে বলি' যে কেবল ঋণী করে রাখে তাকে ভালবাসতে যাই না। তার কাছে যেতে যেতে হয়ে যাই বিনীত মোমবাতি। দিনে বা রাতে কখন এই মোমবাতি জ্বলবে এ দায়ভার একান্তই তার।
ভালোবাসার মানুষের কাছে কোন ঋণ থাকতে পারে না....
মুক্তা কুড়িয়ে আনার স্মৃতি থাকতে পারে অথবা থাকতে পারে যৌথ মালিকানার একটি অসুস্থ সমুদ্র।

ঋণ এবং প্রেমের প্রতিটি সম্পর্কের শেকড় কাটা পড়ে। তবু একটা ইচ্ছা থেকে যায় পূর্ণদৈর্ঘ্য জুড়ে। ইচ্ছা হয়, সবুজ কাচের আয়নায় আকাশটাকে দেখবো। ভারি হয়ে ওঠে চোখ।
খুব বেশী ক্লান্ত হয়ে পড়লে নিজের বিচ্ছিন্নতার ভেতর গজিয়ে ওঠা পথটি ধরে নিজেকে চালান করে দেই। কখনো-কখনো কোন এক নক্ষত্রের পাশে পেয়ে যাই নিজস্ব একটা কক্ষপথ। কোন কোন সময়ে দেখা হয় কালপুরুষের সাথে।
তারপর আবার নিজের নিশ্বাসের ভেতর খুড়ে চলি পরিচিত-চেতনার সুড়ঙ্গ। খোঁড়া শেষ হলে নেমে পড়ি পৃথিবীর পথে। মাঝের সময়টুকুকে তুমি ঘুম বলতে পারো। আমি আপত্তি করবো না।
*ঘুমের ভাঙ্গা সাঁকো

একটা প্রচ্ছন্ন ছায়া। তার মধ্যে বিলীন হতে হতে নিজেই নিজের কাছে অপরিচিত হয়ে যাই। সম্পূর্ণ অপরিচিত হলে বাকী গল্প অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে!
তবে সব ঘুমের চিত্র এমন নয়। কোন কোন ঘুমের সাঁকো মাঝে-মধ্যে ভেঙে যায়। বেদে বহরের মতো ভেসে আসে গান। কাছে পাই একতারা-দোতারা কখনোবা একটি আকাশ। নিস্তব্ধতা গুণে গুণে পায়চারি। তারপর বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়াই।
বাতাসকে পাওয়া যায় একান্তে। সে ঝিরিঝিরি গল্প শোনায়। অনুভূতিতে ঝাঁকে ঝাঁকে উঠে আসে রেশম পোকা। তারপর আমাকে বিচ্ছিন্ন করে নেয় গান থেকে। বুনতে থাকে; রাগ-অনুরাগ, ঝগড়া-অপেক্ষা অথবা শৈশবে ফেলে আসা স্কুলের পেছনের মাঠটা।
বোনার শব্দ থামে। আমার বিশ্বাসের ঝুনঝুনিতে তখনো বেজে চলে অনেকগুলো 'মিথ্যা'। এই 'মিথ্যাগুলো' দেখতে পথের মতো কিন্তু আমি তাকে রবার্ট ফ্রস্ট নামে ডাকি।
নিজের দিকে হাত বাড়িয়ে দেই। হাত দিয়ে যতোটুকু ছুঁতে পারি তার বাইরের সমস্তটুকু-জুড়ে, জেগে থাকে 'আমিত্ব'।
ঘুম ভাঙলে মাঝে মধ্যে হয়ে যাই কামরাঙা বন। বুকের কাছে জাগিয়ে রাখি গভীর জলের পুকুর। আমার নবাগত ইচ্ছারা কখন যে আমাকে ফাঁকি দিয়ে সেই পুকুরে নেমে যায়, তার খোঁজ কোন দিন পাইনি। নাকের সোনা হারানো গৃহীনির মতো ডুব দেই-বার বার ডুব দেই সেই জলে; তবে জানি না কি খুঁজি।
কাছে-দূরে পাওয়া গন্ধে ও ছন্দে নিজেকে একবার চেক করে চালান করে দেই নিজেরই ভেতর। কুমোরের উনুনের মতো একটি গর্ত পায়ের কাছে জমা হয়।
কিন্তু পা চলতে থাকে নিজের মতো।
*ঘুমের মৌলিক গন্তব্য
অতীতের গল্পগুলো আড়মোড়া ভাঙতে ভাঙতে আমাকে নিয়ে যায় সকালের সিঁড়িতে। বাউকুড়ানি কোন চৈত্র লুকিয়ে ফেলি চোখে জমানো বর্ষায়। অনুভূতিগুলো নীল-সাদা গালিচায় হেঁটে চলে। একটা সময় আমাকে পৌঁছে দেয় মৌলিক গন্তব্যে।